(Oceans of the World)
মহাদেশকে আবৃত করে যেসব বৃহৎ প্রাকৃতিক জলরাশি অবস্থিত সেগুলোকে মহাসাগর বলে। মহাসাগরগুলোর গভীরতা সর্বত্র সমান নয়। মহাসাগরের সর্বাধিক গভীরতা ৯.৬৫ কিলোমিটার। পৃথিবীতে প্রকৃতপক্ষে মহাসাগরগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, আন্তঃসংযোগে সংযুক্ত। মহাসাগরকে ৫টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- ১. প্রশান্ত মহাসাগর, ২. আটলান্টিক মহাসাগর, ৩. ভারত মহাসাগর, ৪. উত্তর মহাসাগর ও ৫. দক্ষিণ মহাসাগর।

প্রশান্ত মহাসাগর (Pacific Ocean): পাঁচটি মহাসাগরের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগর আয়তন ও গভীরতায় সর্ববৃহৎ এবং এর
আয়তন আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরের যুক্ত আয়তনের প্রায় সমান। প্রশান্ত মহাসাগর উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ দ্বারা বেষ্টিত হয়ে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশের অধিক স্থান জুড়ে রয়েছে ও পৃথিবীর মুক্ত পানির অর্ধেকের বেশি ধারণ করছে। প্রশান্ত মহাসাগর সবচেয়ে বেশি গভীর (গড় গভীরতা ৪,২৮০ মিটার বা ১৪,০৪০ ফুট)। এ মহাসাগরে অনেকগুলো গভীর গিরিখাত (Trenches বা সমুদ্রের সবচেয়ে গভীর এলাকা) রয়েছে, যার গভীরতা গড়ে প্রায় ১১,০০০ মিটার (৩৬,০০০ ফুট)। এ গভীর খাত অঞ্চল সক্রিয় আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্প অধ্যুষিত প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল গঠন করেছে এবং এ এলাকা সক্রিয় পর্বত গঠনকারী অঞ্চল। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের প্রায় গোলাকৃতি উপকূল ভাগে অনেকগুলো আগ্নেয়গিরি থাকায় এই উপকূল ভাগকে 'আগ্নেয় মেখলা' (Rings of Fire) বলে।
তুলনামূলকভাবে বেশ কমসংখ্যক নদী প্রশান্ত মহাসাগরে এসে পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে প্রশান্ত মহাসাগরের আয়তন এ মহাসাগরের পতিত সকল নদীর অববাহিকার আয়তনের ১০ গুণ। ফলে অন্যান্য মহাসাগরের তুলনায় প্রশান্ত মহাসাগর মহাদেশের দ্বারা কম প্রভাবিত। প্রশান্ত মহাসাগরে বিশেষ করে দক্ষিণ ও পশ্চিম প্রান্তে দ্বীপ বা দ্বীপপুঞ্জের সংখ্যা অনেক। অধিকাংশ বড় দ্বীপগুলো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্টি হয়েছে এবং এদের অনেকগুলো এখনও সক্রিয়। মৃত বা সুপ্ত আগ্নেয়গিরিগুলো সামুদ্রিক তরঙ্গ স্রোত ও জোয়ার-ভাটা দ্বারা ব্যাপকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। হাওয়াই দ্বীপ, আগ্নেয় অগ্ন্যুৎপাতে সৃষ্ট দ্বীপের উদাহরণ।
আটলান্টিক মহাসাগর (Atlantic Ocean): আটলান্টিক মহাসাগর তুলনামূলকভাবে কম প্রশস্ত এবং উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে ইংরেজি 'S' এর মতো বিস্তৃত। এ মহাসাগরের পূর্ব ও পশ্চিম দুই তীরেই মহাদেশ অবস্থিত। আর্কটিক সাগরসহ এটি সবচেয়ে দীর্ঘ মহাসাগর, যা উত্তর-দক্ষিণ মেরু অঞ্চলদ্বয়কে যুক্ত করেছে। স্থলভাগ সংলগ্ন বহু অগভীর সাগর (ক্যারিবিয়ান, ভূমধ্যসাগর, বাল্টিক, মেক্সিকো উপসাগর ও আর্কটিক সাগর) এবং প্রশস্ত মহীসোপান থাকার দরুন এ মহাসাগর সবচেয়ে কম গভীরতাসম্পন্ন। এ মহাসাগরের গড় গভীরতা ৩,৩৩৯ মিটার (১০,৯৫৫ ফুট)। অনেক নদীর মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুটি নদী আমাজান ও কঙ্গো আটলান্টিক মহাসাগরে এসে পতিত হয়েছে। আটলান্টিকের আয়তন এ মহাসাগরে পতিত নদীসমূহের অববাহিকার আয়তনের মাত্র ১.৬ গুণ।
আটলান্টিক মহাসাগরে তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক দ্বীপ রয়েছে। উত্তর আটলান্টিকে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং দক্ষিণ আটলান্টিকে দক্ষিণ স্যান্ডউইচ দ্বীপ আগ্নেয় দ্বীপ। অন্যান্য দ্বীপ (যেমন- আইসল্যান্ড, আজোরস, সেন্ট পল রক ও ট্রিসটান-দ্য-কুনহা) মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরার অংশ, যা বৃহদাকার সুপরিচিত মধ্য সাগরীয় পর্বতপুঞ্জ। আর্কটিক সাগর মহাসাগরেরই একটি অংশ। বিভিন্ন দিক থেকে আর্কটিক সাগর অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এটি সমুদ্র তলদেশের এক-তৃতীয়াংশ নিমজ্জিত মহীপ্রান্তের (continental margin) দ্বারা গঠিত, এটি সম্পূর্ণভাবে ভূভাগ দ্বারা বেষ্টিত এবং এর অধিকাংশ এলাকা সমুদ্রের বরফ দ্বারা আবৃত। বছরের অধিকাংশ সময় এ সাগরের পৃষ্ঠদেশ ৩ থেকে ৪ মিটার (১০-১২ ফুট) পুরু বরফের (pack ice) স্তর দ্বারা আবৃত থাকে। আর্কটিকের কেন্দ্রাঞ্চল স্থায়ী বরফে আবৃত, যদিও এটি আংশিকভাবে গলে আগস্টের শেষ দিকে পাতলা হয়ে প্রায় ২ মিটার স্তরে এসে পৌঁছে। আটলান্টিক মহাসাগরের দুই প্রান্তে ইউরোপ ও আমেরিকার মতো দুটি শিল্পসমৃদ্ধ মহাদেশ থাকায় বাণিজ্যিক দিক থেকে এই মহাসাগরের গুরুত্ব সর্বাধিক।
ভারত মহাসাগর (Indian Ocean): ভারত মহাসাগরকে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে উত্তর দক্ষিণে প্রলম্বিত পূর্ব দ্রাঘিমা রেখার দ্বারা বিভক্ত করা হয়েছে, যা আফ্রিকা মহাদেশের সর্ব দক্ষিণ বিন্দু কেপ অব গুড হোপ থেকে এন্টার্কটিকায় স্পর্শ করেছে। প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে এ মহাসাগরের সীমানা ইন্দোনেশিয়ার মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে দক্ষিণ দিকে ১৫০° পূর্ব দ্রাঘিমা বরাবর এন্টার্কটিকায় এসে মিলেছে। উত্তর গোলার্ধে ভারত মহাসাগরের বিস্তৃতি অতি অল্প। এর উত্তরের সীমানা মোটামুটি ২৫° উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত। এ মহাসাগরের খুব অল্পসংখ্যক দ্বীপ ও সংলগ্ন সাগর রয়েছে। ভারত মহাসাগরের গড় গভীরতা ৩,৯৬০ মিটার (১২,৯৯০ ফুট), যা আটলান্টিক থেকে বেশি কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগর থেকে কম। এ মহাসাগরের আয়তন এতে পতিত নদীসমূহের মোট অববাহিকার আয়তনের ৪.৩ গুণ। এ মহাসাগরে এশিয়া তথা পৃথিবীর বৃহত্তম নদীগুলোর কয়েকটি এসে পতিত হয়েছে। নদীগুলো হিমালয় পর্বত থেকে উৎপত্তি হয়ে উত্তর ভারত মহাসাগরে পতিত হয়েছে। প্রধান নদীগুলোর মধ্যে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা বঙ্গোপসাগরে, ইরাবতি আন্দামান সাগরে এবং সিন্ধু নদ আরব সাগরে এসে পতিত হয়েছে।
মহাসাগরগুলোর মধ্যে ভারত মহাসাগর প্রশান্ত ও আটলান্টিকের চেয়ে আয়তনে ছোট। এ মহাসাগরের চারদিকের মহীসোপান তুলনামূলকভাবে অপ্রশস্ত। পৃথিবীর দুটি বৃহৎ নদী (গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র) বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়ে এ সাগরের পানির লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে। নদীবাহিত বিপুল পরিমাণ তলানি জমা হয়ে উত্তর বঙ্গোপসাগরের মহীসোপান বেশ প্রশস্ত হয়েছে। লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের অধিক লবণাক্ত ও উত্তপ্ত পানি সম্পূর্ণ ভারত মহাসাগরকে প্রভাবিত করে। এই উত্তর-পশ্চিম ভারত মহাসাগরে (লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগর ও আরব সাগর) অত্যধিক বাষ্পীভবন, কিন্তু স্বল্প পরিমাণ নদীবাহিত স্বাদু পানি ও বৃষ্টিপাত হওয়ার দরুন এখানে পানি অধিক লবণাক্ত ও ভারি হয়ে নিচের দিকে ডুবে যায় ও সমুদ্রের বিভিন্ন দিকে বিভিন্ন গভীরতায় ভারি পানিপুঞ্জের স্রোত হিসেবে প্রবাহিত হয়।
ভারত মহাসাগরে মৌসুমি বায়ু সৃষ্টি হয়। এই বায়ু উৎপত্তির প্রধান কারণ হলো এটি একদিকে এশিয়া ও ইউরোপের বিশালাকার ভূভাগ দ্বারা উত্তর মেরু অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন, যে অবস্থা অন্য দুটি মহাসাগরে অনুপস্থিত। এর ফলে ভূভাগ ও সমুদ্রের পানির তাপ গ্রহণ ও তাপ বিকিরণের মধ্যে যে প্রক্রিয়াগত পার্থক্য রয়েছে তা সমুদ্র ও স্থলভাগের মধ্যে তাপের পার্থক্য সৃষ্টি করে চাপের বৈষম্য ঘটিয়ে মৌসুমি বায়ুর সৃষ্টি করে। ভারত মহাসাগরের অন্য বৈশিষ্ট্যটি হলো উত্তর মেরু অঞ্চলের সাথে পানির আদান-প্রদান না হওয়া। এ মহাসাগরের অবস্থান এমনই যে, উত্তরের শীতল পানি এসে উষ্ণ পানির সাথে এবং ক্রান্তীয় অঞ্চলের উষ্ণ পানি যেয়ে শীতল পানির সাথে মিশতে পারে না।
উত্তর মহাসাগর (Arctic Ocean): এ মহাসাগর সুমেরুর চারদিকে অবস্থিত। এর প্রায় সমস্ত অংশই সুমেরুবৃত্তের মধ্যে রয়েছে। এটি প্রায় বারো মাসই বরফে ঢাকা থাকে। এ অঞ্চল হতে বহু হিমশৈল ভাসতে ভাসতে দক্ষিণের উষ্ণতর সমুদ্রে প্রবেশ করে। এ মহাসাগরের মোট আয়তন প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। এর গড় গভীরতা ১,০৩৮ মিটার এবং সর্বাধিক গভীরতা ৫,৪৫০ মিটার।
দক্ষিণ মহাসাগর (Southern Ocean): এ মহাসাগরটি এন্টার্কটিকা মহাদেশের চারপাশ ঘিরে বৃত্তাকারে অবস্থিত। এর কিছু অংশ মেরুবৃত্তের ভিতর এবং সামান্য কিছু অংশ মেরুবৃত্তের বাইরে অবস্থিত। এটা প্রায় বারো মাসই বরফে ঢাকা থাকে। অনেক সময় এ মহাসাগর হতে হিমশৈল ভাসতে ভাসতে উষ্ণ মহাসাগরে প্রবেশ করে থাকে। আয়তনে এটি প্রায় ১ কোটি ৪৭ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। গড় গভীরতা ১৪৯ মিটার এবং সর্বাধিক গভীরতা ৫.৭৪ কিলোমিটার।
বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই
Read more