(River)
ভূপৃষ্ঠের পরিবর্তন সাধনকারী প্রাকৃতিক শক্তিসমূহের মধ্যে নদীর ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। নদী কোনো উঁচু স্থান থেকে উৎপত্তি লাভ করে একটি সুনির্দিষ্ট খাতে নিম্নঢাল অভিমুখে পানি প্রবাহিত করে। সাধারণত উচ্চ পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ গলে নিম্নঢালে প্রবাহিত হয়ে হ্রদ বা সমুদ্রে পতিত হলে তাকে নদী বলে। যেমন- গঙ্গা নদী হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপত্তি লাভ করে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এছাড়া মালভূমি বা পার্বত্য ভূমিরূপে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঝরণাধারা (যেমন- বৃষ্টির পানি থেকে সৃষ্ট) মিলিত হয়ে নিম্ন ঢালে নদীরূপে প্রবাহিত হয়। যেমন- বাংলাদেশের কর্ণফুলী, সাঙ্গু, নাফ, হালদা প্রভৃতি।
নদী উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত ক্ষয়সাধন, পরিবহন ও সঞ্চয় কাজ করে থাকে। নদীর ক্ষয়কাজের দ্বারা গিরিখাত, বর্তুলাকার গর্ত, সর্পিল বাঁক ইত্যাদি বৈচিত্র্যময় ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়। আবার সঞ্চয় কাজের ফলে প্লাবন সমভূমি, বদ্বীপ, বাঁকবিশিষ্ট নদী, অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের মত ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক গতিতে পার্বত্য ভূমিরূপের খাড়া ঢালের জন্য নদীতে খরস্রোত থাকে। ফলে এ গতিতে নদীর ক্ষয়সাধনের ক্ষমতা অনেক বেশি থাকে।
নদীর পর্যায় (Stages of river)
উৎস হতে মোহনায় পতিত হওয়া পর্যন্ত নদীর গতিপথকে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়। যেমনঃ (১) পার্বত্য অবস্থা বা ঊর্ধ্বগতি, (২) সমভূমি অবস্থা বা মধ্যগতি এবং (৩) বদ্বীপ অবস্থা বা নিম্নগতি।
(১) পার্বত্য অবস্থা বা ঊর্ধ্বগতি (Mountain Phase): ঊর্ধ্বগতি হলো নদীর প্রাথমিক অবস্থা। পর্বতের যে স্থান থেকে নদীর উৎপত্তি হয়েছে সেখান থেকে সমভূমিতে পৌছানো পর্যন্ত অংশকে নদীর ঊর্ধ্বগতি বলে। ঊর্ধ্বগতি অবস্থায় নদী ভূমি ক্ষয় করে এবং ক্ষয়িত পদার্থ পরিবহন করে। পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিভাগ ঢালু ও উঁচুনিচু থাকে বলে নদীর গতিবেগ ঘণ্টায় ২৪-৩২ কি.মি. পর্যন্ত হয়ে থাকে। প্রবল স্রোতের আঘাতে ভূত্বক হতে শিলা ভেঙে পড়ে এবং তা নিম্নদিকে গড়িয়ে অগ্রসর হয়। পার্বত্য অবস্থায় নদীর পার্শ্বক্ষয় অপেক্ষা নিম্নক্ষয়ই বেশি হয়ে থাকে। ফলে গিরিখাত, ক্যানিয়ন, খরস্রোত, জলপ্রপাত প্রভৃতির সৃষ্টি হয়।

পার্বত্য অবস্থায় নদীর প্রধান কাজ ক্ষয়সাধন হলেও অনেক সময় নদীর ঢাল কমে নদীর গতি হ্রাস পেলে অথবা হঠাৎ অধিক পরিমাণ প্রস্তরখণ্ড আসলে নদী তা সম্পূর্ণরূপে বহন করতে না পেরে সামান্য কিছু সঞ্চয় করে। এ প্রকারে নদীবাহিত বিভিন্ন পদার্থগুলো অল্প ঢালযুক্ত অঞ্চলে সঞ্চিত হয়। নদী হঠাৎ উচ্চভূমি হতে নিম্নভূমিতে পতিত হলে সেখানে পলি জমা হয়ে পলল পাখা বা পলল কোণ গঠিত হয়। কখনও কখনও পাহাড়ের পাদদেশে প্রস্তরখণ্ড, নুড়ি, বালি প্রভৃতি জমা হয়ে একটি বিস্তীর্ণ সমভূমির সৃষ্টি করে। ভারতের শিবালিক পর্বতের পাদদেশে এরূপ সমভূমি গঠিত হতে দেখা যায়।
(২) সমভূমি অবস্থা বা মধ্যগতি (Plain or Middle Phase): পার্বত্য অঞ্চল পার হয়ে নদী যখন সমভূমির উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় তখন এর প্রবাহকে সমভূমি অবস্থা বা মধ্যগতি বলে। মধ্যগতিতে নদীর বিস্তার ঊর্ধ্বগতি অবস্থার তুলনায় অনেক বেশি হয় কিন্তু গভীরতা উর্ধ্বগতি অবস্থার তুলনায় অনেক কমে যায়। নদী উপত্যকার গভীরতা হ্রাস পাওয়ায় পানি ধারণ ক্ষমতাও কমে যায়। ফলে বর্ষাকালে নদী স্ফীত হয়ে মধ্যগতিতে নদীর দুই দিকের নিম্নভূমিসমূহকে বন্যায় প্লাবিত করে এবং পলি দ্বারা ভরাট হয়ে সমভূমির আকার ধারণ করে। একে প্লাবন সমভূমি বলে। এ প্রবাহে নদী ক্রমশ ধীরগতি সম্পন্ন হয় এবং বাধা এড়িয়ে আঁকাবাঁকা পথে চলতে থাকে। সমভূমি অবস্থায় নদীর ক্ষয় ও পরিবহন কার্য তত প্রবল নয়। এ অবস্থায় নদীর সঞ্চয়কার্য শুরু হয়।
(৩) বদ্বীপ অবস্থা বা নিম্নগতি (Delta or Lower Phase): নদীর জীবনচক্রের শেষ পর্যায় হলো নিম্নগতি। এ অবস্থায় স্রোত একেবারে কমে যায়। নদীর নিম্নক্ষয় বন্ধ হলেও পার্শ্বক্ষয় হয় যথেষ্ট পরিমাণে। ফলে নদী উপত্যকা খুব চওড়া ও অগভীর হয়। নিম্নগতিতে স্রোতের বেগ কমে যাওয়ায় পানিবাহিত বালুকণা, কাদা নদীগর্ভে ও মোহনায় সঞ্চিত হয়ে নদীর গতিপথে বাধার সৃষ্টি করে। নদীর গতি বাধা পেয়ে তা দুই দিক দিয়ে চলে যায়। কালক্রমে নদীমুখে পলি সঞ্চিত হয়। ফলে নদীতলে ভূভাগ উঁচু হয়ে মাত্রাহীন গ্রিক ডেল্টা 'A' কিংবা বাংলা 'ব' এর আকার ধারণ করে ত্রিকোণাকার দ্বীপের সৃষ্টি করে। একে বদ্বীপ (delta) বলে। বদ্বীপ গঠন ব্যতীত এ অংশে নদীর খাত পরিবর্তন, নদীর অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ, প্লাবন সমভূমি প্রভৃতি বিভিন্ন ভূমিরূপ দেখতে পাওয়া যায়।
ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
Read more