Population
জনসংখ্যা বলতে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী একই সাংস্কৃতিক বা কর্মপরিমণ্ডলের অন্তর্ভুক্ত কোনো জনগোষ্ঠী বা মানবসমষ্টিকে বোঝানো হয়ে থাকে। এই অর্থে বিভিন্ন ধরনের মানুষ নিয়ে গঠিত হলেও জনসংখ্যাকে একক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে এবং অন্য যেকোনো বিষয়ের মতো জনসংখ্যারও বিশেষ অবস্থান, আকার, উপাদান, ঘনত্ব, পরিবর্তন প্রক্রিয়া প্রভৃতি একাধিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যেগুলোর সুবিন্যস্ত বা রীতিবদ্ধ পর্যালোচনা হচ্ছে জনসংখ্যা ভূগোলের বিবেচ্য বিষয়।

দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
‘ক’ একটি উন্নয়নশীল দেশ যেখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১,০১৫ জন বাস করে। এ দেশের একজন হতদরিদ্র কৃষক রহিম। তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৫ জন। সে গ্রামে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে ৷
জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেলের ‘ক’ ধাপ যেখানে খাদ্য ও চিকিৎসার অভাব, যুদ্ধ ইত্যাদি বিদ্যমান। মায়ানমার এই ধাপের একটি দেশ । আবার বাংলাদেশ এই মডেলের ‘খ’ ধাপে রয়েছে যেখানে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন দেখা যায়।
(Demographic Elements of Population)
জনমিতি হচ্ছে জনসংখ্যার বৈশিষ্ট্যগত জ্ঞান। জনমিতিতে জনসংখ্যার বৈশিষ্ট্যগত পরিবর্তনের গাণিতিক বিশ্লেষণ করা হয়ে থাকে। জনমিতিতে জনসংখ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো হচ্ছে-
১. আকার (size)
২.ঘনত্ব (density)
৩.বয়স কাঠামো (age structure)
৪. উৎপাদনশীলতা (Productivity) ও জন্মহার (birthrate)
৫. মৃত্যুহার (death rate)
৬. লিঙ্গ অনুপাত (sex ratio)
১. আকার (size): জনসংখ্যার জনমিতিক উপাদানগুলোর মধ্যে এর আকারগত বৈশিষ্ট্য সর্বাগ্রে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জনসংখ্যার আকার বলতে কোনো একক অঞ্চলে অন্তর্ভুক্ত মানুষের মোটসংখ্যা বোঝানো হয়ে থাকে। বিশ্ব ব্যাংক এর এক তথ্যে দেখা যায় যে, ১৯৯০ সালে সমগ্র পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার পরিমাণ ছিল ৫২৫ কোটি। ১৯৯৯ সালের বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল ৬০০ কোটি। ২০০৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬৮ কোটি। ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে বিশ্বের জনসংখ্যা ৭০০ কোটি ছাড়িয়ে যায়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এভাবে চলতে থাকলে ২০২৪ ও ২০৪৫ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা হবে যথাক্রমে ৮০০ ও ৯০০ কোটি। পৃথিবীর মহাদেশগুলোর মধ্যে এশিয়া মহাদেশে সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা বিদ্যমান।
সারণি-২.১: বিশ্ব জনসংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি
| সাল | জনসংখ্যা (বিলিয়ন) |
| ১৮০০ | ০.৯ |
| ১৯০০ | ১.৬৫ |
| ১৯৬০ | ৩ |
| ১৯৮০ | 8.8 |
| ২০১৫ | ৭.৪ |
| ২০৪০ | (সম্ভাব্য) ৯.২ |
| ২১০০ | (সম্ভাব্য) ১১.২ |
সূত্র: UN and HYDE: Ourworldindata.org
সারণি-২.২: মহাদেশভিত্তিক জনসংখ্যার ঘনত্ব ও বণ্টন (২০১৮)
| মহাদেশ | জনসংখ্যা (২০১৮) | আয়তন (বর্গ কি. মি.) | ঘনত্ব (বর্গ কি.মি.-এ) | বিশ্ব জনসংখ্যার অংশীদার (%) |
| এশিয়া | ৪,৫৪৫,১৩৩,০৯৪ | ৩১,০৩৩,১৩১ | ১৪৬ | ৫৯.৫৫ |
| আফ্রিকা | ১,২৮৭,৯২০,৫১৮ | ২৯,৬৪৮,৪৮১ | ৪৩ | ১৬.৮৭ |
| ইউরোপ | ৭৪২,৬৪৮,০১০ | ২২,১৩৪,৯০০ | ৩৪ | ৯.৭৩ |
| মহাদেশ | জনসংখ্যা (২০১৮) | আয়তন (বর্গ কি. মি.) | ঘনত্ব (বর্গ কি.মি.-এ) | বিশ্ব জনসংখ্যার অংশীদার (%) |
| উত্তর আমেরিকা | ৫৮৭,৬১৫,৯৭৬ | ২১,৩২৯,৯২৬ | ২৮ | ৭.৭০ |
| দক্ষিণ আমেরিকা | ৪২৮,২৪০,৫১৫ | ১৭,৪৬১,১১২ | ২৫ | ৫.৬১ |
| অস্ট্রেলিয়া | ৪১,২৬১.২১২ | ৮,৪৮৬,৪৬০ | ৫ | ০.৫৪ |
সূত্র: worldometers.2019
এশিয়া মহাদেশের জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৪.৪ বিলিয়ন যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০%। পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশ হচ্ছে চীন ও ভারত এবং এখানে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৩৭% লোকের বসবাস।
সারণি-২.৩: পৃথিবীর জনবহুল ১০টি দেশ (২০১৮)
| ক্রম | দেশ | জনসংখ্যা (মিলিয়নে) | ক্রম | দেশ | জনসংখ্যা (মিলিয়নে) |
| ১ | চীন | ১,৪১৫ | ৬ | পাকিস্তান | ২১০ |
| ২ | ভারত | ১,৩৫৪ | ৭ | নাইজেরিয়া | ১৯৫ |
| ৩ | যুক্তরাষ্ট্র | ৩২৬ | ৮ | বাংলাদেশ | ১৬৬ |
| ৪ | ইন্দোনেশিয়া | ২৬৬ | ৯ | রাশিয়া | ১৪৩ |
| ৫ | ব্রাজিল | ২০০ | ১০ | মেক্সিকো | ১৩০ |
Source: US Census Bureau, 30 June, 2018
রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে জনসংখ্যার আকারগত বৈশিষ্ট্যের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। জনমিতিক প্রক্রিয়ায় বিশেষ করে পরিবর্তন প্রক্রিয়ার আকারগত বৈশিষ্ট্যের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। আকারগত বৈশিষ্ট্য জনসংখ্যার মোট বৃদ্ধির পরিমাণকে প্রভাবিত করে।
২. ঘনত্ব (Density): ঘনত্ব বলতে সাধারণভাবে কোনো বস্তুর উপাদানগত দৃঢ়তা বা সংবদ্ধতা বোঝানো হয়ে থাকে। জনসংখ্যার ঘনত্ব বলতে বিভিন্ন মানুষের সংবদ্ধতা তথা জনবসতির নিবিড়তা বোঝানো হয়ে থাকে। ঘনত্বের দ্বারা ভূমির ওপর জনসংখ্যার চাপের তীব্রতা প্রকাশ পেয়ে থাকে। গাণিতিকভাবে কোনো দেশের জনসংখ্যাকে ঐ দেশের আয়তন দিয়ে ভাগ করলে জনসংখ্যার ঘনত্ব পাওয়া যায়।
সারণি ২.৪: ঘনত্বের ভিত্তিতে জনবহুল দেশের তালিকা (২০১৮)
| ক্রম | দেশ | আয়তন (বর্গ কিমি) | ঘনত্ব (বর্গ কি.মি.-এ) |
| ১ | মোনাকো | ২.০২ | ২৬,১০৫ |
| ২ | মেকাও | ৩০.৫ | ২১,১৫১ |
| ৩ | সিঙ্গাপুর | ৭১৯.২ | ৮,২৭৪ |
| ৪ | হংকং | ৬.৩৪ | ৭,০৭৫ |
| ৫ | বাহরাইন | ৭৫৭ | ২,০৬১ |
| ক্রম | দেশ | আয়তন (বর্গ কিমি) | ঘনত্ব (বর্গ কি.মি.-এ) |
| ৬ | মালদ্বীপ | ২৯৮ | ১,৪৮১ |
| ৭ | মাল্টা | ৩১৫ | ১,৩৫০ |
| ৮ | বাংলাদেশ | ১,৪৭,৫৭০ | ১,২৭৮ |
| ৯ | বারমুডা | ৫৩.২ | ১,২২১ |
উপরে প্রদত্ত পৃথিবীর জনবহুল রাষ্ট্রগুলোর ঘনত্ব পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বসতির নিবিড়তা ও সংবদ্ধতার দিক থেকে এদের মধ্যে ব্যাপক তারতম্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে তুলনা করা যেতে পারে। জনসংখ্যার আকারগত বৈশিষ্ট্যে উভয় দেশ প্রায় সমপর্যায়ভুক্ত। কিন্তু ঘনত্বের দিক থেকে উভয় দেশের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান। উল্লেখ্য, জনবহুলতা তথা কোনো স্থানে জনসংখ্যার যে সমাবেশ বা পুঞ্জীভবন তা নির্ভর করে প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নানাবিধ ভৌগোলিক উপাদানের ওপর। সমতলভূমি, উর্বর মৃত্তিকা, নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু, স্থল ও নৌপথে যাতায়াতের বিশেষ সুবিধা, শিল্পের কেন্দ্রায়ন, রাজধানী ও অন্যান্য শহর বন্দরের অবস্থান ইত্যাদি জনসংখ্যার ঘনত্বকে প্রভাবিত করে থাকে।
৩. বয়স কাঠামো (Age Structure): কোনো ব্যক্তি জনসংখ্যার কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে পারে না। জনসংখ্যার বয়স কাঠামো কোনো দেশের অর্থনৈতিক সামাজিক অবস্থার প্রকাশ ঘটায়, জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক পরিমাপ করতে হলে জনসংখ্যাকে বিভিন্ন বয়স শ্রেণিতে বিভক্ত করা প্রয়োজন। প্রজনন ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে কোনো জনসংখ্যাকে সাধারণভাবে তিনটি বয়স শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়ে থাকে, যথা-
i. শিশু ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক: সাধারণত ১৪ অথবা ১৯ বছরের কম বয়স্কদের শিশু বা অপ্রাপ্ত বয়স্ক ধরা হয়।
ii. প্রাপ্ত বয়স্ক: ১৫ থেকে ৫৯ কিংবা ১৫ থেকে ৬৪, অথবা ১৯ থেকে ৫৯ কিংবা ১৯ থেকে ৬৪ বছর বয়স্কদের প্রাপ্তবয়স্ক বলা হয়।
iii. বৃদ্ধ: ৬০ বছর ও তদুর্ধ্ব অথবা ৬৫ বছর ও তদুর্ধ্ব বয়স্কদের বৃদ্ধ বলে ধরা হয়।
কোনো দেশের জনসংখ্যার বয়স কাঠামো জনসংখ্যার পিরামিডের মাধ্যমে দেখানো যায়। যদিও জনসংখ্যা কাঠামো সবসময় পিরামিডের আকার ধারণ নাও করতে পারে। আবার উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশের জনসংখ্যা পিরামিডও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।
৪. উৎপাদনশীলতা ও জন্মহার (Productivity and Birth rate): নারীদের সন্তান ধারণ করার ক্ষমতা বা সামর্থ্যকে সমাজবিজ্ঞানী ও জনবিজ্ঞানীগণ Fecundity বা উর্বরতা এবং প্রকৃত সন্তান ধারণ অর্থাৎ সন্তান জন্মদানকে Fertility বা প্রজননশীলতা বলে অভিহিত করে থাকেন। কোনো দেশের উন্নতিতে প্রজননশীলতা বা বংশবৃদ্ধির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। প্রজননশীলতা যেমন কোনো সমাজের অস্তিত্ব বিপন্ন করতে পারে, তেমনি অতি প্রজননশীলতা বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। সামাজিক ও জনমিতিক পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় প্রজননশীলতার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। প্রজননশীলতা পরিমাপ করার জন্য জনমিতিতে কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সেগুলো হলো:
i. স্থূল বা অশোধিত জন্মহার (Crude Birth Rate - CBR)
ii. স্বাভাবিক জন্মহার (Natural or Physiological Birth Rate - NBR)
iii. সাধারণ প্রজননশীলতা হার (General Fertility Rate - GFR)
iv. প্রজননশীলতা অনুপাত (Fertility Ratio)
V. বয়স নির্দিষ্ট জন্মহার (Age Specific Birth Rate - ASFR)
vi. মোট জন্মহার (Total Birth Rate - TFR)
vii. স্থূল প্রজনন হার (Gross Reproduction Rate - GRR)
viii. নীট প্রজনন হার (Net Reproduction Rate - NRR)
৫. মৃত্যুহার (Death rate): জনসংখ্যার আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মৃত্যুহার। মৃত্যুহার জনসংখ্যার বৃদ্ধি প্রক্রিয়াকে যেমন প্রভাবিত করে তেমনি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে থাকে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে যে সময় ও স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, অকাল ও অত্যধিক মৃত্যুর ফলে তা বিঘ্নিত হতে পারে। মৃত্যুহার বিভিন্নভাবে পরিমাণ ও প্রকাশ করা যেতে পারে। নিম্নে মৃত্যুহার পরিমাপের কয়েকটি পদ্ধতি এত দেওয়া হলো
i. স্কুল বা অশোধিত মৃত্যুহার (Crude Death Rate - CDR)
ii. বয়স নির্দিষ্ট মৃত্যুহার (Age Specific Death Rate - ASDR)
iii. শিশু মৃত্যুহার (Infant Mortality Rate - IMR)
iv. প্রমিত মৃত্যুহার (Standardified Death Rate - SDR)
v. জন্মকালীন আয়ু প্রত্যাশা (Expectation of Life in Birth
কোনো দেশের মৃত্যুহার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্যতম কারণগুলো হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঝড়, ভূমিকম্প, বন্যা, দুর্ভিক্ষ, মহামারী। এছাড়াও রয়েছে যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ, রোগ, দুর্ঘটনা ইত্যাদি।
৬. লিঙ্গ অনুপাত (Sex ratio): নারী-পুরুষ অনুপাত বা লিঙ্গ অনুপাত একটি গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক উপাদান। Sex-ratio বলতে প্রতি হাজারে নারী-পুরুষের সংখ্যা অথবা নারীতে পুরুষ সংখ্যাকে বুঝায়। যেমন: তিনটি ভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে এই অনুপাত দেখানো যায়।
i. প্রতি ১০০ বা ১০০০ মহিলার মধ্যে পুরুষ সংখ্যা অথবা এর বিপরীত।
ii. মোট জনসংখ্যায় মহিলা বা পুরুষের সংখ্যা।
iii. দশমিক আকারে নারী বা পুরুষের সংখ্যা।
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
(Migration)
আদিকাল থেকেই মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অভিগমন করছে। পৃথিবীর ইতিহাসে তাই অভিগমন অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানুষ তার নিজের বিভিন্ন চাহিদা পূরণের জন্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অভিগমন করে। প্রাচীনকালে যাতায়াত ব্যবস্থা অনুন্নত থাকার কারণে অভিগমনের হার কম ছিল। কিন্তু বর্তমানে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উন্নতির ফলে অভিগমনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অভিগমন এর ইংরেজি শব্দ migration এসেছে ল্যাটিন শব্দ 'migrate' থেকে, যার অর্থ বাসস্থান পরিবর্তন। অভিগমন বলতে মানবগোষ্ঠী এক আবাসস্থল বা জায়গা থেকে অন্য জায়গায়, সাধারণত দূরে গমনকে বোঝায়। তবে সাধারণ অর্থে migration বলতে তুলনামূলক স্থায়ীভাবে অনেক দূরে গমনকে বোঝানো হয়। । হয়। বিভিন্ন সমাজ বিজ্ঞানী অভিগমনকে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী W. Peterson অভিগমনের সংজ্ঞায় বলেন:
Migration is the permanent or temporal movement of persons over a significant distance".
অভিগমন হলো কোনো ব্যক্তির দূরবর্তী স্থানে স্থায়ী বা সাময়িক গমন বা স্থানান্তর।
কানাডার সমাজবিজ্ঞানী F. S. lee বলেন,
"Migration is the permanent or temporal change of residence".
অভিগমন হলো আবাসস্থলের সাময়িক বা স্থায়ী পরিবর্তন।
United Nations এর সংজ্ঞায় বলা হয়-
"Any change of residence for at least one year is called migration".
নূন্যতম এক বছরের জন্য বাসস্থানের পরিবর্তনই অভিগমন।
জাতিসংঘের মতে, "এক বা একাধিক বছরের জন্য বাসস্থানের যেকোনো রকম পরিবর্তনকে অভিগমন এবং এর চেয়ে স্বল্পকাল স্থায়ী অবস্থানকে দর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়।"
মি. ক্লার্ক-এর মতে, "বাসস্থান পরিবর্তনের জন্য কোনো রাষ্ট্র বা দেশে আগমন বা দেশান্তর অথবা একই দেশের একস্থান থেকে অন্যস্থানে গমনকে অভিগমন বলা হয়।"
উল্লেখ্য মানুষের সব ধরনের স্থান পরিবর্তন, যেমন- দৈনিক কাজের জন্য কর্মস্থলে গমনাগমন, হাটবাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসালয়ে গমন প্রভৃতিকে অভিগমনের পর্যায়ভুক্ত করা উচিৎ নয়। কেননা এসব কাজ শেষে সকলেই স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করে। এ ধরনের অভিগমন সাময়িক ও স্বল্প দূরত্বে ঘটে থাকে। তবে অনেক ক্ষেত্রে মানুষ নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে স্বস্থান পরিবর্তন করে বদুদূরে গিয়ে নতুন আবাস স্থাপন করতে পারে। এরূপ স্থায়ী বসবাসের উদ্দেশ্যে দূরান্তে বা অন্যদেশে গমন করাকে অভিগমন বলে।
অতএব, আমরা বলতে পারি, অভিগমন বলতে কোনো ব্যক্তির স্থায়ী গমনকে বোঝায় যেখানে ব্যক্তি একটি সমাজব্যবস্থা থেকে অন্য সমাজব্যবস্থায় গমন করে।
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
(Causes of Migration)
বিভিন্ন কারণে মানুষ অভিগমন করে থাকে। অভিগমনের দুটি প্রধান কারণ হলো- আকর্ষণমূলক (Pull factors) এবং বিকর্ষণমূলক (Push factors)। আকর্ষণমূলক কারণে মানুষ নিজ ইচ্ছায় বাসস্থান ত্যাগ করলেও বিকর্ষণজনিত কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে। আকর্ষণ ও বিকর্ষণমূলক কারণগুলো হলো-
অভিগমনের আকর্ষণমূলক কারণ: উর্বর কৃষিজমি, খনিজ ও শক্তি সম্পদের ভাণ্ডার, অনুকূল ও আরামদায়ক জলবায়ু, উচ্চতর শিক্ষা, উন্নততর অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা, জীবনযাত্রার উচ্চ মান, অজানাকে জানা, পানির প্রাচুর্য প্রভৃতি।
অভিগমনের বিকর্ষণমূলক কারণ: প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- বন্যা, খরা, মহামারি, অগ্নুৎপাত, ভূমিকম্প, দারিদ্র্যতা, সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক দাঙ্গা, যুদ্ধ, বেকারত্ব।
অভিগমন এর সার্বিক কারণগুলোকে দুইভাবে আলোচনা করা যায়। যথা: (ক) অভ্যন্তরীণ অভিগমন ও (খ) আন্তর্জাতিক অভিগমন।
ক. অভ্যন্তরীণ অভিগমনের কারণ: মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে একই দেশের ভেতর গ্রাম থেকে গ্রামে, গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে গ্রামে এবং শহর থেকে শহরে অভিগমন করে থাকে। যেসব কারণে এ সকল অভ্যন্তরীণ অভিগমন হয়ে থাকে সেগুলো আলোচনা করা হলো:
১. অর্থনৈতিক কারণ মানুষ তার আর্থিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য গ্রাম থেকে শহরে অভিগমন করে। অভ্যন্তরীণ অভিগমনের অর্থনৈতিক কারণের মধ্যে রয়েছে জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, ভূমি ও খাদ্য সরবরাহের সীমাবদ্ধতা, শিল্প ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি। যেমন- বাংলাদেশে গ্রাম থেকে মানুষ জেলা শহরে (ঢাকা, চট্টগ্রাম) চলে আসে।
২. সামাজিক কারণ: অভ্যন্তরীণ অভিগমনের অন্যতম একটি কারণ হলো সামাজিক অবস্থা। যেমন: বিবাহজনিত কারণে মহিলারা এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে বা গ্রাম থেকে শহরে অভিগমন করে থাকে। এছাড়া সন্তান জন্মদানের সময়েও মহিলারা পিত্রালয়ে অভিগমন করে যা অভ্যন্তরীণ অস্থায়ী অভিগমন।
৩. জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন কখনো কখনো জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য অভ্যন্তরীণ অভিগমন ঘটে। পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে যে, জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য মানুষ অনুন্নত গ্রাম হতে উন্নত শহরের দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে। যেমন- বাংলাদেশের পৌরঅঞ্চলে (ঢাকা, গাজীপুর, কুমিল্লা, চাঁদপুর) ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৪. শিল্পের উন্নয়ন: শহরে শিল্পের উন্নয়নের জন্য অভ্যন্তরীণ অভিগমন ঘটে। শিল্পের উন্নতি অভিগমনের একটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উপাদান। শহর এলাকায় শিল্প প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এবং কৃষিভিত্তিক নয় এমন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন স্থানের মধ্যে অর্থনৈতিক অসমতা দেখা দেয়। এজন্য মানুষ স্থানান্তরিত হয়। যেমন- গাজীপুর।
৫. পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন: পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নও অভিগমনের একটি অন্যতম কারণ।
প্রাচীনকালে পরিবহনের সুযোগ সুবিধা না থাকায় অভিগমনের হার কম ছিল। বর্তমানে যোগাযোগ সহজ হওয়ার কারণে অভিগমনের হারও বেশি।
.৬. ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণ: দেশের অভ্যন্তরে এক শহর থেকে অন্য শহরে মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে অভিগমন করে। যেমন: নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ জেলা শহর থেকে রাজধানী ঢাকায় অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অভিগমন করে থাকে।
৭. ভূমি ও খাদ্যের সীমাবদ্ধতা: ভূমি ও খাদ্যের সীমাবদ্ধতা অভ্যন্তরীণ অভিগমনের আরেকটি কারণ। ভূমির
সীমাবদ্ধতা মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। এক্ষেত্রে জমির অনুপাতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং মাথাপিছু আয় কমে যায়। ফলে মানুষ অভিগমন করতে চায়। সাধারণত এক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ অভিগমণ ঘটে। যেমন- দেশের গ্রামাঞ্চল থেকে ঢাকা শহরে অভিগমন।
৮. জনসংখ্যার চাপ: পারিবারিক জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি পেলে মানুষ এক স্থান হতে অন্য স্থানে অভিগমন করে। অভ্যন্তরীণ অভিগমনের অন্যতম একটি কারণ হলো জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি।
৯. কৃষিব্যবস্থা যান্ত্রিকীকরণ: যে অঞ্চলে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার হয় সে অঞ্চলে কৃষকরা সহজেই অভিগমন করে। গ্রাম থেকে গ্রামে বা শহরের নিকটবর্তী অঞ্চলে এ ধরনের অভ্যন্তরীণ অভিগমন দেখা যায়।
আন্তর্জাতিক অভিগমনের কারণ মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যে অভিগমন করে তাকে আন্তর্জাতিক অভিগমন বলে। আন্তর্জাতিক অভিগমন যেসব কারণে হয় সেগুলো আলোচনা করা হলো:
১. অর্থনৈতিক কারণ: সাধারণত মানুষ উন্নত ও সচ্ছল জীবনযাপনের জন্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অধিক হারে অভিগমন করে। সাধারণত কৃষি জমির হ্রাস, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, শিল্পায়ন, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার এসব কারণে বিভিন্ন দেশের মধ্যে অভিগমন ঘটে থাকে। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশের মানুষ বিদেশে ভালো কাজের আশায় মধ্যপ্রাচ্যে (কাতার, বাহরাইন) অভিগমন করে থাকে।
২. সামাজিক কারণ: অভিগমনের জন্য কিছু সামাজিক কারণও থাকতে পারে, যেমন: আত্মীয়-স্বজন, ভাষা, বৈবাহিক সম্পর্ক, জোরপূর্বক উৎখাত, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন। যেমন- রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা ইত্যাদি কারণে আন্তর্জাতিক অভিগমন ঘটে।'
৩. রাজনৈতিক কারণ বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণে আন্তর্জাতিক অভিগমন হয়ে থাকে। সরকারের বিভিন্ন নীতিমালা, আইন-কানুন, রাজনৈতিক অসন্তোষ ইত্যাদি কারণে অভিগমন হয়ে থাকে। যেমন- বাংলাদেশ থেকে কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন।
৪. সাংস্কৃতিক কারণ: অনেক ক্ষেত্রে অভিগমনের পেছনে কিছু সাংস্কৃতিক কারণ থাকে। মানুষ উন্নত ও মুক্ত সমাজব্যবস্থার প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়। শিক্ষা, খাদ্যাভাব, ভাষা, উন্নত মন-মানসিকতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বিভিন্ন দেশে অভিগমন করে থাকে। যেমন- বাংলাদেশের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করে l
৫. ধর্মীয় কারণ: ধর্মীয় কারণেও কিছু মানুষ অভিগমন করে থাকে। হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের মধ্যে হিন্দু অধ্যুষিত দেশে ও মুসলমান ধর্মাবলম্বী মানুষদের মধ্যে মুসলমান অধ্যুষিত দেশে অভিগমনের প্রবণতা থাকে। যেমন: সামর্থ্যবান হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনেকেই বাংলাদেশ থেকে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করেন।
৬. শিক্ষা ও গবেষণা: উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ ও গবেষণার কাজেও অভিগমন হয়ে থাকে। মানুষ অনুন্নত, উন্নয়নশীল দেশসমূহ থেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য উন্নত দেশগুলোতে অভিগমন করে। যেমন- বাংলাদেশ থেকে শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষালাভের জন্য যুক্তরাজ্য, কানাডায় গমন করে।
৭. জলবায়ু পরিবর্তন: বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন এবং সেই সাথে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধিও অভিগমনের কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
(Types of Migration)
সাধারণত দুই ধরনের অভিগমন দেখা যায়। যথা- ঐচ্ছিক ও অনৈচ্ছিক।
১. ঐচ্ছিক অভিগমন: যখন মানুষ তার নিজের চাহিদা মেটানোর জন্য বা নিজের ইচ্ছায় অভিগমন করে তখন তাকে বলা হয় ঐচ্ছিক অভিগমন। যেমন- উচ্চশিক্ষার্থে যুক্তরাষ্ট্রে অভিগমন।
২. অনৈচ্ছিক অভিগমন মানুষ যখন ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতির কারণে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যায় তখন তাকে অনৈচ্ছিক অভিগমন বলে। যেমন- মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অভিগমন।
স্থানের ওপর ভিত্তি করে অভিগমনকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যথা- ১. অভ্যন্তরীণ; ও ২. আন্তর্জাতিক।
১. অভ্যন্তরীণ অভিগমন: যখন মানুষ নিজ দেশের মধ্যে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অভিগমন করে তাকে অভ্যন্তরীণ অভিগমন বলে। এ অভিগমনের ক্ষেত্রে দেশের সীমা অতিক্রম করতে হয় না। যেমন: এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে, এক জেলা থেকে অন্য জেলায় অভিগমন। অভ্যন্তরীণ অভিগমনকে আবার দুইভাবে দেখা যায়। যথা-ক. ধারা (stream) অনুযায়ী অভিগমন; ও খ. দূরত্ব অনুযায়ী অভিগমন। নিচে এগুলো বর্ণনা করা হলো:
ক. ধারা অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ অভিগমন: এই ধরনের অভিগমনের প্রধান ধারাগুলো হলো:
i. গ্রাম থেকে গ্রামে: যখন কোনো মানুষ একই দেশে একটি গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে অভিগমন করে তখন তাকে বলা হয় গ্রাম থেকে গ্রামে অভিগমন। পুরুষদের তুলনায় মহিলারা এ ধরনের অভিগমন অধিক পছন্দ করে। কারণ তারা অধিক দূরত্বে অভিগমনে অনিচ্ছুক থাকে।
ii. গ্রাম থেকে শহরে একই দেশের মধ্যে গ্রাম থেকে শহর এলাকায় অভিগমনকে বলা হয় গ্রাম থেকে শহরে অভিগমন। এটি অভ্যন্তরীণ অভিগমনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধরন। সাধারণত যেসব দেশে কেবল শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুরু হয়েছে সেসব দেশে মানুষ অধিক উপার্জনের আশায় গ্রাম থেকে শহরে অভিগমন করে থাকে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এ ধরনের অভিগমনের ধারা লক্ষ করা যায়। যেমন- বাংলাদেশ।
iii. শহর থেকে গ্রামে যখন কোনো মানুষ একই দেশের মধ্যে শহর থেকে গ্রামে অভিগমন করে তখন সেই ধারাকে বলা হয় শহর থেকে গ্রামে অভিগমন। কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণের পর অনেকে এ ধরনের অভিগমন করেন। উন্নত দেশে এরূপ দেখা যায়।
iv. শহর থেকে শহরে একই দেশের মধ্যে এক শহর থেকে অন্য শহরে অভিগমন হয়ে থাকে। সাধারণত ভালো চাকরি, ব্যবসা, আত্মীয়-স্বজন, জীবনযাত্রার মান ইত্যাদি কারণে মানুষ এক শহর থেকে অন্য শহরে অভিগমন করে থাকে। যেমন- ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় আগমন।
খ. দূরত্ব অনুযায়ী অভিগমন: দূরত্বের ভিত্তিতে সাধারণত তিন ধরনের অভ্যন্তরীণ অভিগমন দেখা যায়। যেমন:
i. স্বল্প দূরত্বে অভিগমন: এক থানা থেকে অন্য থানায় অভিগমন।
ii. মাঝারি দূরত্বে অভিগমন: এক জেলা থেকে অন্য জেলায় অভিগমন।
iii. অধিক দূরত্বে অভিগমন: এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে অভিগমন।
২. আন্তর্জাতিক অভিগমন: যখন মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে বেশ দীর্ঘ সময়ের জন্য (কমপক্ষে ৬ মাসের জন্য) অভিগমন করে তখন তাকে আন্তর্জাতিক অভিগমন বলা হয়। এক্ষেত্রে অবশ্যই কোনো দেশের রাজনৈতিক সীমা অতিক্রম করতে হয়। জনমিতিতে আন্তর্জাতিক অভিগমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ এই অভিগমনের ফলে দেশের জনসংখ্যার পরিবর্তন ঘটে।
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
(Effects of Migration)
অভিগমনের যেমন কিছু ভালো দিক রয়েছে তেমনি মন্দ দিকও রয়েছে। অভিগমনের প্রভাবগুলো নিচে বর্ণনা করা হলো:
১. অর্থনৈতিক প্রভাব: অভিগমনের ফলে অর্থনীতির ওপর বিশেষ প্রভাব পড়ে। আন্তর্জাতিকভাবে অভিগমনকারীগণ নিজ দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে এবং পরিবারে আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটায়। গ্রামের গরিব মানুষ শহরে এসে নতুন পেশায় অধিক আয় করে থাকে।
২. জনসংখ্যার ওপর প্রভাব: কোনো দেশের জনসংখ্যার জন্য অভিগমনের ভালো দিকগুলো হলো দেশের জনসংখ্যার পুনঃবণ্টন, সম্পদ অনুযায়ী জনসংখ্যার বণ্টন, জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি। এছাড়াও অভিগমনের কিছু ঋণাত্মক প্রভাবও রয়েছে জনসংখ্যার ওপর। সাধারণত নারীদের তুলনায় পুরুষরা অভিগমনে অধিক আগ্রহী থাকে। ফলে নারী-পুরুষের অনুপাতে অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। এছাড়াও গ্রাম থেকে পুরুষরা শহরে অধিক অভিগমন করায় গ্রামে দক্ষ জনশক্তির অভাব দেখা দেয়। ফলে তা উৎপাদনমূলক কাজের (যেমন- কৃষি) ক্ষতিসাধন করে।
৩. সামাজিক প্রভাব: অভিগমনের ফলে সমাজব্যবস্থায় কিছু ইতিবাচক প্রভাব দেখা দেয়। যেমন: পরিবার নিয়ন্ত্রণ, নারী শিক্ষা, নতুন প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার প্রতি মানুষ আকৃষ্ট হয়। এছাড়াও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি উন্নত হয় এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির ও মানুষের সাথে পরিচয় ঘটে।
সামাজিকভাবে অভিগমনের কিছু খারাপ দিকও রয়েছে। যেমন পরস্পরের মধ্যকার বন্ধন কমে যায়, হতাশা বৃদ্ধি পায়। অভিগমন গ্রামের মহিলাদের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলে। স্বামী অন্যত্র অভিগমন করলে তাদের শারীরিক ও মানসিক চাপের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৪. পরিবেশগত প্রভাব: পরিবেশের ওপর অভিগমনের বিশেষ প্রভাব রয়েছে। শহরাঞ্চলে অধিক অভিগমনের ফলে সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অধিক জনসংখ্যার ফলে শহরে অপরিকল্পিতভাবে বাসস্থান ও স্থাপনা তৈরি হয় এবং বস্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয়। ফলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অধিক চাপ পড়ে; ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়, বায়ু, পানি ও মৃত্তিকাদূষণ ঘটে। এভাবে প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে।
৫. জৈবিক পরিবর্তন অভিগমনের ফলে মানুষ তার জন্মস্থান ত্যাগ করে কোনো নতুন জায়গায় আসে। ফলে জৈবিক পরিবর্তন ঘটে। নতুন পরিবেশে এসে অনেকেরই স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। শহরের ঘনবসতি; বায়ু দূষণ এবং অপর্যাপ্ত বাসস্থান গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায়।
৬. সাংস্কৃতিক পরিবর্তন: এক স্থান থেকে অন্যস্থানে অভিগমনের ফলে মানুষের গুণগত ও সংস্কৃতির কিছু পরিবর্তন ঘটে। যেমন- ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, রীতিনীতির পরিবর্তন ঘটে।
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
(Demographic Characteristics of Population in Bangladesh: Birth Rate, Death Rate, Growth Rate)
বাংলাদেশ পৃথিবীর জনবহুল দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯৫১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ৫০.৮৪ মিলিয়ন ১৯৯১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৬.৩১ মিলিয়ন এবং ২০১১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪২.৩১ মিলিয়ন। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অত্যন্ত বেশি (১.৩৭%)। বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় সকল জেলাতেই সমান শুধু তিনটি পার্বত্য জেলায় জনসংখ্যার ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে কম। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
জনসংখ্যার পরিমাণ: পৃথিবীর প্রথম ১০টি জনবহুল দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৮৬.৬% মুসলিম, ১২.১% হিন্দু, ০.৬% বৌদ্ধ ও ০.৪% খ্রিস্টান। (সূত্র: বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (www.bangladesh.gov.bd)। বিশ্বে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান জনসংখ্যায় দ্বিতীয়।

সূত্র- বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বাংলাদেশ আমদশুমারি ২০১১ অনুযায়ী)
জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার: ১৯৬০ এবং ১৯৭০ এর দশকে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অত্যন্ত বেশি ছিল। ১৯৭৪ সাল হতে ১৯৮১ সালের মধ্যে বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২.৪৮% থেকে কমে ২.২৮% হয়েছে। এ ধারা বজায় রেখে ২০১১ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায় বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৭%। অতএব বর্তমানে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে।
সারণি-২.৫: জনসংখ্যা স্বাভাবিক বৃদ্ধির হার
| সাল | বৃদ্ধির হার (%) |
| ১৯৮১ | ২.২৮ |
| ১৯৯১ | ২.১৮ |
| ২০০১ | ১.৪০ |
| ২০১১ | ১.৩৭ |
| ২০১৮ | ১.৩৪ |
উৎস: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, (২০১১ সালের সর্বশেষ আদমশুমারী অনুযায়ী)-২০১৯
জনসংখ্যার ঘনত্ব: বাংলাদেশের আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কি. মি.। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১০১৫ জন। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৭৪ সালের গণনা অনুসারে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল ৪৯৭ জন। ২০১৮ সালে যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৭৮ জনে। বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ জেলা ঢাকা। বর্তমানে ঢাকামুখী জনসংখ্যার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে।
সারণি-২.৬: বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব
| সাল | ঘনত্ব (প্রতি বর্গ কি. মি.) |
| ১৯৭৫ | ৪৮৩ |
| ১৯৮০ | ৫৫২ |
| ১৯৮০ | ৬৩২ |
| ১৯৯০ | ৭২০ |
| ১৯৯৫ | ৮০৪ |
| ২০০০ | ৮৯২ |
| ২০০৫ | ৯৭২ |
| ২০১০ | ১০৩১ |
| ২০১৫ | ১০৯২ |
| ২০১৮ | ১০৯২ |
সূত্র: World Population Review.2018
| সাল | স্থূল জন্মহার | স্থূল মৃত্যুহার | শিশু মৃত্যুহার (প্রতি হাজার জীবিত জন্মে) |
| ২০০১ | ১৮.৯ | ৪.৮ | ৫৬ |
| ২০১১ | ১৯.২ | ৫.৫ | ৫৬ |
| ২০১৭ | ১৮.৫ | ৫.১ | ৫৬ |
উৎস: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, ২০১৮
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
(Demographic Characteristics of Population in Bangladesh: Sex Ratio, Migration)
বাংলাদেশে 'জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে যাবার ফলে বয়স কাঠামোর উপর বিশেষ প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশে আগের তুলনায় কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা বাড়ছে এবং একই সাথে নির্ভরশীল জনসংখ্যার পরিমাণ কমছে। কোনো দেশের জনসংখ্যা কাঠামোতে কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে তা অর্থনৈতিক উন্নতিকে ত্বরান্বিত করে।
সারণি-২.৮: বাংলাদেশের বয়স কাঠামো
| বয়স শ্রেণি | শতকরা হার | পুরুষ | মহিলা |
| ০-১৪ | ২৭.৭ | ২২,২৮৩,৭৮০ | ২১,৫২১,৯৭৭ |
| ১৫-২৪ | ১৯.৩৬ | ১৫,৩০৯,৫৪৩ | ১৫,২৪১,৯৭১ |
| ২৫-৫৪ | ৩৯.৭৩ | ৩০,০৯৪,০১৪ | ৩২,৬১৪,২৮৬ |
| ২৫-৫৪ | ৬.৯৩ | ৫,৪০৫,৯০০ | ৫,৫২৭,৩৩০ |
| ২৫-৫৪ | ৬.২৩ | ৪,৬৬৬,০৩২ | ৫,১৬১,৭৪৪ |
উৎস: Bangladesh Demographic profile 2018
সূত্র: CIA World Factbook, 2018
এ বয়স কাঠামোতে নারী-পুরুষের অনুপাত তাৎপর্যময় জনমিতিক বৈশিষ্ট্য।
নারী-পুরুষের অনুপাত: বাংলাদেশে ২০০৪ সাল পর্যন্ত নারীর তুলনায় পুরুষের সংখ্যা বেশি ছিল। বর্তমান নারী পুরুষের অনুপাতে সামঞ্জস্য এসেছে। বাল্যবিবাহ, সন্তান প্রসবকালীন মৃত্যু, অপরিণত বয়সে গর্ভধারণ, যথাযথ চিকিৎসা ও পুষ্টির অভাব প্রভৃতি কারণে বাংলাদেশে নারীর মৃত্যুহার বেশি। তবে বর্তমানে এসব ব্যবস্থার উন্নতির ফলে নারী মৃত্যুহার অনেকাংশে কমেছে।
| সাল | পুরুষ | মহিলা |
| ১৯৯১ | ১০৬.২৬ | ১০০ |
| ২০০৪ | ১০৪.১ | ১০০ |
| ২০১১ | ৯৯.৬৮ | ১০০ |
| ২০১৮ | ১০০.৩০ | ১০০ |
উৎস: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-২০১৮
সূত্র: বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন। www.bangladesh.gov.bd
অভিগমন: বাংলাদেশের জনসংখ্যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য অভিগমন। এদেশে গ্রাম থেকে শহরে অভিগমন ব্যাপক, বিস্তৃত এবং দ্রুত। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৮০ ভাগ গ্রামে বসবাস করে। বাংলাদেশে ৮টি বিভাগীয় শহর রয়েছে এবং নগরায়ণের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় অত্যধিক পরিমাণ জনসংখ্যা বসবাস করে। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৩৫.০৬ শতাংশ নগরে বাস করে এবং নগরায়ণের হার ৩.৫% (সূত্র- বিশ্ব ব্যাংক-২০১৮)। এছাড়া গ্রাম থেকে গ্রামে বিবাহজনিত কারণে কেবল নারীদের অভিগমন উল্লেখযোগ্য।
অপরদিকে আন্তর্জাতিক অভিগমনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বহিঃগমনকারীর সংখ্যা আগমনকারীর তুলনায় অনেক বেশি (মায়ানমার থেকে বলপূর্বক রোহিঙ্গা আগমন বিবেচনা না করে)। যে কারণে নিট অভিগমন হারে বাংলাদেশের মান ঋণাত্মক। কিন্তু বাংলাদেশে বহিঃগমনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
সারণি-২.১০ বাংলাদেশের অভিগমনের হার (হাজারে)
| সাল | অভিগমনের হার |
| ২০১৫ | -৩.২৩ |
| ২০১০ | -৪.৮৩ |
| ২০১০ | -২.২৪ |
| সাল | অভিগমনের হার |
| ২০০০ | -১.২১ |
| ১৯৯৫ | -১.৪২ |
| ১৯৯০ | -০.৪৪ |
| ১৯৮৫ | -১.৮০ |
| ১৯৮০ | -২.৮২ |
- বহি:অভিগমনকারীর সংখ্যা আগমনকারীর তুলনায় অধিক, যা ঋণাত্মক (-) চিহ্ন দ্বারা সূচিত।
সূত্র: World Data Atlas-2018
বাংলাদেশের জনসংখ্যার আরও কিছু বৈশিষ্ট্য এ প্রেক্ষিতে উল্লেখ করা হলো-
i. নৃগোষ্ঠী: বাংলাদেশের অধিক সংখ্যক লোক (প্রায় ৯৮%) বাঙালি। এছাড়া কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ২% রয়েছে যেমন: খাসিয়া, সাঁওতাল, চাকমা, মারমা, গারো, বিহারী, মুন্ডা এবং রোহিঙ্গা। বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এক বিশাল অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করে। রোহিঙ্গারা মূলত মায়ানমার থেকে আগত। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
ii. ভাষাগত বৈশিষ্ট্য: বাংলাদেশের মানুষের প্রধান ভাষা বাংলা। এটি জাতীয় ভাষা (৯৫% জনগণ) হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া চট্টগ্রাম, সিলেট নোয়াখালীতে কিছু উপভাষা রয়েছে। আদিবাসীদের কিছু নিজস্ব ভাষা রয়েছে যেমন: খাসিয়া, জৈয়ন্তিয়া, বিষ্ণুপ্রিয়া, মণিপুরী, আরাকানীয়, চাকমা, গারো, হো, এবং কুরুখ।
iii. ধর্মভিত্তিক বৈশিষ্ট: ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে ৮৬.৬% লোক মুসলমান, ১২.১% লোক হিন্দু, ০.৬% লোক বৌদ্ধ, ০.৪% খ্রিস্টান এবং অন্যান্য ০.১%। বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে অধিকাংশ সুন্নী (প্রায় ৯৫%) এবং অন্য মুসলমানরা শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্গত।

চিত্র-২.২: বাংলাদেশের জনসংখ্যার ধর্মভিত্তিক অবস্থানের গ্রাফচিত্র।
iv. শিক্ষাগত বৈশিষ্ট্য: উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে শিক্ষিতের হার তুলনামূলকভাবে কম। বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষার হার ৭২.৯% (সূত্র: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৮)। পূর্বের তুলনায় বাংলাদেশে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নারী শিক্ষার হারও আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বিরাট অংশ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকায় দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে।
সারণী-২.১১: বাংলাদেশের শিক্ষার হার (%)
| সাল | মোট | মহিলা | পুরুষ |
| ১৯৯১ | ২৪.৯০ | ১৯.৫০ | ৩০.০০ |
| ২০০৪ | ৩৮.০৬ | ৩৫.৩১ | ৪০.৭০ |
| ২০১১ | ৪৭.৬৮ | ৪৫.৫৪ | ৪৯.৮২ |
| ২০১৮ | ৭২.৯ | ৬৯.৯ | ৭৫.৬ |
উৎস: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (২০১১ সালের সর্বশেষ আদমশুমারি অনুসারে)
v. পেশাগত বৈশিষ্ট্য: বাংলাদেশের অধিকাংশ লোক প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক পেশার সঙ্গে জড়িত। কৃষিতে ৩৯.০৭%, শিল্পে ২১.০৯% এবং অন্যান্য সেবা খাতে ৩৯.৮৫% লোক জড়িত (সূত্র: statista, 2018)। ২০১১ সালের সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার ৩৭.৮% লোক কর্মক্ষম বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। মোট ৫.৪১ কোটি শ্রমিকের মধ্যে পুরুষ ৩.৭৯ কোটি ও নারী ১.৬২ কোটি (সূত্র: বিইএস)।
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
(DemographTransitional Model)
জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেল হলো এমন একটি মডেল, যা সময়ের সাথে সাথে জনসংখ্যার পরিবর্তন বর্ণনা করে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে কোনো অঞ্চল বা দেশের জন্মহার ও মৃত্যুহার পরিবর্তিত হয়। ফলে ঐ দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাস পায় অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থির থাকে। এর ফলে জনসংখ্যা এক ধাপ থেকে অন্য ধাপে পরিবর্তিত হতে থাকে। জনসংখ্যার এই ধরনের ট্রানজিশনই জনমিতিক ট্রানজিশন নামে পরিচিত। জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেল জনসংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাখ্যায় আধুনিক মডেল হিসেবে পরিচিত।
উৎপত্তি: বিখ্যাত আমেরিকান ভূগোলবিদ ওয়ারেন থমসন (Waren Thompson) ১৯২৯ সালে প্রথম জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেলের ব্যাখ্যা প্রদান করেন। এই মডেলের ব্যাখ্যা প্রদান করতে গিয়ে Waren Thompson শিল্পায়িত আধুনিক সমাজের গত দু'শ বছরের জন্মহার, মৃত্যুহার এবং ট্রানজিশন পর্যালোচনা করেন।
মূল বিষয়বস্তু
এ মডেল জন্মহার ও মৃত্যুহারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কে ধারনা প্রদান করা হয়েছে। এ মডেল অনুসারে-প্রথমে কোনো দেশে জন্মহার ও মৃত্যুহার উভয়ই বেশি থাকে। ধীরে ধীরে জন্মহারের তুলনায় মৃত্যুহার কমতে শুরু করে। এর পরে ধীরে ধীরে জন্মহারও কমতে শুরু করে। ।। জন্মহার ও মৃত্যুহার হ্রাস পায় অত্যন্ত ধীর গতিতে এবং দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান থাকায় এই সময়ে কোনো দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেলকে Thompson চারটি ধাপে আলোচনা করেন। ধাপ চারটি হলো:
১. উচ্চ জন্মহার এবং উচ্চ মৃত্যুহার।
২. অধিক জন্মহার এবং মৃত্যুহার হ্রাস।'
৩. মৃত্যুহার ও জন্মহার উভয়ই হ্রাস।
৪. মৃত্যুহারের তুলনায় কম জন্মহার।
প্রথম ধাপ
এটি হলো ট্রানজিশনের পূর্বের সময়। অনুন্নত দেশসমূহ যেখানে শিল্পায়ন হয়নি, জীবনযাত্রার নিম্নমান বিদ্যমান, কৃষি নির্ভরশীল অর্থনীতি, শিক্ষার হার কম সেই সমস্ত দেশই এই ধাপের অন্তর্গত। যেহেতু এই সকল দেশের অর্থনীতি অনুন্নত সেহেতু অধিক জন্মহার ও মৃত্যুহার থাকে।
বার্মা (মায়ানমার), ভুটান, পূর্ব ও পশ্চিম আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা ইত্যাদি দেশসমূহ এই পর্যায়ে পড়ে।
এই পর্যায়ের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে অধিক জন্মহার, অধিক মৃত্যুহার, অধিক শিশু মৃত্যুহার, জীবনযাত্রার নিম্নমান, অনুন্নত অর্থনীতি, শিক্ষার অভাব, খাদ্যের অভাব, চিকিৎসার অভাব ইত্যাদি।
এই ধাপে অধিক জন্মহার থাকার মূল কারণগুলো হলো বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, বড় পরিবার, শিক্ষার অভাব, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্মীয় গোঁড়ামি, কৃষিতে নির্ভরশীলতা ইত্যাদি। এছাড়া অধিক মৃত্যুহার থাকার কারণ হলো খাদ্য ও চিকিৎসার অভাব, যুদ্ধ, মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি।
দ্বিতীয় ধাপ
জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেলের এই ধাপকে শিল্পধাপ বলা যায়, যা শুরু হয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে। এই ধাপে শিল্পবিপ্লব মূলত কৃষিবিপ্লবের সঙ্গে শুরু হয়। এই সময়ে এসে মৃত্যুহার হ্রাস পায়, কিন্তু জন্মহার অপরিবর্তিত অবস্থায় থাকে।
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, মেক্সিকো, দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশে এই অবস্থা পরিলক্ষিত হয়।
জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেলের এই ধাপের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো অধিক জন্মহার ও নিম্ন মৃত্যুহার। নগরায়ণ, কৃষির উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, পানির সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন, খাদ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি ইত্যাদি। ফলে ধীরে ধীরে মৃত্যুহার কমতে থাকে। কিন্তু জন্মহারের ক্ষেত্রে ১ম ধাপের ন্যায় অবস্থা বিরাজ করার কারণে জন্মহার অপরিবর্তিত থাকে। এর ফলে ২য় ধাপে এসে কোনো দেশে অধিক জনসংখ্যা যোগ হয়। এই ধাপকে আরো কিছু উপবিভাগে ভাগ করা হয়েছে।
২.১. প্রাক ট্রানজিশন: এই পর্যায়ে মৃত্যুহার কমতে শুরু করে কিন্তু মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নতির কারণে জন্মহার কিছুটা বৃদ্ধি পায়।
২.২. মধ্য ট্রানজিশন: জন্মহার ও মৃত্যুহার উভয়ই কমতে শুরু করে, কিন্তু জন্মহার মৃত্যুহারের তুলনায় বেশিই থাকে।
২.৩. ট্রানজিশন পরবর্তী সময়: জন্মহার ও মৃত্যুহার কমার ধারা অব্যাহত থাকে, কিন্তু এই সময়েও জন্মহার মৃত্যুহারের তুলনায় অধিক থাকে।

তৃতীয় ধাপ
এই পর্যায় বা ধাপকে বলা হয় অর্থনৈতিকভাবে উন্নত পর্যায়। এই ধাপে এসে জন্মহার কমতে শুরু করে এবং মৃত্যুহারের সমান হয় এবং জনসংখ্যার ভারসাম্য বজায় থাকে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে উন্নত দেশগুলোতে এই অবস্থা বিরাজমান ছিল। ইউরোপের দেশগুলো, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এই ধাপের অন্তর্গত।
এই সময় কতগুলো বিশেষ কারণে জন্মহার হ্রাস পেতে থাকে, যেমন: গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন, নির্ভরশীলতা হ্রাস, অধিক নগরায়ণ ও ছোট পরিবার, নারী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, চিকিৎসা ক্ষেত্রে উন্নতি, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং এই সব কিছুর সাথে জনগণের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি।
চতুর্থ ধাপ
জনমিতিক ট্রানজিশন মডেলের ৪র্থ পর্যায়ে জনসংখ্যার পরিবর্তন (জন্মহার, মৃত্যুহার) স্থিতিশীল থাকে। জন্মহার ধীরে ধীরে এমনভাবে কমতে শুরু করে যে জনসংখ্যা বৃদ্ধি শূন্যতে পৌছায়। একই সাথে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ও জীবনমান উন্নত হওয়ায় মৃত্যুহারও কমতে শুরু করে। এর ফলে দেশে জনসংখ্যা স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে ও নির্ভরশীল জনসংখ্যার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
নিউজিল্যান্ড, সুইডেনের মতো উন্নত দেশগুলোতে এই অবস্থা পরিলক্ষিত হয়।
সমালোচনা: এ তত্ত্বটি অধিক যুক্তিযুক্ত ও বাস্তব বলে প্রমাণিত হলেও কতগুলো বিষয় অনিশ্চিত। এ তত্ত্বটি তাই নানাভাবে
সমালোচিত। যেমন-
১. ঐতিহাসিক ধারণার ভিত্তিতে এ মডেল দাঁড় করানো হয়েছিল। এর নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানগত ভিত্তি নেই।
২. পরিবর্তনমূলক মডেলে অবাধ-নীতিকে দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করা হয়েছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারি প্রচেষ্টার কথা উল্লিখিত হয়নি।
৩. এ মডেলে স্থানান্তরের (অভিগমন) কথা বিবেচনা করা হয়নি।
৪. এখানে জন্মহার ও মৃত্যুহারের ভারসাম্যের কথা বিবেচনা করা হয়নি। এখানে জন্মহার ও মৃত্যুহার হ্রাসের কথা অধিক বিবেচিত হয়েছে।
৫. এ মডেলে উল্লেখ করা হয়, কেবল নগরায়িত স্তরেই জন্মহার কমতে থাকে, কিন্তু ডেনমার্ক-সুইজারল্যান্ড শিল্পায়নের আগেই নিম্ন প্রজননশীলতা অর্জনে সক্ষম হয়।
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
(Demographic Transitional Model and Bangladesh)
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ এশিয়ায় পঞ্চম ও পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম রাষ্ট্র। ১৯৬৯ সালে এ দেশের জনসংখ্যা ছিল ৫.৫২ কোটি। ১৯৭৪ সালে জনসংখ্যার পরিমাণ ছিল ৭,৫৩৯৮,০০০০ জন। কিন্তু ২০০১ সাল ও ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেখা যায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা যথাক্রমে ১২, কোটি ও ১৪ কোটি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক ১ জানুয়ারী ২০১৯ সালে বাংলাদেশের মোট প্রাক্কলিত জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫৬ লাখ। অর্থাৎ বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অত্যন্ত বেশি এবং এর প্রধান কারণ উচ্চ জন্মহার।
সারণি-২.১২: বাংলাদেশের জনসংখ্যার জন্মহার ও মৃত্যুহার (প্রতি ১০০০ জনে)
| বছর | জন্মহার (প্রতি ১০০০ জনে) | মৃত্যুহার (প্রতি ১০০০ জনে) |
| ২০১০ | ১৯.২ | ৫.৬ |
| ২০১১ | ১৯.২ | ৫.৫ |
| ২০১২ | ১৮.৯ | ৫.৩ |
| ২০১৩ | ১৯.০ | ৫.৩ |
| ২০১৪ | ১৮.৯ | ৫.২ |
| ২০১৫ | ১৮.৮ | ৫.১ |
| ২০১৬ | ১৮.৭ | ৫.১ |
| ২০১৭ | ১৮.৫ | ৫.১ |
| ২০১৮ | ১৮.৮ | ৫.১ |
উৎস: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা- ২০১৯; পৃষ্ঠা ২২৭
মৃত্যুহার ও জন্মহারের ভারসাম্য দ্বারাই দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি নির্ধারিত হয়। বিগত শতকের গোড়ার দিকে জন্মহার ও মৃত্যুহার দুইটিই অধিক থাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ধীরে। যা জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেলের প্রথম ধাপ। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির ফলে জন্মহারের তুলনায় মৃত্যুহার হ্রাস পেয়েছে বেশি। ফলে বেড়েছে সমগ্র জনসংখ্যা, এটা জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেলের ২য় ধাপ। বর্তমানে এদেশে জনসংখ্যার বৈশিষ্ট্য ৩য় ধাপের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
সারণি-২.১৩: বাংলাদেশের জনসংখ্যা এবং বৃদ্ধির হার (শতকরায়)
| ১৯৬১ | ৫৫ | ২.২৬ |
| ১৯৭৪ | ৭৬ | ২.৪৮ |
| ১৯৮১ | ৯০ | ২.৩২ |
| ১৯৯১ | ১১১ | ২.১৭ |
| ২০০১ | ১৩১ | ১.৫৪ |
| ২০১১ | ১৫০ | ১.৩৭ |
| ২০১৯ | ১৬৬ | ১.৩৭ |
উৎস: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, ২০১৯
অতএব, দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি এবং বাংলাদেশের জনসংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার উপাত্ত ব্যবহার করে জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেলকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

অতএব বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত জন্মহার ও মৃত্যুহার উভয়ই অধিক ছিল, যা এই মডেলের প্রথম পর্যায়, এর পরে মৃত্যুহার জন্মহারের তুলনায় কমতে শুরু করে এবং ২০১৭ সালের জন্মহার ও মৃত্যুহারের পার্থক্য কমে যাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে বাংলাদেশের জনসংখ্যা জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেলের ৪র্থ ধাপে পৌছাবে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন, জীবনযাত্রার মানোন্নয়নসহ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেছে। এছাড়াও সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ জনসংখ্যার পরিবর্তনকে একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে নেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
(Practical: Age Pyramid Drawing and Analysis)
পিরামিড অঙ্কন পদ্ধতি
জনসংখ্যা পিরামিড খুব সহজেই আঁকা যায়। জনসংখ্যা পিরামিড আঁকার সময় জনসংখ্যাকে স্ত্রী ও পুরুষ দুইভাগে ভাগ করে দেখানো হয়। পিরামিডের ভূমি অক্ষে বাম পাশে পুরুষদের বয়সভিত্তিক এবং ডান পাশে স্ত্রীদের বয়সভিত্তিক আয়তলেখ অঙ্কন করে দেখানো হয়। পিরামিডের লম্ব অক্ষে বয়সভিত্তিক বিন্যাস দেখানো হয়।
একটি পিরামিডের মাধ্যমে বিভিন্ন বয়সের জনসংখ্যা এবং বিভিন্ন কাঠামোর জনসংখ্যার প্রদর্শন করা যায়।
পিরামিড লেখচিত্র (Pyramid Graphs): স্তম্ভ লেখচিত্রের একটি ভিন্নরূপ হলো পিরামিড লেখচিত্র। এখানে একটির পর একটি সমান্তরাল সারিতে সরল বা মিশ্র স্তম্ভ লেখচিত্র অঙ্কন করা হয়। নারী ও পুরুষের বয়স ও লিঙ্গ উভয় তথ্য এতে সহজে এক সাথে প্রকাশ করা যায় বলে একে বয়সলিঙ্গ পিরামিড (Age-Sex Pyramid) বলা হয়।
উদাহরণ: নিচে উপাত্তের মাধ্যমে বাংলাদেশের বয়স লিঙ্গ জনসংখ্যার পিরামিড দেখানো হলো:
সারণি-২.১৪: বাংলাদেশের বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক জনসংখ্যা ২০১৮
১৯৯১ সাল (হাজার হিসাবে)
| বয়োবর্গ | পুরুষ | নারী |
| ০-১৪ | ২২,১৩৫ | ২১,৩৭৩ |
| ১৫-২৪ | ১৫,৩১৩ | ১৫,২০০ |
| ২৫-৫৪ | ৩০,৬২৬ | ৩৩,২৬৭ |
| ৫৫-৬৪ | ৫,৫৮২ | ৫,৭১৬ |
| ৬৫+ | ৪,৮৪৪. | ৫,৭১৬ |
উৎস: CIA, World Factbook 2019 1
বাংলাদেশ-২০১৮.

দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
Practical: (Age-pyramid Analysis of Developing and Developed Countries)
উন্নয়নশীল দেশের বয়ঃপিরামিড বিশ্লেষণ (Age-pyramid Analysis of Developing Countries)
বিশ্বের উন্নয়নশীল অঞ্চলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এখনও যথেষ্ট বেশি। উন্নয়নশীল দেশসমূহে বিগত কয়েক দশকে যে হারে মৃত্যুহার কমেছে, সে হারে জন্মহার কমেনি। এ দেশগুলোর জনসংখ্যা পিরামিডের ভূমি অত্যন্ত প্রশস্ত এবং শীর্ষভাগ সংকীর্ণ। মোট জনসংখ্যায় শিশু ও অপ্রাপ্ত বয়স্কদের অনুপাত বেশি। যার ফলে নির্ভরশীল জনসংখ্যা বেশি। কর্মক্ষম জনসংখ্যা কম থাকায় অর্থনৈতিক দিক থেকে এই সকল দেশ পিছিয়ে আছে।
উন্নত দেশের বয়ঃপিরামিড বিশ্লেষণ (Age-pyramid analysis of developed countries)
এই অঞ্চলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়েছে ও জনসংখ্যা স্থিতিশীল। জনসংখ্যা পিরামিড দেখলে বোঝা যাবে এর ভূমি কম প্রশস্ত, উপরের দিকে প্রশস্ততা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং স্ফীত হয়ে উপরের দিকে গিয়ে আবার সরু হয়েছে। উন্নত দেশসমূহে অর্থাৎ উন্নত অঞ্চলে নারী ও পুরুষের শতকরা বৃদ্ধির হারের খুব বেশি পার্থক্য নেই এবং নির্ভরশীল জনসংখ্যার পরিমাণ কম। কর্মক্ষম জনসংখ্যার পরিমাণ অনেক বেশি, ফলে দেশের অর্থনৈতিক কার্যাবলিতে তারা যথেষ্ট অবদান রাখে।

দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
(Causes and Distribution of Bangladesh Population due to Density)
জনসংখ্যার ঘনত্ব
জনসংখ্যার ঘনত্ব বলতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে কত জন লোক বাস করে তাকে বোঝায়। কোনো দেশের মোট জনসংখ্যাকে সে দেশের মোট আয়তন দ্বারা ভাগ করলেই প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাসকারী লোকসংখ্যার ঘনত্ব পাওয়া যায়। জনসংখ্যার ঘনত্ব নির্ণয়ের সূত্রটি নিম্নরূপ-
জনসংখ্যার ঘনত্ব = মোট জনসংখ্যা মোট আয়তন।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান অষ্টম কিন্তু আয়তনের দিক দিয়ে এর স্থান তিরানব্বইতম। বর্তমানে এদেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১,২৭৮ জন (সূত্র: World Population Review, 2018) এবং এ ঘনত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এদেশের সর্বত্র জনসংখ্যা সমানভাবে বণ্টিত নয়। ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, মৃত্তিকা, পরিবহন ও যাতায়াত ব্যবস্থা, শিল্প, ব্যবসা বাণিজ্য প্রভৃতি উপাদানের প্রভাব সর্বত্র সমান নয় বলে বিভিন্ন অঞ্চলের জনসংখ্যার ঘনত্ব ও বণ্টনের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা বণ্টনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
বাংলাদেশ পৃথিবীর প্রধান ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল। তবে এদেশের সব জায়গায় জনসংখ্যার সুষম বণ্টন পরিলক্ষিত হয় না। ভূপ্রাকৃতিক কারণে চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়িয়া এলাকায় ও দক্ষিণের বনাঞ্চলগুলোর পার্শ্ববর্তী এলাকায় জনবসতির ঘনত্ব খুবই কম। অন্যদিকে, নদ-নদী, উর্বর মৃত্তিকা, সমতল ভূভাগ ও নানাবিধ অর্থনৈতিক কারণে ঢাকা, কুমিল্লা ইত্যাদি এলাকায় নিবিড় জনবসতি পরিলক্ষিত হয়।
গ্রামে জনসংখ্যার বণ্টন: দেশের কতিপয় পার্বত্য ও উচ্চভূমি বাদে সমস্ত ভূমিই সমতল ও উর্বর। যেখানে রয়েছে গ্রামীণ জনপদ। এসব সমতল ভূমিতে কম পরিশ্রমে অধিক ফসল উৎপন্ন হয়। এছাড়া প্রতিবছর পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র প্রভৃতি নদী এবং এদের শাখা নদীগুলো দ্বারা পলি সঞ্চিত হয় বলে জমির উর্বরাশক্তি নষ্ট হয় না। অধিক সার প্রয়োগ না করেও অল্প পরিশ্রম ও অল্প খরচে গ্রামীণ অধিবাসীরা ধান, পাট, আখ ও অন্যান্য শস্য প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন করতে সক্ষম হয়। তাই গ্রামাঞ্চলে লোকবসতির ঘনত্ব অধিক।

বাংলাদেশ মৌসুমি জলবায়ুর অন্তর্গত এবং এর প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। ফলে কৃষিকাজের জন্য পানি সেচের বিশেষ প্রয়োজন হয় না এবং কৃষি উৎপাদন সহজ হয়। এ কারণে গ্রামে জনসংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে ঘনবসতিপূর্ণ
হয়েছে।
বাংলাদেশে সমতল অঞ্চলে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন: সড়কপথ, রেলপথ এবং জলপথ আছে। অতি সহজে নানা ধরনের যানবাহনে যাতায়াত এবং পরিবহন ব্যবস্থার সুবিধা এ দেশের গ্রামাঞ্চলে লোকবসতির ঘনত্বের অন্যতম কারণ। এছাড়া সমতল ভূমিতে অধিবাসীদের ঘরবাড়ি তৈরি করে বসবাস করা সহজতর বলে লোকবসতির ঘনত্ব অধিক।
বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার দক্ষিণাংশে জনবসতি অতি বিরল। বান্দরবান জেলায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৮৭ জন, রাঙ্গামাটি জেলায় ৯৭ জন, খাগড়াছড়ি জেলায় ২২৩ জন বসবাস করে।
[Population Monograph of Bangladesh, November, 2015]
অন্যদিকে, পদ্মা ও মেঘনার মোহনার নিকটবর্তী অঞ্চলে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১,০০০ জনের অধিক লোক বাস করে। এটি বাংলাদেশের অতি নিবিড় অঞ্চল। এখানে প্রগাঢ় বা নিবিড় চাষের মাধ্যমে বছরে দুইটি বা কোনো কোনো স্থানে তিনটি ফসল উৎপাদন করা হয়। উর্বর পলল সমৃদ্ধ কৃষিজমির জন্য এ অঞ্চলে জনবসতি খুবই ঘন হয়েছে।
আবার মধুপুর ও ভাওয়ালের গড় এবং বরেন্দ্রভূমির অনুর্বর জমিতে কৃষিকাজের বিশেষ সুবিধা না থাকায় সেখানে জনবসতি কম। সাবেক সিলেট জেলার 'হাওর' বা বিল এলাকায় জলমগ্নতার দরুন এবং বৃহত্তর দিনাজপুর, কুষ্টিয়া ও যশোরের কোনো কোনো অংশে জমির অনুর্বরতার জন্য জনসংখ্যা তেমন ঘন নয়।
শহর এলাকায় জনসংখ্যা বণ্টন: বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং এটি শিল্প ও বাণিজ্যে অনুন্নত। ১৯৭৪ সালের
হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশের জনসংখ্যার মাত্র ৮.৮% লোক শহরে বাস করে। ১৯৯১ সালের হিসাব অনুযায়ী তা বৃদ্ধি পেয়ে ১৩% এ দাঁড়িয়েছে। ১৯৯২ সালে শহরের জনসংখ্যা ছিল ১৫% আর তা বৃদ্ধি পেয়ে ২০০১ সালে হয়েছে। ২৩%। বর্তমানে এদেশে শহরে জনসংখ্যার হার প্রায় ৩৫.০৩% (সূত্র- বিশ্বব্যাংক-২০১৮)।
বর্তমানে এদেশের ৫০০০ ও তার অধিক জনসংখ্যাকে নগরীয় জনসংখ্যারূপে গণ্য করা হয়। অবশ্য ৫০০০ অপেক্ষা কম অধিবাসীর কয়েকটি জনসংখ্যাকে স্থানীয় ও অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্যের জন্য শহর হিসেবে ধরা হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে ১১টি সিটি কর্পোরেশন রয়েছে। এছাড়া ১৫টি বৃহৎ নগর (City) রয়েছে যেগুলোর জনসংখ্যা লক্ষাধিক। যথা-
সারণি-২.১৫: প্রধান প্রধান শহরের জনসংখ্যা-২০১৯
| শহরের নাম | লোকসংখ্যা | শহরের নাম | লোকসংখ্যা |
| ঢাকা | ১০,৩৫৬,৫০০ | যশোর | ২৪৩,৯৮৭ |
| চট্টগ্রাম | ৩,৯২০,২২২ | সিলেট | ২৩৭,০০০ |
| খুলনা | ১,৩৪২,৩৩৯ | ময়মনসিংহ | ২২৫,১২৬ |
| রাজশাহী | ৭০০,১৩৩ | গাজীপুর | ২৩১,০৬১ |
| কুমিল্লা | ৩৮৯,৪১১ | নারায়ণগঞ্জ | ২২৩,৬২২ |
| নাটোর | ৩৬৯,১৩৮ | বগুড়া | ২১০,০০০ |
| রংপুর | ৩৪৩,১২২ | দিনাজপুর | ২০৬,২৩৪ |
| কক্সবাজার | ২৫৩,৭৮৮। | বরিশাল | ২০২,২৪২ |
উৎস: Worldometer.com-2019
বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। এদেশের সর্বত্র জনসংখ্যার বণ্টন সমান নয়। কিন্তু আয়তনে ছোট বলে জনসংখ্যা বণ্টনের সুনির্দিষ্ট কাঠামো প্রদান করা কষ্টকর। ভূপ্রকৃতি, মৃত্তিকা, জলবায়ু, পরিবহন ও যাতায়াত ব্যবস্থা, শিক্ষা, শিল্প, ব্যবসা বাণিজ্য, নগরায়ণ প্রভৃতি নিয়ামক দ্বারা বাংলাদেশের গ্রামীণ ও শহুরে জনসংখ্যার বণ্টন বিশেষভাবে প্রভাবিত।
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল রাষ্ট্র (৮ম)। এ দেশের আয়তনের তুলনায় লোকসংখ্যার ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। তবে এ জনসংখ্যার ঘনত্ব সর্বত্র সমভাবে বণ্টিত নয়। ভূ-প্রকৃতি, জলবায়ু, মৃত্তিকার উর্বরতা, শিল্পায়ন, নগরায়ণ প্রভৃতি কারণে এদেশে জনসংখ্যার অসম বণ্টন পরিলক্ষিত হয়।
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
(Causes of Variation of Population Density in Bangladesh)
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে জনসংখ্যার ঘনত্বের তারতম্য লক্ষ করা যায়। ভূপ্রাকৃতিক কারণে চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়িয়া অঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে অনেক কম। অন্যদিকে, উর্বর সমতল ভূভাগ ও অর্থনৈতিক কারণে ঢাকা বিভাগে জনসংখ্যার ঘনত্ব অধিক পরিলক্ষিত হয়।
সারণি-২.১৬: বিভাগ অনুযায়ী জনসংখ্যার ঘনত্ব, ২০১১
| বিভাগ | জনসংখ্যার ঘনত্ব (বর্গকিলোমিটার) |
| ঢাকা | ১৫২৩ |
| রাজশাহী | ১,০১৫ |
| চট্টগ্রাম | ৮৪১ |
| খুলনা | ৭০৪ |
| সিলেট | ৭৮০ |
| বরিশাল | ৬২৬ |
| রংপুর | ৯৬০ |
| ময়মনসিংহ | ১০৭৪* |
উৎস: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো: Population and Housing Census 2011
(*wikipedia-2018)
নিচে বাংলাদেশের লোকবসতি ঘনত্বের তারতম্যের কারণসমূহ বর্ণনা করা হলো-
১. ভূপ্রকৃতি: ভূভাগের গঠন প্রকৃতির ওপর জনসংখ্যার বণ্টন বহুলাংশে নির্ভরশীল। উচ্চ পার্বত্য এলাকা অপেক্ষা সমভূমিতে মানুষের জীবনযাত্রা অত্যন্ত সহজ বলে সমভূমি অঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি হয়ে থাকে। তাই বাংলাদেশের সমতল ভূমি অঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব অধিক। পক্ষান্তরে, পার্বত্য চট্টগ্রামে লোকবসতি অনেক কম।
২. জলবায়ু : জনসংখ্যা বণ্টনের ওপর জলবায়ুর বিশেষ প্রভাব রয়েছে। অনুকূল সমভাবাপন্ন জলবায়ু বিরাজ করায় বাংলাদেশের সর্বত্র জনসংখ্যার অধিক ঘনত্ব লক্ষণীয়।
৩. মৃত্তিকার উর্বরতা: মৃত্তিকার উর্বরতা জনসংখ্যার বণ্টনকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় কৃষিই এদেশের মানুষের প্রধান উপজীবিকা। কৃষিকাজের জন্য উর্বর মৃত্তিকা অত্যন্ত উপযোগী। ফলে বাংলাদেশের যে সকল অঞ্চলের মৃত্তিকা অত্যন্ত উর্বর সে সকল অঞ্চলের লোকবসতি অত্যন্ত ঘন। অপরদিকে, পাহাড়ি এলাকা, প্রাচীন পাললিক সমভূমি অঞ্চল, ভাওয়াল ও মধুপুরের গড় এবং রংপুর ও দিনাজপুরের অনুর্বর মৃত্তিকা গঠিত অঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব কম।
৪. বৃষ্টিপাত: বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষিকাজের জন্য সময়মতো ও পরিমিত বৃষ্টিপাত একান্ত প্রয়োজন। যে সকল অঞ্চলে বৃষ্টিপাত পরিমিত তথায় জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি। যেমন- বাংলাদেশের পদ্মা ও যমুনা নদীর পশ্চিম তীর অপেক্ষা পূর্ব তীরে পরিমিত বৃষ্টিপাত হওয়ায় কৃষিকার্য সহজভাবে সম্পাদন করা যায়। ফলে এ পাড়ে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি।
৫. সেচ ব্যবস্থা: কৃষিকাজের জন্য পর্যাপ্ত পানি প্রয়োজন। বাংলাদেশের যেসব এলাকায় বৃষ্টিপাত কম কিন্তু সেচ কার্যের সুবিধা রয়েছে সেসব এলাকায় লোকবসতির ঘনত্ব বেশি। যেমন: চাঁদপুর জেলা।
৬. নদী অববাহিকা: নদী অববাহিকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব খুব বেশি হয়। কারণ-
ক. পানির উৎস ও সহজে মৎস্য পাওয়া যায়।
খ. জীবনধারণের জন্য সহজেই চাষাবাদ করা যায়।
গ. যাতায়াতের জন্য সুবিধাজনক।
এসব কারণে বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব অধিক।
৭. পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা: জনসংখ্যা বণ্টনে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভাব অপরিসীম। যে সকল অঞ্চলে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত তথায় লোকবসতি বেশি। সড়ক, রেল ও নৌপথে উত্তম যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকায় রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের পাহাড়িয়া এলাকা এবং সুন্দরবন ব্যতীত বাংলাদেশের সর্বত্র জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি।
৮. শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য: শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি বা অবনতির ওপর জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেকাংশে নির্ভর করে। যে সকল অঞ্চল ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকারখানায় উন্নত তথায় কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি। ফলে জনসংখ্যার ঘনত্বও বেশি। শিক্ষা মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন আনে।
৯. নগরায়ণ: নগরায়ণের ওপর জনসংখ্যার ঘনত্ব নির্ভরশীল। শহরে মানুষের জীবনধারণের উপযোগী সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান থাকায় লোকবসতি অধিক ঘন হয়। যেমন- বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় লোকবসতি সর্বাধিক।
১০. খনিজ সম্পদ: বাংলাদেশের যেসব অঞ্চলে পর্যাপ্ত পরিমাণ খনিজ সম্পদ পাওয়া যায় সেসব অঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি। যেমন- সিলেট, কৈলাশটিলা, তিতাস গ্যাস অঞ্চলে লোকবসতি ঘন।
১১. বনভূমির অবস্থান: দুর্গম বনাঞ্চল থাকায় দক্ষিণে সুন্দরবন এলাকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব কম। পার্বত্য রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানেও ঐ কারণে জনবসতি কম।
বাংলাদেশের সমতল উর্বর মৃত্তিকা, সমভাবাপন্ন জলবায়ু ইত্যাদি প্রাকৃতিক নগরায়ণ ও শিল্পায়নসহ বহুবিধ অর্থনৈতিক কারণে জনসংখ্যার ঘনত্বের তারতম্য পরিলক্ষিত হয়।
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
(Practical: Showing of Population Distribution in Maps)
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। সর্বশেষ ২০১১ আদমশুমারি রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রায় ১০১৫ জন। এই বিপুল জনসংখ্যার বণ্টন অত্যন্ত অসমান। বিভাগ অনুসারে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ঢাকা বিভাগে সর্বাধিক লোকের বসবাস। ক্রমানুসারে রাজশাহী দ্বিতীয়, রংপুর তৃতীয়, চট্টগ্রাম চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।
সারণি-২.১৭: বিভাগ অনুযায়ী জনসংখ্যার ঘনত্ব ২০১১
| বিভাগ | জনসংখ্যার ঘনত্ব (বর্গকিলোমিটার) |
| ঢাকা | ১,৫২৩ |
| রাজশাহী | ১,০১৫ |
| চট্টগ্রাম | ৮৪১ |
| খুলনা | ৭০৪ |
| সিলেট | ৭৮০ |
| বরিশাল | ৬২৬ |
| রংপুর | ৯৬০ |
উৎস: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো: Population and Housing Census 2011
মানচিত্রে (২.৮ নং) বিভাগ অনুসারে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব দেখানো হয়েছে। এতে দেখা যায় জনসংখ্যার ঘনত্ব ৫০০-১০০০ এর মধ্যে রংপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা ও বরিশাল বিভাগ অন্তর্গত। রাজশাহী বিভাগে জনসংখ্যার ঘনত্ব ১০১৫ এবং ঢাকা বিভাগে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে সর্বাধিক প্রায় ১৫২৩ জন লোকের বসবাস।
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
(Effects of Fast population growth in Bangladesh)
বাংলাদেশে জনসংখ্যার অন্যতম সমস্যা হলো দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি। ১৯৯১ সালে আদমশুমারি রিপোর্ট ছিল ২.১৭ ভাগ। বর্তমানে এই বৃদ্ধির হার ১.৩৭% (সূত্র- বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো- ২০১৯)। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার পূর্বের তুলনায় হ্রাস পেলেও এর প্রভাব পড়ছে আমাদের বাসস্থান, আবাদি জমি, খাদ্যশস্য ও যাতায়াত ব্যবস্থা ইত্যাদির ওপর। তবে অধিক জনসংখ্যা একটি দেশের জন্য আর্শীবাদ হতে পারে যখন তা অন্য দেশে রপ্তানি করা হয়। নিম্নে জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির প্রভাব আলোচনা করা হলো:
১. বাসস্থানের ওপর প্রভাব: বাংলাদেশে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বাসস্থানের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে।
World Population Review-2018-র রিপোর্ট অনুসারে বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কি.মি. এ ১২৭৮ জন। সুতরাং, এই বিপুল জনসংখ্যা এত ক্ষুদ্র দেশে বসবাস করতে বহু সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। গ্রাম থেকে মানুষ শহরের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ফলে শহরে জনসংখ্যার বাসস্থান সংকুলান সম্ভব না হওয়ায় ঘর বাড়ি আনুভূমিকভাবে গড়ে না ওঠে উল্লম্ব (vertical) ভাবে গড়ে উঠছে। শহরে অধিক জনসংখ্যার কারণে বেশি মাত্রায় বস্তি সৃষ্টি হচ্ছে যা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান শহরগুলো যেমন ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ইত্যাদি শহরগুলোতে বাসস্থানগুলো উল্লম্বভাবে গড়ে উঠছে। অন্যদিকে, গ্রামাঞ্চলেও জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির কারণে দিন দিন ঘর বাড়ির দূরত্ব কমে আসছে। অর্থাৎ পুঞ্জিভূত বাসস্থান সৃষ্টি হচ্ছে।
২. আবাদি জমির ওপর প্রভাব: বাংলাদেশে জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে আবাদি জমির ওপর। গ্রামাঞ্চলে পূর্বে একটি পরিবারের জন্য যে পরিমাণ জমির ফসলে চাহিদা মিটতো বর্তমানে সেই একই পরিবারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে উক্ত জমি বণ্টনের ফলে খন্ড-বিখন্ড হয়ে গেছে। ফলে ফসলের উৎপাদনও হ্রাস পেয়েছে।
৩. খাদ্যশস্যের ওপর প্রভাব: কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে খাদ্য সমস্যা বিদ্যমান। খাদ্য ঘাটতি পূরণের জন্য বাংলাদেশকে প্রতি বছর বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দেশের খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের কৃষিতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির শতকরা হার ৪৮.৪% [সূত্র: জাতীয় তথ্য বাস্তবায়ন www.bdgov.com]। অথচ এই বিপুল শ্রমশক্তির অদক্ষতা ও অজ্ঞতার কারণে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব হচ্ছে না। আবাদি জমির পরিমাণ হ্রাসও খাদ্যশস্য উৎপাদন হ্রাসের একটি কারণ। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি তুলনামূলক অনেক কম। এর প্রভাবে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়।
৪. যাতায়াত ব্যবস্থার ওপর প্রভাব: বাংলাদেশে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি যাতায়াত ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করে।
বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও নগরায়ণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও উন্নত হচ্ছে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে যাতায়াত ব্যবস্থা অর্থাৎ সড়ক, রেলপথ, নৌপথ ও আকাশপথের ওপর প্রচুর চাপ পড়ছে। স্বাধীনতার পর থেকে সড়ক পথের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। কিন্তু জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপের কারণে সড়ক দুর্ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি বছর নৌ পথে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই এর কারণে লঞ্চ ডুবির মতো বড় বড় দুর্ঘটনায় প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছে। ১৯৪৭ সালে বাংলাদেশ অংশে মোট রেলপথের পরিমাণ ছিল ২,৭০৬ কিলোমিটার। ২০১৮ সাল নাগাদ তা বৃদ্ধি পেয়ে ২৮৭৭.১০ কি.মি. এ দাঁড়ায়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে রেলপথের সুব্যবস্থাও অনেক সময় দুর্ভোগ ডেকে আনে। অর্থাৎ অতিরিক্ত যাত্রীদের কারণে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।
দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি যেকোনো দেশের খাদ্যশস্য, বাসস্থান, আবাদি জমি ও যাতায়াত ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। বাংলাদেশেও দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বাসস্থানের সমস্যা, আবাদি জমির পরিমাণ হ্রাস, খাদ্যশস্য ঘাটতি, যাতায়াত ব্যবস্থায় দুর্ঘটনা ইত্যাদি প্রভাব পড়ছে। সর্বোপরি বলা যায়, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি একটি দেশের জন্য কখনই মঙ্গলকর নয়।
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
(Relationship between Natural Resources and Population)
সম্পদ বলতে বুঝায় যার উপযোগ আছে। অর্থাৎ মানুষের প্রয়োজনে যা ব্যবহৃত হয় এবং যার অর্থমূল্য আছে তাই সম্পদ। প্রকৃতি অবারিতভাবে মানুষের জন্য যা কিছু দান করেছে তা সম্পদ হিসাবে বিবেচিত। বনজ সম্পদ, খনিজ সম্পদ, মৎস্য সম্পদ, পশু সম্পদ, পানি সম্পদ, মৃত্তিকা সম্পদ ইত্যাদি সবকিছুই প্রকৃতি প্রদত্ত। তবে জনসংখ্যা না থাকলে এগুলো অব্যবহৃত থাকে এবং সেক্ষেত্রে তা সম্পদ হিসাবে পরিগণিত হবে না। দক্ষ জনশক্তিও একটা সম্পদ। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটা অন্যতম খাত হলো বৈদেশিক শ্রমবাজার। বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর অনেক দেশই জনবিরল উন্নত দেশে জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। এদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ভারত। শিল্প শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর থেকে শুরু করে কম্পিউটার বিশারদ, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী সবই 'জনসম্পদের' পর্যায়ভুক্ত। অর্থাৎ জনসংখ্যা ও সম্পদের সম্পর্ক সরাসরি। প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ নিজে যেমন সম্পদ তেমনি প্রকৃতির দানকে সরাসরি ব্যবহার করে কিংবা ব্যবহার উপযোগী করে তাকে সম্পদ রূপান্তর করে থাকে। যেমন: মৃত্তিকাকে কর্ষণ করে ফসল না ফলানো পর্যন্ত তা সম্পদ নয়। আবার বনের কাঠ থেকে আসবাবপত্র ও শিল্পজাতদ্রব্য তৈরি না করলে কিংবা তা জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার না করলে তা সম্পদের পর্যায়ভুক্ত হবে না। এ ছাড়া প্রাচীনকাল থেকে মানুষ বনের ফলমূল আহরণ, পশু শিকার, মধু সংগ্রহ, বাঁশ, বেত ও ছনঘাসের ব্যবহারের মাধ্যমে তাদেরকে সম্পদে পরিণত করেছে। তেমনিভাবে প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ মাটির নিচ থেকে কয়লা, লৌহ, তামা, স্বর্ণ, রৌপ্য, তেল, গ্যাস প্রভৃতি আহরণ ও ব্যবহার করে তাদেরকে সম্পদে পরিণত করেছে। বহমান পানি থেকে পানি বিদ্যুৎ কিংবা সূর্যালোক থেকে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন মানুষেরই কীর্তি এবং মানুষের প্রয়োজনেই তা ব্যবহার হচ্ছে।
উপরের আলোচনায় প্রতীয়মান হয়, জনসংখ্যা ও সম্পদ নিবিড় সম্পর্কযুক্ত। কোনো ভূখণ্ডে জনবসতি না থাকলে সেখানে প্রাকৃতিক ও মানবিক সম্পদ সৃষ্টি হবে না। আবার সম্পদে রূপান্তর উপযোগী প্রকৃতির দানসমূহ না থাকলে সেখানে জনবসতি সৃষ্টি কিংবা জনসম্পদও গড়ে উঠবে না। প্রাচীনকাল থেকে উর্বর মৃত্তিকাযুক্ত নদী তীরবর্তী এলাকায় কৃষিভিত্তিক সভ্যতা গড়ে উঠেছে। আবার নদী ও সমুদ্রপথকে কাজে লাগিয়ে আন্তঃদেশীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। পরবর্তীতে খনি এলাকায় খনিজ উত্তোলনভিত্তিক আবাসন সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ সম্পদ জনসংখ্যা বিকাশের অপরিহার্য উপাদান। কোনো অঞ্চলের সম্পদ যখন জনগণের চাহিদাকে যথাযথভাবে পূরণ করতে পারে না তখন তা অতিরিক্ত জনসংখ্যার দেশ হিসাবে গণ্য হয়। জনসংখ্যা তত্ত্ববিদ ম্যালথাসের মতে, ঐ সময় যুদ্ধ, মহামারী, দুর্ভিক্ষ, বন্যা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ অতিরিক্ত জনসংখ্যা গ্রাস করে। তবে পৃথিবীতে জনবহুল দেশের পাশাপাশি সম্পদ পরিপূর্ণ জনবিরল দেশও থাকে। সেক্ষেত্রে প্রাচীনকাল থেকে সম্পদপূর্ণ অঞ্চল বা দেশের দিকে অভিগমন একটা সাধারণ ঘটনা।
এ অধ্যায়ের প্রধান শব্দভিত্তিক সারসংক্ষেপ
| জনমিতিক উপাদান | জনসংখ্যার জনমিতিক উপাদানগুলো হলো- আকার, ঘনত্ব, বয়স কাঠামো, প্রজননশীলতা, জন্ম ও মৃত্যুহার, লিঙ্গ অনুপাত। উপাদানগুলোর মধ্যে আকারগত বৈশিষ্ট্য জনসংখ্যার মোট বৃদ্ধির পরিমাণকে প্রভাবিত করে। ঘনত্বের দ্বারা ভূমির ওপর জনসংখ্যার চাপের তীব্রতা প্রকাশ পেয়ে থাকে। জনসংখ্যার বয়স কাঠামো কোনো দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার প্রকাশ ঘটায়। প্রজনন ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে জনসংখ্যার বয়স কাঠামোকে শিশু ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক, প্রাপ্ত বয়স্ক ও বৃদ্ধ এই তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়। কোনো দেশের উন্নতিতে প্রজননশীলতা বা বংশবৃদ্ধির গুরুত্ব রয়েছে। সামাজিক ও জনমিতিক পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় প্রজননশীলতার ভূমিকা রয়েছে। জন্ম ও মৃত্যুহার জনসংখ্যার বৃদ্ধি প্রক্রিয়াকে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে থাকে। |
| জন্মহার | কোনো বছরের জন্মিত সন্তানের মোট সংখ্যাকে উক্ত বছরের মধ্যকালীন মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে স্থূল জন্মহার পাওয়া যায়। স্থূল জন্মহার (CBR) =কোনো বছরে জন্মিত সন্তানের মোট সংখ্যা/বছরের মধ্যকালীন মোট জনসংখ্যা × ১০০০ |
| স্থূল মৃত্যুহার | স্থূল মৃত্যুহার মরণশীলতা পরিমাপের বহুল প্রচলিত ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। নির্দিষ্ট কোনো বছরে মৃত্যুবরণকারীদের মোট সংখ্যাকে উক্ত বছরের মধ্যবর্তী সময়ের মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে স্কুল মৃত্যুহার পাওয়া যায়। অর্থাৎ স্কুল মৃত্যুহার (CDR) = কোনো বছরে মৃত্যুবরণকারীদের মোট সংখ্যা/ঐ বছরের মধ্যকালীন মোট জনসংখ্যা × ১০০০ |
| লিঙ্গ অনুপাত | জনসংখ্যার লিঙ্গভিত্তিক কাঠামো বলতে একটি দেশে মোট জনসংখ্যার কতজন নারী ও পুরুষ আছে তার পরিসংখ্যানকে বোঝায়। সাধারণত নারী-পুরুষ অনুপাত দ্বারা এরূপ লিজাভিত্তিক বৈশিষ্ট্যের গঠন নির্দেশ করা হয়। লিঙ্গভিত্তিক কাঠামো নিম্নোক্ত সূত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। লিঙ্গানুপাত = মোট মহিলার সংখ্যা/মোট পুরুষের সংখ্যা × ১০০। |
| অভিগমন | মানুষ তার নিজের চাহিদা পূরণের জন্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে গমন করাকে অভিগমন বলে। সাধারণত দুই ধরনের অভিগমন দেখা যায়; ঐচ্ছিক ও অনৈচ্ছিক অভিগমন। স্থানের উপর ভিত্তি করে অভিগমনকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অভিগমনে ভাগ করা যায়। অভ্যন্তরীণ অভিগমনের ক্ষেত্রে দেশের সীমা অতিক্রম করতে হয় না। জনমিতিতে আন্তর্জাতিক অভিগমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে দেশের জনসংখ্যার পরিবর্তন ঘটে। |
| ট্রানজিশনাল মডেল | জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেল জনসংখ্যা বৃদ্ধির আধুনিক মডেল নামে পরিচিত। বিখ্যাত আমেরিকান ভূগোলবিদ ওয়ারেন থমসন ১৯২৯ সালে প্রথম জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেল এর ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি একে চারটি ধাপে ভাগ করেন। যেমন- উচ্চ জন্মহার ও মৃত্যুহার, অধিক জন্মহার ও মৃত্যুহার হ্রাস পায়, মৃত্যুহার ও জন্মহার উভয়ই হ্রাস পায় এবং মৃত্যুহারের তুলনায় কম জন্মহার। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, ১৯৭৪ সালে জন্মহার ও মৃত্যুহার উভয়ই অধিক ছিল, যা. এই মডেলের প্রথম পর্যায়। এর পরে মৃত্যুহার জন্মহারের তুলনায় কমতে শুরু করে এবং ২০০৮ সালের পর জন্মহার ও মৃত্যুহারের পার্থক্য কমে যাচ্ছে। এক সময় এদেশের জনসংখ্যা জনমিতিক ট্রানজিশনাল মডেলের চতুর্থ ধাপে পৌছাবে। |
| জনসংখ্যা পিরামিড | জনসংখ্যা পিরামিড হচ্ছে কোনো স্থানের জনমিতিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশক গ্রাফচিত্র। নারী পুরুষের বয়সভিত্তিক বিন্যাস গ্রাফে প্রকাশ করলে ত্রিভুজ বা পিরামিড সদৃশ যে নকশা তৈরি হয় তাকে জনসংখ্যা পিরামিড বলে। এক্ষেত্রে উল্লম্ব অক্ষে (Vertical line) বয়স এবং অনুভূমিক অক্ষের (Horizontal line) বামে পুরুষ ও ডানে নারীর সংখ্যা বা শতকরা হার স্তম্ভে (Bar) স্থাপন করে দেখানো হয়। |
| কাম্য জনসংখ্যা | কোনো দেশের কাম্য জনসংখ্যা বলতে উক্ত দেশের প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পদসমূহকে সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জনসংখ্যাকে বোঝানো হয়। কাম্য জনসংখ্যা দ্বারা কোনো দেশের সম্পদসমূহকে পরিকল্পনার মাধ্যমে সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। এর মাধ্যমে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি করা যায় এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব হয়। |
| জনসংখ্যার বিস্ফোরণ | যখন কোনো দেশ বা অঞ্চলে জনসংখ্যার হার দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে তখন তাকে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ বলে। জনসংখ্যার মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধির ফলে দেশ বা জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বাঁধার সৃষ্টি হয়। এর ফলে এমন সব সমস্যার সৃষ্টি হয়, যা দেশ বা জাতিকে চরম অবনতির দিকে ঠেলে দেয়। এজন্য একে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ বলা হয়। |
| জনসংখ্যা নীতি | জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত সমস্যা সমাধানের জন্য প্রস্তাবিত নীতি ও কার্যক্রমের টেকসই (Sustainable) প্রায়োগিক কৌশলই জনসংখ্যা নীতি। জনসংখ্যা নীতি হলো এমন কতগুলো গঠনমূলক ও বাস্তবধর্মী আইনানুগ ব্যবস্থা, যা প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং সরকারি পদক্ষেপের সমষ্টি ও সমন্বয় সাধন করে। এই নীতির মাধ্যমে দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। |
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
Read more