(Influence of geographic environment on Bangladesh transport system)
যেকোনো দেশের পরিবহন ব্যবস্থার উপর সেই দেশের ভৌগোলিক পরিবেশ যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে থাকে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এই দেশের উত্তর ও দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি অঞ্চল; টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহের ভাওয়াল ও মধুপুর গড়; দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবন এবং দক্ষিণ অঞ্চলের নদীবহুলতা এদেশের ভূপ্রকৃতিকে শুধু বৈচিত্র্যময় করেনি বরং এগুলো এদেশের পরিবহন ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করেছে।
বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থায় ভৌগোলিক পরিবেশের প্রভাবকে আমরা নিম্নোক্তভাবে বর্ণনা করতে পারি-
১. প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রভাব: পরিবহন ব্যবস্থার উপর প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রভাবকে আমরা কতকগুলো ভাগে ভাগ করে আলোচনা করতে পারি। যেমন-
ক. ভূপ্রকৃতি: সমতল ভূমিতে সড়ক নির্মাণ সহজসাধ্য এবং কম ব্যয়বহুল। পক্ষান্তরে বন্ধুর ভূপ্রকৃতি বিশিষ্ট পাহাড়ি অঞ্চলে সড়ক নির্মাণ ও সংরক্ষণ করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য এবং ব্যয়বহুল। সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, বাংলাদেশে অধিকাংশ জায়গা সমতল ভূমি দ্বারা গঠিত বলে সড়কপথে দেশের প্রায় সর্বত্র যাওয়া সম্ভব। কিন্তু দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল দুর্গম পাহাড়ি বলে সেখানে উত্তম যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। আবার দক্ষিণাঞ্চল নদীবহুল বলে সড়কের উপর প্রচুর ব্রীজ, কালভার্ট নির্মাণ করা প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ ভূপ্রকৃতি কেমন হবে তার উপর সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা নির্ভর করে।
খ. নদ-নদী: কোনো অঞ্চলে নদ-নদী বেশী হলে সেই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নৌপথ মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ আমাদের দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের (বরিশাল, ভোলা) কথা বলা যায়। এই অঞ্চলে অসংখ্য নদ-নদী জালের ন্যায় ছড়িয়ে আছে। ফলে এই অঞ্চলে রাস্তা-ঘাট বা রেলপথ তৈরি করতে হলে প্রচুর ছোট বড় সেতু, কালভার্ট প্রভৃতি তৈরি করা প্রয়োজন যা যথেষ্ট ব্যয়বহুল। ফলে আমাদের দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে উন্নত সড়ক ও রেল যোগাযোগ গড়ে উঠেনি বরং স্বল্প ব্যয়ের জলপথভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এই অঞ্চলের যাতায়াতের প্রধানতম মাধ্যম।
গ. বৃষ্টিপাত: বাংলাদেশ মৌসুমি জলবায়ুর দেশ। আর সড়ক পথ নির্মাণে জলবায়ু তথা বৃষ্টিপাতের যথেষ্ট গুরুত্ব আছে। বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে হালকা মাটি অতি সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত, বিধৌত ও স্থানান্তরিত হয়। ফলে প্রতিবছর সেই সমস্ত অঞ্চলে সড়ক সংরক্ষণে, এর উপর নতুন করে মাটি ফেলতে হয়। এজন্য বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে সড়ক নির্মাণের সময় উপাদান (যেমন- পিচ ঢালা পথ বৃষ্টিতে সহজে নষ্ট হয় না) নির্বাচনে অধিক সতর্ক থাকতে হয়।
ঘ. কৃষিজমির অবস্থান: বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। সড়ক পথ নির্মাণে বা বড় বড় রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্য অনেক জায়গার প্রয়োজন। আবার কৃষকের উৎপাদিত ফসল জমি থেকে ঘরে বা বাজারে নেওয়ার জন্য রাস্তা প্রয়োজন। এ কারণে যেখানে অনেক কৃষিজমি থাকে সেখানে বড় রাস্তা নির্মাণ না করে ছোট ছোট রাস্তা নির্মাণ করা হয়।
ঙ. বনভূমির অবস্থান: বড় বড় সড়ক নির্মাণে অনেক জমির প্রয়োজন হয়। এ কারণে যে সমস্ত অঞ্চলে বনভূমি আছে
সেই বনভূমি যেন কোনক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেভাবে রাস্তাঘাট নির্মাণ করা হয়। কেননা পরিবেশ রক্ষায় বনভূমির কোনো বিকল্প নেই। বনভূমির মধ্যে বা পাশ দিয়ে যদি সড়ক নির্মাণ করা হয় তাহলে একদিকে যেমন বনভূমির আয়তন কমে যায়, অন্যদিকে সড়ক চলাচলকারী যানবাহনের শব্দে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট হয়। ফলে বনের জীববৈচিত্র্য হ্রাস পেতে পারে। এ কারণেই আমাদের দেশে সুন্দরবনের ক্ষতি করে কোনো সড়ক নির্মাণ করা হয় নি।
২. সামাজিক প্রভাব: পরিবহন ব্যবস্থায় কেবল প্রাকৃতিক পরিবেশ নয়, একই সাথে সামাজিক পরিবেশও যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে থাকে। যেমন-
ক. জনবসতি: মানুষের যাতায়াত বা পণ্য পরিবহন বা অন্য কোনো সুবিধার জন্যই যোগাযোগ ব্যবস্থার সৃষ্টি। তাই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে জনবসতিকে কেন্দ্র করে। এদেশের বড় বড় জনবসতি যেমন- জেলা ও বিভাগীয় শহর (ঢাকা, চট্টগ্রাম), বন্দর (চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ) প্রভৃতি সড়ক, রেল, জলপথ দ্বারা অর্থাৎ উত্তম পরিবহন ব্যবস্থা দ্বারা পরস্পরের সাথে সংযুক্ত।
খ. অর্থনৈতিক অবস্থা: যেকোনো ধরনের পরিবহন ব্যবস্থা অর্থাৎ রাস্তা-ঘাট নির্মাণ, সংরক্ষণ ও পরিচালনা করা যথেষ্ট ব্যয়বহুল। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এদেশে অর্থের প্রাচুর্য না থাকায় অনেক জায়গায় যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সড়ক ও রেলপথ ব্রীজ, কালভার্ট নির্মাণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যায় না। উদাহরণ হিসেবে পদ্মা নদীর উপর সেতু নির্মাণের কথা বলা যায়। এর অভাব দীর্ঘদিন ধরে অনুভূত হলেও স্বাধীনতার পর ৪৭ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে এর বাস্তবায়নে।
গ. সংস্কৃতিঃ পরিবহন ব্যবস্থার উপর সংস্কৃতির প্রভাবকে অস্বীকার করা যায় না। জাতি হিসেবে আমরা অনেক অসচেতন। এ কারণে একই রাস্তার একই লেনে বিভিন্ন গতির যানবাহন চালানো এবং রাস্তার উপর যত্রতত্র পার্কিং আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থাকে বিঘ্নিত করে। এছাড়া সড়ক পথের এত বহুমুখী ব্যবহার বিশ্বের আর কোথাও দেখা যায় না। এই জনপথগুলোকে আমরা মিছিল মিটিংয়ে, জনসভায়, গাড়ি পার্কিং, হাট বাজার স্থাপন এমনকি ফসল শুকানোর স্থান (গ্রামে) হিসেবেও ব্যবহার করে থাকি। এছাড়া কারণে অকারণে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ, পরিবহন ধর্মঘট আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্ত কর্মকাণ্ড আমাদের পরিবহন ব্যবস্থায় যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে।
ঘ. প্রযুক্তি: উন্নত প্রযুক্তি একটি দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। পরিবহনে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা যথেষ্ট পিছিয়ে আছি। যদিও বিদেশি সহায়তায় ও সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আমরা অনেক এগিয়েছি (উড়াল সড়ক, মেট্রো রেল নির্মাণ) কিন্তু ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার এখনও যথেষ্ট নয়। ফলে যাতায়াতে একদিকে যেমন সময় বেশি লাগছে, অন্যদিকে তা আরামদায়ক হচ্ছে না।
ঙ. রাজনীতি: বাংলাদেশের যাতায়াত ব্যবস্থায় রাজনীতি অন্যতম প্রভাব বিস্তারকারী নিয়ামক। এদেশের রাজনীতিবিদরা ভোট পাওয়ার আশায় এমন অনেক জায়গায় রাস্তা-ঘাট নির্মাণ করেন, যেখানে সেগুলো নির্মাণের প্রয়োজন নেই। এর ফলে অনেক অপরিকল্পিত রাস্তা-ঘাট, স্টেশন বা বন্দর তৈরি হয়, যা আর্থিকভাবে লাভজনক তো নয়ই বরং অনেক সময় যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
চ. বিদেশি সাহায্য: বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এদেশের অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী নয়। তাই রাস্তা-ঘাট, বিমানবন্দর, ব্রীজ প্রভৃতি নির্মাণের বড় কোন প্রকল্প গ্রহণের সময় বিদেশি সাহায্য নিতে হয়। অর্থাৎ, কীভাবে নির্মাণ করতে হবে, তার ডিজাইন কী হবে, কোন দেশ থেকে প্রকৌশলী নিতে হবে, নির্মাণ সামগ্রী কোন দেশের হবে প্রভৃতি সবকিছুই দাতা দেশ সমূহের ইচ্ছামাফিক হতে হয়। ফলে একদিকে কাজের গতি হ্রাস পায়, আবার অন্য দিকে আমাদের চাহিদামতো কাজ হয় না।
পরিবহন ও যোগাযোগ-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
Read more