hsc

পাঠ-৫: মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চল

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.4k

(Monsoon Climatic Region)

ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু: আরবি শব্দ 'মওসুম' থেকে মৌসুমি শব্দের উৎপত্তি। 'মওসুম' শব্দের বাংলা অর্থ 'ঋতু'। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে যে বায়ুর দিক পরিবর্তন হয় তাকে মৌসুমি বায়ু বলে। যেসব দেশের উপর দিয়ে এ বায়ু প্রবাহিত হয় সেসব দেশের জলবায়ুকে মৌসুমি জলবায়ু বলা হয়। আবার কর্কট ও মকরক্রান্তির নিকটবর্তী অঞ্চলে এর প্রভাব ও বিস্তৃতি অনেক বেশি বলে এ জলবায়ুকে ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুও বলা হয়।

মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের উৎপত্তি: ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ভূগোলবিদ Edmand Halley ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে উষ্ণ প্রকৃতির শীত- গ্রীষ্ম বায়ুপ্রবাহকে বুঝানোর জন্য সর্বপ্রথম মৌসুমি (monsoon) শব্দটি ব্যবহার করেন। মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের বায়ুপ্রবাহ সম্পর্কে Halley-এর উক্তি, 'সম্পূর্ণ তাপজনিত কারণে মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের উৎপত্তি।' তাঁর মতে, গ্রীষ্মে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পার্শ্ববর্তী সমুদ্র অপেক্ষা উত্তপ্ত হয়ে পড়লে স্থলভাগে নিম্নচাপ এবং পার্শ্ববর্তী সমুদ্রে উচ্চচাপের উদ্ভব হয়। ফলে সমুদ্র থেকে জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু স্থলভাগের দিকে প্রবাহিত হয়। অপরদিকে, শীতকালে উত্তর-পূর্ব এশিয়া তাপ বিকিরণের ফলে পার্শ্ববর্তী সমুদ্র অপেক্ষা শীতল হয়ে পড়লে স্থলভাগে উচ্চচাপ এবং পার্শ্ববর্তী সমুদ্রে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। য। ফলে শুষ্কবায়ু স্থলভাগ হয়ে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়।

মৌসুমি জলবায়ুর অবস্থান:

ক. অক্ষাংশগত অবস্থান: উষ্ণমণ্ডলে সাধারণত ° থেকে ৩০° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে অবস্থিত। অর্থাৎ ' মহাদেশসমূহের পূর্বাঞ্চলসমূহ তথা কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তির মধ্যবর্তী অঞ্চলসমূহ মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্ভূক্ত।

খ. আঞ্চলিক অবস্থান: ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর আঞ্চলিক অবস্থানকে মৌসুমী জলবায়ুর সুস্পষ্টতার ভিত্তিতে দুটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা-

i.প্রধান অঞ্চল: বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন, পশ্চিম ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ প্রভৃতি প্রধান মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।
ii. অপ্রধান অঞ্চল: অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড, নিউ সাউথ ওয়েলসের উত্তর-পূর্বাংশ এবং কার্পেন্টারিয়া উপসাগরের পশ্চিমাংশ, ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণ অংশ, জাভা হতে দক্ষিণে মধ্য নিউগিনি পর্যন্ত, দক্ষিণ আফ্রিকার পূর্বাংশ, লিসোথো, সোয়াজিল্যান্ড, মোজাম্বিক, মালাগাছি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস, আলাস্কা, লুসিয়ানা, জর্জিয়া, ফ্লোরিডা প্রভৃতি অঙ্গরাজ্যসমূহ, মেক্সিকো, জ্যামাইকা, হাইতি, কিউবা, বাহামা, পানামা, কোস্টারিকা, এল সালভেদর, নিকারাগুয়া, গুয়াতেমালা, দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলের পূর্বাংশ, গায়ানা, সুরিনাম, উরুগুয়ের উত্তরাংশ, কলম্বিয়া ও ভেনিজুয়েলার উত্তরাংশ, পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ প্রভৃতি মৌসুমি জলবায়ুর অপ্রধান অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।

বৈশিষ্ট্য বা বিশেষত্ব: মৌসুমি জলবায়ুর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বায়ুর দিক বা গতিও পরিবর্তিত হয়। এ জলবায়ু গ্রীষ্মকালে জলভাগ হতে স্থলভাগের দিকে এবং শীতকালে স্থলভাগ হতে জলভাগের দিকে প্রবাহিত হয়। এজন্য গ্রীষ্মকাল বৃষ্টিবহুল এবং শীতকাল প্রায় বৃষ্টিহীন অবস্থায় থাকে। সাধারণত বায়ুর তাপ, বায়ুর চাপ, বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের দ্বারা এ জলবায়ুর-বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করা হয়।

বায়ুর তাপ: মৌসুমি জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আর্দ্র গ্রীষ্মকাল এবং শুষ্ক শীতকাল। গ্রীষ্মকালীন গড় তাপমাত্রা ° সেলসিয়াসের অধিক থাকে। গ্রীষ্মকালে যেখানে বৃষ্টিপাত বেশি সেখানে তাপমাত্রা অধিক বৃদ্ধি পেতে পারে না। কিন্তু যেখানে বৃষ্টিপাত কম সেখানে তাপমাত্রা অনেক বেশি। শীতকালে তাপমাত্রা গড়ে °থেকে ২২° সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। তবে গ্রীষ্ম ও শীতকালে গড় উষ্ণতার পার্থক্য প্রায় ৫° সেলসিয়াসের মতো হয়ে থাকে।

বায়ুর চাপ ও বায়ুপ্রবাহ: ঋতুভেদে বায়ুর চাপের তারতম্যের জন্য মৌসুমি বায়ুর উৎপত্তি হয়। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে এ বায়ুপ্রবাহের গতি ও দিকের পরিবর্তন হয় এবং বায়ুর চাপেরও বৈষম্য হয়। উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকালে সূর্য কর্কটক্রান্তি রেখার ওপর লম্বভাবে কিরণ দেয়। এর ফলে কর্কটক্রান্তি অঞ্চলের অন্তর্গত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, উত্তর-পশ্চিম ভারত, মধ্য এশিয়া প্রভৃতি স্থানের স্থলভাগ অতিশয় উত্তপ্ত হয়। ফলে এ সকল স্থানে বায়ুর চাপ কমে যায় এবং একটি সুবৃহৎ নিম্নচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হয়। এ পরিস্থিতিতে দক্ষিণ গোলার্ধের ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় হতে আগত দক্ষিণ-পূর্ব অয়ন বায়ু নিরক্ষরেখা অতিক্রম করে এশিয়া মহাদেশের নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে প্রবলবেগে ছুটে যায়। এ বায়ুকে উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মের মৌসুমি বায়ু বলে।

নিরক্ষরেখা অতিক্রম করলে ফেরেলের সূত্র অনুসারে দক্ষিণ-পূর্ব অয়ন বায়ুর গতি বেঁকে দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়। এ জন্য গ্রীষ্মের এ মৌসুমি বায়ুকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বলা হয়। শীতকালে সূর্য দক্ষিণ গোলার্ধে মকরক্রান্তি রেখার নিকট অবস্থান করায় সেখানে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। এ সময় উত্তর গোলার্ধের স্থলভাগ অত্যন্ত শীতল হওয়ায় সেখানে উচ্চচাপের সৃষ্টি হয়। ফলে স্থলভাগের উচ্চচাপ অঞ্চল হতে বায়ু দক্ষিণের নিম্নচাপের দিকে প্রবাহিত হয়। এ বায়ু উত্তর-পূর্ব দিক থেকে আসে বলে একে উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু বলে। স্থলভাগের উপর দিয়ে দীর্ঘপথ অতিক্রম করে আসে বলে এ বায়ু শুষ্ক থাকে।

বৃষ্টিপাত : মৌসুমি অঞ্চলের অধিকাংশ বৃষ্টিপাত গ্রীষ্মকালেই হয়ে থাকে। শীতকালে বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। এ অঞ্চলে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১২৫ থেকে ২০০ সেন্টিমিটার। জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালে উত্তর গোলার্ধের স্থলভাগে অধিক উত্তাপের ফলে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। দক্ষিণে সমুদ্র হতে আগত জলীয়বাষ্পপূর্ণ মৌসুমি বায়ু পর্বতে প্রতিহত হয়ে ব্যাপকভাবে বৃষ্টিপাত ঘটায়।

ঋতু: সাধারণত মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে তিনটি ঋতু সুস্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়; যেমন- শীতল ও শুষ্ক শীতকাল, উষ্ণ ও শুষ্ক গ্রীষ্মকাল এবং আর্দ্র বর্ষাকাল। উত্তর গোলার্ধে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতকাল, মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল এবং জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষাকাল দেখা যায়। সকল ঋতুতেই কম-বেশি বৃষ্টিপাত হয়। তবে বর্ষাকালেই সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। মৌসুমি অঞ্চলের বৃষ্টিপাত এল নিনো (EL Nino) ও লা নিনা (La Nina) দ্বারা প্রভাবিত এবং পরিবর্তনশীল।

সারণি-৬.১: মাসভিত্তিক মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত।

মাসের নামতাপমাত্রা (০° সে.)বৃষ্টিপাত (সে.মি.)
জানুয়ারি১৭.৪০১.৮০
ফেব্রুয়ারি২১.২৫২.৯০
মার্চ২৮.১০২.৭০
এপ্রিল৩০.৬৫৩.৫০
মে৩২.৭০৯.৪০
জুন২৯.৭৫২৫.৮০
জুলাই২৯.১০৩৩.৬০
আগস্ট৩১.১০৩১.৯০
সেপ্টেম্বর২৭.৯০১৯.৭০
অক্টোবর২৬.৯৫৮.৮০
নভেম্বর২৬.৯৫৮.৮০
ডিসেম্বর২০.১০০.80
গড় তাপমাত্রা/মোট বৃষ্টিপাত২৬.৪৮১৪২.৩০

উৎস: স্নাতক ব্যবহারিক ভূগোল, দুলাল দাস ও ড. যুধিষ্ঠির হাজরা, কোলকাতা, ২০০৮

জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...