hsc

রাসায়নিক বিচূর্ণীভবন (পাঠ-১০)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

15

(Chemical Weathering)

শিলা বিভিন্ন খনিজের সংমিশ্রণে গঠিত। এ খনিজগুলোর ওপর বায়ুমণ্ডলের প্রধান উপাদানগুলো বিশেষত অক্সিজেন, কার্বন ডাইঅক্সাইড ও জলীয়বাষ্প বিক্রিয়া (reaction) করে। এর ফলে কঠিন শিলা বিয়োজিত হয় এবং খনিজগুলো নতুন গৌণ খনিজে পরিণত হয়ে সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এরূপে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় শিলার চূর্ণবিচূর্ণ হওয়াকে রাসায়নিক বিচূর্ণীভবন বলা হয়।

ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে বায়ুর আর্দ্রতার কারণে অধিক পরিমাণ রাসায়নিক বিচূর্ণীভবন দেখা যায়। রাসায়নিক বিচূর্ণীভবন নিম্নলিখিত প্রক্রিয়ায় সংঘটিত হয়-

১. দ্রবণ (Solution): খুব অল্প সংখ্যক শিলা গঠনকারী খনিজ পানিতে দ্রবণীয় বলে দ্রবণ সরাসরি বিচূর্ণীভবন করে না। তবে এটি রাসায়নিক বিচূর্ণীভবনে গঠিত বিভিন্ন দ্রব্যকে পানিতে দ্রবীভূত করে অপসারণ করে এবং পরোক্ষভাবে বিচূর্ণীভবনে একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

উদাহরণ: ক্যালসিয়াম কার্বনেট (CaCO3) যখন ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেটে পরিণত হয় তখন তা পানিতে দ্রবীভূত হয়ে অপসারিত হয়।

২. জারণ (Oxidation): বিভিন্ন শিলার মধ্যে লৌহ জাতীয় খনিজ পদার্থ থাকলে এবং তা অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসলে তাতে ধীরে ধীরে আয়রন অক্সাইড (Iron-oxide) সৃষ্টি হয়। অক্সিজেনের প্রভাবে শিলারাশির এ প্রকার বিচূর্ণীভবনকে জারণ বলে।

উদাহরণ: সাধারণত দেখা যায় লৌহ নির্মিত দ্রব্য মরিচা ধরে সহজেই নষ্ট হয়ে যায়। কারণ বাতাসের অক্সিজেন লৌহের
সাথে যুক্ত হয়ে হলুদ বা বাদামি রঙের লিমোনাইট (2Fe2O3.3H2O) গঠন করে এবং সহজেই তা ভেঙে যায়।

4FeO + 2H2O + O2 2Fe2O3.2H2O

(ফেরাস অক্সাইড + পানি + অক্সিজেন লিমোনাইট)

৩. জলযোজন (Hydration): রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পানিযুক্ত হয়ে খনিজের যে পরিবর্তন ঘটে তাকে জলযোজন (Hydration) বলে। কিছু খনিজ বায়ু হতে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পানি গ্রহণ করে আকারে বৃদ্ধি লাভ করে। এর ফলে শিলার ভেতর টানের সৃষ্টি হয় এবং শিলা সহজেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়। এছাড়া জলযোজনের ফলে খনিজের আয়তন ও ছিদ্রতলের পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে শিলাস্তরের বিয়োজন সহজ হয়।

উদাহরণ: এ প্রক্রিয়ায় অ্যানহাইড্রাইটের (CaSO4) সাথে পানিযুক্ত হয়ে জিপসাম গঠিত হয়।

CaSO4 + 2H2O CaSO4.2H2O

(অ্যানহাইড্রাইট) (পানি) (জিপসাম)

এরূপ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় খনিজের মধ্যে পানি ঢুকলে খনিজের পরিবর্তন ঘটে এবং তা আয়তনে বৃদ্ধি পায়।

৪. অঙ্গারযোজন (Carbonation) : বিভিন্ন খনিজের সাথে কার্বন ডাইঅক্সাইডের রাসায়নিক সংযোগকে কার্বনেশন বা অঙ্গারযোজন বলে। বৃষ্টির পানি বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে পড়ার সময় বায়ুমণ্ডলস্থিত কার্বন ডাইঅক্সাইডের সাথে মিশ্রিত হয়ে এসিডে পরিণত হয়।

H2O + CO2  H2CO3

(পানি) + (কার্বন ডাইঅক্সাইড) → (কার্বনিক এসিড)

উদাহরণ: চুনাপাথর ক্যালসিয়াম কার্বনেট দ্বারা গঠিত।

৫. হাইড্রোলাইসিস (Hydrolysis): হাইড্রোলাইসিস পদ্ধতিতে পানি ভেঙে হাইড্রোজেন (H+) ও হাইড্রোক্সিল (OH-) আয়নে পরিণত হয়। এ হাইড্রোক্সিল আয়ন খনিজের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটায়।

উদাহরণ: আগ্নেয় শিলায় প্রাপ্ত দুটি প্রধান খনিজ ফেলসপার ও অভ্রের রাসায়নিক পরিবর্তন প্রধানত এ প্রক্রিয়ায় হয়।

জৈবিক বিচূর্ণীভবন (Biological Weathering)

জৈবিক বিচূর্ণীভবন প্রকৃতপক্ষে উদ্ভিদ ও প্রাণীর সংঘটিত ভৌত ও রাসায়নিক ক্ষয়ীভবন।
মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ, বৃক্ষলতাদি প্রতিনিয়ত ভূপৃষ্ঠের ক্ষয়সাধন ও পরিবর্তন সাধন করছে। নানা প্রকার প্রাণী ও উদ্ভিদের ক্রিয়ার দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় বলে এ প্রক্রিয়াকে জৈবিক বিচূর্ণীভবন বলে। এটি তিন ভাবে সংঘটিত হয়। যথা-

১. উদ্ভিদের কাজ : ভূপৃষ্ঠের ক্ষয়সাধনে উদ্ভিদ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন প্রকার গাছপালা মূল ও শিকড় দ্বারা
মাটিকে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে। গাছের মূল বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মোটা হয়ে মাটির নিচে বহুদূর পর্যন্ত চলে যায়। ফলে শিলার ফাটলও বড় হয় এবং ঐ সমস্ত ফাটলে পানি প্রবেশ করলে সেখানকার শিলাস্তর দুর্বল হয় ও গলে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এছাড়া মস, শৈবাল প্রভৃতি নানা প্রকার ক্ষুদ্র উদ্ভিদের দ্বারা শিলার উপরিভাগে পানি আটকে থাকে। এ সকল উদ্ভিদের দেহ পানি ও উত্তাপের সংযোগে পচে যায়। একে হিউমাস বলে। এ হিউমাস বৃষ্টির পানি পেলেই জৈব 'এসিডে পরিণত হয়ে শিলাকে সহজেই ক্ষয় করে দেয়।

২. জীবজন্তুর কাজ: কেঁচো, ছুঁচো, পিঁপড়া, শিয়াল, কুকুর প্রভৃতি সর্বদা মাটি খুঁড়ে শিলারাশিকে চূর্ণবিচূর্ণ করে। এছাড়া উইপোকা, সজারু, ইঁদুর ইত্যাদিও গর্ত করে ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তর হতে মাটি তোলে। এছাড়া মৃত্তিকার অণুজীবসমূহ শিলার প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক বিচূর্ণীভবনে যথেষ্ট সক্রিয় হয়। এভাবে জীবজন্তু ও কীটপতঙ্গ দ্বারা ভূত্বক চূর্ণবিচূর্ণ হচ্ছে।

৩. মানুষের কাজ: নানাবিধ গঠনমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মানুষ ভূপৃষ্ঠের ব্যাপক ক্ষয়সাধন করছে। যেমন-রাস্তাঘাট, খাল, গৃহ, শহর বন্দর প্রভৃতি নির্মাণ করার জন্য মানুষ সর্বদা ভূত্বক খণ্ড-বিখণ্ড করছে। এভাবে মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জৈবিক বিচুণীভবনে সহায়তা করছে।

নগ্নীভবন (Denudation)

নগ্নীভবন অর্থ উন্মুক্ত করা। ভূঅভ্যন্তরস্থ শক্তি ভূত্বকে বিভিন্ন ধরনের ভূমিরূপ গড়ে তোলে। অপরদিকে, নগ্নীভবন এ সমস্ত ভূমিরূপকে ক্ষয় করে সমুদ্র সমতলে নিয়ে আসার কাজে লিপ্ত থাকে এবং ভূত্বকের ক্ষয় সাধনের মাধ্যমে ভূমির উচ্চতা কমায়। তাই সাধারণভাবে বলা যায়, যে প্রক্রিয়ায় ভূপৃষ্ঠের শিলা চূর্ণবিচূর্ণ হয় এবং ক্ষয়প্রাপ্ত শিলা অন্যত্র অপসারিত হয় তাই নগ্নীভবন। নগ্নীভবন চার ধরনের প্রক্রিয়ায় কাজ করে। যথা: (ক) বিচূর্ণীভবন, (খ) স্তূপ অপসারণ, (গ) ক্ষয়সাধন ও (ঘ) পরিবহন।

ক. বিচূর্ণীভবন: নগ্নীভবনের যে চারটি প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে তন্মধ্যে বিচূর্ণীভবন শিলার ক্ষয়সাধনে প্রথম পর্যায় হিসেবে কাজ করে। বিচূর্ণীভবনের ফলে ভূত্বকের উপরিস্তরের শিলা ভেঙেচুরে শিথিল হয়ে পড়ে। কিন্তু অপসারিত হয় না। এটি একটি স্থির প্রক্রিয়া।

খ. স্তূপ অপসারণ: বিচূর্ণীত শিলা উচ্চ ঢালে অবস্থিত হলে তা অবশ্যই মাধ্যাকর্ষণের টানে নিম্নঢালে নেমে আসবে। শিলার এ নিম্নঢাল অভিমুখী যাত্রাকে স্তূপ অপসারণ বলে। বিচূর্ণীত শিলার কিয়দংশ পানি বা বায়ুর মাধ্যমে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়। এটি চলমান প্রক্রিয়া।

গ. ক্ষয়সাধন: বিচূর্ণীভবনের সময় ভূত্বকের উপরিস্তরের শিলা ভেঙেচুরে প্রস্তরখণ্ড, কঙ্কর, নুড়ি, বালুকা ও কাদা প্রভৃতিতে পরিণত হয়। কিন্তু অপসৃত হয় না। এদের শিলাবরণী বলা হয়। এসব আলগা পদার্থ নানাবিধ প্রাকৃতিক শক্তির দ্বারা অপসারিত হলে তাকে ক্ষয়ীভবন বলে। যে সব প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে ক্ষয়ীভবন সংঘটিত হয় তাদের মধ্যে বায়ু, বৃষ্টিপাত, হিমবাহ এবং সমুদ্রতরঙ্গ প্রভৃতি প্রধান।

ঘ. পরিবহন: নগ্নীভবনের চারটি প্রক্রিয়ার মধ্যে সর্বশেষ প্রক্রিয়াটি হলো পরিবহন। বিচূর্ণীভূত পদার্থসমূহ ক্ষয়সাধিত হয়ে পরিবাহিত হলে নিচের অবিকৃত শিলা দৃষ্টিগোচর বা নগ্ন হয়। বিচূণীভূত শিলা বায়ু, বৃষ্টিপাত, হিমবাহ, সমুদ্রতরঙ্গ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা অপসারিত হয়।

ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...