বারিমণ্ডল (সপ্তম অধ্যায়)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.1k
Please, contribute by adding content to বারিমণ্ডল.
Content

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নের উত্তর দাও

আনোয়ার সাহেব তার ছাত্রদের সাথে পানিচক্রের এমন একটি প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করলেন যে বাষ্পীভবন প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট জলীয়বাষ্প বাম্প বায়ুমণ্ডলের উপরে উঠে ক্রমশ শীতল হয় এবং ঘন হয় বায়ুর আর্দ্রতা ১০০ ভাগ হলে ঘনীভূত জলীয়বাষ্প বৃষ্টিপাত রূপে ফিরে আসে।

(Source and Distribution of Water)

পৃথিবীপৃষ্ঠের মোট আয়তন ৫১০ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার (১৯৭ মিলিয়ন বর্গ মাইল)। এর মধ্যে সমুদ্রের আয়তন প্রায় ৩৬১ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার যা পৃথিবীপৃষ্ঠের মোট আয়তনের শতকরা ৭০.৮ ভাগ। মহাসাগরগুলো আমাদের গ্রহের প্রায় শতকরা ৯৭ ভাগ পানি ধারণ করছে।

পৃথিবীপৃষ্ঠে সমুদ্র ও মহাদেশগুলো ছড়িয়ে রয়েছে। উত্তর গোলার্ধের মোট আয়তনের শতকরা ৩৯ ভাগ স্থল ও ৬১ ভাগ জল আর দক্ষিণ গোলার্ধের শতকরা ১৯ ভাগ স্থল ও ৮১ ভাগ জল। অর্থাৎ দক্ষিণ গোলার্ধে স্থলভাগের পরিমাণ উত্তর গোলার্ধের স্থলভাগের দ্বিগুণেরও অধিক। মহাদেশীয় অংশের ঠিক উল্টো দিকেই রয়েছে সমুদ্রাঞ্চল। অধিকাংশ ভূভাগ যেহেতু (৬৭%) উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত, এ গোলার্ধকে স্থল গোলার্ধ বললে দক্ষিণ গোলার্ধকে জল গোলার্ধ বলা যেতে পারে। উল্লেখ্য ৪০০ থেকে ৬৫° দক্ষিণ অক্ষাংশ পর্যন্ত সমুদ্র পৃথিবীপৃষ্ঠের শতকরা ৮১ ভাগ স্থান দখল করে রয়েছে। পৃথিবীর বুকে সমুদ্র পানির সর্ববৃহৎ আধার বা উৎস হলেও এর আরও অনেক উৎস রয়েছে। উৎস অনুসারে পৃথিবীর জলরাশিকে ৮টি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। যথা-

১. সহজাত পানি (Connate water): পাললিক শিলা সৃষ্টির সময় শিলার মধ্যে যে সামান্য পানি থেকে যায় তাকে সহজাত পানি বলা হয়। পলল ভূমির মাটিতে এই ধরনের পানি অবস্থান করে।
২. উৎসারিত পানি (Juvenile or Magmatic water): ভূপৃষ্ঠের নিচে ম্যাগমা জাতীয় পদার্থের সাথে বাষ্পকণা ঘনীভূত হয়ে এই ধরনের পানি সৃষ্টি করে। এটি পানিচক্রের ক্ষেত্রে তেমন কোনো ভূমিকা পালন করে না।
৩. ঘনীভূত পানি (Condensed water): কোনো শিলার ভেতরকার বায়ু অপেক্ষা বায়ুমন্ডলের জলীয়বাষ্পের চাপ বেশি হলে জলীয়বাষ্প শিলার ছিদ্রের মধ্যে প্রবেশ করে। জলীয়বাষ্প নিম্ন তাপমাত্রা সম্পন্ন শিলার সংস্পর্শে এসে হঠাৎ করে ঘনীভূত হয়ে থাকে। এই পানিকে ঘনীভূত পানি বলে।
৪. সামুদ্রিক পানি (Oceanic water): পৃথিবীর শতকরা ৯৭ ভাগ পানি সমুদ্রের মধ্যে অবস্থান করে। বাষ্পীভবনের ফলে সমুদ্রের পানি বায়ুমণ্ডলে এসে বর্ষণের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠে পতিত হয়।
৫. ভূগর্ভস্থ পানি (Infiltrated water): পৃথিবীর শতকরা ০.৬৮ ভাগ পানি ভূগর্ভস্থ পানি। অনুপ্রবিষ্ট পানি ভূগর্ভস্থ পানির প্রধান উৎস। বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে আকাশের মেঘ থেকে পানি ফোঁটাকারে ভূপৃষ্ঠে পতিত হয়। এই বৃষ্টির পানির কিছু অংশ মাটিতে অনুপ্রবেশ করে।
৬. বরফ ও হিমবাহ (Ice Caps and Glaciers): মেরু ও উচ্চ পর্বতে বরফ ও হিমবাহ আকারে পানি থাকে। পৃথিবীর শতকরা ২.০৫ ভাগ পানি হিমবাহ ও বরফ রূপে অবস্থান করছে। এই বরফের শতকরা ৯০ ভাগ এন্টার্টিকা মহাদেশে সঞ্চিত রয়েছে।
৭. নদী ও হ্রদের পানি (Rivers and Lakes water): পৃথিবীর শতকরা ০.২১ ভাগ পানি নদী ও হ্রদের পানি। আমাজান, নীল নদ, মিসিসিপি, গঙ্গা ইত্যাদি নদী ও কাম্পিয়ান সাগার, কৃষ্ণ সাগর, বৈকাল হ্রদ, ভিক্টোরিয়া হ্রদের মতো পৃথিবীর অসংখ্য নদী ও হ্রদ রয়েছে এই পানির ধারক হিসেবে।

৮. বায়ুমণ্ডলীয় মেঘ (Atmospheric cloud): আকাশে পানি মেঘ ও জলীয়বাষ্প আকারে অবস্থান করে।
অনুকূল পরিবেশে বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে তা পৃথিবীতে ঝরে পড়ে।

পৃথিবীর ভূভাগের পানিআয়তন (মিলিয়ন ঘন কি.মি.)
স্বাদু পানি১০.৫৩
ভূপৃষ্ঠস্থ পানি৯.৫
বরফ২৪.৩৫
হ্রদের পানি০.১৩
নদী, বায়ুমণ্ডল, মৃত্তিকা ও জীবমণ্ডল০.০৮
মোট৪৪.৫৯

বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই

Content added || updated By

(Seas of the World)

সাগর মহাসমুদ্রের অংশ। মহাসমুদ্র হচ্ছে বিশাল লোনা পানির অঞ্চল যা এক মহাদেশের প্রান্ত থেকে বিপরীত দিকে অন্য মহাদেশের প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত গভীর পানির খাত। একটি মহাসাগরে অনেকগুলো সাগর, উপসাগর, অনেক দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জ (জাপান) থাকতে পারে। সাগর হচ্ছে মহাদেশের উপকূলভাগে মহাসাগরের প্রান্তে অবস্থিত জলভাগ যা প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি দ্বারা মহাসাগর থেকে আংশিকভাবে বিচ্ছিন্ন। যেমন- এশিয়ার মূল ভূভাগ দ্বারা প্রশান্ত মহাসাগর থেকে বিচ্ছিন্ন জাপান সাগর বা পূর্ব সাগর। বিভিন্ন সাগরের মধ্যে গভীরতা, আকৃতি ও আয়তনের দিক থেকে ব্যাপক পার্থক্য থাকতে পারে। এশিয়ার পূর্ব উপকূলে অনেকগুলো সাগর আছে। যেমন-দক্ষিণ চীন সাগর, পূর্ব চীন সাগর, জাপান সাগর, ওখটস্ক সাগর, বেরিং সাগর প্রভৃতি। মহাসাগরের প্রান্তে ও মহাদেশের উপকূলে অবস্থিত বিধায় এগুলোকে প্রান্তীয় সাগর (Marginal sea) বলে। যে সকল সাগর মহাদেশের ভূভাগ দ্বারা প্রায় আবদ্ধ ও মহাসাগরের সাথে অগভীর প্রণালি দ্বারা যুক্ত সেগুলোকে ভূমধ্যসাগর বলে (Mediterranean sea)। এগুলোর মধ্যে ভূমধ্যসাগর (ইউরোপ ও আফ্রিকা দ্বারা পরিবেষ্টিত), আর্কটিক

সাগর, মেক্সিকো উপসাগর, কৃষ্ণসাগর, বালটিক সাগর প্রভৃতি প্রধান। অধিকাংশ সাগরের কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য থাকে, যেমন (১) উন্মুক্ত সাগরের সাথে সীমিত যোগাযোগ, (২) পার্শ্ববর্তী মহাদেশের প্রভাব, যেমন- শুষ্ক শীতল বায়ু বা অতিরিক্ত নদীবাহিত পানির প্রবাহ ইত্যাদি, (৩) অতিরিক্ত বাষ্পীভবন অথবা অধিক বারিপাত।

সাগরের সীমানা নির্ধারিত হয় সাধারণত প্রাকৃতিকভাবে স্থলভাগের অবস্থান, দ্বীপ বা উপদ্বীপের অবস্থানের দ্বারা বা নিমজ্জিত দ্বীপ বা দ্বীপপুঞ্জের দ্বারা। সমুদ্রবিজ্ঞানীরা কখনও কখনও কাল্পনিক রেখার দ্বারা এক সাগর অঞ্চল থেকে অন্য সাগর অঞ্চলকে বিভক্ত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বঙ্গোপসাগরের উত্তর এবং পশ্চিম সীমা ভূভাগ দ্বারা বেষ্টিত, পূর্ব দিকে আন্দামান সাগর ও দক্ষিণ দিকে উন্মুক্ত ভারত মহাসাগর। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের সীমা নির্ধারিত হয়েছে আন্তর্জাতিক হাইড্রোগ্রাফিক ব্যুরো কর্তৃক নির্ধারিত একটি কাল্পনিক রেখার দ্বারা। এই রেখা শ্রীলঙ্কার সর্ব দক্ষিণ বিন্দুকে সুমাত্রার সর্ব উত্তর বিন্দুতে যোগ করে বঙ্গোপসাগরকে ভারত মহাসাগর থেকে পৃথক করেছে। তাছাড়া, সমুদ্রের স্রোত, সমুদ্রের পানির অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের ওপর (যেমন- লবণাক্ততা, তাপমাত্রা, অক্সিজেন, নাইট্রেট, ফসফেট ইত্যাদির পরিমাণের ওপর) ভিত্তি করে সমুদ্রের সীমা নির্ধারণ করা হয়।
আংশিক বিচ্ছিন্ন প্রান্তীয় সাগরসমূহের মধ্যে আর্কটিক সাগর সর্ববৃহৎ। এটি আটলান্টিক মহাসাগর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন উত্তরের বর্ধিতাংশ। এই উত্তরের অংশ যা মেরু অতিক্রম করে অগভীর বেরিং প্রণালিতে ৬৬° উত্তর অক্ষাংশে পৌছে। আর্কটিক সাগরে এশিয়ার অনেকগুলো বড় নদী (যেমন- লেনা, ইনিসি, ওব) এসে পতিত হয়েছে। এর ফলে এ সাগরের উপরিভাগের পানির লবণাক্ততা আটলান্টিক মহাসাগরের লবণাক্ততাযুক্ত পানি থেকে অনেক কম। আর্কটিক সাগরের প্রায় শতকরা ৭০ ভাগ অঞ্চল সারা বছরই বরফে আবৃত থাকে। উত্তর গোলার্ধের শীত ঋতুতে আর্কটিক 'সাগরের অধিকাংশ এলাকা সামুদ্রিক বরফে আচ্ছন্ন থাকে।

আয়তনের দিক থেকে পরবর্তী সাগর হচ্ছে ক্যারিবিয়ান সাগর ও মেক্সিকো উপসাগর, যা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সংযোগ স্থলে অবস্থিত। অন্যটি হলো ভূমধ্যসাগর, যা আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যস্থলে অবস্থিত। উভয় সাগর ৩০০ উত্তর অক্ষাংশের উষ্ণ উপক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলে এবং পৃথিবীর বৃহৎ মরুভূমির সন্নিকটে অবস্থিত। উভয় অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বাষ্পীভবনের আধিক্য। তার অর্থ এখানে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে স্বাদু পানি উড়ে যাওয়ার পরিমাণ বারিপাত বা নদীবাহিত পানির সংযোজনের চেয়ে বেশি। এমনকি মিসিসিপি নদী উত্তর মেক্সিকো উপসাগরে পতিত হলেও এর স্বাদু পানি এ অঞ্চলের অত্যধিক বাষ্পীভবনের সাথে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারছে না। ফলে উপরের স্তরের পানি উভয় সাগরেই অত্যধিক লবণাক্ত। নিচের স্তরের পানির লবণাক্ততা অপেক্ষাকৃত কম। বাংলাদেশের উপকূলে অবস্থিত বঙ্গোপসাগরে ঠিক বিপরীত চিত্র পরিলক্ষিত হয়। এখানে পানির লবণাক্ততা সমুদ্রের স্বাভাবিক লবণাক্ততার চেয়ে বেশ কম।

কৃষ্ণসাগর ভূমধ্যসাগরের সাথে বসফরাস প্রণালির দ্বারা সংযুক্ত। এই প্রণালি খুব সরু যার গড় গভীরতা ৭০০ মিটার (২২৭৫ ফুট) এবং সর্বনিম্ন গভীরতা ৪০ মিটারের মতো (১৩০ ফুট)। এমন নিয়ন্ত্রিত প্রণালি দিয়ে ভূমধ্যসাগরের সাথে মুক্ত যোগাযোগ রক্ষা প্রায় অসম্ভব। অতীতে এই অপ্রশস্ত খাল দিয়েই বিশ্ব সমুদ্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা হতো। কৃষ্ণ সাগরের পূর্ব দিকে কাস্পিয়ান সাগর বিশ্ব সমুদ্রের সাথে একদা সংযুক্ত থেকে যোগাযোগ রক্ষা করেছে।
পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সাগরের কিছু তথ্য ছকে দেখান হলো:

সারণি-৭.২: পৃথিবীর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সাগর

সাগরের নামআয়তন (বর্গ কি.মি.)গড় গভীরতা (মিটার)
দক্ষিণ চীন সাগর২,৯৭৪,৬০০১,৬৫২
ক্যারিবীয় সাগর২,৫১৫,৯০০২,৬৪৭
ভূমধ্যসাগর২,৫১০,০০০১,৪২৯
বেরিং সাগার২,২৬১,০০০১,৫৪৭
মেক্সিকো উপসাগর১,৫০৭,৬০০১,৪৮৬
ওখটস্ক সাগর১,৩৯২,১০০৯৭৩
জাপান সাগর৯৭৮,০০০১,৩৫০
পূর্ব চীন সাগর৬৬৪,৬০০১৮৯
আন্দামান সাগর৫৬৪,৯০০১,১১৮
বঙ্গোপসাগর২২,০০,০০০২৬০০

Source: www.the travelalmanac.com

বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই

Content added By

(Oceans of the World)

মহাদেশকে আবৃত করে যেসব বৃহৎ প্রাকৃতিক জলরাশি অবস্থিত সেগুলোকে মহাসাগর বলে। মহাসাগরগুলোর গভীরতা সর্বত্র সমান নয়। মহাসাগরের সর্বাধিক গভীরতা ৯.৬৫ কিলোমিটার। পৃথিবীতে প্রকৃতপক্ষে মহাসাগরগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, আন্তঃসংযোগে সংযুক্ত। মহাসাগরকে ৫টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- ১. প্রশান্ত মহাসাগর, ২. আটলান্টিক মহাসাগর, ৩. ভারত মহাসাগর, ৪. উত্তর মহাসাগর ও ৫. দক্ষিণ মহাসাগর।

প্রশান্ত মহাসাগর (Pacific Ocean): পাঁচটি মহাসাগরের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগর আয়তন ও গভীরতায় সর্ববৃহৎ এবং এর
আয়তন আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরের যুক্ত আয়তনের প্রায় সমান। প্রশান্ত মহাসাগর উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ দ্বারা বেষ্টিত হয়ে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশের অধিক স্থান জুড়ে রয়েছে ও পৃথিবীর মুক্ত পানির অর্ধেকের বেশি ধারণ করছে। প্রশান্ত মহাসাগর সবচেয়ে বেশি গভীর (গড় গভীরতা ৪,২৮০ মিটার বা ১৪,০৪০ ফুট)। এ মহাসাগরে অনেকগুলো গভীর গিরিখাত (Trenches বা সমুদ্রের সবচেয়ে গভীর এলাকা) রয়েছে, যার গভীরতা গড়ে প্রায় ১১,০০০ মিটার (৩৬,০০০ ফুট)। এ গভীর খাত অঞ্চল সক্রিয় আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্প অধ্যুষিত প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল গঠন করেছে এবং এ এলাকা সক্রিয় পর্বত গঠনকারী অঞ্চল। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের প্রায় গোলাকৃতি উপকূল ভাগে অনেকগুলো আগ্নেয়গিরি থাকায় এই উপকূল ভাগকে 'আগ্নেয় মেখলা' (Rings of Fire) বলে।

তুলনামূলকভাবে বেশ কমসংখ্যক নদী প্রশান্ত মহাসাগরে এসে পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে প্রশান্ত মহাসাগরের আয়তন এ মহাসাগরের পতিত সকল নদীর অববাহিকার আয়তনের ১০ গুণ। ফলে অন্যান্য মহাসাগরের তুলনায় প্রশান্ত মহাসাগর মহাদেশের দ্বারা কম প্রভাবিত। প্রশান্ত মহাসাগরে বিশেষ করে দক্ষিণ ও পশ্চিম প্রান্তে দ্বীপ বা দ্বীপপুঞ্জের সংখ্যা অনেক। অধিকাংশ বড় দ্বীপগুলো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্টি হয়েছে এবং এদের অনেকগুলো এখনও সক্রিয়। মৃত বা সুপ্ত আগ্নেয়গিরিগুলো সামুদ্রিক তরঙ্গ স্রোত ও জোয়ার-ভাটা দ্বারা ব্যাপকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। হাওয়াই দ্বীপ, আগ্নেয় অগ্ন্যুৎপাতে সৃষ্ট দ্বীপের উদাহরণ।

আটলান্টিক মহাসাগর (Atlantic Ocean): আটলান্টিক মহাসাগর তুলনামূলকভাবে কম প্রশস্ত এবং উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে ইংরেজি 'S' এর মতো বিস্তৃত। এ মহাসাগরের পূর্ব ও পশ্চিম দুই তীরেই মহাদেশ অবস্থিত। আর্কটিক সাগরসহ এটি সবচেয়ে দীর্ঘ মহাসাগর, যা উত্তর-দক্ষিণ মেরু অঞ্চলদ্বয়কে যুক্ত করেছে। স্থলভাগ সংলগ্ন বহু অগভীর সাগর (ক্যারিবিয়ান, ভূমধ্যসাগর, বাল্টিক, মেক্সিকো উপসাগর ও আর্কটিক সাগর) এবং প্রশস্ত মহীসোপান থাকার দরুন এ মহাসাগর সবচেয়ে কম গভীরতাসম্পন্ন। এ মহাসাগরের গড় গভীরতা ৩,৩৩৯ মিটার (১০,৯৫৫ ফুট)। অনেক নদীর মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুটি নদী আমাজান ও কঙ্গো আটলান্টিক মহাসাগরে এসে পতিত হয়েছে। আটলান্টিকের আয়তন এ মহাসাগরে পতিত নদীসমূহের অববাহিকার আয়তনের মাত্র ১.৬ গুণ।

আটলান্টিক মহাসাগরে তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক দ্বীপ রয়েছে। উত্তর আটলান্টিকে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং দক্ষিণ আটলান্টিকে দক্ষিণ স্যান্ডউইচ দ্বীপ আগ্নেয় দ্বীপ। অন্যান্য দ্বীপ (যেমন- আইসল্যান্ড, আজোরস, সেন্ট পল রক ও ট্রিসটান-দ্য-কুনহা) মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরার অংশ, যা বৃহদাকার সুপরিচিত মধ্য সাগরীয় পর্বতপুঞ্জ। আর্কটিক সাগর মহাসাগরেরই একটি অংশ। বিভিন্ন দিক থেকে আর্কটিক সাগর অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এটি সমুদ্র তলদেশের এক-তৃতীয়াংশ নিমজ্জিত মহীপ্রান্তের (continental margin) দ্বারা গঠিত, এটি সম্পূর্ণভাবে ভূভাগ দ্বারা বেষ্টিত এবং এর অধিকাংশ এলাকা সমুদ্রের বরফ দ্বারা আবৃত। বছরের অধিকাংশ সময় এ সাগরের পৃষ্ঠদেশ ৩ থেকে ৪ মিটার (১০-১২ ফুট) পুরু বরফের (pack ice) স্তর দ্বারা আবৃত থাকে। আর্কটিকের কেন্দ্রাঞ্চল স্থায়ী বরফে আবৃত, যদিও এটি আংশিকভাবে গলে আগস্টের শেষ দিকে পাতলা হয়ে প্রায় ২ মিটার স্তরে এসে পৌঁছে। আটলান্টিক মহাসাগরের দুই প্রান্তে ইউরোপ ও আমেরিকার মতো দুটি শিল্পসমৃদ্ধ মহাদেশ থাকায় বাণিজ্যিক দিক থেকে এই মহাসাগরের গুরুত্ব সর্বাধিক।

ভারত মহাসাগর (Indian Ocean): ভারত মহাসাগরকে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে উত্তর দক্ষিণে প্রলম্বিত °পূর্ব দ্রাঘিমা রেখার দ্বারা বিভক্ত করা হয়েছে, যা আফ্রিকা মহাদেশের সর্ব দক্ষিণ বিন্দু কেপ অব গুড হোপ থেকে এন্টার্কটিকায় স্পর্শ করেছে। প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে এ মহাসাগরের সীমানা ইন্দোনেশিয়ার মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে দক্ষিণ দিকে ১৫০° পূর্ব দ্রাঘিমা বরাবর এন্টার্কটিকায় এসে মিলেছে। উত্তর গোলার্ধে ভারত মহাসাগরের বিস্তৃতি অতি অল্প। এর উত্তরের সীমানা মোটামুটি ২৫° উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত। এ মহাসাগরের খুব অল্পসংখ্যক দ্বীপ ও সংলগ্ন সাগর রয়েছে। ভারত মহাসাগরের গড় গভীরতা ৩,৯৬০ মিটার (১২,৯৯০ ফুট), যা আটলান্টিক থেকে বেশি কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগর থেকে কম। এ মহাসাগরের আয়তন এতে পতিত নদীসমূহের মোট অববাহিকার আয়তনের ৪.৩ গুণ। এ মহাসাগরে এশিয়া তথা পৃথিবীর বৃহত্তম নদীগুলোর কয়েকটি এসে পতিত হয়েছে। নদীগুলো হিমালয় পর্বত থেকে উৎপত্তি হয়ে উত্তর ভারত মহাসাগরে পতিত হয়েছে। প্রধান নদীগুলোর মধ্যে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা বঙ্গোপসাগরে, ইরাবতি আন্দামান সাগরে এবং সিন্ধু নদ আরব সাগরে এসে পতিত হয়েছে।

মহাসাগরগুলোর মধ্যে ভারত মহাসাগর প্রশান্ত ও আটলান্টিকের চেয়ে আয়তনে ছোট। এ মহাসাগরের চারদিকের মহীসোপান তুলনামূলকভাবে অপ্রশস্ত। পৃথিবীর দুটি বৃহৎ নদী (গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র) বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়ে এ সাগরের পানির লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে। নদীবাহিত বিপুল পরিমাণ তলানি জমা হয়ে উত্তর বঙ্গোপসাগরের মহীসোপান বেশ প্রশস্ত হয়েছে। লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের অধিক লবণাক্ত ও উত্তপ্ত পানি সম্পূর্ণ ভারত মহাসাগরকে প্রভাবিত করে। এই উত্তর-পশ্চিম ভারত মহাসাগরে (লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগর ও আরব সাগর) অত্যধিক বাষ্পীভবন, কিন্তু স্বল্প পরিমাণ নদীবাহিত স্বাদু পানি ও বৃষ্টিপাত হওয়ার দরুন এখানে পানি অধিক লবণাক্ত ও ভারি হয়ে নিচের দিকে ডুবে যায় ও সমুদ্রের বিভিন্ন দিকে বিভিন্ন গভীরতায় ভারি পানিপুঞ্জের স্রোত হিসেবে প্রবাহিত হয়।

ভারত মহাসাগরে মৌসুমি বায়ু সৃষ্টি হয়। এই বায়ু উৎপত্তির প্রধান কারণ হলো এটি একদিকে এশিয়া ও ইউরোপের বিশালাকার ভূভাগ দ্বারা উত্তর মেরু অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন, যে অবস্থা অন্য দুটি মহাসাগরে অনুপস্থিত। এর ফলে ভূভাগ ও সমুদ্রের পানির তাপ গ্রহণ ও তাপ বিকিরণের মধ্যে যে প্রক্রিয়াগত পার্থক্য রয়েছে তা সমুদ্র ও স্থলভাগের মধ্যে তাপের পার্থক্য সৃষ্টি করে চাপের বৈষম্য ঘটিয়ে মৌসুমি বায়ুর সৃষ্টি করে। ভারত মহাসাগরের অন্য বৈশিষ্ট্যটি হলো উত্তর মেরু অঞ্চলের সাথে পানির আদান-প্রদান না হওয়া। এ মহাসাগরের অবস্থান এমনই যে, উত্তরের শীতল পানি এসে উষ্ণ পানির সাথে এবং ক্রান্তীয় অঞ্চলের উষ্ণ পানি যেয়ে শীতল পানির সাথে মিশতে পারে না।

উত্তর মহাসাগর (Arctic Ocean): এ মহাসাগর সুমেরুর চারদিকে অবস্থিত। এর প্রায় সমস্ত অংশই সুমেরুবৃত্তের মধ্যে রয়েছে। এটি প্রায় বারো মাসই বরফে ঢাকা থাকে। এ অঞ্চল হতে বহু হিমশৈল ভাসতে ভাসতে দক্ষিণের উষ্ণতর সমুদ্রে প্রবেশ করে। এ মহাসাগরের মোট আয়তন প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। এর গড় গভীরতা ১,০৩৮ মিটার এবং সর্বাধিক গভীরতা ৫,৪৫০ মিটার।

দক্ষিণ মহাসাগর (Southern Ocean): এ মহাসাগরটি এন্টার্কটিকা মহাদেশের চারপাশ ঘিরে বৃত্তাকারে অবস্থিত। এর কিছু অংশ মেরুবৃত্তের ভিতর এবং সামান্য কিছু অংশ মেরুবৃত্তের বাইরে অবস্থিত। এটা প্রায় বারো মাসই বরফে ঢাকা থাকে। অনেক সময় এ মহাসাগর হতে হিমশৈল ভাসতে ভাসতে উষ্ণ মহাসাগরে প্রবেশ করে থাকে। আয়তনে এটি প্রায় ১ কোটি ৪৭ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। গড় গভীরতা ১৪৯ মিটার এবং সর্বাধিক গভীরতা ৫.৭৪ কিলোমিটার।

বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই

Content added By

(Practical: Showing the Area of Oceans on Pie Chart)

সমুদ্রবিজ্ঞানীরা সমুদ্রের অবিচ্ছিন্ন জলরাশিকে পাঁচটি প্রধান মহাসাগরে বিভক্ত করেছেন। এসব মহাসাগরের আয়তন পাইচিত্রে প্রদর্শন করতে হলে আমাদেরকে প্রথমে পাইচিত্র সম্পর্কে জানতে হবে।

পাইচিত্র (Pie Chart)

বৃত্তের সাহায্যে তথ্য প্রদর্শনের পদ্ধতিকে পাই চিত্র বা পাই লেখচিত্র বলে। সাধারণত কতিপয় তথ্যের পরস্পরের মধ্যে এবং ঐ তথ্যগুলোর সমষ্টির সঙ্গে প্রতি তথ্যের সম্পর্ক বুঝাবার জন্য পাইচিত্র ব্যবহৃত হয়। এই চিত্র অঙ্কন করতে বৃত্তের কোনো নির্ধারিত ব্যাসার্ধ থাকে না। যেকোনো ব্যাসার্ধের বৃত্ত অঙ্কন করলেই চলে।

পাইচিত্রের সুবিধা: এই চিত্রের মাধ্যমে কতিপয় তথ্যের পরস্পরের মধ্যে এবং ঐ তথ্যগুলোর সমষ্টির সাথে প্রতিটি তথ্যের সম্পর্ক বুঝানো সহজ। একটি সম্পূর্ণ জিনিসের মধ্যে অবস্থিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলোর আনুপাতিক বিস্তৃতিকে এ চিত্রের মাধ্যমে প্রদর্শন করা সহজ। এটি দেখতেও অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক।

পাইচিত্রের অসুবিধা: এই চিত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন দ্রব্যের উপযোগিতা বা মূল্য বৃদ্ধি বা উৎপাদনের প্রবণতা দেখানো যায় না। এটি দেখামাত্র সঠিক তথ্য জানা সম্ভব হয় না। এটি অঙ্কনও সহজ নয়। হিসাবের ক্ষেত্রে যথেষ্ট মনোযোগী হতে হয়।
অঙ্কন পদ্ধতি

  • প্রথমে প্রদত্ত তথ্য বা উপাত্তের সমষ্টি বের করতে হবে।
  • নির্ণেয় সমষ্টি বা যোগফলকে বৃত্তের কেন্দ্রে উৎপন্ন কোণ ° (ডিগ্রি) এর সমান ধরে নিতে হবে।
  • প্রত্যেকটি উপাত্ত বা তথ্যের মান কত ডিগ্রি, তা নির্ণয় করতে হবে।
  • প্রত্যেক তথ্যের বা উপাত্তের ডিগ্রি নির্ণয়ের জন্য নিচের সূত্রটি ব্যবহার করতে হবে-

কৌণিক মান = ° ×প্রদত্ত সংখ্যা (তথ্য)

প্রদত্ত তথ্য সমষ্টি

  • প্রত্যেক উপাত্তের কৌণিক মানের যোগফল মোট ৩৬০° হয় কিনা বিশেষভাবে লক্ষ রাখতে হবে।
  • বৃত্তের মধ্যে কোণ অঙ্কন করতে চাঁদা ব্যবহার করতে হবে।
  • সব সময় কোণগুলো ডানাবর্তে (Clockwise) অঙ্কন করতে হবে।

নিচে মহাসাগরগুলোর আয়তন দেওয়া হলো-

সারণি- ৭.৩: পৃথিবীর প্রধান মহাসাগরগুলোর আয়তন

মহাসাগরআয়তন (মিলিয়ন বর্গ কি.মি.)%প্রাপ্ত ডিগ্রি
প্রশান্ত মহাসাগর১৬ কোটি ৬০ লক্ষ৪৭.২০.°
আটলান্টিক মহাসাগর৮ কোটি ২৪ লক্ষ২৩.৪০.°
ভারত মহাসাগর৭ কোটি ৩৬ লক্ষ২০.৯০.°
উত্তর মহাসাগর১ কোটি ৫০ লক্ষ৪.৩০.°
দক্ষিণ মহাসাগর১ কোটি ৪৭ লক্ষ৪.২০.°
৩৫,১৭,০০০০১০০৩৬০°

হিসাব: প্রশান্ত মহাসাগরের আয়তন মোট আয়তনের ৪৭.২০ শতাংশ।

সুতরাং, প্রশান্ত মহাসাগরের জন্য প্রাপ্ত কৌণিক মান=° × .=.°

এভাবে প্রাপ্ত কৌণিক মানগুলো ৭.৩ নং সারণিতে সন্নিবেশিত হয়েছে।
মহাসাগরগুলোর আয়তন থেকে নিচে একটি পাইচিত্র তৈরি করা হলো

বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই

Content added By

(Bottom Topography of the Ocean)

মহাসাগর হচ্ছে পৃথিবীর কঠিন ভূত্বকের ওপর লবণাক্ত পানিপূর্ণ খাত। সমুদ্রখাতের তলদেশেও স্থলভাগের ভূপ্রকৃতির মতোই উঁচু-নিচু, পাহাড়, পর্বত ঘেরা অসমতল পৃষ্ঠ বিদ্যমান। সাধারণত সমুদ্রখাতের মধ্যস্থান বরাবর মধ্য সামুদ্রিক শৈলশিরা (mid oceanic ridge), যথেষ্ট সংখ্যক বিস্তৃত খাড়া ঢালযুক্ত উঁচু চ্যুতি (fracture zone), গভীর ও সংকীর্ণ গিরিখাত প্রভৃতি পরিলক্ষিত হয়। সমুদ্র তলদেশের ভূমিরূপগুলোর বৈশিষ্ট্যের মধ্যে মিল থাকলেও প্রত্যেকটি মহাসাগরের তলদেশের ভূমিরূপের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

মহীসোপান (Continental shelf): মহাদেশ ও মহাসাগরের সংযোগস্থল থেকে সাগরের দিকে ক্রমশ নিমজ্জিত মহাদেশের অংশই হচ্ছে মহীসোপান। এ অগভীর অংশটিকে মহাদেশের স্থলভাগের নিমজ্জিত অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি সমুদ্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এ অঞ্চলের গড় প্রশস্ততা প্রায় ৬৫ কি.মি. (৪০ মাইল)। এ অগভীর অঞ্চল সাধারণত ১৩০ মিটারের (৪৩০ ফুট) কম গভীর এবং সমুদ্রের দিকে ক্রমশ ঢালু।

মহীসোপানের বৈশিষ্ট্য সাধারণত পার্শ্ববর্তী স্থলভাগের ভূপ্রকৃতি ও গঠনের ওপর নির্ভর করে। স্থলভাগের উপকূলবর্তী অঞ্চল থেকে আরম্ভ করে অভ্যন্তরে বিস্তীর্ণ অঞ্চল সমতল ও প্লাবন ভূমি হলে সংলগ্ন মহীসোপান অঞ্চলও অত্যন্ত প্রশস্ত ও অল্প ঢালযুক্ত হয়। অন্যদিকে, সমুদ্র উপকূলভাগের ভূপ্রকৃতি পার্বত্যময় ও খাড়া ঢালযুক্ত হলে মহীসোপান সরু প্রকৃতির হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, বঙ্গোপসাগরের উত্তর দিকের বাংলাদেশ সংলগ্ন মহীসোপান প্রথমোক্ত কারণের জন্য বেশ প্রশস্ত। অপরদিকে, দ্বিতীয় কারণের জন্য ভারতের পূর্ব উপকূলে বঙ্গোপসাগরের মহীসোপান অত্যন্ত খাড়া ঢালযুক্ত ও অপ্রশস্ত।

মহীঢাল (Continental slope): মহীসোপানের শেষপ্রান্ত থেকেই আরম্ভ হয় মহীঢাল। সমুদ্রের গভীরতা এখানে হঠাৎ
করে বৃদ্ধি পায় এবং এখানে ঢালের বৃদ্ধির হারের পরিমাণ পূর্বের অগভীর অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। মহীসোপান ও মহীঢাল উভয়কে এক সাথে মহীপ্রান্ত (continental margin) বলা হয়, যা গঠনগত দিক থেকে মহাদেশেরই অংশ। মহাদেশগুলোর স্থলভাগ ও পানিতে নিমজ্জিত মহাদেশের অংশ একত্রে পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রায় শতকরা ৪৪ ভাগ। মহীঢাল মহাদেশীয় ভূভাগের শেষপ্রান্ত।

মহীস্ফীতি (Continental rise) কী?

মহীঢালের শেষপ্রান্তে মহাদেশের ভূভাগ থেকে বাহিত বিপুল পরিমাণ ক্ষয়প্রাপ্ত পদার্থ জমা হয়; এর অপেক্ষাকৃত উচ্চ স্থানটি মহীস্ফীতি নামে পরিচিত। এ পুরু পলি সঞ্চিত অঞ্চলটি মহাদেশ ও সমুদ্র খাতের মধ্যবর্তী অবস্থান্তর অঞ্চল (Transitional Zone)।

গভীর সমুদ্রের পাতাল সমভূমি ও পাহাড় (Deep Oceanic Abyssal plains and hills): মহীঢালের শেষপ্রান্তে বৈচিত্র্যহীন প্রায় সমভূমির আস্তরণ মৃদু ঢালবিশিষ্ট হয়ে সমুদ্রের দিকে প্রসারিত। এই সমপ্রায় ভূমির সৃষ্টি হয়েছে নিকটবর্তী মহাদেশ হতে আনীত পলি থেকে। সামুদ্রিক ক্যানিয়ন থেকে টারবিডিটি স্রোতের মাধ্যমে বাহিত হয়ে সমুদ্রের তলদেশে জমা হয়ে যে পুরু তলানি স্তরের সৃষ্টি হয় তাকে মহীস্ফীতি (continental rise) বলা হয়। অধিকাংশ সময়ে পলির স্তর এত পুরু যে তলদেশের বন্ধুরতা সম্পূর্ণ ঢেকে দিয়ে প্রায় বৈচিত্র্যহীন তলদেশের সৃষ্টি করে, যা গভীর সমুদ্রের পাতাল সমভূমি (abyssal plain) হিসেবে পরিচিত। গভীর সমুদ্রের তলদেশের অধিকাংশ এলাকাই গভীর সমুদ্রের সমভূমির অন্তর্ভুক্ত। বিরাট অঞ্চল জুড়ে প্রায় সমতল থালার মতো ও প্রায়ই মহাদেশের সন্নিকটে অবস্থিত সমুদ্র তলদেশকে গভীর সমুদ্রের সমভূমি বলে। এটি পৃথিবীপৃষ্ঠের সবচেয়ে সমতল এলাকা। মহাদেশের সবচেয়ে সমতল অংশের তুলনায় এখানে ঢালের পরিমাণ ১০০০ ভাগের ১ ভাগের চেয়েও কম। গভীর সমুদ্রের সমভূমি সাধারণত গভীর সমুদ্র পাখা (deep sea fan) এর প্রান্তে দেখা যায়, যা মহীস্ফীতি তৈরি করে। গভীর সমুদ্রের সমভূমি প্রান্তীয় সাগরসমূহে যেমন- মেক্সিকো উপসাগর, ক্যারিবিয়ান সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের চারদিকের প্রান্তে বহু ক্ষুদ্র সামুদ্রিক খাতে বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। গভীর সমুদ্রের তলদেশ (৪০০০ মিটার বা ১৩,০০০ ফুটের চেয়েও অধিক গভীর) পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রায় শতকরা ২৯.৫ ভাগ অঞ্চল জুড়ে রয়েছে। গভীর সমুদ্রখাত সাধারণত ৪০০০ থেকে ৬০০০ মিটার (২.৫ থেকে ৩.৫ মাইল) গভীর। গভীর সমুদ্রের নিম্ন পাতাল পাহাড় (low abyssal hills) যা পার্শ্ববর্তী সমুদ্র তলদেশের তুলনায় ১০০০ মিটারের (৩৩০০ ফুট) চেয়েও কম উঁচু; প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর সমুদ্রের তলদেশের প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ, আটলান্টিক মহাসাগরে প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ ও ভারত মহাসাগরের বিরাট এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এ পাহাড়ের অবস্থান সম্ভবত পৃথিবীপৃষ্ঠে সবচেয়ে সাধারণ ভূমিরূপ, যা প্রায় ২০০ মিটার (৬০০ ফুট) উঁচু ও প্রায় ৬ কি.মি. (৪ মাইল) চওড়া। অধিকাংশগুলোই মৃত ক্ষুদ্র আগ্নেয়গিরি বলে মনে হয়। আগ্নেয়গিরিগুলোর মধ্যবর্তী স্থান থালার মতো খাতবিশিষ্ট ও পলি আবৃত।

বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই

Content added By

(Trenches)

সামুদ্রিক খাত সমুদ্রের তলদেশের সবচেয়ে গভীরতম অংশ, যা গভীর সমুদ্রের সমভূমির প্রান্তে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এগুলো তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ ও অত্যন্ত ঢালযুক্ত ভূমিরূপ এবং সাধারণত কয়েক কিলোমিটার প্রশস্ত ও পার্শ্ববর্তী সমুদ্র তলদেশের তুলনায় প্রায় ৩-৪ কি.মি. (১.৯-২.৫ মাইল) গভীর। অধিকাংশ সামুদ্রিক খাত প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত, যদিও আটলান্টিক মহাসাগরে দুটি ও ভারত মহাসাগরেও একটি রয়েছে।

সামুদ্রিক গিরিখাত (কি.মি.)গভীরতা (কি.মি.)দৈর্ঘ্য (কি.মি.)গড় প্রশস্ততা (কি.মি.)
প্রশান্ত মহাসাগর
কুরিল-কামচাটকা১০.৫২২০০১২০
জাপান৮.৫৮০০১০০
বেনিন৯.৮৮০০৯০
ম্যারিয়ানা১১.০২২৫০৭০
ফিলিপাইন১০.৫১৪০০৬০
টোংগা১০.৮১৪০০৫৫
কারমাডেক১০.০১৫০০8০
অ্যালুসিয়ান৭.৭৩৭০০৫০
মধ্য আমেরিকান৬.৭২৮০০৪০
পেরু চিলি৮.১৫৯০০১০০
ভারত মহাসাগর
জাভা গিরিখাত৭.৫৪৫০০৮০
আটলান্টিক মহাসাগর
পর্টোরিকো৮.৪১৫৫০১২০
দক্ষিণ স্যান্ডউইচ৮.৪১৪৫০৯০

প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্তে সুন্দর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গিরিখাত রয়েছে। এ ধরনের কয়েকটি গিরিখাত আটলান্টিক মহাসাগরে ও উত্তর ভারত মহাসাগরেও দেখা যায়। লম্বা ও অপ্রশস্ত এ গভীর অবনমিত স্থানগুলো সমুদ্রের সবচেয়ে গভীরতম অঞ্চল। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের কয়েকটি গিরিখাত প্রায় ১১,০০০ মিটার বা প্রায় ৩৬,০০০ ফুট গভীর (সারণি ৭.৩)। গিরিখাতগুলোর নিচু ভূপ্রকৃতি ও প্রশস্ত আয়তন সমুদ্রের গভীরতার দিকে প্রায় সমান্তরাল।
অনেক স্থানেই মহীপ্রান্ত বিরাট আকারের সামুদ্রিক ক্যানিয়ন (submarine canyon) দ্বারা কর্তিত। এর অনেকগুলোই আরিজোনার কলোরাডো নদীর গ্রান্ড ক্যানিয়নের চেয়ে আকারে বড়। সমুদ্রের অনেক ক্যানিয়নই বহু বৃহৎ নদীর সাথে সম্পর্কিত, যেমন; কঙ্গো, হাডসন, কলম্বিয়া ও সিন্ধু। বঙ্গোপসাগরের কয়েকটি নদীর মোহনায় ক্যানিয়নের অবস্থান লক্ষণীয়; যেমন: গঙ্গা, কৃষ্ণা, কাবেরী, মহানন্দা প্রভৃতি। যদিও বর্তমানে নদী মোহনার সাথে সামুদ্রিক ক্যানিয়নগুলোর খুব কমই সম্পর্ক রয়েছে। এগুলোর উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিকের বিতর্কিত মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। তবে অনেকেই সমর্থন করেন যে, সামুদ্রিক ক্যানিয়ন কর্দমযুক্ত ঘোলা পানির স্রোতের (turbidity currents) দ্বারা কর্তিত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে। এ স্রোত হলো ঘন কর্দম ও পলি মিশ্রিত পানির স্রোত, যা সমুদ্র তলদেশের ওপর দিয়ে ঢাল বেয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। আবার কেউ কেউ এর সৃষ্টি রহস্যকে হিমবাহ ও অহিমবাহ যুগের আবর্তনে সমুদ্র সমতলের উত্থান ও পতনের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন।

বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই

Content added || updated By

(Mid Oceanic Ridge and Rise)

মধ্য সামুদ্রিক শৈলশিরা পৃথিবীর সকল মহাসাগরের তলদেশেই রয়েছে এবং পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রায় শতকরা প্রায় ২৩ ভাগ এর অন্তর্ভুক্ত। এর কিছু অংশ সমুদ্রের মধ্যস্থল দিয়ে চলেছে যেমন, অসমতল মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা ও মধ্য ভারত মহাসাগরীয় শৈলশিরা। কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্ফীতি (east pacific rise) দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের সন্নিকটে অবস্থিত। এটি ক্যালিফোর্নিয়া উপসাগরের নিকট উত্তর আমেরিকাকে অতিক্রম করে ক্যালিফোর্নিয়া অরিজিন সীমানায় পুনরায় আবির্ভূত হয়েছে। কিছু আগ্নেয় দ্বীপ (যেমন, আইসল্যান্ড) মধ্য সামুদ্রিক শৈলশিরার অংশবিশেষ l

জেনে রাখো:
সক্রিয় অগ্ন্যুৎপাতের (active eruption) আগ্নেয়জাত পদার্থ সঞ্চিত হয়ে শৈলশিরা অঞ্চলে দ্বীপ গঠন করে। যেমন- দক্ষিণ আটলান্টিকের অ্যাসেনসিয়ন দ্বীপ।

সমুদ্রের মধ্যে বহু স্বল্প উচ্চতর পাহাড় রয়েছে যেগুলো সমুদ্র তলদেশ থেকে ১০০০ মিটারেরও কম উঁচু। এখানে তলানি সঞ্চয়ের পরিমাণ অত্যন্ত কম হওয়ার দরুন সমুদ্র তলদেশের বন্ধুরতা সম্পূর্ণভাবে ঢেকে যায় না।

বন্ধুর ও উচ্চ ভূমিরূপসম্পন্ন মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা গভীর সমুদ্রের তলদেশের ১ থেকে ৩ কি.মি.. (০.৬-১.৯ মাইল) পর্যন্ত উঁচুতে অবস্থিত। এটি সমুদ্রের মাঝখান দিয়ে ১৫০০ থেকে ২০০০ কি.মি. (৯০০ ১২০০ মাইল) পর্যন্ত আড়াআড়িভাবে বিস্তৃত এবং কেন্দ্রে খাঁজযুক্ত গ্রস্ত উপত্যকা যা ২৫ থেকে ৫০ কি.মি. (১৫-৩০ মাইল) চওড়া ও ১ থেকে ২ কি.মি. (০.৬-১.২ মাইল) গভীর। এটি অসমতল পর্বত দ্বারা বেষ্টিত যার সবচেয়ে অগভীর চূড়া সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ কি.মি. (১.২ মাইল) গভীরতার মধ্যে অবস্থান করে। পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্ফীতি অনেক কম বন্ধুর। এটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় খাতের পূর্ব প্রান্তের নিকটে অবস্থিত। এটি মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা থেকে স্বতন্ত্র এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মিলিত আয়তনের সমান কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম উঁচু। এ স্ফীতি অঞ্চল পার্শ্ববর্তী সমুদ্র তলদেশ থেকে প্রায় ২ থেকে ৪ কি.মি. (১.২-২.৪ মাইল) উচ্চে অবস্থিত।

ভারত মহাসাগরে উচ্চ ভূপ্রকৃতির মধ্য ভারত মহাসাগরীয় শৈলশিরা লোহিত সাগরের মধ্য বরাবর এশিয়াকে আফ্রিকা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। দক্ষিণে মধ্য ভারত মহাসাগরীয় শৈলশিরার শাখা সক্রিয় মধ্যসাগরীয় শৈলশিরা ও স্ফীতির সাথে যুক্ত হয়ে এন্টার্কটিকাকে পরিবেষ্টিত করেছে। মাদাগাস্কারের নিকট শৈলশিরার একটি নিচু অংশের অবস্থানের ফলে আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে গভীর স্তরের পানির স্থানান্তর সম্ভব হয়েছে।

ভগ্ন এলাকা (Fracture zone): সমুদ্র তলদেশ শত শত ভগ্ন এলাকা দ্বারা কর্তিত। এ অঞ্চলগুলো লম্বা ও সরু প্রায়
১০ থেকে ১০০ কি.মি. (৬ থেকে ৬০ মাইল) এবং অসমতল। ভূমিকম্পপ্রবণ এ অঞ্চলগুলো অনেক উঁচু-নিচু শৈলশিরায় গঠিত। কিছু শৈলশিরা প্রায় ৪,০০০ কি.মি. (২৪০০ মাইল) দীর্ঘ। ভগ্ন এলাকা মধ্য সামুদ্রিক শৈলশিরার কিছু অংশকে স্থানান্তরিত বা কর্তিত (curtail) করে থাকে।

ভগ্ন এলাকা মহাদেশের অভ্যন্তর পর্যন্ত প্রসারিত হয়ে থাকে। পৃথিবীর অন্যতম প্রধান ভগ্ন এলাকা হচ্ছে রোমানচে ভগ্ন এলাকা, যা নিরক্ষরেখার নিকট মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা থেকে ৯৫০ কি.মি. (৬০০ মাইল) স্থানচ্যুত হয়েছে। এটি বৃহৎ চ্যুতি গ্রুপের একটি অংশ। সম্পূর্ণ অঞ্চল প্রায় ১০০ কি.মি. (৬০ মাইল) প্রশস্ত গভীর উপত্যকা সমন্বয়ে গঠিত ও শৈলশিরার দ্বারা বিচ্ছিন্ন।

রোমানচে ভগ্ন এলাকা আটলান্টিক মহাসাগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল যার গভীরতা প্রায় ৭,৯৬০ মিটার (২৬,১০০ ফুট) পর্যন্ত পৌঁছে। মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরার মধ্যে যে নিচু স্থান রয়েছে সেগুলো পশ্চিম আটলান্টিকের তলদেশের সাথে প্রায় বিচ্ছিন্ন পূর্ব আটলান্টিকের গভীর খাতের পানির প্রবাহ ঘটানোর গুরুত্বপূর্ণ প্রবাহ পথ।
ভগ্ন এলাকা হলো সিঁড়ির মতো পর্যায়ক্রমে উঁচু বন্ধুর ভূপ্রকৃতি ও সামুদ্রিক পর্বত বলয় এবং এগুলো প্রশান্ত মহাসাগরে বেশ কয়েক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। বহু চ্যুতির দ্বারা কর্তিত হয়ে সমুদ্রের তলদেশে ভগ্ন এলাকার সৃষ্টি হয়েছে।

বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই

Content added By

(Volcano and Volcanic Islands)

আগ্নেয়গিরি ও আগ্নেয় দ্বীপ সমুদ্রের তলদেশের সাধারণ ভূমিরূপ এবং এটি সাধারণত সমুদ্র তলদেশ থেকে এক কিলোমিটার (০.৬ মাইল) বা তারও অধিক উচ্চে অবস্থান করে। প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে দশ হাজারেরও বেশি আগ্নেয়গিরি রয়েছে। ভূভাগের অধিকাংশ আগ্নেয়গিরির ক্রিয়া সমুদ্রখাতের প্রান্তের নিকটে বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরের চারদিকে সংঘটিত হয়ে থাকে।
অনেক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি মধ্য সামুদ্রিক শৈলশিরায় বা দ্বীপ বলয় থেকে বাইরে সমুদ্রখাতের মধ্যস্থলে দেখা যায়। সামুদ্রিক আগ্নেয়গিরি কখনও আলাদাভাবে আবার কখনও অনেকগুলো এক সাথে দেখা যায়। গভীর সমুদ্রের তলদেশে প্রায় ১০,০০০ আগ্নেয়গিরি আছে এবং এগুলোর অধিকাংশই পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত। সবচেয়ে বড়গুলোর চূড়া পানির ওপরে এসে দ্বীপের সৃষ্টি করেছে। হাওয়াই দ্বীপ এমনি ধরনের আগ্নেয় দ্বীপ। পার্শ্ববর্তী সমুদ্র তলদেশ থেকে প্রায় ৯ কি.মি. (প্রায় ৫.৬ মাইল) উচ্চতাবিশিষ্ট হাওয়াই আগ্নেয় দ্বীপপুঞ্জ মহাদেশীয় ভূখণ্ডের সর্ববৃহৎ পর্বতের চেয়েও বড়।

বক্রাকারে সজ্জিত দ্বীপপুঞ্জ ও তার ভেতরের দিকে জীবন্ত আগ্নেয়গিরিগুলো গিরিখাতের সাথে সম্পৃক্ত। এগুলোকে দ্বীপ বলয় (island arc) বলে। এ ধরনের মহাদেশ-মহাসাগর সীমানা হচ্ছে সক্রিয় পর্বত গঠনকারী অঞ্চল। এ অঞ্চলে বড় ধরনের ভূআন্দোলনের ফলে ঘন ঘন ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত হয়ে থাকে। দ্বীপ বলয় প্রশান্ত মহাসাগরে খুব বেশি দেখা যায়, কিন্তু আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরে এগুলোর সংখ্যা কম। মহাদেশ ও কিছু কিছু বড় দ্বীপ বলয় গোষ্ঠীর (island arc system) মধ্যে অগভীর উপকূলীয় সাগর রয়েছে; যেমন আছে জাপান ও ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জের প্রান্তে।

সমুদ্রের তলদেশের অনেক পর্বত ও বৃহৎ উঁচু টিলা প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘদিনের মৃত আগ্নেয়গিরি। অনেক প্রাচীন মৃত আগ্নেয়গিরি 'বর্তমানে নিমজ্জিত এবং এগুলো প্রবাল শৈল ও প্রবালজনিত পলি দ্বারা আবৃত। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের বারমুডা চুনাপাথর দ্বারা আবৃত একটি প্রাচীন আগ্নেয়গিরি।

সমুদ্রের তলদেশে আগ্নেয়গিরির উৎপত্তি হয় যখন ভূত্বকের দুর্বল অংশের ফাটলের মধ্য দিয়ে ভূগর্ভস্থ ধূম্র, গ্যাস, গলিত শিলা, ভস্ম এবং বিবিধ তরল ও কঠিন ধাতব পদার্থ নির্গত হয়। দীর্ঘকাল ধরে লাভা ও ভস্ম অগ্ন্যুৎপাতের ফলে জমা হয়ে তলদেশে পাহাড়, পর্বত বা উঁচু টিলার সৃষ্টি করে। প্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় ২০টি প্রধান আগ্নেয় অগ্ন্যুৎপাত ঘটে থাকে। এর অর্ধেকেরও বেশি ঘটে থাকে সমুদ্রে। সমুদ্রের পানিতে লুক্কায়িত এবং ভূভাগ অথবা বাণিজ্যিক নৌপথ থেকে দূরে অবস্থিত বলে এ ধরনের অগ্ন্যুৎপাত অদৃশ্যত ও অনথিভুক্ত থেকে যায়। শুধু অগভীর সমুদ্রে ও স্থলভাগে অগ্ন্যুৎপাত ঘটলে তাতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণা করা হয়।

জেনে রাখো:
প্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় ২০টি প্রধান অগ্ন্যুৎপাত ঘটে থাকে। এর অর্ধেকেরও বেশি ঘটে থাকে সমুদ্রে।

আইসল্যান্ডের দক্ষিণে মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরায় সামুদ্রিক অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সারটসে (Surtsey) নামক দ্বীপের সৃষ্টি হয়েছিল। আগ্নেয় ক্রিয়াকলাপ আরম্ভ হয়েছিল ১৯৬৩ সালের নভেম্বর মাসে এবং ৪ বছরেরও অধিককাল ধরে চলেছিল। তিনটি দ্বীপ গঠিত হয়েছিল কিন্তু ক্ষুদ্রাকার দ্বীপটি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বন্ধ হওয়ার খুব কম সময়ের মধ্যেই ঢেউ এর ধাক্কায় ধুয়ে ক্ষয়প্রায় হয়ে যায়। বৃহৎ দ্বীপটি সমুদ্র সমতল থেকে ১০০ মিটারেরও (৩০০ ফুট) বেশি উঁচু হয়ে গঠিত হয়েছিল। অধিকাংশ দ্বীপের ওপর অত্যধিক লাভা প্রবাহের ফলে তার সর্বমোট আয়তন ছিল প্রায় তিন বর্গ কি.মি. (প্রায় ১ বর্গ মাইল)।
আগ্নেয় দ্বীপে সার্বক্ষণিক অগ্ন্যুৎপাতের দ্বারা ভূপৃষ্ঠ নবায়িত না হলে বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ ও ঢেউ দ্বারা দ্বীপ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে সমুদ্র সমতলের নিচে চলে যায়। কখনও কখনও সবিরাম আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত প্রায় ক্ষয়প্রাপ্ত দ্বীপকেও পুনঃগঠিত করে।

দীর্ঘস্থায়ী আগ্নেয়গিরির কেন্দ্রকে উত্তপ্ত বিন্দু (hot spots) বলা হয় যেগুলো সারিবদ্ধভাবে আগ্নেয়গিরির লাইন বা রেখা তৈরি করে এবং সেই বরাবর প্লেটগুলো চলাচল করে। পৃথিবীর অনেক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি মধ্য সামুদ্রিক শৈলশিরার ওপর অথবা নিকটে দেখা যায়; যেমন- আইসল্যান্ড, আজোরস অথবা আটলান্টিক মহাসাগরে অ্যাসেনসন দ্বীপ।
প্লেটের মধ্যে আগ্নেয়গিরির কেন্দ্রের ওপরেও আগ্নেয়গিরি গঠিত হতে পারে। যখন একটি প্লেট আগ্নেয়গিরি কেন্দ্রের ওপর দিয়ে চলে তখন পুরোনো আগ্নেয়গিরি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় এবং নতুন একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরির উদ্ভব হয়। আগ্নেয় দ্বীপের শিকল (chain) অথবা নিমজ্জিত মৃত আগ্নেয়গিরি চূড়া এভাবে গঠিত হয়। দ্বীপের সারিবদ্ধতা প্লেট চলাচলের পথ নির্দেশ করে, যেমন- হাওয়াই দ্বীপের দ্বীপ শিকলের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে সক্রিয় অগ্ন্যুৎপাত সংঘটিত হয়। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের উত্তর-পশ্চিম দিক অপেক্ষাকৃত প্রাচীন। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে মিডওয়ে দ্বীপ শেষবার জীবন্ত বা সক্রিয় ছিল প্রায় ১৮ মিলিয়ন বছর পূর্বে। উত্তর দিকে প্রসারিত, নিমজ্জিত ও মৃত আগ্নেয়গিরিমালা ৪০ মিলিয়ন বছরেরও অধিক পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেট স্থানান্তরের চিহ্ন রক্ষা করছে যখন এটি তার দিক পরিবর্তন করেছিল।

সমুদ্র তলদেশ অথবা দ্বীপে বিরাট অগ্ন্যুৎপাত পর্বতের অংশবিশেষ উড়িয়ে নিতে পারে। পানি গলিত শিলার সংস্পর্শে এসে বিরাট উদগিরণ ঘটাতে পারে। ১৮৮৩ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাভা ও সুমাত্রার মধ্যে অবস্থিত ক্লাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির উদগিরণ জানা অগ্ন্যুৎপাতের মধ্যে অন্যতম ঘটনা। দুইশত বছর নিষ্ক্রিয় থাকার পর আগ্নেয়গিরি কয়েক সপ্তাহের জন্য মধ্যম আকারের সক্রিয়তা পেয়েছিল। ২৬ আগস্ট এক প্রলয়ঙ্করী উদগিরণের শব্দ ১০০ মাইল দূর থেকে শোনা গিয়েছিল এবং পৃথিবীব্যাপী এর ব্যাপকতা নির্ণয় আরম্ভ হয়েছিল। দুই দিনের উদগিরণে দ্বীপের তিনভাগের দুই ভাগই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। উদগিরণের ফলে সৃষ্ট বৃহদাকারের ঢেউ 'সুনামি' উপকূলীয় দ্বীপসমূহের নিচু অঞ্চল প্লাবিত ও ধ্বংস করে প্রায় ৩৬,০০০ লোকের মৃত্যু ঘটিয়েছিল। জাভা দ্বীপে ঢেউয়ের উচ্চতা সমুদ্র সমতল থেকে ৪০ মিটার (১৩০ ফুট) উঁচুতে উঠেছিল এবং অভ্যন্তরে প্রায় ১৬ কি.মি. (১০ মাইল) পর্যন্ত বিধৌত করেছিল। আগ্নেয় ভস্ম বায়ুমণ্ডলে ৫০ কি.মি. (৩০ মাইল) উপরে উঠেছিল এবং ৭৭০,০০০ বর্গ কি.মি. (৩০০,০০০ বর্গ মাইল) জুড়ে পুরু আস্তরণের এবং ৩.৮ মিলিয়ন বর্গ কি.মি. (১.৫ মিলিয়ন বর্গ মাইল) জুড়ে পাতলা আস্তরণের সৃষ্টি করেছিল। মোট ভস্মের পরিমাণ নির্ণয় করা হয়েছিল ১৬ ঘন কি.মি. (৩.৮ ঘন মাইল) এবং নিকটবর্তী দ্বীপসমূহের ওপর ভস্ম স্তরের পুরুত্ব ছিল ১৫ মিটার (৫০ ফুট)। উদগিরণের শব্দ ৫০০০ কি.মি. (৩০০০ মাইল) এর বেশি দূরত্ব থেকে শোনা গিয়েছিল। মিহি ভস্ম কণা স্ট্রাটোস্ফিয়ারে (stratosphere) ঢুকে পড়েছিল এবং পৃথিবীব্যাপী কমপক্ষে তিন বার প্রদক্ষিণ করেছিল। ফলে কয়েক বছর ধরে সুন্দর রঙিন সূর্যাস্তের দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছিল। অধিকাংশ আগ্নেয় ভস্ম উত্তর ভারত মহাসাগরে অবঃক্ষেপিত হয়েছিল।

কখনও কখনও আগ্নেয়গিরির আংশিকভাবে পতন বা ধ্বংস হয়। উদাহরণস্বরূপ- যখন আগ্নেয় উদগিরণ নিমজ্জিত হয় তখন নিচের থেকে উপরের দিকে ধাবিত গলিত শিলাও নিমজ্জিত হতে পারে। যখন এরূপ অবস্থা সংঘটিত হয় তখন আগ্নেয়গিরির ওপরের স্তর ধসে পড়ে শুধু ডুবে যাওয়া জ্বালামুখ (crater) অথবা ক্যালডেরা (caldera) থেকে যায়; যেমন অরিগনের জ্বালামুখ হ্রদ (Oregon crater lake)। যখন ক্যালডেরা উপকূল বরাবর গঠিত হয় তখন এগুলো প্রায়ই গভীর ও গোলাকার উপসাগরের সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে আগ্নেয়গিরির ক্রিয়াকলাপে ক্যালডেরা ভরাট হয়ে আগ্নেয়গিরির উপরিভাগ প্রায় সমতল হয়ে যায়।

বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই

Content added By

(Marginal Ocean Basins)

প্রান্তীয় সমুদ্রখাত মহাদেশের সন্নিকটে অবস্থিত সমুদ্রের তলদেশের বৃহৎ অবনমিত স্থান। এগুলো উন্মুক্ত সমুদ্র থেকে সামুদ্রিক শৈলশিরা, বদ্বীপ অথবা মহাদেশের অংশবিশেষ দ্বারা বিচ্ছিন্ন। প্রান্তীয় সাগর সাধারণত ২ কিলোমিটার (১.২ মাইল) থেকেও বেশি গভীর। প্রান্তীয় সমুদ্রখাতে তিন ধরনের বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। যথাঃ

১. যে খাত দ্বীপমালা ও সামুদ্রিক শৈলশিরার দ্বারা সমুদ্রের ওপরের স্তরের পানিকে আংশিকভাবে ও নিচের স্তরের পানিকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করতে পারে সে জাতীয় খাতই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ইন্দোনেশিয়ার চারদিকে অনেক ক্ষুদ্র খাত ও এশিয়া মহাদেশের প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রান্তে এমন খাতের সুন্দর উদাহরণ রয়েছে। যেমন-জাপান সাগর।
২. দ্বিতীয় প্রকারের প্রান্তীয় খাত দুই মহাদেশের মধ্যে অবস্থিত এবং সাগর সৃষ্টিকারী। যেমন- ভূমধ্যসাগর (ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে), কৃষ্ণসাগর (এখন প্রায় সম্পূর্ণভাবে স্থলবেষ্টিত), মেক্সিকো উপসাগর ও ক্যারিবিয়ান সাগর, (উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে)।
৩. তৃতীয় ধরনের প্রান্তীয় খাত লম্বা, সরু এবং মহাদেশের ভূভাগ দ্বারা বেষ্টিত। লোহিত সাগর, ক্যালিফোর্নিয়া উপসাগর এমন খাতের উদাহরণ।

বৃহৎ স্থলভাগের সন্নিকটে অবস্থিত বিধায় প্রান্তীয় সমুদ্র খাতের বা সাগরের, জলবায়ু উন্মুক্ত মহাসাগরের তুলনায় অনেক বেশি চরমভাবাপন্ন। উচ্চ অক্ষাংশে প্রান্তীয় খাতের সাগরে শীতকালে অত্যন্ত ঠান্ডার দরুন পানি বরফে পরিণত হয়। আঞ্চলিক ও ঋতুভিত্তিক আবহাওয়ার স্পষ্ট ও উল্লেখযোগ্য প্রভাবে প্রান্তীয় খাতের সাগরের পানির প্রবাহ বা সঞ্চালন (circulation) পার্শ্ববর্তী উন্মুক্ত সাগরে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিলক্ষিত হয়।

আমেরিকা ও ইউরোপের চারদিকে মহাদেশের প্রান্ত জুড়ে রয়েছে অগভীর সাগর, অবনমিত এলাকা। যেমন- কানাডার হাডসন উপসাগর। উত্তর ইউরোপের উত্তর সাগর অপর এক নিমজ্জিত মহাদেশের অঞ্চল যেখানে বর্তমানে একমাত্র ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জই সমুদ্র সমতলের ওপরে অবস্থান করছে।

মহাদেশ ও মহীপ্রান্ত (Continents and Continental margins): উত্তর-দক্ষিণে প্রসারিত চারটি ভূভাগ যেমন- ইউরেশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা (উত্তর ও দক্ষিণ), এন্টার্কটিকা ও অস্ট্রেলিয়া বিশ্বব্যাপী সমুদ্রখাতকে বিভক্ত করেছে। এগুলোই মহাদেশ। সমুদ্রস্রোতের ওপর এ সকল ভূভাগের অবস্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সমুদ্র সমতলে সামান্য পরিবর্তনে নিচু এলাকা সহজেই বন্যায় প্লাবিত হয় অথবা পানি শুকিয়ে যায়। তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক সমুদ্র সমতলের পরিবর্তন উপকূলীয় ভূপ্রকৃতির ব্যাপক পরিবর্তন করেছে। সমুদ্র সমতলের পরিবর্তন সমুদ্রখাতগুলোর মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে। যেমন- মধ্য আমেরিকায় বন্যা আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্ত করে।

বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই

Content added By

(BottomTopography of the Bay of Bengal)

ভারতীয় উপদ্বীপের পূর্বদিকে ও বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ভারত মহাসাগরের উত্তর-পূর্ব অংশের নাম বঙ্গোপসাগর, যার তিন দিকই স্থলভাগ দ্বারা বেষ্টিত। শুধু দক্ষিণ দিকে উন্মুক্ত ভারত মহাসাগর। আন্তর্জাতিক হাইড্রোগ্রাফিক ব্যুরোর (International Hydrographic Bureau) জরিপ অনুযায়ী এর দক্ষিণ দিকের সীমারেখা নির্ধারিত হয়েছে একটি বিশেষ কাল্পনিক রেখার সাহায্যে, যা শ্রীলঙ্কার সর্ব দক্ষিণ বিন্দু ডড্রা হেডকে (Dondra Head) সুমাত্রা দ্বীপের সর্ব উত্তর বিন্দুতে সংযোজিত করেছে। বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ অবস্থিত। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ বঙ্গোপসাগরকে পূর্বদিকের আন্দামান সাগর থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।

আয়তন ও গভীরতার দিক থেকে বঙ্গোপসাগর পৃথিবীর সাগরগুলোর মধ্যে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এর আয়তন প্রায় ২.২ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার এবং গড় গভীরতা ২৬০০ মিটার ও সর্বোচ্চ গভীরতা ৫২৫৮ মিটার। বঙ্গোপসাগরের তলদেশের ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ৯০° পূর্ব শৈলশিরা (ninety degree east ridge), বেঙ্গল ডিপ সি ফ্যান (bengal deep sea fan), নিকোবর ফ্যান (nicobar fan), সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড (swatch of no ground), বার্মা খাত (burma trench) ও চাগোস পূর্ব-উপকূল খাত (chagos east coast trench) উল্লেখযোগ্য। ৯০° পূর্ব শৈলশিরা বঙ্গোপসাগরের মাঝখান দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে প্রায় ৯০° পূর্ব দ্রাঘিমা বরাবর বিস্তৃত। এ শৈলশিরা °

জেনে রাখো:
১৪ মার্চ, ২০১২ সালে বাংলাদেশ-মায়ানমার মামলায় আন্তর্জাতিক আদালত থেকে বাংলাদেশ ন্যায্যভিত্তিক দাবির পক্ষে ঐতিহাসিক রায় পায়। এ রায়ের ফলে বাংলাদেশ প্রায় এক লক্ষ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি জলসীমা পেয়েছে। বাংলাদেশ এ রায়ের মাধ্যমে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে উপকূলীয় বেজলাইন ধরে ১২ নটিক্যাল মাইল রাষ্ট্রাধীন সমুদ্র এলাকা (territorial sea) এবং ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল বা একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল (exclusive economic zone) পেয়েছে।

উত্তর অক্ষাংশ থেকে আরম্ভ করে ৩০° দক্ষিণ অক্ষাংশ পর্যন্ত প্রায় ৫০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। ৯০° পূর্ব শৈলশিরার পশ্চিমে বেঙ্গল ফ্যান ও পূর্বে নিকোবর ফ্যান অবস্থিত। বেঙ্গল ডিপ সি ফ্যান ২০০ উত্তর অক্ষাংশ থেকে শুরু হয়ে ° দক্ষিণ অক্ষাংশ পর্যন্ত প্রায় ৩০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১০০০ কিলোমিটার প্রশস্ত (curray and moore, 1971)। নিকোবর ফ্যানের পূর্ব প্রান্তে আন্দামান সুন্দা ট্রেন্স (andaman sunda trench) অবস্থিত। বঙ্গোপসাগরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূপ্রাকৃতিক ও ভূমিরূপগত বৈশিষ্ট্য হলো গঙ্গা গিরিখাত (ganges canyon), যা সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড (swatch of no ground) নামে বিশেষভাবে পরিচিত। এটি একটি অত্যন্ত খাড়া তীরবিশিষ্ট সামুদ্রিক গিরিখাত, যা উত্তর-পূর্ব দিক থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রশস্ত ও গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ থেকে মাত্র ২৪ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত।

সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের উপস্থিতি জোয়ার-ভাটা, পললের গতিবিধি ও অবক্ষেপণ, পানির গতি-প্রকৃতি ও ভূমিরূপের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এ ক্যানিয়নের উৎপত্তি ও ভূমিরূপ সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদীবাহিত পলি সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের মধ্য দিয়ে টারবিডিটি স্রোতের মাধ্যমে প্রায় ৩০০০ কিলোমিটার দক্ষিণে পরিবাহিত হয়। এ পলি মিশ্রিত স্রোত বঙ্গোপসাগরের তলদেশে অগভীর খাতের সৃষ্টি করে শিরা-উপশিরার আকারে জালের বেষ্টন নির্মাণ করেছে, যাকে বেঙ্গল ফ্যান (bengal fan) বা গাঙ্গেয় ফ্যান (ganges fan) বলা হয়। পৃথিবীর গভীর সমুদ্রে আর এমন কোনো অঞ্চল নেই যেখানে নদীবাহিত তলানি দ্বারা সমুদ্র তলদেশ বঙ্গোপসাগরের মতো এতটা প্রভাবিত হয়।
বঙ্গোপসাগরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ভূমিরূপগত বৈশিষ্ট্য হলো বার্মা খাত। এটি সমুদ্রের তলদেশে লম্বা, কিন্তু সরু ও তুলনামূলকভাবে খাড়া ঢালবিশিষ্ট নিম্নভূমি। এটি বঙ্গোপসাগরের পূর্ব প্রান্তে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বার্মা উপকূল বরাবর অবস্থিত। চাগোস পূর্ব-উপকূল খাত খুলনার পশুর নদীর মোহনার নিকট থেকে আরম্ভ করে শ্রীলংকা অতিক্রম করে আরও দক্ষিণ দিকে বিস্তৃত।

বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই

Content added By

(Bottom Topography of the Pacific Ocean)

প্রশান্ত মহাসাগর পৃথিবীর বৃহত্তম মহাসাগর। এর মোট আয়তন প্রায় ১৬.৬ কোটি বর্গ কিলোমিটার; অর্থাৎ সমগ্র পানিরাশির ৪৬% এবং সমগ্র ভূপৃষ্ঠের ৩২%। এর শীর্ষদেশ বেরিং প্রণালি হতে ক্রমশই দক্ষিণ দিকে সর্বাধিক বিস্তৃতি লাভ করেছে এবং নিরক্ষরেখার নিকট এটি সর্বাধিক প্রশস্ত। উত্তর-দক্ষিণে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪,৯৬২ কিলোমিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তার ১৬,০৮৯ কিলোমিটার। অর্থাৎ উত্তর-দক্ষিণ সীমার দূরত্ব পূর্ব-পশ্চিম সীমার চেয়ে সামান্য কম। এর আকৃতি বৃহদাকার ত্রিভুজের ন্যায়। এ মহাসাগরের পূর্ব দিকে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং পশ্চিমে এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও এন্টার্কটিকা মহাদেশ অবস্থিত।

প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ: প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ অন্যান্য মহাসাগরের তলদেশ অপেক্ষা বেশি গভীর। এ মহাসাগরের অধিকাংশই গভীর সমুদ্রের সমভূমি (deep sea plains) অঞ্চল নিয়ে গঠিত। এর গভীরতা গড়ে ৭.২৪ কিলোমিটার (৪,০০০ ফ্যাদম)। এ মহাসাগরের শতকরা প্রায় ৭৮ ভাগ স্থানের গভীরতা ৩.৬৫ কিলোমিটারের বেশি।

মহীসোপান ও মহীঢাল: অন্যান্য মহাসাগরের তুলনায় প্রশান্ত মহাসাগরের মহীসোপান খুবই কম। এর পশ্চিম উপকূলের নিকটবর্তী ওখটস্ক সাগর, পীত সাগর, পূর্ব চীন সাগর প্রভৃতি মহীসোপানের অন্তর্গত। এশিয়ার উপকূলবর্তী এ সাগরগুলো বাদে সমগ্র প্রশান্ত মহাসাগরের চতুর্দিকে মহীসোপান খুবই অপ্রশস্ত। কারণ কোনো কোনো স্থানে সমুদ্রের তীরস্থ অংশ খাড়াভাবে গভীর সমুদ্রে প্রবেশ করেছে। এ মহাসাগরের পূর্ব তীর বরাবর উত্তর-দক্ষিণে রকি ও আন্দিজ পর্বতশ্রেণি থাকায় সেখানকার উপকূল মহীসোপানবিহীন। অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব প্রান্তে উচ্চভূমি থাকায় সেখানকার উপকূলেও কোনো মহীসোপান গড়ে ওঠেনি। মহীসোপান কম থাকায় এ মহাসাগরে মহীঢালের পরিমাণই বেশি।

তলদেশের উচ্চভূমিসমূহ: প্রশান্ত মহাসাগরের উচ্চভূমির মধ্যে কতিপয় মালভূমি ও শৈলশিরা এবং ছোট-বড় অসংখ্য দ্বীপ রয়েছে। যেমন-

মালভূমি: প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে কয়েকটি মালভূমি রয়েছে। কোনো কোনো স্থানে এ মালভূমি এত উঁচু যে, এদের উপরিভাগে পানির গভীরতা মাত্র ১৮০ মিটার। এ মালভূমিগুলোর মধ্যে বিখ্যাত মালভূমি হলো অ্যালবাট্রস মালভূমি (albatross plateau)। এটি প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব প্রান্তে ক্যালিফোর্নিয়া উপদ্বীপের দক্ষিণ সীমা হতে দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডর পর্যন্ত বিস্তৃত। চিলির পশ্চিম দিকে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত মালভূমিকে দক্ষিণ-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় মালভূমি বলা হয়।

শৈলশিরা: প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ সীমায় এন্টার্কটিকা মহাদেশের মধ্যে সুউচ্চ প্যাসিফিক এন্টার্কটিকা শৈলশিরা অবস্থিত। এ শৈলশিরা অ্যালবাট্রস মালভূমি ও দক্ষিণ-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় মালভূমির সাথে উচ্চ অংশ দিয়ে সংযুক্ত। এটি মূল প্রশান্ত মহাসাগরীয় তলদেশকে দক্ষিণ আমেরিকা ও এন্টার্কটিকা হতে পৃথক করে রেখেছে। এ শৈলশিরা নিরক্ষরেখার দক্ষিণ দিয়ে পশ্চিম দিকে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত।

এ মহাসাগরের সমগ্র পশ্চিম প্রান্ত ব্যাপী একটি অপ্রশস্ত ও সুদীর্ঘ শৈলশিরা জাপান হতে দক্ষিণ দিকে অস্ট্রেলিয়ার পূর্বপ্রান্ত ও নিউজিল্যান্ড হয়ে দক্ষিণ মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। অবশ্য এ শৈলশিরাটি কয়েকটি স্থানে বিচ্ছিন্ন।

দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জ : প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে পাত সীমানা বরাবর ভূঅভ্যন্তরস্থ লাভা নির্গত হয়ে ছোট-বড় অসংখ্য দ্বীপ
বৃত্তচাপের আকৃতি গঠন করে আগ্নেয় দ্বীপবলয় সৃষ্টি করেছে। অ্যালিউসিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, কিউরাউল দ্বীপপুঞ্জ, জাপান দ্বীপপুঞ্জ, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ, ইন্দোনেশিয়ান দ্বীপপুঞ্জ ইত্যাদি দ্বীপমালাগুলো এশিয়া পাতের আঘাতে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে উত্তল আকৃতিযুক্ত হয়েছে। এ মহাসাগরের প্রায় সব দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জ আগ্নেয় দ্বীপের অন্তর্গত হলেও মহাসাগরীয় পাতের কিছু অংশ সংঘর্ষের ফলে বর্তমানে মহাদেশ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে দ্বীপের আকার ধারণ করে এ মহাসাগরে অবস্থান করছে। অ্যালিউসিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, চিলির দ্বীপপুঞ্জ, জাপান দ্বীপপুঞ্জ ইত্যাদি এ ধরনের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এছাড়া প্রবাল কীটের দেহাবশেষ সঞ্চিত হয়ে প্রবাল দ্বীপের সৃষ্টি হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার আশপাশে এ জাতীয় অনেকগুলো দ্বীপ রয়েছে।

গভীর খাত: প্রশান্ত মহাসাগরের প্রান্তদেশে বহুসংখ্যক সুদীর্ঘ গভীর সমুদ্রখাত এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ গভীর সমুদ্রখাতগুলোর অধিকাংশই ভূপৃষ্ঠের উচ্চ আগ্নেয় পর্বতের নিকটতম স্থানে অবস্থিত। কোনো কোনো স্থানে সমুদ্রখাতগুলো আগ্নেয় পর্বতসমূহের সাথে সমান্তরালভাবে অবস্থিত। কারণ পাত সীমানা বরাবর পাতগুলোর মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলেই খাতগুলোর সৃষ্টি হয়েছে। এ সকল গভীর সমুদ্রখাত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্তেই অধিক দেখতে পাওয়া যায়। এ সকল গভীর সমুদ্রখাতের মধ্যে গুয়াম দ্বীপের ৩২২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ম্যারিয়ানা খাত (mariana trench) সর্বাপেক্ষা গভীর। এর গভীরতা ১০.৮৬ কিলোমিটার (৫,৯৪০ ফ্যাদম) এবং এটাই পৃথিবীর গভীরতম খাত। এর দক্ষিণ-পূর্বে চ্যালেঞ্জার ডিপের অবস্থান (challenger deep), যা পৃথিবীর গভীরতম স্থান। অন্যান্য খাতগুলোর মধ্যে ফিলিপাইনের উত্তর-পূর্বে এমডেন খাত (১০৭৯৪ মিটার বা ৫,৯০২ ফ্যাদম), ফিলিপাইনের দক্ষিণ-পূর্বে মিন্ডানাও দ্বীপের পার্শ্বে মিন্ডানাও খাত (১০৭৯০ মিটার বা ৫,৯০০ ফ্যাদম), জাপানের দক্ষিণ-পূর্বে জাপান খাত (১০৫৫৪ মিটার বা ৫,৭৭১ ফ্যাদম), কিউরাইল দ্বীপপুঞ্জের পূর্বে কিউরাইল বা টাস্কারোবা খাত (৮,৫১৮ মিটার) এবং আরও উত্তরে অ্যালিউসিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণে অ্যালিউসিয়ান খাত (৯,১৪৮ মিটার) অবস্থিত। এ সকল খাত এশিয়ার পূর্ব উপকূলে অনেকটা সারিবদ্ধভাবে অবস্থিত। এছাড়া দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের নিউজিল্যান্ডের উত্তর-পূর্বে কারমাডেক দ্বীপের নিকট কারমাডেক খাত (৯,৪২৪ মিটার) বা এর উত্তরে টোঙ্গা দ্বীপপুঞ্জের পার্শ্বে টোঙ্গা খাত (৮,৭০৯ মিটার) এবং আরও উত্তরে ফনিক্স দ্বীপের নিকট ফনিক্স খাত অবস্থিত।

এ মহাসাগরের পূর্ব দিকে খাতের সংখ্যা কম এবং তাদের গভীরতাও কম। পূর্ব প্রান্তে দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের নিকটে কেবল আতাকামা খাত (৭৬৪০ মিটার বা ৪,১৭৭ ফ্যাদম) উল্লেখযোগ্য। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণেও ক্ষুদ্রাকৃতি কয়েকটি খাত রয়েছে। এ মহাসাগরের সব কয়টি খাত পাত সীমানা বরাবর সংকীর্ণ অবস্থায় লম্বালম্বিভাবে অবস্থিত।

প্রান্তদেশীয় সাগরসমূহ: প্রশান্ত মহাসাগরের প্রান্তভাগে অবস্থিত কতকগুলো সাগর প্রধান জলরাশি হতে বিচ্ছিন্ন। এ বিচ্ছিন্ন সাগরগুলো মহাসাগরের পশ্চিম সীমায়, এশিয়া মহাদেশে ও তৎসংলগ্ন দ্বীপমালার মধ্যবর্তী এলাকায়ই বেশি দেখা যায়। এ সকল সাগরের মধ্যে বেরিং সাগর, ওখটস্ক সাগর, জাপান সাগর, পীত সাগর, পূর্ব চীন সাগর, দক্ষিণ চীন সাগর ও শ্যাম উপসাগর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ সকল সাগরের গভীরতা ২,৪৩৮ মিটার থেকে প্রায় ২,৭৪৩ মিটার। তবে পীত সাগরের গভীরতা অনেক কম। পূর্ব উপকূলে সাগর নেই বললেই চলে। কেবল দক্ষিণে ক্যালিফোর্নিয়া উপসাগরই দেখা যায়। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব দিকে পাপুয়া উপসাগর ও কোরাল সাগর অবস্থিত।

বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই

Content added By

(Bottom Topography of the Atlantic Ocean)

আটলান্টিক মহাসাগর পৃথিবীর মহাসাগরসমূহের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাসাগর। এ মহাসাগরের আয়তন প্রায় ৮ কোটি ১৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। এর আয়তন সমগ্র ভূভাগের প্রায় ১৬% এবং প্রশান্ত মহাসাগরের প্রায় অর্ধেক। এ মহাসাগরের পশ্চিমে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং পূর্ব দিকে ইউরোপ ও আফ্রিকা। আটলান্টিক মহাসাগরের আকৃতি অনেকটা ইংরেজি 'S' অক্ষরের মতো। নিরক্ষরেখার নিকট এটি বেশি সংকীর্ণ। এখানে এর বিস্তার ২,৫৭৪ কিলোমিটার। কিন্তু নিরক্ষরেখা হতে এটি উত্তর ও দক্ষিণে ক্রমশ চওড়া। উত্তরে ° অক্ষাংশের নিকট এর বিস্তার ৪,৮২৭ কিলোমিটার এবং দক্ষিণে ৩৫° দক্ষিণ অক্ষাংশের নিকট ৫,৯৫৩ কিলোমিটার। এ মহাসাগরের উত্তরাংশ গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড প্রভৃতি দ্বীপ দ্বারা পরিবেষ্টিত। কিন্তু দক্ষিণ অংশটি ক্রমশ দক্ষিণ মহাসাগরের সাথে মিশেছে।

আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশ: আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশ প্রশান্ত মহাসাগরের মতো তত গভীর নয়। এর মহীসোপান পৃথিবীর অন্যান্য মহাসাগর অপেক্ষা বেশি। এ মহাসাগরের গভীর সমুদ্রখাতের সংখ্যা খুবই কম।

মহীসোপান ও মহীঢাল: আটলান্টিকের উত্তর দিকে সুবিস্তৃত মহীসোপান অবস্থিত। কিন্তু দক্ষিণ আটলান্টিকের উপকূলে মহীসোপান খুবই সরু। এ কারণে উত্তর আটলান্টিকে মহীঢালের পরিমাণ কম এবং দক্ষিণ আটলান্টিকে মহীঢালই বেশি।
উত্তর আটলান্টিকের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলের অগভীর সাগর ও উপসাগরগুলো মহীসোপানেরই অংশবিশেষ। উত্তর আটলান্টিকের পূর্ব দিকের উত্তর সাগর, বাল্টিক সাগর প্রভৃতি এবং পশ্চিম দিকের বেফিন ও হাডসন উপসাগর মহীসোপানের অন্তর্গত। এ সকল সাগর ও উপসাগরে পানির গভীরতা ১৮০ মিটার বা তারও কম। এছাড়া পূর্ব উপকূলে ভূমধ্যসাগর এবং পশ্চিম উপকূলের মেক্সিকো উপসাগরেও পানির গভীরতা ৩,৭৫০ মিটারের কম। দক্ষিণ আটলান্টিকের উভয় উপকূলে মহীসোপান খুব কম বিস্তৃত। এর পর হতে মহাসাগরের মহীঢাল ক্রমশ ঢালু হয়ে গভীর সমুদ্রতলে প্রবেশ করেছে।

তলদেশের উন্নত অংশসমূহ: অন্যান্য মহাসাগরের তলদেশের মতো আটলান্টিকের তলদেশেও সুবিস্তৃত উঁচু অংশ রয়েছে। এ উঁচু অংশগুলো শৈলশিরা ও আন্তঃমহাসাগরীয় মালভূমিরূপে অবস্থিত।
আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশের মধ্যভাগে অবস্থিত উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা (mid atlantic ridge)। এর আকৃতি মহাসাগরের নিজস্ব আকৃতি ইংরেজি 'S' অক্ষরের মতো। বিষুবরেখার উত্তরে অবস্থিত এর উত্তরাংশকে ডলফিন শৈলশিরা (dolphin ridge) এবং দক্ষিণাংশকে চ্যালেঞ্জার শৈলশিরা (challenger ridge) বলা হয়। এ উচ্চভূমির গভীরতা সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে প্রায় ৩,০৪৮ মিটার। ভূবিজ্ঞানীদের মতে, অতীতে এ শৈলশিরা বরাবর আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্য স্থান দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে একটি সুদীর্ঘ ফাটল ছিল এবং ফাটল দিয়ে ভূঅভ্যন্তরীণ পদার্থসমূহ উপরে উত্থিত ও সঞ্চিত হয়ে এ শৈলশিরার সৃষ্টি করেছে।

ডলফিন শৈলশিরার উত্তরাংশ প্রশস্ত হয়ে সুবিস্তৃত টেলিগ্রাফ মালভূমিতে পরিণত হয়েছে। গ্রিনল্যান্ড ও ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের মধ্যবর্তী অংশে এর উচ্চতা এত অধিক যে এ স্থানে পানিরাশির গভীরতা গড়ে ৯১৪ থেকে ১,০৬৭ মিটার। ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের পশ্চিম দিকে এ মালভূমির পূর্বাংশ উইভিল টমসন শৈলশিরা (wyvill tomson ridge) এবং ফ্যারো আইসল্যান্ড শৈলশিরা নামে পরিচিত। গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের মধ্যবর্তী উন্নত অংশের নাম গ্রিনল্যান্ড শৈলশিরা এবং গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিম পাশ দিয়ে বেফিন উপসাগরের দিকে বিস্তৃত উন্নত ভূমিকে বেফিন গ্রিনল্যান্ড শৈলশিরা (bafin
greenland ridge) বলা হয়।

তলদেশের উন্নত অংশসমূহ: অন্যান্য মহাসাগরের তলদেশের মতো আটলান্টিকের তলদেশেও সুবিস্তৃত উঁচু অংশ রয়েছে। এ উঁচু অংশগুলো শৈলশিরা ও আন্তঃমহাসাগরীয় মালভূমিরূপে অবস্থিত।
আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশের মধ্যভাগে অবস্থিত উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা (mid atlantic ridge)। এর আকৃতি মহাসাগরের নিজস্ব আকৃতি ইংরেজি 'S' অক্ষরের মতো। বিষুবরেখার উত্তরে অবস্থিত এর উত্তরাংশকে ডলফিন শৈলশিরা (dolphin ridge) এবং দক্ষিণাংশকে চ্যালেঞ্জার শৈলশিরা (challenger ridge) বলা হয়। এ উচ্চভূমির গভীরতা সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে প্রায় ৩,০৪৮ মিটার। ভূবিজ্ঞানীদের মতে, অতীতে এ শৈলশিরা বরাবর আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্য স্থান দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে একটি সুদীর্ঘ ফাটল ছিল এবং ফাটল দিয়ে ভূঅভ্যন্তরীণ পদার্থসমূহ উপরে উত্থিত ও সঞ্চিত হয়ে এ শৈলশিরার সৃষ্টি করেছে।

উত্তর আটলান্টিকের মতো দক্ষিণ আটলান্টিকে কতিপয় শৈলশিরা রয়েছে। চ্যালেঞ্জার শৈলশিরার দক্ষিণ দিকের তৃস্তান-দা-কুনহা দ্বীপের নিকট হতে ওয়ালভিস শৈলশিরা উত্তর-পূর্ব দিকে প্রসারিত হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়া তৃস্তান-দা-কুনহা দ্বীপ হতে একটি বিচ্ছিন্ন ও অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রাকৃতি শৈলশিরা এর পশ্চিম দিকে অবস্থিত। এটি রায়োগ্র্যান্ড শৈলশিরা (riogrand ridge) নামে পরিচিত। এ শৈলশিরা ব্যতীত আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশের অন্যান্য শৈলশিরা ও মালভূমি পরস্পরের সাথে সংযুক্ত।

মহাসাগরীয় দ্বীপসমূহ: এ মহাসাগরের দ্বীপের সংখ্যা প্রশান্ত মহাসাগরের তুলনায় অনেক কম। উত্তর আটলান্টিক
মহাসাগরের পূর্ব উপকূলে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ এবং পশ্চিম উপকূলে নিউফাউন্ডল্যান্ড দ্বীপ প্রকৃতপক্ষে মহীসোপানের উচ্চতম অংশ। কতিপয় দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের উত্তর সীমা ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত। আইসল্যান্ড এদের মধ্যে সর্বপ্রধান। এ দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জ স্থানীয় শৈলশিরাকে অবলম্বন করে অবস্থিত। পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ মূল ভূভাগের খুব নিকটে মহীসোপানের ওপর অবস্থিত। এর পর হতেই মহীসোপান মহীঢালে পরিণত হয়ে ক্রমশ অধিক গভীরে সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এ মহাসাগরের মধ্যভাগে অবস্থিত মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরার উভয় পার্শ্বের বিস্তীর্ণ অংশের তলদেশ খুবই গভীর। মাঝে মাঝে এ শৈলশিরাকে অবলম্বন করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ রয়েছে। সেন্ট হেলেন, অ্যাজোর্স এদের মধ্যে প্রধান। অন্যান্য দ্বীপমালার মধ্যে ম্যাডেরিয়া (maderia) দ্বীপ সম্পূর্ণ আগ্নেয়গিরি হতে উৎক্ষিপ্ত পদার্থ দিয়ে গঠিত। এটি পূর্ব দিকে ১০০ পশ্চিম দ্রাঘিমাংশ ও ৩০° উত্তর অক্ষাংশে অবস্থিত। বারমুডা পশ্চিম দিকে ৬৪° পশ্চিম দ্রাঘিমাংশ ও ৩২° উত্তর অক্ষাংশে অবস্থিত একটি প্রধান দ্বীপপুঞ্জ।

গভীর খাত: আটলান্টিক মহাসাগরে উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরের ন্যায় ভঙ্গিল পর্বত নেই। ফলশ্রুতিতে প্রশান্ত মহাসাগরের তুলনায় এ মহাসাগরে গভীর খাতও তেমন নেই। আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরতম খাত পোর্টোরিকো খাত (puerto rico trench) পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের উত্তরে পোর্টোরিকো দ্বীপের নিকট অবস্থিত। এর গভীরতা ৮,৪৭৪ মিটার (৪,৬৩৪ ফ্যাদম)। এ মহাসাগরের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত দক্ষিণ স্যান্ডউইচ খাত (south sandwich trench) দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের দক্ষিণ অংশে হর্ন অন্তরীপের সোজাসুজি দক্ষিণ স্যান্ডউইচ দ্বীপের নিকট অবস্থিত। এর গভীরতা ৮,২৩০ মিটার (৪,৫০০ ফ্যাদম)। নিরক্ষরেখা বরাবর ২০০ পশ্চিম দ্রাঘিমারেখার নিকট অবস্থিত রোমানস খাত (romanche trench) মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরাকে দ্বিখণ্ডিত করেছে। এর আয়তন অতিশয় স্বল্প এবং গভীরতা ৭,৩১৫ মিটার (৩,৯৯৯ ফ্যাদম)।

প্রান্তদেশীয় সাগরসমূহ: দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে সাগর ও উপসাগরের সংখ্যা অনেক কম। কিন্তু উত্তর আটলান্টিকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা মহাদেশের তীরবর্তী অঞ্চলে অনেকগুলো দ্বীপ রয়েছে। ইউরোপ মহাদেশ বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপদ্বীপ নিয়ে গঠিত বলে এ অঞ্চলে অনেকগুলো সাগর ও উপসাগরের সৃষ্টি হয়েছে। এদের মধ্যে বাল্টিক সাগর, উত্তর সাগর, বিস্কে উপসাগর, আড্রিয়াটিক সাগর, ভূমধ্যসাগর প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে উত্তর সাগর ও বাল্টিক সাগরের গভীরতা ১৮৩ মিটারের কম। এ সাগরদ্বয় উত্তর আটলান্টিক মহীসোপানের অন্তর্ভুক্ত। ডেনমার্ক ও সুইডেনের মধ্যস্থিত এ উভয় সাগরের সংযোগস্থল মাত্র ১৮.২৮ মিটার গভীর। ভূমধ্যসাগর বেশ গভীর এবং এর সবচেয়ে গভীরতম অংশের গভীরতা প্রায় ৪,৫৭২ মিটার। উত্তর আটলান্টিকের পশ্চিম উপকূলের বেফিন ও হাডসন উপসাগরের গভীরতা ১৮৩ মিটারেরও কম। মেক্সিকো উপসাগরের গভীরতা প্রায় ভূমধ্যসাগরের সমান। এর সবচেয়ে গভীরতম অংশের গভীরতা ৩,৮১০ মিটারের মতো। ক্যারিবিয়ান সাগরের গভীরতা প্রায় ৭১৬২.৮ মিটার।

বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই

Content added By
Please, contribute by adding content to ভারত মহাসাগরের তলদেশের ভূমিরূপ.
Content
Please, contribute by adding content to পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ও জীবজগতে পানিচক্রের ভূমিকা.
Content
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...