hsc

পাঠ-১৫: বায়ুমণ্ডলীয় গোলযোগ: ঘূর্ণিঝড়

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

15

(Atmospheric Disturbances)

বায়ুমণ্ডলে বায়ুর তাপ ও চাপের অনিয়মিত পার্থক্যের কারণে গোলযোগ দেখা দেয়। পৃথিবীর বিভিন্ন বায়ুপ্রবাহ অঞ্চলে বায়ুপ্রাচীরের আকারে, তরঙ্গাকারে, ঘূর্ণিপাকের ন্যায়, আবার কোথাও পরিচলনের আকারে বায়ুমণ্ডলীয় গোলযোগ সংঘটিত হয়ে থাকে। এগুলো ছোট, বড় এবং স্বল্প ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। অভিসরণ ও উর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহের কেন্দ্র অঞ্চলে বায়ুমণ্ডলীয় গোলযোগসমূহ সংঘটিত হয়ে থাকে এবং এর প্রভাবেই বর্ষণ হয়ে থাকে। বায়ুমণ্ডলীয় গোলযোগ অঞ্চলে অবস্থিত মেঘ আগত সৌর শক্তি এবং বহির্গামী পৃথিবীর বিকিরণের পরিমাণকে প্রভাবিত করে বলে বায়ুর তাপমাত্রার পরিমাণেও ভিন্নতা দেখা যায়। তাছাড়া বায়ুমণ্ডলীয় গোলযোগের ফলে বায়ুর তাপমাত্রা আনুভূমিকভাবেও প্রভাবিত হয়। বায়ুমণ্ডলীয় গোলযোগের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়, কালবৈশাখী ও টর্নেডো জনজীবনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

ঘূর্ণিঝড় (Cyclone): বাংলাদেশে সংঘটিত প্রচণ্ড শক্তিশালী এবং মারাত্মক ধ্বংসকারী প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ঘূর্ণিঝড় উল্লেখযোগ্য। স্থান অনুসারে ঘূর্ণিঝড়ের বিভিন্ন নামকরণ করা হয়। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রমুখী ও ঊর্ধ্বমুখী বায়ুরূপে পরিচিত। ভূপৃষ্ঠের কোনো অংশে বায়ুমণ্ডল যদি অধিক উত্তপ্ত হয় তখন বায়ু দ্রুত উষ্ণ ও হালকা হয়ে উপরের দিকে উঠে যায়। এখানে নিম্নচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হয়। তখন চাপের সমতা রক্ষার্থে চারদিকের উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে শীতল ও ভারি বায়ু প্রবল বেগে ঘুরতে ঘুরতে নিম্নচাপ কেন্দ্রে প্রবেশ করে, আবার ক্রমাগত উষ্ণ ও হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায়। এই ঘূর্ণায়মান বায়ুপ্রবাহকে ঘূর্ণিঝড় বলে।

ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির কারণ: ঘূর্ণিঝড় সাধারণত গভীর সমুদ্রে সৃষ্টি হয়। মূলত যে দুটি কারণ ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করে তা হলো নিম্নচাপ ও উচ্চ তাপমাত্রা। ঘূর্ণিঝড় তৈরি হতে সাগরের তাপমাত্রা ২৭০ সেলসিয়াস এর বেশি হতে হয়। দুর্ভাগ্যবশত বঙ্গোপসাগরে প্রায় সারা বছরই তা বিদ্যমান থাকে। সাগরে বৃষ্টিপাতের ফলে তা সুপ্ততাপ ছেড়ে দেয়, যা বাষ্পীভবন বাড়িয়ে দেয়। আবার এই সুপ্ততাপের প্রভাবে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রাও বেড়ে যায়। ফলে বায়ুমণ্ডল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং নিম্নচাপের সৃষ্টি করে।

নিম্নচাপ সৃষ্টি হলে আশপাশের বাতাস সেখানে ধাবিত হয়, যা বাড়তি তাপমাত্রার কারণে ঘুরতে ঘুরতে উপরে উঠতে থাকে ও ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি করে। এ প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের বেগ অনেক বেশি হয়। তবে বাতাসের বেগ ঘণ্টায় ৬৩ কি.মি. বা তার বেশি হলে তা সাইক্লোন হিসেবে গণ্য করা হয়। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে সবচেয়ে শক্তিশালী সাইক্লোন আঘাত হানে ১৯৯১ সালে, যেখানে বাতাসের বেগ ছিল ঘণ্টায় ২২৫ কিলোমিটার। বাংলাদেশে আশ্বিন-কার্তিক এবং চৈত্র-বৈশাখ মাসে ঘূর্ণিঝড় হয়ে থাকে। বর্ষাকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর কারণে ঘূর্ণিঝড় হয়।
জনজীবনে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব: বাংলাদেশে ১৯৬৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১২টি বড় আকারের ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়সহ সর্বমোট ছোট বড় প্রায় ৬১টি ঘূর্ণিঝড় এবং ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস উপকূলবর্তী অঞ্চলে আঘাত হেনেছে। এসব ঝড়ে মানুষ ও পশুর মৃত্যু ছাড়াও কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে। ১৯৯১ সালে সংঘটিত উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।

১৯৬০, ১৯৬১, ১৯৬৫, ১৯৬৬ সালের ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২১২ কোটি টাকা এবং মানুষের মৃত্যু সংখ্যা ছিল ২ লক্ষ ৫১ হাজার। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর রাতে যে ঝড় সংঘটিত হয় তা উনবিংশ শতাব্দীর বৃহত্তম প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে মনে করা হয়। এই ঘূর্ণিঝড়ে ১০০ কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয় এবং সাড়ে ৫ লক্ষ লোক প্রাণ হারায়।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...