hsc

পাঠ-১৯: বাংলাদেশে জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির প্রভাব

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

8

(Effects of Fast population growth in Bangladesh)

বাংলাদেশে জনসংখ্যার অন্যতম সমস্যা হলো দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি। ১৯৯১ সালে আদমশুমারি রিপোর্ট ছিল ২.১৭ ভাগ। বর্তমানে এই বৃদ্ধির হার ১.৩৭% (সূত্র- বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো- ২০১৯)। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার পূর্বের তুলনায় হ্রাস পেলেও এর প্রভাব পড়ছে আমাদের বাসস্থান, আবাদি জমি, খাদ্যশস্য ও যাতায়াত ব্যবস্থা ইত্যাদির ওপর। তবে অধিক জনসংখ্যা একটি দেশের জন্য আর্শীবাদ হতে পারে যখন তা অন্য দেশে রপ্তানি করা হয়। নিম্নে জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির প্রভাব আলোচনা করা হলো:

১. বাসস্থানের ওপর প্রভাব: বাংলাদেশে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বাসস্থানের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে।
World Population Review-2018-র রিপোর্ট অনুসারে বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কি.মি. এ ১২৭৮ জন। সুতরাং, এই বিপুল জনসংখ্যা এত ক্ষুদ্র দেশে বসবাস করতে বহু সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। গ্রাম থেকে মানুষ শহরের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ফলে শহরে জনসংখ্যার বাসস্থান সংকুলান সম্ভব না হওয়ায় ঘর বাড়ি আনুভূমিকভাবে গড়ে না ওঠে উল্লম্ব (vertical) ভাবে গড়ে উঠছে। শহরে অধিক জনসংখ্যার কারণে বেশি মাত্রায় বস্তি সৃষ্টি হচ্ছে যা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান শহরগুলো যেমন ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ইত্যাদি শহরগুলোতে বাসস্থানগুলো উল্লম্বভাবে গড়ে উঠছে। অন্যদিকে, গ্রামাঞ্চলেও জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির কারণে দিন দিন ঘর বাড়ির দূরত্ব কমে আসছে। অর্থাৎ পুঞ্জিভূত বাসস্থান সৃষ্টি হচ্ছে।

২. আবাদি জমির ওপর প্রভাব: বাংলাদেশে জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে আবাদি জমির ওপর। গ্রামাঞ্চলে পূর্বে একটি পরিবারের জন্য যে পরিমাণ জমির ফসলে চাহিদা মিটতো বর্তমানে সেই একই পরিবারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে উক্ত জমি বণ্টনের ফলে খন্ড-বিখন্ড হয়ে গেছে। ফলে ফসলের উৎপাদনও হ্রাস পেয়েছে।

৩. খাদ্যশস্যের ওপর প্রভাব: কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে খাদ্য সমস্যা বিদ্যমান। খাদ্য ঘাটতি পূরণের জন্য বাংলাদেশকে প্রতি বছর বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দেশের খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের কৃষিতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির শতকরা হার ৪৮.৪% [সূত্র: জাতীয় তথ্য বাস্তবায়ন www.bdgov.com]। অথচ এই বিপুল শ্রমশক্তির অদক্ষতা ও অজ্ঞতার কারণে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব হচ্ছে না। আবাদি জমির পরিমাণ হ্রাসও খাদ্যশস্য উৎপাদন হ্রাসের একটি কারণ। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি তুলনামূলক অনেক কম। এর প্রভাবে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়।

৪. যাতায়াত ব্যবস্থার ওপর প্রভাব: বাংলাদেশে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি যাতায়াত ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করে।
বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও নগরায়ণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও উন্নত হচ্ছে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে যাতায়াত ব্যবস্থা অর্থাৎ সড়ক, রেলপথ, নৌপথ ও আকাশপথের ওপর প্রচুর চাপ পড়ছে। স্বাধীনতার পর থেকে সড়ক পথের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। কিন্তু জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপের কারণে সড়ক দুর্ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি বছর নৌ পথে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই এর কারণে লঞ্চ ডুবির মতো বড় বড় দুর্ঘটনায় প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছে। ১৯৪৭ সালে বাংলাদেশ অংশে মোট রেলপথের পরিমাণ ছিল ২,৭০৬ কিলোমিটার। ২০১৮ সাল নাগাদ তা বৃদ্ধি পেয়ে ২৮৭৭.১০ কি.মি. এ দাঁড়ায়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে রেলপথের সুব্যবস্থাও অনেক সময় দুর্ভোগ ডেকে আনে। অর্থাৎ অতিরিক্ত যাত্রীদের কারণে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।
দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি যেকোনো দেশের খাদ্যশস্য, বাসস্থান, আবাদি জমি ও যাতায়াত ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। বাংলাদেশেও দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বাসস্থানের সমস্যা, আবাদি জমির পরিমাণ হ্রাস, খাদ্যশস্য ঘাটতি, যাতায়াত ব্যবস্থায় দুর্ঘটনা ইত্যাদি প্রভাব পড়ছে। সর্বোপরি বলা যায়, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি একটি দেশের জন্য কখনই মঙ্গলকর নয়।

দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...