(Bottom Topography of the Atlantic Ocean)
আটলান্টিক মহাসাগর পৃথিবীর মহাসাগরসমূহের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাসাগর। এ মহাসাগরের আয়তন প্রায় ৮ কোটি ১৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। এর আয়তন সমগ্র ভূভাগের প্রায় ১৬% এবং প্রশান্ত মহাসাগরের প্রায় অর্ধেক। এ মহাসাগরের পশ্চিমে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং পূর্ব দিকে ইউরোপ ও আফ্রিকা। আটলান্টিক মহাসাগরের আকৃতি অনেকটা ইংরেজি 'S' অক্ষরের মতো। নিরক্ষরেখার নিকট এটি বেশি সংকীর্ণ। এখানে এর বিস্তার ২,৫৭৪ কিলোমিটার। কিন্তু নিরক্ষরেখা হতে এটি উত্তর ও দক্ষিণে ক্রমশ চওড়া। উত্তরে অক্ষাংশের নিকট এর বিস্তার ৪,৮২৭ কিলোমিটার এবং দক্ষিণে ৩৫° দক্ষিণ অক্ষাংশের নিকট ৫,৯৫৩ কিলোমিটার। এ মহাসাগরের উত্তরাংশ গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড প্রভৃতি দ্বীপ দ্বারা পরিবেষ্টিত। কিন্তু দক্ষিণ অংশটি ক্রমশ দক্ষিণ মহাসাগরের সাথে মিশেছে।

আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশ: আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশ প্রশান্ত মহাসাগরের মতো তত গভীর নয়। এর মহীসোপান পৃথিবীর অন্যান্য মহাসাগর অপেক্ষা বেশি। এ মহাসাগরের গভীর সমুদ্রখাতের সংখ্যা খুবই কম।
মহীসোপান ও মহীঢাল: আটলান্টিকের উত্তর দিকে সুবিস্তৃত মহীসোপান অবস্থিত। কিন্তু দক্ষিণ আটলান্টিকের উপকূলে মহীসোপান খুবই সরু। এ কারণে উত্তর আটলান্টিকে মহীঢালের পরিমাণ কম এবং দক্ষিণ আটলান্টিকে মহীঢালই বেশি।
উত্তর আটলান্টিকের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলের অগভীর সাগর ও উপসাগরগুলো মহীসোপানেরই অংশবিশেষ। উত্তর আটলান্টিকের পূর্ব দিকের উত্তর সাগর, বাল্টিক সাগর প্রভৃতি এবং পশ্চিম দিকের বেফিন ও হাডসন উপসাগর মহীসোপানের অন্তর্গত। এ সকল সাগর ও উপসাগরে পানির গভীরতা ১৮০ মিটার বা তারও কম। এছাড়া পূর্ব উপকূলে ভূমধ্যসাগর এবং পশ্চিম উপকূলের মেক্সিকো উপসাগরেও পানির গভীরতা ৩,৭৫০ মিটারের কম। দক্ষিণ আটলান্টিকের উভয় উপকূলে মহীসোপান খুব কম বিস্তৃত। এর পর হতে মহাসাগরের মহীঢাল ক্রমশ ঢালু হয়ে গভীর সমুদ্রতলে প্রবেশ করেছে।

তলদেশের উন্নত অংশসমূহ: অন্যান্য মহাসাগরের তলদেশের মতো আটলান্টিকের তলদেশেও সুবিস্তৃত উঁচু অংশ রয়েছে। এ উঁচু অংশগুলো শৈলশিরা ও আন্তঃমহাসাগরীয় মালভূমিরূপে অবস্থিত।
আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশের মধ্যভাগে অবস্থিত উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা (mid atlantic ridge)। এর আকৃতি মহাসাগরের নিজস্ব আকৃতি ইংরেজি 'S' অক্ষরের মতো। বিষুবরেখার উত্তরে অবস্থিত এর উত্তরাংশকে ডলফিন শৈলশিরা (dolphin ridge) এবং দক্ষিণাংশকে চ্যালেঞ্জার শৈলশিরা (challenger ridge) বলা হয়। এ উচ্চভূমির গভীরতা সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে প্রায় ৩,০৪৮ মিটার। ভূবিজ্ঞানীদের মতে, অতীতে এ শৈলশিরা বরাবর আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্য স্থান দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে একটি সুদীর্ঘ ফাটল ছিল এবং ফাটল দিয়ে ভূঅভ্যন্তরীণ পদার্থসমূহ উপরে উত্থিত ও সঞ্চিত হয়ে এ শৈলশিরার সৃষ্টি করেছে।
ডলফিন শৈলশিরার উত্তরাংশ প্রশস্ত হয়ে সুবিস্তৃত টেলিগ্রাফ মালভূমিতে পরিণত হয়েছে। গ্রিনল্যান্ড ও ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের মধ্যবর্তী অংশে এর উচ্চতা এত অধিক যে এ স্থানে পানিরাশির গভীরতা গড়ে ৯১৪ থেকে ১,০৬৭ মিটার। ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের পশ্চিম দিকে এ মালভূমির পূর্বাংশ উইভিল টমসন শৈলশিরা (wyvill tomson ridge) এবং ফ্যারো আইসল্যান্ড শৈলশিরা নামে পরিচিত। গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের মধ্যবর্তী উন্নত অংশের নাম গ্রিনল্যান্ড শৈলশিরা এবং গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিম পাশ দিয়ে বেফিন উপসাগরের দিকে বিস্তৃত উন্নত ভূমিকে বেফিন গ্রিনল্যান্ড শৈলশিরা (bafin
greenland ridge) বলা হয়।
তলদেশের উন্নত অংশসমূহ: অন্যান্য মহাসাগরের তলদেশের মতো আটলান্টিকের তলদেশেও সুবিস্তৃত উঁচু অংশ রয়েছে। এ উঁচু অংশগুলো শৈলশিরা ও আন্তঃমহাসাগরীয় মালভূমিরূপে অবস্থিত।
আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশের মধ্যভাগে অবস্থিত উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা (mid atlantic ridge)। এর আকৃতি মহাসাগরের নিজস্ব আকৃতি ইংরেজি 'S' অক্ষরের মতো। বিষুবরেখার উত্তরে অবস্থিত এর উত্তরাংশকে ডলফিন শৈলশিরা (dolphin ridge) এবং দক্ষিণাংশকে চ্যালেঞ্জার শৈলশিরা (challenger ridge) বলা হয়। এ উচ্চভূমির গভীরতা সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে প্রায় ৩,০৪৮ মিটার। ভূবিজ্ঞানীদের মতে, অতীতে এ শৈলশিরা বরাবর আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্য স্থান দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে একটি সুদীর্ঘ ফাটল ছিল এবং ফাটল দিয়ে ভূঅভ্যন্তরীণ পদার্থসমূহ উপরে উত্থিত ও সঞ্চিত হয়ে এ শৈলশিরার সৃষ্টি করেছে।
উত্তর আটলান্টিকের মতো দক্ষিণ আটলান্টিকে কতিপয় শৈলশিরা রয়েছে। চ্যালেঞ্জার শৈলশিরার দক্ষিণ দিকের তৃস্তান-দা-কুনহা দ্বীপের নিকট হতে ওয়ালভিস শৈলশিরা উত্তর-পূর্ব দিকে প্রসারিত হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়া তৃস্তান-দা-কুনহা দ্বীপ হতে একটি বিচ্ছিন্ন ও অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রাকৃতি শৈলশিরা এর পশ্চিম দিকে অবস্থিত। এটি রায়োগ্র্যান্ড শৈলশিরা (riogrand ridge) নামে পরিচিত। এ শৈলশিরা ব্যতীত আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশের অন্যান্য শৈলশিরা ও মালভূমি পরস্পরের সাথে সংযুক্ত।
মহাসাগরীয় দ্বীপসমূহ: এ মহাসাগরের দ্বীপের সংখ্যা প্রশান্ত মহাসাগরের তুলনায় অনেক কম। উত্তর আটলান্টিক
মহাসাগরের পূর্ব উপকূলে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ এবং পশ্চিম উপকূলে নিউফাউন্ডল্যান্ড দ্বীপ প্রকৃতপক্ষে মহীসোপানের উচ্চতম অংশ। কতিপয় দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের উত্তর সীমা ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত। আইসল্যান্ড এদের মধ্যে সর্বপ্রধান। এ দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জ স্থানীয় শৈলশিরাকে অবলম্বন করে অবস্থিত। পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ মূল ভূভাগের খুব নিকটে মহীসোপানের ওপর অবস্থিত। এর পর হতেই মহীসোপান মহীঢালে পরিণত হয়ে ক্রমশ অধিক গভীরে সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এ মহাসাগরের মধ্যভাগে অবস্থিত মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরার উভয় পার্শ্বের বিস্তীর্ণ অংশের তলদেশ খুবই গভীর। মাঝে মাঝে এ শৈলশিরাকে অবলম্বন করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ রয়েছে। সেন্ট হেলেন, অ্যাজোর্স এদের মধ্যে প্রধান। অন্যান্য দ্বীপমালার মধ্যে ম্যাডেরিয়া (maderia) দ্বীপ সম্পূর্ণ আগ্নেয়গিরি হতে উৎক্ষিপ্ত পদার্থ দিয়ে গঠিত। এটি পূর্ব দিকে ১০০ পশ্চিম দ্রাঘিমাংশ ও ৩০° উত্তর অক্ষাংশে অবস্থিত। বারমুডা পশ্চিম দিকে ৬৪° পশ্চিম দ্রাঘিমাংশ ও ৩২° উত্তর অক্ষাংশে অবস্থিত একটি প্রধান দ্বীপপুঞ্জ।
গভীর খাত: আটলান্টিক মহাসাগরে উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরের ন্যায় ভঙ্গিল পর্বত নেই। ফলশ্রুতিতে প্রশান্ত মহাসাগরের তুলনায় এ মহাসাগরে গভীর খাতও তেমন নেই। আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরতম খাত পোর্টোরিকো খাত (puerto rico trench) পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের উত্তরে পোর্টোরিকো দ্বীপের নিকট অবস্থিত। এর গভীরতা ৮,৪৭৪ মিটার (৪,৬৩৪ ফ্যাদম)। এ মহাসাগরের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত দক্ষিণ স্যান্ডউইচ খাত (south sandwich trench) দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের দক্ষিণ অংশে হর্ন অন্তরীপের সোজাসুজি দক্ষিণ স্যান্ডউইচ দ্বীপের নিকট অবস্থিত। এর গভীরতা ৮,২৩০ মিটার (৪,৫০০ ফ্যাদম)। নিরক্ষরেখা বরাবর ২০০ পশ্চিম দ্রাঘিমারেখার নিকট অবস্থিত রোমানস খাত (romanche trench) মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরাকে দ্বিখণ্ডিত করেছে। এর আয়তন অতিশয় স্বল্প এবং গভীরতা ৭,৩১৫ মিটার (৩,৯৯৯ ফ্যাদম)।
প্রান্তদেশীয় সাগরসমূহ: দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে সাগর ও উপসাগরের সংখ্যা অনেক কম। কিন্তু উত্তর আটলান্টিকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা মহাদেশের তীরবর্তী অঞ্চলে অনেকগুলো দ্বীপ রয়েছে। ইউরোপ মহাদেশ বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপদ্বীপ নিয়ে গঠিত বলে এ অঞ্চলে অনেকগুলো সাগর ও উপসাগরের সৃষ্টি হয়েছে। এদের মধ্যে বাল্টিক সাগর, উত্তর সাগর, বিস্কে উপসাগর, আড্রিয়াটিক সাগর, ভূমধ্যসাগর প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে উত্তর সাগর ও বাল্টিক সাগরের গভীরতা ১৮৩ মিটারের কম। এ সাগরদ্বয় উত্তর আটলান্টিক মহীসোপানের অন্তর্ভুক্ত। ডেনমার্ক ও সুইডেনের মধ্যস্থিত এ উভয় সাগরের সংযোগস্থল মাত্র ১৮.২৮ মিটার গভীর। ভূমধ্যসাগর বেশ গভীর এবং এর সবচেয়ে গভীরতম অংশের গভীরতা প্রায় ৪,৫৭২ মিটার। উত্তর আটলান্টিকের পশ্চিম উপকূলের বেফিন ও হাডসন উপসাগরের গভীরতা ১৮৩ মিটারেরও কম। মেক্সিকো উপসাগরের গভীরতা প্রায় ভূমধ্যসাগরের সমান। এর সবচেয়ে গভীরতম অংশের গভীরতা ৩,৮১০ মিটারের মতো। ক্যারিবিয়ান সাগরের গভীরতা প্রায় ৭১৬২.৮ মিটার।
বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই
Read more