(Bottom Topography of the Ocean)
মহাসাগর হচ্ছে পৃথিবীর কঠিন ভূত্বকের ওপর লবণাক্ত পানিপূর্ণ খাত। সমুদ্রখাতের তলদেশেও স্থলভাগের ভূপ্রকৃতির মতোই উঁচু-নিচু, পাহাড়, পর্বত ঘেরা অসমতল পৃষ্ঠ বিদ্যমান। সাধারণত সমুদ্রখাতের মধ্যস্থান বরাবর মধ্য সামুদ্রিক শৈলশিরা (mid oceanic ridge), যথেষ্ট সংখ্যক বিস্তৃত খাড়া ঢালযুক্ত উঁচু চ্যুতি (fracture zone), গভীর ও সংকীর্ণ গিরিখাত প্রভৃতি পরিলক্ষিত হয়। সমুদ্র তলদেশের ভূমিরূপগুলোর বৈশিষ্ট্যের মধ্যে মিল থাকলেও প্রত্যেকটি মহাসাগরের তলদেশের ভূমিরূপের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

মহীসোপান (Continental shelf): মহাদেশ ও মহাসাগরের সংযোগস্থল থেকে সাগরের দিকে ক্রমশ নিমজ্জিত মহাদেশের অংশই হচ্ছে মহীসোপান। এ অগভীর অংশটিকে মহাদেশের স্থলভাগের নিমজ্জিত অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি সমুদ্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এ অঞ্চলের গড় প্রশস্ততা প্রায় ৬৫ কি.মি. (৪০ মাইল)। এ অগভীর অঞ্চল সাধারণত ১৩০ মিটারের (৪৩০ ফুট) কম গভীর এবং সমুদ্রের দিকে ক্রমশ ঢালু।

মহীসোপানের বৈশিষ্ট্য সাধারণত পার্শ্ববর্তী স্থলভাগের ভূপ্রকৃতি ও গঠনের ওপর নির্ভর করে। স্থলভাগের উপকূলবর্তী অঞ্চল থেকে আরম্ভ করে অভ্যন্তরে বিস্তীর্ণ অঞ্চল সমতল ও প্লাবন ভূমি হলে সংলগ্ন মহীসোপান অঞ্চলও অত্যন্ত প্রশস্ত ও অল্প ঢালযুক্ত হয়। অন্যদিকে, সমুদ্র উপকূলভাগের ভূপ্রকৃতি পার্বত্যময় ও খাড়া ঢালযুক্ত হলে মহীসোপান সরু প্রকৃতির হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, বঙ্গোপসাগরের উত্তর দিকের বাংলাদেশ সংলগ্ন মহীসোপান প্রথমোক্ত কারণের জন্য বেশ প্রশস্ত। অপরদিকে, দ্বিতীয় কারণের জন্য ভারতের পূর্ব উপকূলে বঙ্গোপসাগরের মহীসোপান অত্যন্ত খাড়া ঢালযুক্ত ও অপ্রশস্ত।
মহীঢাল (Continental slope): মহীসোপানের শেষপ্রান্ত থেকেই আরম্ভ হয় মহীঢাল। সমুদ্রের গভীরতা এখানে হঠাৎ
করে বৃদ্ধি পায় এবং এখানে ঢালের বৃদ্ধির হারের পরিমাণ পূর্বের অগভীর অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। মহীসোপান ও মহীঢাল উভয়কে এক সাথে মহীপ্রান্ত (continental margin) বলা হয়, যা গঠনগত দিক থেকে মহাদেশেরই অংশ। মহাদেশগুলোর স্থলভাগ ও পানিতে নিমজ্জিত মহাদেশের অংশ একত্রে পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রায় শতকরা ৪৪ ভাগ। মহীঢাল মহাদেশীয় ভূভাগের শেষপ্রান্ত।
মহীস্ফীতি (Continental rise) কী?
মহীঢালের শেষপ্রান্তে মহাদেশের ভূভাগ থেকে বাহিত বিপুল পরিমাণ ক্ষয়প্রাপ্ত পদার্থ জমা হয়; এর অপেক্ষাকৃত উচ্চ স্থানটি মহীস্ফীতি নামে পরিচিত। এ পুরু পলি সঞ্চিত অঞ্চলটি মহাদেশ ও সমুদ্র খাতের মধ্যবর্তী অবস্থান্তর অঞ্চল (Transitional Zone)।
গভীর সমুদ্রের পাতাল সমভূমি ও পাহাড় (Deep Oceanic Abyssal plains and hills): মহীঢালের শেষপ্রান্তে বৈচিত্র্যহীন প্রায় সমভূমির আস্তরণ মৃদু ঢালবিশিষ্ট হয়ে সমুদ্রের দিকে প্রসারিত। এই সমপ্রায় ভূমির সৃষ্টি হয়েছে নিকটবর্তী মহাদেশ হতে আনীত পলি থেকে। সামুদ্রিক ক্যানিয়ন থেকে টারবিডিটি স্রোতের মাধ্যমে বাহিত হয়ে সমুদ্রের তলদেশে জমা হয়ে যে পুরু তলানি স্তরের সৃষ্টি হয় তাকে মহীস্ফীতি (continental rise) বলা হয়। অধিকাংশ সময়ে পলির স্তর এত পুরু যে তলদেশের বন্ধুরতা সম্পূর্ণ ঢেকে দিয়ে প্রায় বৈচিত্র্যহীন তলদেশের সৃষ্টি করে, যা গভীর সমুদ্রের পাতাল সমভূমি (abyssal plain) হিসেবে পরিচিত। গভীর সমুদ্রের তলদেশের অধিকাংশ এলাকাই গভীর সমুদ্রের সমভূমির অন্তর্ভুক্ত। বিরাট অঞ্চল জুড়ে প্রায় সমতল থালার মতো ও প্রায়ই মহাদেশের সন্নিকটে অবস্থিত সমুদ্র তলদেশকে গভীর সমুদ্রের সমভূমি বলে। এটি পৃথিবীপৃষ্ঠের সবচেয়ে সমতল এলাকা। মহাদেশের সবচেয়ে সমতল অংশের তুলনায় এখানে ঢালের পরিমাণ ১০০০ ভাগের ১ ভাগের চেয়েও কম। গভীর সমুদ্রের সমভূমি সাধারণত গভীর সমুদ্র পাখা (deep sea fan) এর প্রান্তে দেখা যায়, যা মহীস্ফীতি তৈরি করে। গভীর সমুদ্রের সমভূমি প্রান্তীয় সাগরসমূহে যেমন- মেক্সিকো উপসাগর, ক্যারিবিয়ান সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের চারদিকের প্রান্তে বহু ক্ষুদ্র সামুদ্রিক খাতে বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। গভীর সমুদ্রের তলদেশ (৪০০০ মিটার বা ১৩,০০০ ফুটের চেয়েও অধিক গভীর) পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রায় শতকরা ২৯.৫ ভাগ অঞ্চল জুড়ে রয়েছে। গভীর সমুদ্রখাত সাধারণত ৪০০০ থেকে ৬০০০ মিটার (২.৫ থেকে ৩.৫ মাইল) গভীর। গভীর সমুদ্রের নিম্ন পাতাল পাহাড় (low abyssal hills) যা পার্শ্ববর্তী সমুদ্র তলদেশের তুলনায় ১০০০ মিটারের (৩৩০০ ফুট) চেয়েও কম উঁচু; প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর সমুদ্রের তলদেশের প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ, আটলান্টিক মহাসাগরে প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ ও ভারত মহাসাগরের বিরাট এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এ পাহাড়ের অবস্থান সম্ভবত পৃথিবীপৃষ্ঠে সবচেয়ে সাধারণ ভূমিরূপ, যা প্রায় ২০০ মিটার (৬০০ ফুট) উঁচু ও প্রায় ৬ কি.মি. (৪ মাইল) চওড়া। অধিকাংশগুলোই মৃত ক্ষুদ্র আগ্নেয়গিরি বলে মনে হয়। আগ্নেয়গিরিগুলোর মধ্যবর্তী স্থান থালার মতো খাতবিশিষ্ট ও পলি আবৃত।
বারিমণ্ডল - ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এর লেখা বই
Read more