(Steps Taken by DoE to Prevent Environment Pollution)
রাসায়নিক, ভৌতিক ও জৈবিক কারণে পরিবেশে প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের যেকোনো নেতিবাচক পরিবর্তনই হলো দূষণ।
মানুষ এই প্রাকৃতিক পরিবেশের উপাদান যেমন: বায়ু, পানি, মাটি ইত্যাদিকে বিভিন্নভাবে দূষিত করছে। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে মাটি, পানি, বায়ু, বিভিন্নভাবে দূষিত হচ্ছে এবং জনজীবন হুমকির মুখে পতিত হচ্ছে। সরকারি, বেসরকারি এমনকি বিদেশি সহায়তায় এই দূষণ প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে ১৯৮৯ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর সৃষ্টি করা হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এর মাধ্যমে পরিবেশ অধিদপ্তরকে সুরক্ষা, পরিবেশ উন্নয়ন ও পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের লক্ষ্য: পরিবেশ অধিদপ্তরের বর্তমান লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে দূষণমুক্ত বসবাসযোগ্য একটি সুস্থ, সুন্দর ও মডেল বাংলাদেশ গড়ে তোলা। নিয়ে পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে গৃহীত পদক্ষেপগুলো আলোচনা করা হলো:
১. দূষণ জরিপ: পরিবেশ অধিদপ্তরের দূষণ প্রতিরোধে একটি অন্যতম পদক্ষেপ হলো দেশের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে দূষণ জরিপ পরিচালনা করা। সাধারণত বিভিন্ন শিল্প কারখানা দ্বারা দূষণ বেশি হয়ে থাকে। এতে পানি দূষণ সবচেয়ে বেশি হয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ নদ-নদী ও জলাশয় দূষিত হওয়ার কারণে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। তাই পরিবেশ অধিদপ্তর শিল্প কারখানায় দূষণ জরিপের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ হ্রাস করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
২. শিল্পদূষণ নিয়ন্ত্রণ: পরিবেশ অধিদপ্তর বাংলাদেশের দূষণ প্রতিরোধে দূষণকারী বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান চিহ্নিতকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই গৃহীত পদক্ষেপে যেসব শিল্প কারখানা দূষণের সাথে জড়িত অর্থাৎ কোনো না কোনোভাবে মাটি, পানি ও বায়ু দূষণের সাথে জড়িত সেসব শিল্প প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বিধির আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এর প্রাথমিক কার্যক্রম হচ্ছে- মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন/জরিপ পরিচালনা, উদ্বুদ্ধকরণ, নোটিশ প্রদান, প্রযোজ্যক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা অথবা পরিবেশ আদালতে মামলা দায়ের করা।
৩. পরিবেশ দূষণ সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তি: পরিবেশ দূষণ সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ এবং তা তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা পরিবেশ অধিদপ্তরের অন্যতম একটি পদক্ষেপ। এর প্রাথমিক কার্যক্রম হচ্ছে অভিযোগ বা প্রতিকার প্রার্থনার আবেদনপত্র গ্রহণ, সরেজমিন পরিদর্শন, তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা, প্রযোজ্যক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা। অভিযোগ সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়।
৪. যানবাহনজনিত দূষণ নিয়ন্ত্রণ: পরিবেশ অধিদপ্তর যানবাহন জরিপ এবং দূষণকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে থাকে। এক্ষেত্রে রাস্তায় চলাচলরত যানবাহন পরীক্ষা ও দূষণকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
৫. বায়ু ও পানির গুণগত মান পরীক্ষা: দেশের বিভিন্ন এলাকায় বায়ু এবং নদী, পুকুর, টিউবওয়েল ও খাবার পানির গুণগত মান নির্ণয়ের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন নদী, পুকুর, টিউবওয়েল ও খাবার পানির গুণগত মান নির্ণয়ের জন্য নমুনা সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ, ডাটা সংরক্ষণ ও প্রতিবেদন প্রকাশ করা এই পদক্ষেপটির প্রাথমিক কার্যক্রম। তাই বলা যায়, পরিবেশ দূষণে বায়ু ও পানির গুণগত মান পরীক্ষা করা পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি অন্যতম কার্যকর পদক্ষেপ।
৬. বায়ুদূষণ প্রতিরোধে পদক্ষেপ গ্রহণ: পরিবেশ অধিদপ্তরের অধীনে পরিবহন ব্যবস্থায় অতিরিক্ত যে বায়ুদূষণ হয় তা প্রতিরোধে সমাজের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সাথে আলোচনা করে কিছু কর্ম-পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। যেমন, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ সংশোধন করা হয়েছে এবং এই সংশোধিত নীতির অধীনে পেট্রোল ও ডিজেল চালিত গাড়ির জন্য অনুঘটক কনভার্টার এবং ডিজেল পার্টিকুলেট ফিল্টার ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উপরন্তু জানুয়ারি ২০০২ থেকে ঢাকা শহরে ২০ বছরের পুরনো ট্যাক্সি, ট্রাক, মিনিট্রাক, ট্যাংক, লরি এবং ২৫ বছরের পুরোনো ভ্যান, মাইক্রোবাস, মিনিবাস, বাস ইত্যাদি চালনায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
৭. ইটভাটার জন্য পদক্ষেপ: শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে ঢাকা শহরের আশপাশে এবং বিভিন্ন বিভাগীয় শহরগুলোরকাছে যত্রতত্র ইটের ভাটা গড়ে উঠেছে। এমনিতেই শহরের যানবাহনের ধোঁয়া ও অতিরিক্ত জনসংখ্যার জন্য শহরের দূষণ বাড়ছে, তার ওপর শহরের কাছাকাছি এলাকায় অতিরিক্ত ইটভাটা গড়ে ওঠায় বায়ুদূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে পরিবেশ অধিদপ্তর ইটভাটা গড়ে ওঠায় কিছু শর্ত ও নীতি প্রদান করেছে। যেমন- ইটভাটার চিমনিগুলোর উচ্চতা ১২০ ফুটের নিচে হতে পারবে না এবং কংক্রিট ব্লক ইট উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া, কম সালফার ব্যবহার করা প্রভৃতি।
৮. বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারে পদক্ষেপ: পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে পরিবেশ অধিদপ্তর বিষাক্ত ও বিপজ্জনক
রাসায়নিক পদার্থের নিরাপদ ব্যবহারে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে বিষাক্ত এবং বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থের আমদানি, পরিবহন, ব্যবহার ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে প্রাথমিক কার্যক্রম হচ্ছে- বিষাক্ত এবং বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থের আন্তঃদেশীয় চলাচল ও মজুদ বিষয়ে সমীক্ষা পরিচালনা করা, এগুলোর নিরাপদ অপসারণ বা ধ্বংসের লক্ষে কর্মকৌশল প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করা।
৯. পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ: পলিথিন শপিং ব্যাগের যথেষ্ট ব্যবহারের ফলে পরিবেশ দূষিত হয়। তাই এই দূষণ প্রতিরোধে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক ১ জানুয়ারি ২০০২ থেকে ঢাকা মহানগরী এলাকায় এবং ১ মার্চ ২০০২ থেকে সমগ্র বাংলাদেশে সব ধরনের পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদন, ব্যবহার ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এই পদক্ষেপকে পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১০. পরিবেশগত সচেতনতা বৃদ্ধি: পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। এ কারণে পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশ বিষয়ে গণসচেতনতা এবং পরিবেশ বিষয়ক তথ্য সকলের কাছে সহজলভ্য করার লক্ষ্যে প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং পরিবেশ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দিবসসমূহ যথাযথ মর্যাদায় উদযাপন করে চলেছে। সচেতনতার উপকরণ হিসেবে এ সংক্রান্ত পোস্টার, লিফলেট, বুকলেট, স্মরণিকা, টিভি স্পট, ডকুমেন্টারি, গণবিজ্ঞপ্তি ইত্যাদি তৈরি ও প্রচারের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
উপরিউক্ত আলোচনায় দেখা যাচ্ছে, পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা বাস্তবায়ন করতে পারলে পরিবেশ দূষণ অনেকখানি হ্রাস করা সম্ভব হবে। পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে নদী দূষণমুক্ত করা, পৌর বর্জ্য থেকে জলাভূমি সংরক্ষণের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সরকারিভাবে না করলেই নয়। এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তাতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকলে পরিবেশ দূষণ ব্যাপকভাবে হ্রাস করা সম্ভব হবে।
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
Read more