(Urbanization in Bangladesh: History and Charecteristics)
বাংলাদেশ গ্রামপ্রধান দেশ হলেও এদেশে নগরায়ণের ইতিহাস যথেষ্ট প্রাচীন। প্রাচীনকালের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি, এদেশের বগুড়ার মহাস্থানগড়ে পুণ্ড নামক নগর ছিল। মুঘল আমলে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ-এ বাংলার রাজধানী স্থাপিত হয়। এখানকার পানামা নগর-এ আধুনিক নগর ব্যবস্থার সকল বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। ১৬১০ সালে ঢাকা জাহাঙ্গীরনগর নামে পরিচিত ছিল এবং বাংলার রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া ব্রিটিশ আমলে পূর্ব বাংলার প্রথম জেলা হিসাবে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি যশোর শহর এর পত্তন ঘটে।
পাকিস্তান আমলে অর্থাৎ স্বাধীনতা লাভের পূর্বে আমাদের দেশে সতেরোটি বৃহত্তর জেলাসহ নব্বইটির মতো শহর ছিল। নগর জনসংখ্যার হার ছিল ১০% এর নিচে। স্বাধীনতার পর থেকে বিশেষ করে গত শতাব্দীর ৯০ এর দশকের পর থেকে নানাবিধ কারণে বাংলাদেশে নগর জনসংখ্যার হার যেমন নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি বৃদ্ধি পেয়েছে নগরের সংখ্যাও। বর্তমানে বাংলাদেশে ৫০০ এর বেশি নগর রয়েছে এবং নগর জনসংখ্যার হার দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ (সূত্র: বিশ্বব্যাংক-২০১৮)।
বাংলাদেশে নগর জনসংখ্যার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে বা নগরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে অর্থাৎ ক্রমবর্ধমান হারে নগরায়ণ হচ্ছে। দেশের সব জেলা সদর তো বটেই প্রায় সকল উপজেলা সদর এমন কি অনেক বড় বড় গঞ্জ বা হাটও আজ শহরে পরিণত হচ্ছে। মানুষ কৃষি পেশা পরিত্যাগ করে অকৃষি পেশা গ্রহণ করছে। জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে। তবে অতি দ্রুত নগরায়ণ হওয়ার ফলে কোথাও পরিকল্পিতভাবে নগর গড়ে তোলা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের নগরায়ণের বৈশিষ্ট্য
অপরিকল্পিত নগরায়ণ: বাংলাদেশে নগর প্রতিষ্ঠায় কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। প্রশাসনের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে এবং মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে যত্রতত্র নগর গড়ে উঠছে। ফলে পরিকল্পিত রাস্তাঘাট, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ আবর্জনা নিষ্কাশনসহ অন্যান্য নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
নগর জনসংখ্যার হার বৃদ্ধি: গত ত্রিশ বছরে নগরে বসবাসকারী জনসংখ্যার হার বেড়েছে কয়েকগুণ। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বর্তমানে যেখানে ২% এর নিচে সেখানে বড় শহরগুলোতে নগর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় ১০% এর বেশি। শহরে নাগরিক সুবিধা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় গ্রাম থেকে মানুষ শহরে পাড়ি জমাচ্ছে এবং স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে থেকে যাচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে শহরের অভ্যন্তরীণ কাঠামো ভেঙে পড়ছে।
সকল কর্মক্ষেত্র নগরকেন্দ্রিক: বাংলাদেশের সমস্যা হলো, নগর ও গ্রাম জীবনের জীবনযাত্রার মানের পার্থক্য অনেক বেশি। এদেশের বড় বড় অফিস-আদালত, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি অনেক ছোট-বড় কারখানাও শহরকেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে।
যত্রতত্র নগর প্রতিষ্ঠা; কোনো স্থান বা বসতি নগর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে হলে কতকগুলো বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সব সময় তা মানা হয় না। অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে বা অন্য কোনো কারণে এমন সব বসতিকে নগর হিসেবে (পৌরসভা) ঘোষণা করা হয়, যা নগর হওয়ার উপযুক্ত হয়নি। ফলে সেই সমস্ত নগরে জীবনযাত্রার মান কাঙ্ক্ষিত স্তরে পৌঁছায় না।
পেশার পরিবর্তন ও নগরায়ণ: বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষিত নব প্রজন্ম পিতৃপুরুষের কৃষি পেশায় ফিরে যেতে চাইছে না। ফলে কাজের সুবিধার্থে তারা শহরে বসতি গড়তে চাচ্ছে। শুরু হচ্ছে নতুন করে নগরায়ণ প্রক্রিয়া।
নগরকেন্দ্রিক মানসিকতা: আমাদের মানসিকতা এমনভাবে তৈরি হয়েছে যে, আমরা যা কিছু ভালো ও উন্নত তার সবকিছুই নগরকেন্দ্রিক করে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যেমন- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শপিংমল, বিনোদন কেন্দ্র সবকিছুই নগরকেন্দ্রিক হতে হবে। এই মানসিকতা ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের অন্যতম কারণ।
বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই
Read more