(Problems & Remedies of Over Population of Urban Areas in Bangladesh)
বাংলাদেশের নগরগুলো মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার ভারে আক্রান্ত। ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত জনসংখ্যা এই সমস্ত নগরগুলোতে আগমনের ফলে যে সমস্ত সমস্যা হয় তা নিম্নরূপ:
ক. অপরিকল্পিত নগরায়ণ: মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা নগরে গমন করার ফলে যত্রতত্র আবাস গড়ে উঠছে। এতে অনেক কৃষি জমি বিনষ্ট হচ্ছে। ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
খ. শিক্ষাক্ষেত্রে সমস্যা: অতিরিক্ত জনসংখ্যার তুলনায় ভালো মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় সবাই ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারছে না। প্রচন্ড চাপের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো সেবা দিতে না পারায় ভালো ফলাফল অর্জন করতে পারছে না।
গ. চিকিৎসা ক্ষেত্রে সমস্যা: শহরে চিকিৎসা কেন্দ্রসমূহ জনসংখ্যার চাপে ভালো সেবা দিতে পারছে না। সরকারি হাসপাতালে লম্বা লাইন পেরিয়ে চিকিৎসকের দেখা পাওয়া কষ্টকর। আবার বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
ঘ. যাতায়াত ব্যবস্থা ভঙ্গুর: আমাদের দেশের নগরগুলোতে রাস্তাঘাটের পরিমাণ আনুপাতিক হারে অনেক কম। কোনো শহরের মোট আয়তনের ২৫% রাস্তাঘাট ও উন্মুক্ত জায়গা হিসেবে ব্যবহারের কথা থাকলেও অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে তা মাত্র ৭%-৮% এর বেশি ব্যবহার করা যায় না। ফলে অল্প জায়গা দিয়ে অধিক মানুষ ও যানবাহন যাতায়াতের ফলে রাস্তায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে অল্প জায়গা পার হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ফলে নাগরিকদের মূল্যবান কর্মঘণ্টা অপচয় হয়। পাশাপাশি শ্রম ও অর্থের অপচয় হয়।
ঙ. চিত্ত বিনোদনের অভাব: বেঁচে থাকার জন্য মানুষের চিত্ত বিনোদনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু নগরগুলোতে যে সমস্ত পার্ক, সিনেমা হল, জাদুঘর, চিড়িয়াখানা আছে, তা তাদের ধারণ ক্ষমতার তুলনায় অধিক মানুষে ভরে যায়। ফলে কারোর পক্ষেই আর ভালোমতো বিনোদিত হওয়া হয় না।
নগরে অতিরিক্ত জনসংখ্যা আগমনের ফলে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে নিম্নের পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা যেতে পারে-
১. গ্রামে কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি: দেশের সর্বত্র কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করতে হবে। শিল্প কারখানা, অফিস আদালত প্রভৃতি শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রামেও স্থাপন করতে হবে। এতে কাজের প্রয়োজনে মানুষ শহরমুখী হবে না।
২. শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার বিস্তরণ: শহরের ন্যায় গ্রামেও পর্যাপ্ত ও ভালোমানের শিক্ষা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
৩. প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ: সরকারি, আধা সরকারি ও বিভিন্ন বেসরকারি অফিসসমূহ গ্রাম পর্যায়ে কমপক্ষে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। ফলে ঘরের কাছে প্রয়োজন মিটলে মানুষ আর শহরমুখী হবে না।
৪. পর্যাপ্ত বিনোদন কেন্দ্র স্থাপন: নগরসমূহের ওপর চাপ কমাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পার্ক, শিশু পার্ক, চিড়িয়াখানা, জাদুঘর, সিনেমা হল প্রভৃতি স্থাপন করতে হবে।
৫. জীবনযাত্রার মানের সমতা বিধান: নগর ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার মানে বর্তমানে ব্যাপক বৈষম্য আছে। শহরের মতো গ্রামেও পাকা রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। জীবনযাত্রার মান একই রকম হলে বা কাছাকাছি হলেও গ্রাম থেকে মানুষ শহরে গমন করে শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ হবে না।
| ভৌগোলিক পরিবেশ ও বসতির ভিন্নতা | কোনো স্থানে বসতি স্থাপন করতে হলে অবশ্যই সেই স্থানের ভৌগোলিক পরিবেশ অর্থাৎ প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশের উপাদানসমূহ অনুকূলে থাকতে হবে। বসতি স্থাপনে প্রাকৃতিক উপাদানের মধ্যে ভূপ্রকৃতি, মৃত্তিকা, জলবায়ু, সূর্যালোক, পানির সহজলভ্যতা ইত্যাদি বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হয়। প্রাকৃতিক পরিবেশকে মানুষ নিজের প্রয়োজনে পরিবর্তন করে নতুন পরিবেশ তৈরি করে। যেমন- যে সমস্ত এলাকায় প্রাকৃতিক সম্পদ পাওয়া যায় সেই সমস্ত জায়গায় অধিক জনবসতি গড়ে ওঠে। সাধারণত স্থিতিকাল, অবস্থান, আকৃতি, বিন্যাস, পেশা ও জনসংখ্যার আকার অনুসারে মানব বসতিকে শ্রেণিবিভাগ করা যায়। |
| গ্রামীণ বসতি | বাংলাদেশ একটি গ্রামপ্রধান দেশ। গ্রামীণ বসতির অধিবাসীরা কৃষিকাজ, পশুপালন, মাছ শিকার, প্রভৃতি পেশায় নিয়োজিত থাকে। গ্রামীণ ঘরবাড়ির নির্মাণ উপকরণ প্রধানত মাটি, টিন, খড়, ইট, ছন, গোলপাতা, বাঁশ প্রভৃতি। বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে ও চর অঞ্চলে পল্লী বসতি দেখা যায়। সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা নিবিড় বা পুঞ্জীভূত বসতি গড়ে তোলে। এছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষিপ্ত, সারিবদ্ধ ও গোলাকার ধরনের বসতি গড়ে উঠতে দেখা যায়। |
| বিক্ষিপ্ত বসতি | যে বসতিতে একটি পরিবার অন্যটি থেকে অনেক দূরে বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করে তাকে বিক্ষিপ্ত বসতি বলে। যেমন- বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের বসতি। |
| পুঞ্জিভূত বসতি | যে অধিবাসীদের বসতবাড়িগুলো খুব কাছাকাছি এবং ঘন বা নিবিড়ভাবে গড়ে ওঠে তাকে পুঞ্জিভূত বসতি বলে। যেমন-ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বসিত। এ বসতিটি কোন বিশেষ সুবিধার (যেমন- চাকুরি, পানীয় জল) ওপর ভিত্তি কড়ে গড়ে ওঠে। এ ধরনের বসতিতে ২০০-৪০০টি পরিবার একত্রে বসবাস করে থাকে। |
| নগর বসতি | যেসব বসতির বেশির ভাগ লোক দ্বিতীয় (যেমন- পোশাক, প্লাষ্টিক, জুতার কারখানা ইত্যাদি) ও তৃতীয় (যেমন- চিকিৎসা, চাকুরি, ব্যবসায়, শিক্ষা ইত্যাদি) পর্যায়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত তাকে নগর বসতি বলে। |
| গ্রামীণ হাট বাজার | গ্রামীণ জীবনযাত্রায় হাট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন মানুষের পক্ষে সব ধরনের উপকরণ উৎপাদন করা সম্ভব নয়। তাই প্রাচীনকাল থেকে মানুষ নিজের উদ্বৃত্ত পণ্য অন্যের সাথে বিনিময় করে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে আসছে। এই বিনিময় প্রথার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে গ্রামীণ হাট বাজার। গ্রামীণ হাট এক বা দুইদিন বসে। গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্য প্রাত্যহিক বাজারে ক্রয় বিক্রয় হয়ে থাকে। গ্রামীণ হাটের মাধ্যমেই কৃষকের উৎপাদিত পণ্যদ্রব্য শহর অঞ্চলসহ সমগ্র দেশের মানুষের কাছে পৌঁছায়। গ্রামীণ মানুষের অর্থনীতির চাকা আবর্তিত হয় গ্রামীণ হাটকে কেন্দ্র করে। |
| বাংলাদেশের নগরায়ণ | বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান হারে নগরায়ণ হচ্ছে। মানুষ কৃষি পেশা ত্যাগ করে অকৃষি পেশা গ্রহণ করছে। ফলে জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে। শহরে সুযোগ সুবিধা বেশি হওয়ার কারণে গ্রামের মানুষ শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। ফলে পরিকল্পিত রাস্তাঘাট, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, আবর্জনা নিষ্কাশনসহ অন্যান্য নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ এর মতো ছোট বড় শহর আছে। বাংলাদেশের সকল পৌরসভাকে শহর হিসেবে ধরা হয়। শহর অপেক্ষা নগরের আয়তন ও জনসংখ্যা বেশি। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী প্রভৃতি বিভাগীয় শহর মহানগর হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা একটি মেগাসিটি। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ উভয় নগর সম্প্রসারিত হয়ে নগরপুঞ্জ সৃষ্টি করেছে। |
| অপরিকল্পিত নগরায়ণ | অপরিকল্পিত নগরায়ণ মানুষ ও পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে যত্রতত্র নগর গড়ে ওঠে। ফলে পরিকল্পিত রাস্তাঘাট, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, আবর্জনা নিষ্কাশনসহ অন্যান্য নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা যায় না। এর ফলে নগরে বস্তি গড়ে ওঠে এবং সকলের সমান নাগরিক সেবা প্রদান করা সম্ভব হয় না। |
বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই
Read more