hsc

পাঠ-২: মানব বসতির বিভিন্নতা

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.3k

(Diversity of Human Settlement)

দেশ ও অঞ্চলভেদে মানব বসতিকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রেণিবিভাগ করা হয়। এ কারণে বসতির শ্রেণিবিভাগ করা বেশ জটিল। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর কতিপয় প্রখ্যাত ভূগোলবিদ যেমন- ফ্রান্সের ভিডাল ডি লা ব্লাশ, জার্মানির ওয়াল্টার ক্রিস্টলার, ভারতের জ্যোতির্ময় সেন, বাংলাদেশের আব্দুল বাকী এবং সাবিহা সুলতানা প্রমুখ ভূগোলবিদ বসতির শ্রেণিবিভাগ করেছেন। এদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুল বাকী প্রদত্ত বসতির শ্রেণিবিভাগ এখানে উল্লেখ করা হলো:-

ক. স্থিতিকাল অনুসারে: ক্ষণস্থায়ী, অস্থায়ী ও স্থায়ী বসতি।
খ. অবস্থান অনুসারে: জলাশয়, পাহাড়ি ও সমভূমি বসতি।
গ. আকৃতি অনুসারে: দণ্ড, সমকোণী, স্থূলকোণী, চৌমাথা ও বৃত্ত বসতি।
ঘ. বিন্যাস অনুসারে: সারিবদ্ধ, অনুকেন্দ্রিক, সংঘবদ্ধ, বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন বসতি।
ঙ. পেশা অনুসারে: কৃষি, কুমোর, তাঁতি ও জেলে বসতি।
চ. জনসংখ্যার আকার অনুসারে খামার, পাড়া, ক্ষুদ্র ও বড়গ্রাম।

ক. স্থিতিকাল অনুসারে বসতির শ্রেণিবিভাগ: কত দিন স্থায়ী হবে, এর ওপর ভিত্তি করে বসতিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
১. ক্ষণস্থায়ী বসতি: যে বসতি বছরের খুব অল্পসময় ব্যবহৃত হয় সেগুলোকে ক্ষণস্থায়ী বসতি বলে। এই ধরনের বসতি বর্তমান সময়ে দেখা যায় না। প্রাচীন খাদ্য সংগ্রহের যুগে এশিয়া মাইনরে, এরূপ বসতির প্রাধান্য ছিল।

২. অস্থায়ী বসতি: এক সময় মানুষ কৃষিকাজ জানত না। তখন শিকার ও খাদ্য সংগ্রহ করা ছিল বেঁচে থাকার প্রধানতম অবলম্বন। এ সময় মানুষ যেখানে শিকার বা খাবার পাওয়া যেত, সেখানে অস্থায়ী ভিত্তিতে বসতি নির্মাণ করত। প্রকৃতিতে প্রাপ্ত খাবার শেষ হয়ে গেলে তারা নতুন কোনো স্থানে পুনরায় বসতি স্থাপন করত। এ ধরনের বসতিকে অস্থায়ী বসতি বলে। মরু অঞ্চলে বেদুঈন, মেরু অঞ্চলে এস্কিমো, অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী, বাংলাদেশের বেদে সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ধরনের বসতি নির্মাণের প্রবণতা লক্ষ করা যায়।

৩. স্থায়ী বসতি: অনেক বছর ধরে যে সমস্ত বসতি টিকে থাকে তাকে স্থায়ী বসতি বলে। বর্তমানে পৃথিবীর ..... অধিকাংশ বসতি স্থায়ী বসতির আওতাভুক্ত। যেমন- ঢাকা শহরের বসতি।

খ. অবস্থান অনুসারে বসতির শ্রেণিবিভাগ: বসতি কোথায় অবস্থিত, তার ওপর ভিত্তি করে একে তিনভাগে ভাগ করা যায়। যথা:-

১. জলাশয় বসতি: কোনো বড় জলাশয় (যেমন- নদী, হ্রদ, সমুদ্র প্রভৃতি) এর তীরবর্তী এলাকায় যে বসতি গড়ে ওঠে তাকে জলাশয় বসতি বলে। অতি প্রাচীনকাল থেকেই এই ধরনের বসতি গড়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ আমাদের দেশের প্রায় সকল বৃহত্তর জেলা শহরগুলোর (যেমন- শীতলক্ষ্যা নদী তীরবর্তী নারায়ণগঞ্জ) বসতি।
২. পাহাড়ি বসতি: পাহাড়ি অঞ্চলে কোনো বসতি গড়ে উঠলে তাকে পাহাড়ি বসতি বলে। এ ধরনের বসতির সংখ্যা পৃথিবীতে কম। আমাদের দেশের বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, ভারতের দার্জিলিং প্রভৃতি পাহাড়ি বসতির উদাহরণ।
৩. সমতল বসতি: সমতল ভূমিতে যে বসতি গড়ে ওঠে তাকে সমতল বসতি বলে। জীবনযাপন সহজ বলে পৃথিবীতে এই ধরনের বসতির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। যেমন- বাংলাদেশের প্লাবন সমভূমির বসতি।

গ. আকৃতি অনুসারে বসতির শ্রেণিবিভাগ: আকার অনুসারে বসতিকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
১. দণ্ডবসতি: যাতায়াতের সুবিধার্থে যখন কোনো বসতি নদী বা রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে গড়ে ওঠে তখন তাকে দণ্ডবসতি বলে। যেমন- নারাণগঞ্জের আড়াইহাজার পৌরসভার বসতি।

২. সমকোণী বা স্থূলকোণী বসতি: যে স্থানে দুই বা তিনটি রাস্তা পরস্পরের সাথে সমকোণে বা ইংরেজি 'Y'
আকারে মিলিত হয়, তখন সেখানে গড়ে ওঠা বসতি হচ্ছে সমকোণী বা স্থূলকোণী বসতি। যেমন-ময়মনসিংহের সদর পৌরসভার বসতি।
৩. চৌমাথা বসতি দুটি রাস্তা পরস্পরকে ছেদ করলে ঐ সংযোগস্থলে গড়ে ওঠা বসতিকে চৌমাথা বসতি বলে। শহর অঞ্চলে এই বসতি বেশি লক্ষ করা যায়। যেমন- ঢাকার মালিবাগ, গাজীপুরের জয়দেবপুর।
৪.বৃত্ত বসতি: মূলত নিরাপত্তার কারণে কোনো একটি নিরাপদ ঘাঁটি বা স্থানকে কেন্দ্র করে বৃত্তাকারে যে বসতি গড়ে ওঠে তাকে বৃত্তাকার বসতি বলে। বাংলাদেশের চরাঞ্চলে এখনও এরূপ কিছু বসতি দেখা যায়। যেমন- শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ।

ঘ.বিন্যাস অনুসারে বসতির শ্রেণিবিভাগ: বসতির বিন্যাস অর্থাৎ এর বাহ্যিক রূপের (out look) ওপর ভিত্তি করে বসতি পাঁচ প্রকার। যথা-

১. সারিবদ্ধ বসতি: যখন নদী বা প্রশস্ত সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে কোনো বসতি গড়ে ওঠে তখন তাকে সারিবদ্ধ বসতি বলে। যেমন- মৌলভীবাজার শহরে মনু নদীর তীরবর্তী বসতি।
২. অনুকেন্দ্রিক বসতি কোনো একটি বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্তিকে কেন্দ্র করে তার চারপাশে বৃত্তাকারে কোনো বসতি গড়ে ওঠলে তাকে অনুকেন্দ্রিক বসতি বলে। ভারতের গয়া, কাশী; সৌদি আরবের মক্কা প্রভৃতি অঞ্চলে এই ধরনের বসতি লক্ষ করা যায়।
৩. সংঘবদ্ধ বসতি যখন একটি স্থানে অনেকগুলো পরিবার খুব কাছাকাছি অবস্থান করে বসবাস করে তখন তাকে সংঘবদ্ধ বসতি বলে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এই ধরনের বসতি লক্ষ করা যায়।
৪. বিক্ষিপ্ত বসতি: কোনো বসতির মধ্যে কৃষিভূমি, বড় উন্মুক্ত জলাশয়, বনভূমি প্রভৃতির বাধা থাকলে সেখানে একটি পরিবার অন্যটি থেকে দূরে অবস্থান করে। এই ধরনের বসতিকে বিক্ষিপ্ত বসতি বলে। কানাডা, ডি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খামার বসতি এই ধরনের বসতির প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
৫. বিচ্ছিন্ন বসতি: কোনো অঞ্চলে বসতিগুলো সুনির্দিষ্ট কোনো বিন্যাস লাভ না করে এলোমেলোভাবে গড়ে উঠলে তাকে বিচ্ছিন্ন বসতি বলে। আমাদের দেশে পাহাড়ি ও হাওর অঞ্চলে এই ধরনের বসতি লক্ষ করা যায়।

ঙ.পেশা অনুসারে বসতির শ্রেণিবিভাগ: অধিবাসীদের পেশা বা জীবিকার ওপর ভিত্তি করে যে বসতি গড়ে ওঠে তাকে পেশাভিত্তিক 'বসতি বলে। এক্ষেত্রে একই পেশার মানুষজন একত্রে বসবাস করতে পছন্দ করে। যেমন- কৃষক, কুমোর, তাঁতি, জেলে প্রভৃতি পেশার লোকজন স্বতন্ত্র বসতি গড়ে তোলে। বাংলাদেশের পদ্মা নদীর তীরে বড় বড় জেলে গ্রাম দেখা যায়।

চ. জনসংখ্যার আকার অনুসারে বসতির শ্রেণিবিভাগ: কোন বসতিতে কতজন মানুষ বসবাস করে তার ওপর ভিত্তি করে বসতিকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

১. খামার বসতি: কোনো একটি কৃষি জমিকে কেন্দ্র করে এক বা একাধিক পরিবার মিলে যে বসতি গড়ে তোলে তাঁকে খামার বসতি বলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় এই ধরনের বসতি লক্ষ করা যায়।
২. পাড়া: সাধারণত অল্প কয়েকটি পরিবার মিলে একটি পাড়া গড়ে তোলে। আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে অনেক পাড়া আছে।
৩. ক্ষুদ্রগ্রাম: কয়েকটি পাড়ার সমন্বয়ে একটি ক্ষুদ্রগ্রাম প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের চরাঞ্চলে (যেমন-চরফ্যাশন, মনপুরা) অনেক ক্ষুদ্রগ্রাম দেখা যায়।
৪. বড় গ্রাম: অনেকগুলো পাড়া নিয়ে একটি বড় গ্রাম গঠিত হয়। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান প্রভৃতি দেশে অনেক বড় গ্রাম আছে। এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম গ্রাম বানিয়াচং বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলায় অবস্থিত।

বসতি (Settlement) - মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও ইকবাল উদ্দিন আহমেদ মিঠু স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...