(Movement of Plates)
পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশের আবরণ কতকগুলো প্লেট বা স্লাব দ্বারা গঠিত। অর্থাৎ ভূত্বক হচ্ছে মহাদেশ ও মহাসাগরের উপরিভাগ যা নমনীয়মণ্ডল তথা ম্যান্টেলের (mantle) উপরিভাগের ওপর দিয়ে সদা সর্বদা চলমান।

আমেরিকার ভূতত্ত্ববিদ এক্স.লি. পিচন (১৯৬৮) এর মতে, পৃথিবীতে ৭টি বৃহৎ পাত এবং ২০টি ক্ষুদ্র পাতের অবস্থান রয়েছে।
৭টি বৃহৎ প্লেট হলো:
১. প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত (Pacific plate);
২. ইউরেশিয়ান পাত (Eurasian plate);
৩. উত্তর আমেরিকান পাত (North American plate);
৪. দক্ষিণ আমেরিকান পাত (South American plate);
৫. আফ্রিকান পাত (African plate);
৬. অস্ট্রেলীয় পাত (Australian plate) এবং
৭. অ্যান্টার্কটিকান পাত (Antarctican plate) ।
এ প্লেটগুলো ম্যান্টেলের (upper mantle) উপরিভাগে এবং সমুদ্র তলদেশীয় ভূত্বকের (oceanic crust) নিচের অংশে অ্যাস্থিনোস্ফিয়ারের (Asthenosphere) উপরে ভেসে রয়েছে। অ্যাস্থিনোস্ফিয়ারের উপরের ভাগ পিচ্ছিল বা তৈলাক্ত পদার্থের দ্বারা গঠিত যার উপরে অবস্থিত প্লেটগুলো সদা চলমান রয়েছে। প্লেটগুলোর এ চলাচলই হলো পাত সঞ্চালন। বিভিন্ন প্লেটের গতির ফলে ভূত্বকের পরিবর্তন সাধিত হয় এবং বিভিন্ন ধরনের ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়।
পাত সঞ্চালন গতি (Plate Movement): সঞ্চালন পাতগুলোর গতির ধরনের উপর নির্ভর করে পাত সঞ্চালন গতিকে
নিম্নোক্ত ৩ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
১. সংকোচন গতি (Compressional movement);
২. সম্প্রসারণ গতি (Extensional movement) এবং
৩. পার্শ্বীয় গতি (Lateral movement)।
প্লেটের গতির কারণ: প্লেটের গতিময়তার পেছনে কোন কোন শক্তি কাজ করছে তা এখনও পুরোপুরি সুস্পষ্ট নয়। প্লেটের গতির কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন বিজ্ঞানী নানা মত পোষণ করেন। সাধারণভাবে প্লেটের গতির কারণ হিসাবে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে উল্লেখ করা হয়ে থাকে:
১. পরিচলন স্রোত (Convection current);
২. আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত (Volcanic eruption);
৩. ঘনত্বের তারতম্য (Density difference);
৪. চৌম্বকত্বের তারতম্য ও চুম্বক মেরুর পরিবর্তন (Magnetic anomaly and change of magnetic pole);
৫. ভূমিকম্প (Earthquake);
৬. জোয়ার-ভাটা (Tidal action);
৭. কেন্দ্রাতিগ ও কেন্দ্রাভিগ বল (Centrifugal and centripetal force);
৮. ধাক্কা ও টান প্রক্রিয়া (Push and pull mechanism);
৯. নিম্নভিমুখী টেনে নেওয়ার তত্ত্ব (Subductional drag hypothesis) এবং
১০. উত্তপ্ত বিন্দুতে টেনে নেওয়ার তত্ত্ব (Hot Spot drag theory) ।
পরিচলন স্রোত: আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, পর্বত ও মালভূমি ইত্যাদি সৃষ্টির জন্য শক্তির প্রয়োজন। এ শক্তির উৎস হিসেবে বিজ্ঞানীগণ ভূঅভ্যন্তরে ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, প্লুটোনিয়াম এবং রেডিয়াম প্রভৃতি পদার্থের তেজস্ক্রিয়তাকে দায়ী করেন। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এ সকল পদার্থের তেজস্ক্রিয়তা হতে ভূঅভ্যন্তরে পরিচলন স্রোতের সৃষ্টি হয় এবং এ পরিচলন স্রোতই প্লেটসমূহকে চলাচলে সহায়তা করে।

ভূঅভ্যন্তরে উত্তপ্ত তরল পদার্থ বিভিন্ন গ্যাসের সংস্পর্শে আরও উত্তপ্ত হয়ে পরিচলন স্রোতের সৃষ্টি করে। অর্থাৎ পরিচলন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অ্যাস্থিনোস্ফিয়ারে গলিত ম্যাগমা উভয় দিকে ধাবিত হয়ে প্লেট স্থানান্তর করে বলে ধারণা করা হয়।
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত: আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পৃথিবীর অভ্যন্তরস্থ লাভা বের হয়ে আসার মুহূর্তে পার্শ্ববর্তী প্লেটে প্রচণ্ড চাপ ও ধাক্কার ফলে প্লেটে গতিময়তা তৈরি হতে পারে।
ঘনত্বের তারতম্য: ভূঅভ্যন্তরস্থ গলিত পদার্থের স্তরে ঘনত্বের তারতম্যও প্লেট চলাকালে গতি সঞ্চার করতে পারে।
চৌম্বকত্বের তারতম্য: চুম্বকত্বের তারতম্য ও চুম্বক মেরুর স্থান পরিবর্তনের কারণেও প্লেট চলাচল করে।
ভূমিকম্প: পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ভূমিকম্প হলে ঐ সকল অঞ্চলের প্লেটের ওপর তার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ প্লেট গতিপ্রাপ্ত হতে পারে।
জোয়ার-ভাটা: পৃথিবীর অভ্যন্তরের গলিত পদার্থ সবসময় চলমান। এর মধ্যে যখন জোয়ার-ভাটা দেখা দেয় তখন জোয়ারের ফলে সৃষ্ট স্ফীত অংশ প্লেটের ওপর প্রচণ্ড চাপ দেয়, ফলে উপরস্থ প্লেটে গতির সঞ্চার হতে পারে।
কেন্দ্রাতিগ ও কেন্দ্রাভিগ বল: ঘূর্ণায়মান পৃথিবীর ওপর সব সময় দুটি বল কার্যরত। একটি কেন্দ্রাভিগ বা অন্তর্মুখী বল
যা পৃথিবীর সকল বস্তুকে নির্জের কেন্দ্রের দিকে টেনে রাখতে চায় এবং অন্যটি বহির্মুখী বা কেন্দ্রাতিগ বল যা, পৃথিবীর সকল বস্তুকে বাইরে নিক্ষেপ করতে চায়। ফলে এ দুটির মধ্যে ভারসাম্যের সৃষ্টি হয় ঠিকই, কিন্তু প্লেটগুলোকে সঞ্চালন ঘটাতে সাহায্য করে।
ধাক্কা ও টান পদ্ধতি: কোনো কারণে অ্যাস্পেনোস্ফিয়ারের নিচের গলিত পদার্থ আয়তনে বৃদ্ধি পেলে এটি ভূপৃষ্ঠকে উপরের দিকে ধাক্কা দেয় এবং তার ফলে প্লেট সঞ্চালন হয়। দুটি প্লেটের যেকোনো একটি ভূকম্পনের কারণে নিম্নে অবনমিত হলে এর আকর্ষণে অপর প্লেটটি আকর্ষিত হয়ে নিম্নে অবনমিত হয়। তাছাড়া ভূঅভ্যন্তরে তাপমাত্রা ভূপৃষ্ঠ অপেক্ষা অনেক বেশি। তাই ভূঅভ্যন্তরের উত্তপ্ত গলিত ধূম, ভস্ম ও ম্যাগমা সর্বদাই বাইরে চলে আসতে চায় এবং ভূপৃষ্ঠের দিকে প্রবল চাপ প্রয়োগ করে ধাক্কা দিয়ে প্লেট চলাচলে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

নিম্নাভিমুখী টেনে নেওয়ার তত্ত্ব: পৃথিবীপৃষ্ঠের গভীর খাতসমূহ প্লেট সীমান্তের সাথে সম্পর্কিত। যেখানে গভীর খাত
আছে সেখানে পৃথিবীপৃষ্ঠ গভীরভাবে ভেতরে ঢুকে গেছে। যে কোনো গভীরতায় ভূপৃষ্ঠের শক্ত প্লেটসমূহ ম্যান্টেল অপেক্ষা কঠিন। অবনমিত প্লেট নিচের দিকে ম্যান্টেলের উত্তপ্ত পদার্থের সংস্পর্শে গলে যায় এবং নিচের দিকে টানের সৃষ্টি করে এবং এ টানই প্লেটসমূহকে চলাচল করতে সহায়তা করে।
উত্তপ্ত বিন্দুতে টেনে নেওয়ার তত্ত্ব: উত্তপ্ত বিন্দু (hot spot) বলতে প্রকৃতপক্ষে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতস্থলকেই বোঝানো হয়েছে। বিজ্ঞানীগণ প্রায় ১০০ উত্তপ্ত বিন্দু আবিষ্কার করেছেন। ম্যান্টেল থেকে উত্থিত এক প্রকার পললের ন্যায় লাভাই উত্তপ্ত বিন্দু। এগুলোর আকর্ষণ বা টান প্লেট চলাচলে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
ভূমিরুপ পরিবর্তন . খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
Read more