hsc

পাঠ-৭: বায়ুপ্রবাহের শ্রেণিবিভাগ

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.2k

(Classification of Wind Movement)

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল, ঋতু এবং প্রকৃতিভেদে পৃথিবীর বায়ুপ্রবাহকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন- নিয়ত ও স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ। এছাড়া সাময়িক বায়ুপ্রবাহ দেখা যায়।
নিয়ত বায়ু (Planetary winds): এ বায়ুর অপর নাম প্রবাহমান বা স্থায়ী বায়ুপ্রবাহ। বায়ুপ্রবাহের ধর্ম বা বৈশিষ্ট্য
অনুযায়ী সারাবছর নিয়মিতভাবে উচ্চচাপ বলয় থেকে নিম্নচাপ বলয়ের দিকে যে বায়ু প্রবাহিত হয় তা নিয়ত বায়ু নামে পরিচিত। ভূপৃষ্ঠে সাতটি সুনির্দিষ্ট চাপবলয় রয়েছে (চিত্র-৫.১১)। এ চাপ বলয়গুলোর অবস্থান লক্ষ্য করলে বায়ুপ্রবাহের দিক সহজেই জানা যায়। বায়ুপ্রবাহ উচ্চচাপ অঞ্চল হতে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হওয়ার সময় উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে যায়। নিয়ত বায়ুকে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। যথা- (i) অয়ন বা বাণিজ্য বায়ু; (ii) প্রত্যয়ন বা পশ্চিমা বায়; এবং (iii) মেরুদেশীয় বায়ু।

i. অয়ন বায়ু বা বাণিজ্য বায়ু (Trade winds): কর্কটীয় উত্তর-পূর্ব এবং মকরীয় দক্ষিণ-পূর্ব উচ্চচাপ বলয় থেকে
নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে যে বায়ু প্রবাহিত হয় তাকে অয়ন বা বাণিজ্য বায়ু বলে। নিরক্ষরেখার উভয় পার্শ্বে °-° অক্ষাংশের মধ্যে এই বায়ু প্রবাহিত হয়। সমগ্র উষ্ণমণ্ডলের অর্ধেকের বেশি এলাকায় এই বায়ু প্রবাহিত হয়। তবে শীতকালেই এ বায়ু বেশি শক্তিশালী হয়। পূর্বে পালতোলা জাহাজ চলাচলে এই অবাধ গতিসম্পন্ন বায়ুপ্রবাহ বিশেষ উপযোগী ছিল বলে অয়ন বায়ুকে বাণিজ্য বায়ু নামে নামকরণ করা হয়।

বাণিজ্য বায়ুর বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-

১. বাণিজ্য বায়ু উত্তর গোলার্ধে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হয়।
এদের যথাক্রমে উত্তর-পূর্ব অয়ন বায়ু (North-East trade winds) ও দক্ষিণ-পূর্ব অয়ন বায়ু (South-East trade winds) বলে।
২. এ বায়ু ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে ক্রমান্বয়ে উষ্ণ অবস্থায় যখন নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে যেতে থাকে তখন জলীয়বাষ্প বহন করে না। এ কারণে অয়ন বায়ুর গতিপথে বিশ্বের বৃহৎ মরুভূমিগুলো (আফ্রিকার সাহারা, এশিয়ার গোবি) অবস্থিত।

৩. তুলনামূলকভাবে শীতল এলাকা থেকে আসা বায়ুপ্রবাহে মনোরম আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়।

৪. বাণিজ্য বায়ু নিয়মিত ও সুস্থিত (steady)। বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১০-১৫ মাইল হয়।

৫. মহাসাগরের ওপর বাণিজ্য বায়ু অধিক মাত্রায় প্রবাহিত হয়।

৬.প্রশান্ত এই বায়ুপ্রবাহগুলো শীতকালে অত্যন্ত প্রবল এবং গ্রীষ্মকালে অত্যন্ত দুর্বল হয়। আটলান্টিকের চেয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে দুর্বল অবস্থা হয় যখন উত্তর ভারত মহাসাগরে তা মৌসুমি বায়ুপ্রবাহ হিসেবে চলতে থাকে।

৭.অয়ন বায়ু মহাদেশের ওপরে শীতকালে নিয়মিত ও একইরূপে প্রবাহিত হয়।

ii. পশ্চিমা বায়ু (The westerlies): দুই ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় অঞ্চলের দিকে দু'টি বায়ু
সারাবছর নির্দিষ্ট পথে প্রবাহিত হয়। এদেরকে পশ্চিমা বায়ু বলে। এই বায়ু দু'টি ৩৫০-৬০০ অক্ষাংশের মধ্যে প্রবাহিত হয়। বায়ু দু'টির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে-

১. উত্তর গোলার্ধে এই বায়ু দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়। এই বায়ুপ্রবাহকে দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু (South-West westerlies) বলে। দক্ষিণ গোলার্ধে এই বায়ু উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্বে যায়। এই বায়ুপ্রবাহকে উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু (North-West westerlies) বলে। বাণিজ্য বায়ুর বিপরীত দিক থেকে প্রবাহিত হয় বলে পশ্চিমা বায়ুকে বিপরীত বাণিজ্য বায়ু (Anti-trade winds) বলে।
২. উষ্ণ থেকে শীতল অক্ষাংশীয় এলাকার দিকে বায়ু প্রবাহিত হওয়ার ফলে সারাবছর কম-বেশি বৃষ্টিপাত হয়।
৩. এই বায়ু চলাচলের পথে রীতিমতো বায়ুমণ্ডলীয় গোলযোগ (Atmospheric disturbance) সৃষ্টি হয়। ঘূর্ণিঝড়, প্রতীপ ঘূর্ণিবাত (Anti-cyclone), বজ্রঝড়, শক্তিশালী ঘূর্ণন প্রভৃতি সৃষ্টিতে এ বায়ু ভূমিকা রাখে।
৪. পশ্চিমা বায়ু প্রবাহিত এলাকা শীতকালের চেয়ে গ্রীষ্মকালে শান্ত থাকে। এ বায়ুর বিশেষত্ব হচ্ছে শীতকালে বাতাস যেকোনো দিক থেকে প্রবাহিত হতে পারে এবং কদাচিৎ ঘূর্ণিঝড় হয়।
৫. উত্তর গোলার্ধে বেশি স্থলভাগ ও নানারূপ ভূপ্রকৃতির জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ুর দিক ও গতি অধিক পরিবর্তিত হয়। দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগ বেশি থাকায় উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু ৪০০-৪৭০ অক্ষাংশের মধ্যে সারাবছর বাধাহীনভাবে প্রবল গতিতে প্রবাহিত হয়। এজন্য এ অবস্থানকে 'গর্জনশীল চল্লিশা' (Roaring forties) বলা হয়।
৬. পশ্চিমের সমুদ্রের ওপর থেকে জলীয়বাষ্প গ্রহণ করায় এই বায়ুপ্রবাহের ফলে সকল মহাদেশের পশ্চিম উপকূলে বৃষ্টিপাত হয়।
৭. শীতকালে জলভাগ অপেক্ষা স্থলভাগ অধিক শীতল হওয়ার কারণে এই বায়ুপ্রবাহে অধিক বৃষ্টিপাত হয়।

iii. মেরু বায়ু (Polar winds): সুমেরু ও কুমেরু উচ্চচাপ বলয় থেকে নিয়মিতভাবে মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়
দু'টির দিকে বাতাস প্রবাহিত হয়। আমেরিকান আবহাওয়াবিদ উইলিয়াম ফেরেলের সূত্র অনুসারে, বায়ুপ্রবাহ উত্তর গোলার্ধে বেঁকে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ গোলার্ধে বেঁকে দক্ষিণ-পূর্ব বায়ুরূপে প্রবাহিত হয়। এদের যথাক্রমে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব মেরুদেশীয় বায়ু বলে।
এ বায়ুপ্রবাহের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- মেরু এলাকা থেকে আগত এই বায়ু শুষ্ক ও শীতল। ক্রান্তীয় এলাকার নিকট থেকে আগত পশ্চিমা বায়ুর সঙ্গে মেরু বায়ুর সংযোগ হলে ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়। দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগের আধিক্য থাকায় এ বায়ুপ্রবাহ দ্বারা প্রবল ঝড় ও বৃষ্টিপাত সংঘটিত হয়। এ বায়ুপ্রবাহ মেরু বৃত্তপ্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়কে নিচের দিকে ঠেলে দেয়। এ বায়ুর গতিবেগ ঘণ্টায় ২ কি.মি. এর কাছাকাছি।

স্থানীয় বায়ু (Local winds): ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, ভৌগোলিক অবস্থান
প্রভৃতির ওপর নির্ভর করে স্থানীয় বায়ুর সৃষ্টি হয়। এই বায়ুপ্রবাহের স্থায়িত্ব কম এবং সীমিত এলাকা জুড়ে সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বায়ু দু'প্রকারের হয়ে থাকে। যেমন- (ক) উষ্ণ প্রকৃতির স্থানীয় বায়ু (warm) ও (খ) শীতল প্রকৃতির স্থানীয় বায়ু (cold)।

ক. উষ্ণ প্রকৃতির স্থানীয় বায়ু:

১. ফন (Fohn) বা ফেরন (Feron), ২. চিনুক (Chinook), ৩. হারমাট্টান (Harmattan), ৪. খামসিন (Khamsin), ৫. লেভেন্টার (Levanter), ৬. লু (Loo), ৭. পাম্পেরো (Pampero), ৮. বার্গ (Berg), ৯. মিস্ট্রাল (Mistral), ১০. ব্রিকফিল্ডার (Brickfielder) ইত্যাদি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে প্রবাহিত উষ্ণ স্থানীয় বায়ু।

খ. শীতল প্রকৃতির স্থানীয় বায়ু:

১. বোরা (Bora); ২. খাজরী (Khazri), ৩. সার্মা (Sarma), ৪. হওক ইত্যাদি শীতল প্রকৃতির স্থানীয় বায়ু।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...