পাঠ-৭ ও ৮: দূষণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্পর্ক

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.1k

(Relationship between Pollution & Natural Disaster)

পরিবেশের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের যেকোনো নেতিবাচক পরিবর্তনই হলো দূষণ। অন্যদিকে মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর প্রতিকূল প্রভাব রয়েছে এমন যেকোনো প্রাকৃতিক ঘটনাই হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিস্তার এবং প্রভাব পৃথিবীর সবদেশে সমান নয়। স্বভাবতই উন্নত দেশসমূহের অধিবাসীদের তুলনায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে উন্নয়নশীল দেশসমূহের অধিবাসীদের ঝুঁকির মাত্রা অধিক। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দূষণের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক বিদ্যমান। অনেক সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে দূষণ বৃদ্ধি পেয়ে পরিবেশ আরো বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। যেমন: বন্যা, খরা, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প ইত্যাদি। আবার অনেক সময় দূষণের মাত্রা বেড়ে গেলে দীর্ঘ সময় পরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটিত হতে পারে। যেমন: শিল্পায়নের ফলে বায়ু দূষণ, পানি দূষণ, মাটি দূষণ হয়। পরবর্তীতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এসব দূষণের ফলে সংঘটিত হয় দুর্যোগ। যেমন- ।। যেমন- বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধি। দূষণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্পর্ককে আমরা দুইভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি:

ক. প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে দূষণ সৃষ্টি
খ. দূষণের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি
নিচে এগুলো আলোচনা করা হলো

ক. প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে দূষণ সৃষ্টি: প্রাকৃতিক দুর্যোগ বর্তমান বিশ্বে যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কেননা প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু জানমালের ক্ষতি ও মৃত্যুর কারণই নয় বরং এর ফলে পরিবেশ দূষণ ঘটে এবং মানুষ স্থায়ীভাবে বিভিন্ন ক্ষতির সম্মুখীন হয়। দূষণের জন্য দায়ী প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহকে তিনটি ভাগে ভাগ করা
যায়-
i. বায়ুমণ্ডলীয় দুর্যোগ (ঝড়, ঘূর্ণিঝড়, কালবৈশাখী, টর্নেডো, হারিকেন, খরা ইত্যাদি)।

ii. ভূপৃষ্ঠের প্রক্রিয়াসৃষ্ট দুর্যোগ (বন্যা, নদী ভাঙন, উপকূলীয় ভাঙন, ভূমিধস, ভূমিক্ষয়, ভূগর্ভস্থ পানি দূষণ ইত্যাদি)।
iii. ভূঅভ্যন্তরে সৃষ্ট দুর্যোগসমূহ (ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি, সুনামি)।

i. বায়ুমণ্ডলীয় দুর্যোগ: প্রথমত বায়ুমণ্ডলীয় দুর্যোগ যেমন: ঝড়, ঘূর্ণিঝড় যখন শুরু হয় তখন প্রবল বেগে বায়ু ঘুরতে ঘুরতে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকার দিকে যেতে থাকে। এ সময় এক এলাকার ধূলি, বালুকণা ইত্যাদি, বিষাক্ত পদার্থ ও নানা রকম গ্যাস ঐ ঘূর্ণায়মান ঝড়ের মধ্যে মিশে অন্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বায়ুমণ্ডলীয় দুর্যোগে বিভিন্ন এলাকা দূষিত হচ্ছে। অনেক সময় বজ্রপাতের কারণে বন জঙ্গলে আগুন ধরে যায়। প্রচন্ড বেগে বায়ু প্রবাহিত হলে ঘর্ষণে জালে দাবানল সৃষ্টি হয়। ফলে বায়ু দূষিত হয়। বায়ুমণ্ডলীয় বিভিন্ন দুর্যোগের ফলে বিপুল পরিমাণ নাইট্রোজেন অক্সাইড, হাইড্রোকার্বন এবং ক্ষতিকর ওজোন গ্যাস ইত্যাদি সহজেই বায়ুর বিভিন্ন স্তরের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট করছে। এই দূষিত বায়ুর প্রভাব ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। এ বিষাক্ত গ্যাস শুধু যে বিশ্ব উষ্ণায়ন সৃষ্টি করে বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরের ক্ষতি করছে তা নয় বরং এর প্রভাবে মানুষ, উদ্ভিদ ও প্রাণী মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ছে।

ii. ভূপৃষ্ঠের প্রক্রিয়াসৃষ্ট দুর্যোগ: ভূপৃষ্ঠের প্রক্রিয়াসৃষ্ট দুর্যোগসমূহ যেমন: বন্যা, নদী ভাঙন, উপকূলীয় ভাঙন, ভূমিধস ইত্যাদি দুর্যোগের সাথে দূষণের সম্পর্ক রয়েছে। বন্যার সময় বিভিন্ন পুকুর, জলাশয়, ডোবা-নালা, খাল-বিল, নদ-নদী ইত্যাদির পানি একত্রে মিশে অর্থাৎ বিশুদ্ধ ও দূষিত সব পানি মিলে বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে অবস্থান করে। এতে সম্পূর্ণ বন্যার পানি দূষিত হয়ে মানুষসহ পশুপাখি, জীবজন্তু দুর্যোগ ও দূষণের সাথে একত্রে বসবাস করে। আবার ভূমিধস, ভূমিক্ষয় ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাটি দূষণ দেখা দেয়। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্তিকার বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে এবং মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন বর্জ্য, ময়লা, আবর্জনা ইত্যাদি মিশে মাটি দূষিত হয়। সুতরাং বলা যায়, ভূপৃষ্ঠের প্রক্রিয়াসৃষ্ট দুর্যোগসমূহের কারণে দূষণ ঘটে।।

iii. ভূঅভ্যন্তরে দুর্যোগসমূহ: ভূঅভ্যন্তরস্থ প্রক্রিয়াসৃষ্ট দুর্যোগসমূহের মধ্যে রয়েছে ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরি। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে অনেক সময় মাটি, পানি ও বায়ু দূষণ ঘটে। ভূমিকম্প একটি ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা একবার সংঘটিত হলে হাজার হাজার প্রাণহানি ঘটে আবার পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান যেমন- পানি, মাটি দূষিত হয়। ১৯৮৮ সালে ৭ ডিসেম্বর আর্মেনিয়াতে প্রচণ্ড ভূমিকম্পে লক্ষাধিক লোক মাটির নিচে চাপা পড়ে এবং ৪ লক্ষাধিক লোক গৃহহীন হয়ে পড়ে। এই ভূমিকম্পে লক্ষাধিক লোক মাটিতে চাপা পড়ায় উক্ত অঞ্চলের মাটি দূষিত হয়ে গিয়েছিল। মানুষের মৃতদেহ মাটির সাথে মিশে এই দূষণ সৃষ্টি হয়েছিল। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণেও দূষণ ঘটে। আগ্নেয়গিরির লাভার নিচে চাপা পড়ে মানুষ ও জীবজন্তু প্রাণ হারায় এতে উত্ত : এলাকার মাটি, পানি ও বায়ু দূষিত হয়। আগ্নেয়গিরির লাভার সাথে ভূগর্ভস্থ বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ ও গ্যাস নির্গত হয় যা উক্ত এলাকার মাটি, পানি ও বায়ুর সাথে মিশে দূষণ ঘটায়। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোতে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ১০ হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটেছিল। ২০০৮ সালে চীনের সিচুয়ান প্রদেশে যে ভূমিকম্প হয় তাতে শিল্পকারখানা ধসে মৃত্তিকা ও বায়ুদূষণ ঘটে। এতে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগটির ফলাফলস্বরূপ পরিবেশ দূষণও মারাত্মক ছিল।

খ. দূষণের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি: বর্তমান বিশ্বে নগরায়ণ ও শিল্পায়ন বৃদ্ধি পাওয়ায় দিন দিন দূষণের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। দূষণ মূলত মনুষ্যসৃষ্ট একটি দুর্যোগ। মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপের কারণে পরিবেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানের মান নিচে নেমে গেলে তাকে দূষণ বলে। যেমন: মাটি দূষণ, পানি দূষণ, বায়ুদূষণ ইত্যাদি। আবার এই দূষণের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগও সৃষ্টি হয়। তবে এটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। দীর্ঘদিন কোনো একটি দূষণের ফলে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটিত হয়।

৫ এপ্রিল ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের MET কার্যালয় গবেষণা করে দেখিয়েছে যে, শিল্প কারখানার কারণে যে বায়ুদূষণ হয় তা থেকে খরা, বন্যা ও হারিকেনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হতে পারে। এই সংস্থাটি আটলান্টিক মহাসাগরের উপর গবেষণা করে দেখেছে যে, বায়ুদূষণ আটলান্টিক মহাসাগরের তাপমাত্রা পরিবর্তনের জন্য দায়ী। আবার এ্যারোসল ব্যবহারে যে বায়ুদূষণ হয় সংস্থাটি একে "Dirty pollution" নামে অভিহিত করেছে। এই dirty pollution এবং অগ্ন্যুৎপাতের কারণেও আটলান্টিকের তাপমাত্রার পরিবর্তন হয়েছে। আটলান্টিকের তাপমাত্রার পরিবর্তন আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ভারতের বৃষ্টিপাতের ধরনকে প্রভাবিত করছে। এমনকি উত্তর আটলান্টিকে হারিকেন সৃষ্টির প্রবণতা দেখা দিচ্ছে, যা আটলান্টিক মাল্টিডেকাডাল অসিলেশন বা AMO হিসেবে পরিচিত। আটলান্টিকের তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলে গ্রীষ্মের সময় উত্তর আটলান্টিকে হারিকেনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়, দক্ষিণ আমেরিকায় বৃষ্টিপাত হ্রাস পায় এবং আফ্রিকাতে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পায়। শীতের সময় এর বিপরীত অবস্থা দেখা দেয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, বায়ুদূষণের ফলে তাপমাত্রার পরিবর্তন হয় এবং এ থেকে হারিকেন, খরা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হয়।

মানুষের অপরিনামদর্শী কার্যক্রমের কারণে মাটি, পানি, বায়ু দূষিত হচ্ছে। বায়ুদূষণের ফলস্বরূপ বায়ুমণ্ডলের ওজোনস্তর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বায়ুমণ্ডলীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঝড়, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, হারিকেন ইত্যাদি সংঘটিত হচ্ছে। মাটি দূষণের ফলে ভূমির বা মাটির অভ্যন্তরস্থ বিভিন্ন উপাদানের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটলে ভূমিধস, ভূমিক্ষয় বা উপকূলীয় ভাঙনের মতো দুর্যোগের সৃষ্টি হয়। সুতরাং দূষণ ও' প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে এবং এদের একটির মাত্রা বৃদ্ধি বা হ্রাস পেলে অপরটি পরিবর্তিত হয়।

দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...