(Biodiversity of the World)
জীববৈচিত্র্য বা Biodiversity পরিভাষাটির উদ্ভব হয়েছে biological ও diversity শব্দদ্বয়ের মিশ্রণে। ১৯৮৬ সালে ডব্লিউ. রোজেন (W. Rasen) সর্বপ্রথম Biodiversity শব্দের প্রবর্তন করেন। জল, স্থল ও অন্তরীক্ষে বসবাসরত জীবসমূহের মধ্যে বিভিন্নতাকেই জীববৈচিত্র্য বলা হয়। জীববৈচিত্র্য বলতে শুধু প্রজাতিগত বিভিন্নতাকেই বোঝায় না বরং ভূপৃষ্ঠে বসবাসকারী সকল প্রকার জীবের মধ্যে বিরাজমান জিনগত ও পারিবেশিক বিভিন্নতাকেও বোঝায়। বাস্তুতন্ত্রের প্রতিটি জড় ও জীব উপাদান একটি অপরটির সাথে এমন নিবিড়ভাবে জড়িত যে, একটির সামান্য পরিবর্তন হলে অন্যগুলোতেও তার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এমনকি একটি জড় উপাদানের পরিবর্তনও সমস্ত জীব উপাদানকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তাছাড়া জীব উপাদানসমূহ একটি অপরটির উপর এমনভাবে নির্ভরশীল যে, একটির ধ্বংস সাধন হলে অপরটির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। সুতরাং সহজ কথায় বলা যায়, 'ভূপৃষ্ঠে বসবাসকারী সকল প্রকার জীবের মধ্যে বিদ্যমান প্রজাতিগত, জিনগত ও বাস্তুতান্ত্রিক বিভিন্নতাকে সম্মিলিতভাবে জীববৈচিত্র্য বলে'।
জীববৈচিত্র্যে স্থানিক ভিন্নতা (Spatial Variations in Biodiversity)
পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে জীববৈচিত্র্য বিভিন্ন রকমের হয়। কোনো এলাকা জীববৈচিত্র্যে খুবই সমৃদ্ধ আবার কোনো কোনো এলাকায় জীববৈচিত্র্য খুবই অল্প। নিচে জীববৈচিত্র্যের স্থানিক ভিন্নতার কারণ তুলে ধরা হলো:
১. ভৌগোলিক অবস্থা (Geographic condition): কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানের ভৌগোলিক অবস্থার ওপর ঐ স্থানের জীববৈচিত্র্য নির্ভর করে। সাধারণত নদী ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আর্দ্র আবহাওয়ায় পর্যাপ্ত পরিমাণ বনভূমি গড়ে উঠে। তাই এসব স্থানের জীববৈচিত্র্য খুবই সমৃদ্ধ হয়। অন্যদিকে, ঠাণ্ডা আবহাওয়া, তুষারপাত ও বরফাচ্ছন্ন অঞ্চলে জীববৈচিত্র্য তেমন সমৃদ্ধ হয় না। এসব স্থানে খুবই কম জীববৈচিত্র্য দেখা যায়। পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ কয়েকটি অঞ্চল নিম্নরূপ-
বাংলাদেশ; শ্রীলঙ্কা; পূর্ব হিমালয়; মালয়েশিয়ান পেনিনসুলা; মাদাগাস্কার; হাওয়াই দ্বীপ; দক্ষিণ-পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া; তানজানিয়া; কেন্দ্রীয় চিলি অঞ্চল; পশ্চিম আমাজানের উঁচুভূমি; ক্যালিফোর্নিয়ার উদ্ভিদ সমৃদ্ধ অঞ্চল ও ভারতীয় উপ-অঞ্চল।
২. ভৌগোলিক সীমানা ও আয়তন (Geographic extent and area): পৃথিবীর যেকোনো বিশেষ এলাকার সীমানা ও আয়তন সেখানকার জীববৈচিত্র্যকে প্রভাবিত করে থাকে। যেমন- একই বৈশিষ্ট্যের আবাস হলেও দ্বীপ বা ক্ষুদ্র অঞ্চলের তুলনায় বৃহত্তর এলাকাগুলোতে বেশি সংখ্যক প্রজাতির জীব বৃদ্ধি পায়। অপরপক্ষে, দ্বীপসমূহে বেশি সংখ্যক নিজস্ব ফ্লোরা (flora) বা ফনা (fauna) দেখা যায়। এ রকমের জীবকে Endemic জীব বলে। এদেরকে সহজে অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। যেমন- বোস্তামী কচ্ছপ, চিত্রিত ঘড়িয়াল প্রভৃতি সরীসৃপ, মনিপুরী কোয়েল, ছোট ফ্লুরিক্যান প্রভৃতি পাখি, কালো বানর, সিংহলেজী বানর, ওরাংওটাং, কালো ভল্লুক, গাঙ্গেয় ডলফিন প্রভৃতি স্তন্যপায়ী প্রাণী ওরিয়েন্টাল বা প্রাচ্যদেশীয় ভৌগোলিক অঞ্চলের Endemic প্রাণী। এই প্রাণীগুলোকে পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না।

৩. জলবায়ু (Climate): জলবায়ু কোনো ভৌগোলিক এলাকার জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে। সাধারণভাবে আর্দ্র ও উষ্ণমণ্ডলীয় এলাকাগুলোতে অধিক জীববৈচিত্র্য দেখা যায়। এসব এলাকায় বেশি বৃষ্টিপাত ও উষ্ণ আবহাওয়া জীববৈচিত্র্যের জন্য বিশেষ সহায়ক। তুলনামূলকভাবে যেসব এলাকায় অল্প পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয় ও জলবায়ু শুষ্ক ও শীতল সেখানে জীববৈচিত্র্য খুব অল্প দেখা যায়।
জীবমণ্ডল - তাপস কুমার মজুমদার স্যার এর লেখা বই
Read more