(Results of Ebb-Tide)
আমরা জানি, জোয়ার-ভাটা বিপুল শক্তির উৎস এবং তা মানুষের জন্য যথেষ্ট কল্যাণ বয়ে আনে। অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপরও জোয়ার-ভাটার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
ক. কল্যাণকর প্রভাব:
১. নদীবন্দর বরফমুক্ত থাকা: জোয়ার-ভাটার ফলে নদীর পানি স্বল্প পরিমাণে লবণাক্ত হওয়ায় শীতে সহজে জমে যায় না। ফলে নাতিশীতোষ্ণমণ্ডলেও শীতে নদীর পানি জমে না এবং নৌচলাচলের যোগ্য থাকে। এ কারণেই ইংল্যান্ডের অনেক নদীবন্দর বারো মাস বরফমুক্ত থাকে।
২. বন্দরের সুবিধা: জোয়ারের সময় পানি বৃদ্ধি পায় বলে সমুদ্রগামী জাহাজের পক্ষে নদীবন্দরে প্রবেশে সুবিধা হয়। আবার ভাটার স্রোতের সাথে ঐ জাহাজ অনায়াসে সমুদ্রে এসে পড়ে। চট্টগ্রাম, মংলা, কলকাতা, লন্ডন প্রভৃতি বন্দরে জোয়ারের সময় জাহাজ প্রবেশ করে এবং ভাটার সময় সমুদ্রে বের হয়ে আসে।
৩. নদীর পানি নির্মল থাকা: দৈনিক দুই বার করে জোয়ার-ভাটা হওয়ার ফলে নদীতে সঞ্চিত সব আবর্জনা ধুয়ে মুছে গভীর সমুদ্রে চলে যায়। এজন্য জোয়ার-ভাটার ফলে নদীর পানি নির্মল থাকে।
৪. নদীমুখের নাব্য রক্ষা জোয়ার-ভাটার জন্য পলিমাটি পড়ে নদীর মুখ বন্ধ হয়ে যেতে পারে না। ফলে নৌচলাচলের যোগ্য থাকে।
৫. পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন করা পৃথিবীর অনেক অংশে বিরাট আকারের জলাধার নির্মাণ করে জোয়ারের সময় পানিতে ভর্তি করে রাখা হয়। ভাটার সময় ঐ পানি সরু পথে নিচে নির্গত করে টারবাইনের সাহায্যে পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। ১৯৬৬ সালে ফ্রান্সের লা-রান্স ফাঁড়িতে সর্বপ্রথম জোয়ার-ভাটার বৈদ্যুতিক শক্তি কেন্দ্রটি স্থাপিত হয়, যার প্রাথমিক উৎপাদনক্ষমতা ছিল ১০ হাজার কিলোওয়াট। বর্তমানে এখান থেকে বার্ষিক ৮০ লক্ষ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়।
৬. মাছ পালন ও শিকার জোয়ার-ভাটা বণ্টন বা বিন্যাসের সহায়ক হওয়ায় জৈবিকভাবে প্লাঙ্কটন ও নোকটনগুলোর সমুদ্র উপকূলীয় পানিতে বণ্টন ও পুনঃবণ্টনে সুবিধা হয়, যা মাছ পালন ও শিকার (মৎস্য) শিল্পের সহায়ক। জোয়ারের সময় নদী পার্শ্ববর্তী নিচু এলাকাগুলোতে সামুদ্রিক লবণাক্ত পানি ধরে রেখে চিংড়ি চাষ করা হয়। ফলে বহু দেশ (যেমন- বাংলাদেশ) চিংড়ি রপ্তানি করে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে উন্নতি লাভ করে।
৭. লবণ উৎপাদন: জোয়ারের সময় সামুদ্রিক লবণাক্ত পানি পার্শ্ববর্তী জমিতে ধরে রেখে সূর্য তাপে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে পানি দূর করে বহু দেশ প্রাকৃতিকভাবে লবণ উৎপন্ন করে। এই লবণ রন্ধন কাজ ছাড়াও মাটির ক্ষারীয় প্রভাব দূরীকরণে ও পুকুরে মাছ চাষের কাজে ব্যবহৃত হয়।
উপরের আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে, জোয়ার-ভাটা নদীর পানি নির্মল রাখতে, নদী খাতের গভীরতা বৃদ্ধি করতে, নদী ও নদীমুখ ভরাট হওয়া থেকে রক্ষা করতে, নদীর পানি শীতে জমে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে, প্লাঙ্কটন ও নোকটন বিন্যাস নিশ্চিত করতে, লবণ উৎপাদন করতে, চিংড়ি উৎপাদন নিশ্চিত করতে, নদী খাতগুলোকে উন্মুক্ত সাগরের সাথে ঘনিষ্ঠ সংযোগ রক্ষা করতে এবং সর্বোপরি ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের মাধ্যমে মানুষের অর্থনৈতিক কার্যকলাপে সহায়তা করছে।
খ. ক্ষতিকর প্রভাব: জোয়ার-ভাটার অনুকূল দিক ছাড়াও জোয়ার-ভাটার কিছু ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। প্রবল জোয়ারের কারণে অনেক সময় নদী বা সমুদ্রের পানি পার্শ্ববর্তী শস্যক্ষেত্রে ঢুকে পড়ে। ফলে শস্যের ক্ষতিসাধন হয়।
আবার অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে নদীতে জোয়ারের বান সৃষ্টি হলে নৌকা, লঞ্চ ডুবে যায় এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পানি প্রবেশ করে জানমালের ক্ষতি হয়।
সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই
(Ebb-Tide and Coastal Area of Bangladesh)
উপকূলবর্তী নদী বা খাঁড়িতে ঋতুভেদে নদীর পানির প্রবাহের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে জোয়ারের প্রভাবে বিরাট তারতম্য লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশের উপকূলে জোয়ার-ভাটার পরিমাণ বেশ উল্লেখযোগ্য। জোয়ারের প্রভাব বাংলাদেশের উপকূলের খাঁড়ি থেকে বহুদূরে নদীর অভ্যন্তরে প্রায় গোয়ালন্দের নিকট পর্যন্ত পৌছে। শীত ঋতুতে নদীবাহিত পানির পরিমাণ গ্রীষ্ম ঋতুর তুলনায় অত্যন্ত কম। এজন্য শীত ঋতুতে জোয়ারের লবণাক্ত পানি নদীর অভ্যন্তরে বহুদূরে অগ্রসর হতে পারে। ফলে বহুদূর পর্যন্ত নদীর অভ্যন্তরে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে মাঠের ফসল, গবাদি পশু ও শিল্পের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে থাকে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের উপর জোয়ার-ভাটার যথেষ্ট প্রভাব আছে উপকূলবর্তী এলাকায় জোয়ার-ভাটার নিম্নের
প্রভাবসমূহ লক্ষ করা যায়:
১. জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে ভূখণ্ড থেকে আবর্জনাসমূহ নদীর মধ্য দিয়ে সমুদ্রে পতিত হয়।
২. নদীর মোহনা পরিষ্কার থাকে। দৈনিক দুবার জোয়ার-ভাটা হওয়ার ফলে ভাটার টানে নদীর মোহনায় পলি ও আবর্জনা জমতে পারে না।
৩. জোয়ার-ভাটার ফলে সৃষ্ট স্রোতের সাহায্যে নদীখাত গভীর হয়।
৪. নদীতে (কর্ণফুলি) ভাটার স্রোতের বিপরীতে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ (hydro-electricity) উৎপাদন করা হয়।
৫. জোয়ারের পানি নদীর মাধ্যমে সেচে সহায়তা করে এবং অনেক সময় খাল খনন করে জোয়ারের পানি আটকিয়ে সেচকার্যে ব্যবহার করা হয়।
৬. জোয়ার-ভাটার ফলে নৌযান চলাচলের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা হয়। জোয়ারের সময় নদীর মোহনায় ও তার অভ্যন্তরে পানি অধিক হয় বলে বড় বড় সমুদ্রগামী জাহাজের পক্ষে নদীতে প্রবেশ করা সুবিধা হয়। আবার ভাটার টানে ঐ জাহাজ অনায়াসে সমুদ্রে নেমে আসতে পারে। বাংলাদেশের দুটি প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মংলা এবং অন্যান্য উপকূলবর্তী নদীবন্দর সচল রাখতে জোয়ার-ভাটার ভূমিকা রয়েছে।
৭. অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে নদীতে জোয়ারের সময় বান ডাকার ফলে অনেক সময় নৌকা, লঞ্চ প্রভৃতি ডুবে যায়। এতে নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় জানমালের ক্ষতি হয়।
এ অধ্যায়ের প্রধান শব্দভিত্তিক সারসংক্ষেপ
| সমুদ্রস্রোত | সমুদ্রের উপরপৃষ্ঠে নিয়মিত প্রবহমান পানি রাশিকে সমুদ্রস্রোত বলে। পৃথিবীর আবর্তনজনিত কারণ, আবহাওয়া ও জলবায়ু, বাষ্পীভবন, সমুদ্রের অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্যসমূহ যেমন-তাপমাত্রার পার্থক্য, লবণাক্ততার তারতম্য, ঘনত্বের তারতম্য, ঋতুভিত্তিক তারতম্য, ইত্যাদি কারণে সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি হয়। |
| মহাসাগরীয় স্রোত | কুমেরু স্রোত, বেঙ্গুয়েলা স্রোত, উপসাগরীয় স্রোত, ক্যানারি স্রোত ইত্যাদি আটলান্টিক মহাসাগরের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্রোত। পশ্চিম অস্ট্রেলিয় স্রোত, সোমালি স্রোত, মৌসুমি স্রোত, আপুলহাস স্রোত ইত্যাদি ভারত মহাসাগরীয় কয়েকটি স্রোত। |
| অন্তঃস্রোত | আন্তঃস্রোত সমুদ্রপৃষ্ঠের বেশ নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় সেখানকার পানি উত্তপ্ত, আয়তনে প্রসারিত ও হালকা হয় এবং ঘনত্ব কমে যায়। অন্যদিকে, মেরু অঞ্চলে সূর্য তির্যকভাবে কিরণ দেওয়ায় সেখানকার পানির ঘনত্ব বেড়ে যায়। মেরু অঞ্চলের ভারি পানি অন্তঃস্রোত হিসেবে নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি করে। |
| পৃষ্ঠস্রোত | নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় সেখানকার পানি উত্তপ্ত, আয়তনে প্রসারিত হয় এবং ঘনত্ব কমে যায়। অন্যদিকে, মেরু অঞ্চলে সূর্য তির্যকভাবে কিরণ দেওয়ায় সেখানকার পানির ঘনত্ব বেড়ে যায়। ফলে উত্তপ্ত পানি পৃষ্ঠস্রোত হিসেবে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রস্রোতের সৃষ্টি করে। |
| জোয়ার-ভাটা | জোয়ার-ভাটা সমুদ্রের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য। সাধারণত মহাকর্যের প্রভাব ও কেন্দ্রাভিমুখী শক্তির কারণে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হয়। জোয়ার-ভাটাকে মুখ্য জোয়ার, গৌণ জোয়ার, ভরা কটাল ও মরা কটাল মূলত এই চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। |
| কেন্দ্রাভিমুখী শক্তি | কেন্দ্রাভিমুখী শক্তির প্রভাবে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হতে পারে। পৃথিবী তার অক্ষ বা মেরুদণ্ডের ওপর চারদিকে দ্রুত বেগে ঘোরে। এ ঘূর্ণায়মান গতির ফলে ভূপৃষ্ঠ হতে তরল পানিরাশি চতুর্দিকে নিক্ষিপ্ত হওয়ার প্রবণতা লাভ করে। একেই কেন্দ্রাভিমুখী শক্তি বলে। চাঁদের আকর্ষণের কারণে পৃথিবীর যে অংশে মুখ্য জোয়ার হয়, ঠিক তার বিপরীত দিকে কেন্দ্রাভিমুখী শক্তির প্রভাবে গৌণ জোয়ার হয়। |
| মুখ্য জোয়ার | পৃথিবীর আবর্তনকালে যে অংশ চাঁদের সামনে আসে সেখানে চাঁদের আকর্ষণ বেশি থাকে। স্থলভাগ অপেক্ষা পানিরাশির উপর এ আকর্ষণ শক্তির কার্যকারিতা অনেক বেশি বলে চারদিক থেকে পানিরাশি ঐ আকর্ষণস্থলের দিকে প্রবাহিত হয়। এর ফলে চাঁদের নিকটবর্তী অংশের পানিরাশি ফুলে উঠে মুখ্য জোয়ারের সৃষ্টি করে। |
| গৌণ জোয়ার | চাঁদের আকর্ষণের কারণে পৃথিবীর যে অংশে মুখ্য জোয়ার হয়, ঠিক তার বিপরীত দিকে কেন্দ্রাতিগ বা কেন্দ্রাভিমুখী শক্তির প্রভাবে গৌণ জোয়ার হয়। চাঁদের আকর্ষণে যেদিকে জোয়ার হয় তার নিচের স্থলভাগকেও চাঁদ আকর্ষণ করে। ফলে জোয়ার সংঘটনের স্থানের বিপরীত দিকে পানিরাশির তুলনায় স্থলভাগ চাঁদের দিকে অধিক আকর্ষিত হয়। ফলে ঐ স্থানে পানিরাশির উপর পৃথিবীর আকর্ষণ শক্তির প্রভাব কমে যায়। একইসাথে কেন্দ্রাতিগ শক্তির প্রভাবে পানিরাশি যে স্থানে প্রবাহিত হয়ে জোয়ার সৃষ্টি করে, এ লোয়ারই গৌণ জোয়ার। |
সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই
Read more