(Bottom Topography of the Pacific Ocean)
প্রশান্ত মহাসাগর পৃথিবীর বৃহত্তম মহাসাগর। এর মোট আয়তন প্রায় ১৬.৬ কোটি বর্গ কিলোমিটার; অর্থাৎ সমগ্র পানিরাশির ৪৬% এবং সমগ্র ভূপৃষ্ঠের ৩২%। এর শীর্ষদেশ বেরিং প্রণালি হতে ক্রমশই দক্ষিণ দিকে সর্বাধিক বিস্তৃতি লাভ করেছে এবং নিরক্ষরেখার নিকট এটি সর্বাধিক প্রশস্ত। উত্তর-দক্ষিণে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪,৯৬২ কিলোমিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তার ১৬,০৮৯ কিলোমিটার। অর্থাৎ উত্তর-দক্ষিণ সীমার দূরত্ব পূর্ব-পশ্চিম সীমার চেয়ে সামান্য কম। এর আকৃতি বৃহদাকার ত্রিভুজের ন্যায়। এ মহাসাগরের পূর্ব দিকে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং পশ্চিমে এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও এন্টার্কটিকা মহাদেশ অবস্থিত।
প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ: প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ অন্যান্য মহাসাগরের তলদেশ অপেক্ষা বেশি গভীর। এ মহাসাগরের অধিকাংশই গভীর সমুদ্রের সমভূমি (deep sea plains) অঞ্চল নিয়ে গঠিত। এর গভীরতা গড়ে ৭.২৪ কিলোমিটার (৪,০০০ ফ্যাদম)। এ মহাসাগরের শতকরা প্রায় ৭৮ ভাগ স্থানের গভীরতা ৩.৬৫ কিলোমিটারের বেশি।
মহীসোপান ও মহীঢাল: অন্যান্য মহাসাগরের তুলনায় প্রশান্ত মহাসাগরের মহীসোপান খুবই কম। এর পশ্চিম উপকূলের নিকটবর্তী ওখটস্ক সাগর, পীত সাগর, পূর্ব চীন সাগর প্রভৃতি মহীসোপানের অন্তর্গত। এশিয়ার উপকূলবর্তী এ সাগরগুলো বাদে সমগ্র প্রশান্ত মহাসাগরের চতুর্দিকে মহীসোপান খুবই অপ্রশস্ত। কারণ কোনো কোনো স্থানে সমুদ্রের তীরস্থ অংশ খাড়াভাবে গভীর সমুদ্রে প্রবেশ করেছে। এ মহাসাগরের পূর্ব তীর বরাবর উত্তর-দক্ষিণে রকি ও আন্দিজ পর্বতশ্রেণি থাকায় সেখানকার উপকূল মহীসোপানবিহীন। অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব প্রান্তে উচ্চভূমি থাকায় সেখানকার উপকূলেও কোনো মহীসোপান গড়ে ওঠেনি। মহীসোপান কম থাকায় এ মহাসাগরে মহীঢালের পরিমাণই বেশি।
তলদেশের উচ্চভূমিসমূহ: প্রশান্ত মহাসাগরের উচ্চভূমির মধ্যে কতিপয় মালভূমি ও শৈলশিরা এবং ছোট-বড় অসংখ্য দ্বীপ রয়েছে। যেমন-
মালভূমি: প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে কয়েকটি মালভূমি রয়েছে। কোনো কোনো স্থানে এ মালভূমি এত উঁচু যে, এদের উপরিভাগে পানির গভীরতা মাত্র ১৮০ মিটার। এ মালভূমিগুলোর মধ্যে বিখ্যাত মালভূমি হলো অ্যালবাট্রস মালভূমি (albatross plateau)। এটি প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব প্রান্তে ক্যালিফোর্নিয়া উপদ্বীপের দক্ষিণ সীমা হতে দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডর পর্যন্ত বিস্তৃত। চিলির পশ্চিম দিকে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত মালভূমিকে দক্ষিণ-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় মালভূমি বলা হয়।

শৈলশিরা: প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ সীমায় এন্টার্কটিকা মহাদেশের মধ্যে সুউচ্চ প্যাসিফিক এন্টার্কটিকা শৈলশিরা অবস্থিত। এ শৈলশিরা অ্যালবাট্রস মালভূমি ও দক্ষিণ-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় মালভূমির সাথে উচ্চ অংশ দিয়ে সংযুক্ত। এটি মূল প্রশান্ত মহাসাগরীয় তলদেশকে দক্ষিণ আমেরিকা ও এন্টার্কটিকা হতে পৃথক করে রেখেছে। এ শৈলশিরা নিরক্ষরেখার দক্ষিণ দিয়ে পশ্চিম দিকে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত।
এ মহাসাগরের সমগ্র পশ্চিম প্রান্ত ব্যাপী একটি অপ্রশস্ত ও সুদীর্ঘ শৈলশিরা জাপান হতে দক্ষিণ দিকে অস্ট্রেলিয়ার পূর্বপ্রান্ত ও নিউজিল্যান্ড হয়ে দক্ষিণ মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। অবশ্য এ শৈলশিরাটি কয়েকটি স্থানে বিচ্ছিন্ন।
দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জ : প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে পাত সীমানা বরাবর ভূঅভ্যন্তরস্থ লাভা নির্গত হয়ে ছোট-বড় অসংখ্য দ্বীপ
বৃত্তচাপের আকৃতি গঠন করে আগ্নেয় দ্বীপবলয় সৃষ্টি করেছে। অ্যালিউসিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, কিউরাউল দ্বীপপুঞ্জ, জাপান দ্বীপপুঞ্জ, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ, ইন্দোনেশিয়ান দ্বীপপুঞ্জ ইত্যাদি দ্বীপমালাগুলো এশিয়া পাতের আঘাতে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে উত্তল আকৃতিযুক্ত হয়েছে। এ মহাসাগরের প্রায় সব দ্বীপ ও দ্বীপপুঞ্জ আগ্নেয় দ্বীপের অন্তর্গত হলেও মহাসাগরীয় পাতের কিছু অংশ সংঘর্ষের ফলে বর্তমানে মহাদেশ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে দ্বীপের আকার ধারণ করে এ মহাসাগরে অবস্থান করছে। অ্যালিউসিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, চিলির দ্বীপপুঞ্জ, জাপান দ্বীপপুঞ্জ ইত্যাদি এ ধরনের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এছাড়া প্রবাল কীটের দেহাবশেষ সঞ্চিত হয়ে প্রবাল দ্বীপের সৃষ্টি হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার আশপাশে এ জাতীয় অনেকগুলো দ্বীপ রয়েছে।

গভীর খাত: প্রশান্ত মহাসাগরের প্রান্তদেশে বহুসংখ্যক সুদীর্ঘ গভীর সমুদ্রখাত এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ গভীর সমুদ্রখাতগুলোর অধিকাংশই ভূপৃষ্ঠের উচ্চ আগ্নেয় পর্বতের নিকটতম স্থানে অবস্থিত। কোনো কোনো স্থানে সমুদ্রখাতগুলো আগ্নেয় পর্বতসমূহের সাথে সমান্তরালভাবে অবস্থিত। কারণ পাত সীমানা বরাবর পাতগুলোর মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলেই খাতগুলোর সৃষ্টি হয়েছে। এ সকল গভীর সমুদ্রখাত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্তেই অধিক দেখতে পাওয়া যায়। এ সকল গভীর সমুদ্রখাতের মধ্যে গুয়াম দ্বীপের ৩২২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ম্যারিয়ানা খাত (mariana trench) সর্বাপেক্ষা গভীর। এর গভীরতা ১০.৮৬ কিলোমিটার (৫,৯৪০ ফ্যাদম) এবং এটাই পৃথিবীর গভীরতম খাত। এর দক্ষিণ-পূর্বে চ্যালেঞ্জার ডিপের অবস্থান (challenger deep), যা পৃথিবীর গভীরতম স্থান। অন্যান্য খাতগুলোর মধ্যে ফিলিপাইনের উত্তর-পূর্বে এমডেন খাত (১০৭৯৪ মিটার বা ৫,৯০২ ফ্যাদম), ফিলিপাইনের দক্ষিণ-পূর্বে মিন্ডানাও দ্বীপের পার্শ্বে মিন্ডানাও খাত (১০৭৯০ মিটার বা ৫,৯০০ ফ্যাদম), জাপানের দক্ষিণ-পূর্বে জাপান খাত (১০৫৫৪ মিটার বা ৫,৭৭১ ফ্যাদম), কিউরাইল দ্বীপপুঞ্জের পূর্বে কিউরাইল বা টাস্কারোবা খাত (৮,৫১৮ মিটার) এবং আরও উত্তরে অ্যালিউসিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণে অ্যালিউসিয়ান খাত (৯,১৪৮ মিটার) অবস্থিত। এ সকল খাত এশিয়ার পূর্ব উপকূলে অনেকটা সারিবদ্ধভাবে অবস্থিত। এছাড়া দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের নিউজিল্যান্ডের উত্তর-পূর্বে কারমাডেক দ্বীপের নিকট কারমাডেক খাত (৯,৪২৪ মিটার) বা এর উত্তরে টোঙ্গা দ্বীপপুঞ্জের পার্শ্বে টোঙ্গা খাত (৮,৭০৯ মিটার) এবং আরও উত্তরে ফনিক্স দ্বীপের নিকট ফনিক্স খাত অবস্থিত।
এ মহাসাগরের পূর্ব দিকে খাতের সংখ্যা কম এবং তাদের গভীরতাও কম। পূর্ব প্রান্তে দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের নিকটে কেবল আতাকামা খাত (৭৬৪০ মিটার বা ৪,১৭৭ ফ্যাদম) উল্লেখযোগ্য। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণেও ক্ষুদ্রাকৃতি কয়েকটি খাত রয়েছে। এ মহাসাগরের সব কয়টি খাত পাত সীমানা বরাবর সংকীর্ণ অবস্থায় লম্বালম্বিভাবে অবস্থিত।
প্রান্তদেশীয় সাগরসমূহ: প্রশান্ত মহাসাগরের প্রান্তভাগে অবস্থিত কতকগুলো সাগর প্রধান জলরাশি হতে বিচ্ছিন্ন। এ বিচ্ছিন্ন সাগরগুলো মহাসাগরের পশ্চিম সীমায়, এশিয়া মহাদেশে ও তৎসংলগ্ন দ্বীপমালার মধ্যবর্তী এলাকায়ই বেশি দেখা যায়। এ সকল সাগরের মধ্যে বেরিং সাগর, ওখটস্ক সাগর, জাপান সাগর, পীত সাগর, পূর্ব চীন সাগর, দক্ষিণ চীন সাগর ও শ্যাম উপসাগর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ সকল সাগরের গভীরতা ২,৪৩৮ মিটার থেকে প্রায় ২,৭৪৩ মিটার। তবে পীত সাগরের গভীরতা অনেক কম। পূর্ব উপকূলে সাগর নেই বললেই চলে। কেবল দক্ষিণে ক্যালিফোর্নিয়া উপসাগরই দেখা যায়। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব দিকে পাপুয়া উপসাগর ও কোরাল সাগর অবস্থিত।
বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই
Read more