# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
আমান প্রতিদিন বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে কামরাঙ্গীর চর থেকে বাসে করে লালবাগ আসে। সে এক পোশাক কারখানায় কাজ করে।
করিম ঢাকা থেকে লঞ্চে করে বরিশাল যাচ্ছিল। রাত্রে লঞ্চটি নদীর মধ্যে একটি চরে আটকা পড়ল। এভাবে যাওয়ার পথে সে অসংখ্য চর ও দ্বীপ দেখতে পেল।
(Sudden Changes of the Earth)
ভূপৃষ্ঠ সর্বদা পরিবর্তনশীল। বিভিন্ন ভূমিরূপ গঠনকারী শক্তির প্রভাবে ভূগর্ভে সর্বদা নানারূপ পরিবর্তন হচ্ছে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূকম্পন, পৃথিবীর অভ্যন্তরে সংকোচন, ভূগর্ভের তাপ-চাপ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক শক্তির ফলে ভূপৃষ্ঠে হঠাৎ যে পরিবর্তন হয় তাকে আকস্মিক পরিবর্তন বা দ্রুত পরিবর্তন বলে। এরূপ পরিবর্তন অল্প পরিসরে হয়ে থাকে। আকস্মিক পরিবর্তন মূলত ২ প্রকার। যথা- (i) ভূমিকম্প এবং (ii) আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত। ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত উভয় প্রক্রিয়াই ভূত্বকের তলদেশে শিলার গঠনে বিকৃতি ঘটায় এবং ভূপৃষ্ঠে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভূমিরূপ গঠন করে।
১. ভূমিকম্প: ভূঅভ্যন্তরে চাপ ও তাপের হ্রাস বৃদ্ধি, তাপীয় পরিচলন স্রোত, প্লেটগতির তারতম্য ও অন্যান্য কারণে মাঝে মাঝে ভূপৃষ্ঠ হঠাৎ কেঁপে ওঠে। এ কম্পন অত্যন্ত মৃদু থেকে প্রচণ্ড হয়ে থাকে, যা মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়। ভূপৃষ্ঠের এরূপ আকস্মিক ও ক্ষণস্থায়ী কম্পনকে ভূমিকম্প বলে।
এ ধরনের প্রক্রিয়া ভূপৃষ্ঠের ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করে। ভূমিকম্প সংঘটিত হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভূপৃষ্ঠে ফাটল, সৃষ্টি হয়। এর ফলে ভূপৃষ্ঠের কোনো স্থান উপরে উঠে যায় বা নিচে নেমে যায়। বিশেষ করে ভূত্বকে বিভিন্ন চ্যুতির সৃষ্টি করে।
২. আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত: ভূগর্ভস্থ গলিত লাভা, বাষ্প, ভস্ম, কর্দম ও ধূম্র প্রভৃতি পদার্থ ভূপৃষ্ঠের ফাটল বা ছিদ্রপথের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠে নির্গত হলে তা অগ্ন্যুৎপাত এবং ঐ সকল পদার্থ জমাট বেঁধে যে পর্বত বা গিরির সৃষ্টি করে তাকে আগ্নেয়গিরি বলে। হাওয়াই দ্বীপের মৌনালোয়া, ইতালির স্ট্রম্বলী এবং আইসল্যান্ডের হ্যাকলা প্রভৃতি পৃথিবীর বিখ্যাত আগ্নেয়গিরি। ভূঅভ্যন্তরীণ কারণে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত সংঘটিত হলে এর ফলে ভূমিরূপের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। এ অগ্ন্যুৎপাতের ফলে গভীর সমুদ্রবক্ষে শত শত দ্বীপ ও সমতলভূমিতে সুউচ্চ পর্বত সৃষ্টি হয়েছে। আবার অনেক স্থলভাগ সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে গেছে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে লাভা সঞ্চারণ ও প্রবাহের দ্বারা নানা ধরনের ভূমিরূপ গঠিত হয়। যেমন- ভারতের দাক্ষিণাত্যের মালভূমি কিংবা ভিসুভিয়াস ও ফুজিয়ামার মতো সুউচ্চ পর্বতসমূহ। আবার ভূঅভ্যন্তরে সৃষ্টি হয় ব্যাথোলিথ, ল্যাকোলিথ, ডাইক ও সিল জাতীয় শিলা


ভূমিরুপ পরিবর্তন . খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(Chemical Weathering)
শিলা বিভিন্ন খনিজের সংমিশ্রণে গঠিত। এ খনিজগুলোর ওপর বায়ুমণ্ডলের প্রধান উপাদানগুলো বিশেষত অক্সিজেন, কার্বন ডাইঅক্সাইড ও জলীয়বাষ্প বিক্রিয়া (reaction) করে। এর ফলে কঠিন শিলা বিয়োজিত হয় এবং খনিজগুলো নতুন গৌণ খনিজে পরিণত হয়ে সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এরূপে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় শিলার চূর্ণবিচূর্ণ হওয়াকে রাসায়নিক বিচূর্ণীভবন বলা হয়।
ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে বায়ুর আর্দ্রতার কারণে অধিক পরিমাণ রাসায়নিক বিচূর্ণীভবন দেখা যায়। রাসায়নিক বিচূর্ণীভবন নিম্নলিখিত প্রক্রিয়ায় সংঘটিত হয়-
১. দ্রবণ (Solution): খুব অল্প সংখ্যক শিলা গঠনকারী খনিজ পানিতে দ্রবণীয় বলে দ্রবণ সরাসরি বিচূর্ণীভবন করে না। তবে এটি রাসায়নিক বিচূর্ণীভবনে গঠিত বিভিন্ন দ্রব্যকে পানিতে দ্রবীভূত করে অপসারণ করে এবং পরোক্ষভাবে বিচূর্ণীভবনে একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

উদাহরণ: ক্যালসিয়াম কার্বনেট যখন ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেটে পরিণত হয় তখন তা পানিতে দ্রবীভূত হয়ে অপসারিত হয়।
২. জারণ (Oxidation): বিভিন্ন শিলার মধ্যে লৌহ জাতীয় খনিজ পদার্থ থাকলে এবং তা অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসলে তাতে ধীরে ধীরে আয়রন অক্সাইড (Iron-oxide) সৃষ্টি হয়। অক্সিজেনের প্রভাবে শিলারাশির এ প্রকার বিচূর্ণীভবনকে জারণ বলে।
উদাহরণ: সাধারণত দেখা যায় লৌহ নির্মিত দ্রব্য মরিচা ধরে সহজেই নষ্ট হয়ে যায়। কারণ বাতাসের অক্সিজেন লৌহের
সাথে যুক্ত হয়ে হলুদ বা বাদামি রঙের লিমোনাইট গঠন করে এবং সহজেই তা ভেঙে যায়।
(ফেরাস অক্সাইড + পানি + অক্সিজেন লিমোনাইট)
৩. জলযোজন (Hydration): রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পানিযুক্ত হয়ে খনিজের যে পরিবর্তন ঘটে তাকে জলযোজন (Hydration) বলে। কিছু খনিজ বায়ু হতে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পানি গ্রহণ করে আকারে বৃদ্ধি লাভ করে। এর ফলে শিলার ভেতর টানের সৃষ্টি হয় এবং শিলা সহজেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়। এছাড়া জলযোজনের ফলে খনিজের আয়তন ও ছিদ্রতলের পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে শিলাস্তরের বিয়োজন সহজ হয়।
উদাহরণ: এ প্রক্রিয়ায় অ্যানহাইড্রাইটের সাথে পানিযুক্ত হয়ে জিপসাম গঠিত হয়।
(অ্যানহাইড্রাইট) (পানি) (জিপসাম)
এরূপ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় খনিজের মধ্যে পানি ঢুকলে খনিজের পরিবর্তন ঘটে এবং তা আয়তনে বৃদ্ধি পায়।
৪. অঙ্গারযোজন (Carbonation) : বিভিন্ন খনিজের সাথে কার্বন ডাইঅক্সাইডের রাসায়নিক সংযোগকে কার্বনেশন বা অঙ্গারযোজন বলে। বৃষ্টির পানি বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে পড়ার সময় বায়ুমণ্ডলস্থিত কার্বন ডাইঅক্সাইডের সাথে মিশ্রিত হয়ে এসিডে পরিণত হয়।
(পানি) + (কার্বন ডাইঅক্সাইড) → (কার্বনিক এসিড)
উদাহরণ: চুনাপাথর ক্যালসিয়াম কার্বনেট দ্বারা গঠিত।

৫. হাইড্রোলাইসিস (Hydrolysis): হাইড্রোলাইসিস পদ্ধতিতে পানি ভেঙে হাইড্রোজেন () ও হাইড্রোক্সিল () আয়নে পরিণত হয়। এ হাইড্রোক্সিল আয়ন খনিজের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটায়।
উদাহরণ: আগ্নেয় শিলায় প্রাপ্ত দুটি প্রধান খনিজ ফেলসপার ও অভ্রের রাসায়নিক পরিবর্তন প্রধানত এ প্রক্রিয়ায় হয়।

জৈবিক বিচূর্ণীভবন (Biological Weathering)
জৈবিক বিচূর্ণীভবন প্রকৃতপক্ষে উদ্ভিদ ও প্রাণীর সংঘটিত ভৌত ও রাসায়নিক ক্ষয়ীভবন।
মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ, বৃক্ষলতাদি প্রতিনিয়ত ভূপৃষ্ঠের ক্ষয়সাধন ও পরিবর্তন সাধন করছে। নানা প্রকার প্রাণী ও উদ্ভিদের ক্রিয়ার দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় বলে এ প্রক্রিয়াকে জৈবিক বিচূর্ণীভবন বলে। এটি তিন ভাবে সংঘটিত হয়। যথা-


১. উদ্ভিদের কাজ : ভূপৃষ্ঠের ক্ষয়সাধনে উদ্ভিদ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন প্রকার গাছপালা মূল ও শিকড় দ্বারা
মাটিকে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে। গাছের মূল বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মোটা হয়ে মাটির নিচে বহুদূর পর্যন্ত চলে যায়। ফলে শিলার ফাটলও বড় হয় এবং ঐ সমস্ত ফাটলে পানি প্রবেশ করলে সেখানকার শিলাস্তর দুর্বল হয় ও গলে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এছাড়া মস, শৈবাল প্রভৃতি নানা প্রকার ক্ষুদ্র উদ্ভিদের দ্বারা শিলার উপরিভাগে পানি আটকে থাকে। এ সকল উদ্ভিদের দেহ পানি ও উত্তাপের সংযোগে পচে যায়। একে হিউমাস বলে। এ হিউমাস বৃষ্টির পানি পেলেই জৈব 'এসিডে পরিণত হয়ে শিলাকে সহজেই ক্ষয় করে দেয়।
২. জীবজন্তুর কাজ: কেঁচো, ছুঁচো, পিঁপড়া, শিয়াল, কুকুর প্রভৃতি সর্বদা মাটি খুঁড়ে শিলারাশিকে চূর্ণবিচূর্ণ করে। এছাড়া উইপোকা, সজারু, ইঁদুর ইত্যাদিও গর্ত করে ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তর হতে মাটি তোলে। এছাড়া মৃত্তিকার অণুজীবসমূহ শিলার প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক বিচূর্ণীভবনে যথেষ্ট সক্রিয় হয়। এভাবে জীবজন্তু ও কীটপতঙ্গ দ্বারা ভূত্বক চূর্ণবিচূর্ণ হচ্ছে।
৩. মানুষের কাজ: নানাবিধ গঠনমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মানুষ ভূপৃষ্ঠের ব্যাপক ক্ষয়সাধন করছে। যেমন-রাস্তাঘাট, খাল, গৃহ, শহর বন্দর প্রভৃতি নির্মাণ করার জন্য মানুষ সর্বদা ভূত্বক খণ্ড-বিখণ্ড করছে। এভাবে মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জৈবিক বিচুণীভবনে সহায়তা করছে।
নগ্নীভবন (Denudation)
নগ্নীভবন অর্থ উন্মুক্ত করা। ভূঅভ্যন্তরস্থ শক্তি ভূত্বকে বিভিন্ন ধরনের ভূমিরূপ গড়ে তোলে। অপরদিকে, নগ্নীভবন এ সমস্ত ভূমিরূপকে ক্ষয় করে সমুদ্র সমতলে নিয়ে আসার কাজে লিপ্ত থাকে এবং ভূত্বকের ক্ষয় সাধনের মাধ্যমে ভূমির উচ্চতা কমায়। তাই সাধারণভাবে বলা যায়, যে প্রক্রিয়ায় ভূপৃষ্ঠের শিলা চূর্ণবিচূর্ণ হয় এবং ক্ষয়প্রাপ্ত শিলা অন্যত্র অপসারিত হয় তাই নগ্নীভবন। নগ্নীভবন চার ধরনের প্রক্রিয়ায় কাজ করে। যথা: (ক) বিচূর্ণীভবন, (খ) স্তূপ অপসারণ, (গ) ক্ষয়সাধন ও (ঘ) পরিবহন।
ক. বিচূর্ণীভবন: নগ্নীভবনের যে চারটি প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে তন্মধ্যে বিচূর্ণীভবন শিলার ক্ষয়সাধনে প্রথম পর্যায় হিসেবে কাজ করে। বিচূর্ণীভবনের ফলে ভূত্বকের উপরিস্তরের শিলা ভেঙেচুরে শিথিল হয়ে পড়ে। কিন্তু অপসারিত হয় না। এটি একটি স্থির প্রক্রিয়া।
খ. স্তূপ অপসারণ: বিচূর্ণীত শিলা উচ্চ ঢালে অবস্থিত হলে তা অবশ্যই মাধ্যাকর্ষণের টানে নিম্নঢালে নেমে আসবে। শিলার এ নিম্নঢাল অভিমুখী যাত্রাকে স্তূপ অপসারণ বলে। বিচূর্ণীত শিলার কিয়দংশ পানি বা বায়ুর মাধ্যমে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়। এটি চলমান প্রক্রিয়া।
গ. ক্ষয়সাধন: বিচূর্ণীভবনের সময় ভূত্বকের উপরিস্তরের শিলা ভেঙেচুরে প্রস্তরখণ্ড, কঙ্কর, নুড়ি, বালুকা ও কাদা প্রভৃতিতে পরিণত হয়। কিন্তু অপসৃত হয় না। এদের শিলাবরণী বলা হয়। এসব আলগা পদার্থ নানাবিধ প্রাকৃতিক শক্তির দ্বারা অপসারিত হলে তাকে ক্ষয়ীভবন বলে। যে সব প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে ক্ষয়ীভবন সংঘটিত হয় তাদের মধ্যে বায়ু, বৃষ্টিপাত, হিমবাহ এবং সমুদ্রতরঙ্গ প্রভৃতি প্রধান।
ঘ. পরিবহন: নগ্নীভবনের চারটি প্রক্রিয়ার মধ্যে সর্বশেষ প্রক্রিয়াটি হলো পরিবহন। বিচূর্ণীভূত পদার্থসমূহ ক্ষয়সাধিত হয়ে পরিবাহিত হলে নিচের অবিকৃত শিলা দৃষ্টিগোচর বা নগ্ন হয়। বিচূণীভূত শিলা বায়ু, বৃষ্টিপাত, হিমবাহ, সমুদ্রতরঙ্গ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক শক্তি দ্বারা অপসারিত হয়।
ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(Effect of Slow and Sudden Changes on Living World)
ভূপৃষ্ঠ বা ভূত্বক সর্বদা পরিবর্তিত হচ্ছে। কখনো ধীরে ধীরে, কখনো দ্রুত ও আকস্মিকভাবে। বিভিন্ন প্রকার ভূগাঠনিক প্রক্রিয়া ভূপৃষ্ঠের পরিবর্তন সাধন করে। এ পরিবর্তন কখনো ভূত্বকের অভ্যন্তরে আবার কখনো ভূত্বকের বাহিরে ঘটছে। যেহেতু জীবজগৎ ভূত্বকে বিচরণশীল সেহেতু এই পরিবর্তন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবজগতের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে এটাই স্বাভাবিক।
ধীর পরিবর্তনসমূহের প্রভাব: সূর্যতাপ, বায়ুপ্রবাহ, নদীপ্রবাহ, হিমবাহ, সমুদ্রস্রোত, বৃষ্টিপাত প্রভৃতি বাহ্যিক শক্তির প্রভাবে
ধীরে ধীরে যে পরিবর্তন সংঘটিত হয় তাকে ধীর পরিবর্তন বলে। এই ধীর পরিবর্তন বিশাল এলাকা জুড়ে হয়ে থাকে। ভূত্বকের ধীর পরিবর্তনের ফলে ভূপৃষ্ঠে বিভিন্ন প্রকার ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়। এসকল ভূমিরূপের উপর মানুষের বসতি, কৃষি, ব্যবসা, বাণিজ্য, সংস্কৃতি, জলবায়ু, জীবিকা প্রভৃতি নির্ভর করে। এছাড়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইহা মানুষের, জীবজগতের অকল্যাণ সাধন করে থাকে। যেমন- নদীর অস্বাভাবিক প্রবাহ বন্যা সৃষ্টি করে মানুষের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে। ধীর পরিবর্তনসমূহ মানুষের বসতির উপরও প্রভাব বিস্তার করে। যেমন- পৃথিবীর শতকরা প্রায় ৯৫ জন লোক সমভূমিতে বাস করে। অধিকাংশ সমভূমি সমুদ্র উপকূলে, নদী অববাহিকায় এবং বদ্বীপে অবস্থিত। সমভূমিগুলো সমতল এবং উর্বর পলিগঠিত বলে চাষাবাদসহ যাতায়াত, শিল্পকার্য ও ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি কাজের জন্য সুবিধাজনক এবং এর ফলে মানুষ জীবিকা অর্জনের সুযোগ পায়।
আকস্মিক পরিবর্তনসমূহের প্রভাব: বিভিন্ন ভূমিরূপ গঠনকারী শক্তির প্রভাবে ভূগর্ভে সর্বদা নানারূপ পরিবর্তন হচ্ছে।
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূকম্পন, পৃথিবীর অভ্যন্তরে সংকোচন, ভূগর্ভের তাপ ও অন্যান্য শক্তির ফলে ভূপৃষ্ঠে হঠাৎ যে পরিবর্তন সাধিত হয় তাকে আকস্মিক পরিবর্তন বলে। এরূপ পরিবর্তন খুব বেশি স্থান জুড়ে হয় না। আকস্মিক পরিবর্তন সংঘটিত হয় প্রধানত ভূমিকম্প, সুনামি ও আগ্নেয়গিরি দ্বারা। ইহা জীবজগতের উপর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যাপক ক্ষতিকর ভূমিকা পালন করে। ভূমিকম্প জীবজগতের ব্যাপক ক্ষতি ও পরিবর্তন সাধন করে। ভূমিকম্প কোনো জনবহুল এলাকায় হলে তা ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, পানি, গ্যাস সরবরাহ ও অন্যান্য সম্পদের ক্ষতিসাধন করে। আগ্নেয়গিরি থেকে গলিত লাভা, ভস্ম প্রভৃতি প্রবলবেগে ঊর্ধ্বে উত্থিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এর পার্শ্ববর্তী জনপদ, শস্যক্ষেত্র সবকিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইহা নতুন ভূমিরূপ ও খনিজ সম্পদ সৃষ্টি করে যা মানুষের অনেক উপকারে আসে।
আকস্মিক ও ধীর পরিবর্তনের ফলে ভূত্বকের ভূমিরূপের পরিবর্তন হয়। আর ভূত্বকের সাথেই জীবজগতের সম্পর্ক। ভূত্বক মানুষ, অন্যান্য প্রাণী এবং উদ্ভিদের সৃষ্টি, বর্ধন ও বংশবৃদ্ধি প্রভৃতির সহিত সম্পর্কিত। তাই বলা যায়, আকস্মিক ও ধীর পরিবর্তন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবজগতের উপর প্রভাব বিস্তার করে।
ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(Land Erosion)
ভূমিক্ষয় বলতে সাধারণত স্বাভাবিক অবস্থায় প্রাকৃতিক নিয়মে ভূপৃষ্ঠের উপরিতলের ক্ষয়সাধন বোঝায়। বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত, জলস্রোত, হিমবাহের গতি প্রভৃতির প্রভাবে ভূমির উপরিভাগের মাটি ক্ষয় হওয়াকে ভূমি বা মৃত্তিকা ক্ষয় বলে। ভূতাত্ত্বিক কারণে অতি ধীরে ভূমিক্ষয় সংঘটিত হয়ে উপত্যকা, বদ্বীপ, সমতলভূমি ইত্যাদি সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত চাষাবাদ, পশুচারণ, বনভূমি ধ্বংস ও অনুপযোগী জমিতে চাষাবাদ এবং ত্রুটিপূর্ণ ভূমি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভূমিক্ষয় ত্বরান্বিত হয়।
ভূমিক্ষয়ের নিয়ামক: কৃষিকাজ, বসতি স্থাপন, শহরায়ণ ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষ ভূমিক্ষয়কে প্রভাবিত করে। এর নিয়ামকগুলো হলো- (ক) মাটির বৈশিষ্ট্য, (খ) উদ্ভিদের আবরণ, (গ) বায়ুপ্রবাহ, (ঘ) বৃষ্টিপাত, (ঙ) পানি এবং (চ) ঢেউয়ের আঘাত (নদী তীরে)।
বাংলাদেশের ভূমিক্ষয়ের কারণ; অতিরিক্ত শস্য উৎপাদন, অনুপযুক্ত জমি কর্ষণ, অতিরিক্ত পশুচারণ বা বনাঞ্চল ধ্বংস ইত্যাদি অব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশে ভূমিক্ষয় ঘটে থাকে। অধিক মাত্রায় শস্য ফলানোর জন্য মাটিস্থ হিউমাসের পরিমাণ কমে যাওয়ায় মাটির সংশক্তি প্রবণতা (cohesiveness) ও ভেদ্যতা কমে যায়। ফলে ভূমিক্ষয় ঘটে। বর্ষার ফলে মাটির উপরিতল পানির প্রত্যক্ষ প্রভাবে উন্মুক্ত হওয়ায় মাটির কণার দ্রুত চলাচলের সম্ভাব্যতা বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে এ কারণটি বেশি ঘটে থাকে। শুষ্ক অঞ্চলে (উত্তরাঞ্চল) ধুলা-ঝড় এবং বালু-ঝড়ের মাধ্যমেও বাংলাদেশে ভূমিক্ষয় সংঘটিত হয়।
ভূমিক্ষয়ের ফলাফল: ভূমিক্ষয়ের ফলে ইতিবাচক প্রভাব-এর চেয়ে নেতিবাচক প্রভাব বেশি পড়ে;
i. ভূমিক্ষয়ের ফলে কৃষিনির্ভর এদেশের কৃষি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ii. ভূমিক্ষয়ের ফলে অনেক স্থানে বিশেষ করে নদীতীরবর্তী অঞ্চলে নদীভাঙন বৃদ্ধি পায়। ফলে কোটি কোটি টাকার ফসল, ঘরবাড়ি, গরু-ছাগল ও অন্যান্য সম্পদ নষ্ট হয়;
iii. ভূমিক্ষয়ের ফলে কৃষির মারাত্মক ক্ষতি হয় বলে কৃষিনির্ভর শিল্পগুলোর উৎপাদন হ্রাস পায়;
iv. ভূমিক্ষয়ের ফলে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হয়; এবং
v. ভূমিক্ষয়ের কারণে চারণভূমি বিনষ্ট ও পশুপালন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভূমিক্ষয় রোধে করণীয়/প্রতিকার: অতিমাত্রায় ভূমিক্ষয়ের ফলে মাটির ভৌত ও রাসায়নিক গঠন বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়ে যায়।
প্রতিবছর বিভিন্ন কারণে এদেশে মাটি ক্ষয় হচ্ছে। ফলে মাটির উর্বরাশক্তি হ্রাস পেয়ে ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। তাই মৃত্তিকা ক্ষয় রোধ করার জন্য বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ (যেমন- শস্যাবর্তন) গ্রহণ করা আবশ্যক। ভূমিক্ষয় প্রতিকারের উপায়গুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো-
(ক) পাড় চাষ বা আড়াআড়ি চাষ: অত্যন্ত খাড়া ঢালে পানির অতি দ্রুত নিম্নগতির জন্য প্রচুর মাটি অপসারিত হওয়ার ফলে খাদ সৃষ্টি হয়। চাষাবাদের মাধ্যমেও মাটিক্ষয় হয়ে থাকে। আড়াআড়ি চাষ (contour tillage) পদ্ধতিতে ঢালের উপর ও তলদেশ ব্যতীত অন্যান্য স্থানে আড়াআড়িভাবে চাষাবাদ, বীজতলা প্রস্তুত ও ফসল সংরক্ষণ করা হয়।
(খ) সোপান চাষ: সাধারণত সোপান চাষাবাদ দ্বারা দুটি পদ্ধতি বোঝানো হয়। যুগ যুগ ধরে চীন, কোরিয়া ও পেরুতে পাহাড় ও পর্বতের ঢালে সিঁড়ির মতো ধাপবিশিষ্ট সমতল ভূমি প্রস্তুত করে তাতে কোথাও শুষ্ক (কৃত্রিম পানিসেচ ব্যতীত) চাষাবাদ আবার কোথাও প্লাবন (সেচের মাধ্যমে) চাষাবাদ করা হয়। প্লাবন চাষের ক্ষেত্রে একটি ধাপ থেকে পরবর্তী ধাপে নালার মাধ্যমে পানি স্থানান্তরিত করা হয়।
সোপান চাষের আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে বড় মাটির বেদী বা বাঁধ তৈরি, যা আধুনিক চাষাবাদে বহুল প্রচলিত। এক্ষেত্রে পানি গড়িয়ে যাওয়ার গতিমাত্রা ও ভূমিক্ষয়ের পরিধি নিয়ন্ত্রণের উপযোগী করে ঢালের প্রতিকূলে বাঁধ তৈরি করা হয়। এতে পরস্পর বাঁধের দূরত্ব এমনভাবে নির্ণয় করা হয় যাতে বাঁধ দুটির মধ্যে মাটি ক্ষয়ের ক্ষমতাবিশিষ্ট পানির উচ্চগতি অর্জিত না হতে পারে (প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ মিটার)। বাঁধের দৈর্ঘ্য, ঘনত্ব ও উচ্চতা ইত্যাদি ভূমির আয়তন, ঢালের (slope) মাত্রা, প্রয়োজনীয় পানি ধারণক্ষমতা, নিষ্কাশন নালা এবং ভূমি কর্ষণের সুবিধা অনযায়ী করা হয়।
(গ) নালা পুনরুদ্ধার: বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অধিক ক্ষয়প্রাপ্ত ভূমিতে সৃষ্ট খাদ বা নালা পুনরুদ্ধার করা যায়। এ ক্ষেত্রে দ্রুত পানি স্রোত হ্রাস করাই হচ্ছে সর্বপ্রথম করণীয়। প্রাথমিকভাবে খাদ বরাবর ছোট ছোট বাঁধ তৈরি করে পানির স্রোত প্রতিহত করা হয় (ঢালের মাত্রা অনুযায়ী ৬-৮ মিটার ঘন বাঁধ)। খড়কুটা, কাঠের খন্ড, ঘাসের চাপড়া (soda), তারের জাল বা মাটি দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করা যায়। ক্রমশ, তলানি জমে খাদ ভরে ওঠে। এর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে খাদের উপরদিক থেকে পানি স্রোতকে ভিন্নপথে প্রবাহিত করে মাটি আটকে রাখা হয়।

(ঘ) খন্ড চাষ বা ফালা চাষ: পানি ও বায়ুস্রোতজনিত ক্ষয়রোধ এবং শস্যাবর্তন পদ্ধতির সুবিধার্থে খণ্ডচাষ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। ভূমির ঢাল বেশি হলে যৌথভাবে খন্ড চাষ ও পাড় চাষ পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায়। এ ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিকভাবে অথবা ভূমি পরিত্যক্ত রেখেও শস্যাবর্তন পদ্ধতিতে পাড় চাষ করা যায়।খণ্ড চাষ পদ্ধতিতে একটানা বিস্তৃত কোনো ভূমিতে বায়ুস্রোত উন্মুক্ত থাকে না এবং বিভিন্ন প্রকারের উদ্ভিদ বায়ু প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করায় ভূমিক্ষয় হ্রাস পায়। এক্ষেত্রে প্রবল বেগে বায়ুপ্রবাহের ঋতুতে বায়ুস্রোতের প্রতিকূলে আড়াআড়ি বা খণ্ডচাষ করা হয়। মাটির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চিলতে চাষের দূরত্ব নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অভ্যন্তরীণ নদী, তীরবর্তী বিস্তীর্ণ ভূমি বাঁধের মাধ্যমে ভূমিক্ষয় ও লবণাক্ত পানির প্রবেশ রোধ করে অধিক উৎপাদনক্ষম করা হয়েছে।

ভূমিক্ষয় রোধের অন্যান্য উপায়গুলোর মধ্যে রয়েছে বৃক্ষরোপণ, নিয়ন্ত্রিত পশুপালন, ঘাস জন্মানো, আবরণ, শস্য রোপণ, নদী তীর ও বদ্বীপের তীরে জলজ, উদ্ভিদ জন্মানো ইত্যাদি। সর্বোপরি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ ভূমিক্ষয় রোধের জন্য বিশেষ উপযোগী।
ভূমিধস (Land slide)
অপেক্ষাকৃত শুষ্ক মাটি বা শিলার ভগ্নস্তূপ মাধ্যাকর্ষণ, ভূমিকম্প বা অন্য কোনো কারণে বৃহৎ পরিসরে ধসে পড়তে পারে। একে ভূমিধস বলে। সাধারণত পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধস পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশেও বর্তমানে প্রাণঘাতী দুর্যোগগুলোর মধ্যে ভূমিধসকে আশংকাজনকরূপে বিবেচনা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট ইত্যাদি জেলার পাহাড়ি অঞ্চলসমূহে দিন দিন ভূমিধসের কারণে প্রাণহানি বাড়ছে।
বাংলাদেশে ভূমিধসের কারণ: বাংলাদেশে ভূমিধসের প্রাকৃতিক কারণসমূহের মধ্যে রয়েছে স্বল্প সময়ে অধিক বৃষ্টিপাত,
পার্বত্য নদীগুলোর পার্শ্বক্ষয় শিলার গঠন এবং ভগ্নস্তূপের ঢাল বিচলন। কিন্তু এদেশে ভূমিধস মানবসৃষ্ট দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যেমন- পাহাড় কাটা, কৃত্রিমভাবে পাহাড়ে স্তূপ সৃষ্টি, বৃক্ষনিধন, ভবনাদি ও অন্যান্য কাঠামো তৈরি, পয়ঃপ্রণালি, জলাধার নির্মাণ এবং জুমচাষ ভূমিধসের আশংকা বাড়াচ্ছে।
ভূমিধসের ফলাফল: ভূমিধস বহু ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংস করে। বিশেষ করে এসব স্থাপনা যদি পর্বতের ঢালে নির্মিত হয়। বাংলাদেশে বান্দরবান ও রাঙামাটিতে প্রায়ই ভূমিধস ঘটছে। প্রায় প্রতিবছরই ভূমিধসের কারণে পার্বত্য জেলাগুলোর সাথে দেশের অন্যান্য অংশের সড়কপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
ভূমিধসের ফলস্বরূপ বহু প্রাণ ও সম্পদ বিলীন হয়। বাংলাদেশেও প্রায় প্রতিবছরেই ভূমিধসের কারণে বহুলোক ঘরবাড়িশূন্য হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলে। খাড়া ঢালে যখন কোনো স্থাপনা বা সম্পদের অবস্থান থাকে ভূমিধসে তা ধ্বংস হয়। বাংলাদেশে পাহাড়ি এলাকায় ঢালে (slope) বাড়িঘর দেখা যায়। আবার জুম চাষ পাহাড়ি ঢালেই হয়ে থাকে। ফলে দেখা যায় ভূমিধস ঘটলে বহু জানমালের ক্ষতিসাধন হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাসমূহে এ জাতীয় ঘটনা ইদানিং অহরহ ঘটে। যেমন- ১১ আগস্ট, ১৯৯০ এ বান্দরবান জেলায় দুটি বড় ভূমিধসে ১৭ জন ব্যক্তি নিহত হয়। ২৪ জুন, ২০০০ সালে চট্টগ্রামে ভূমিধসে অন্তত ১৩ জন ব্যক্তি নিহত ও ১০ জন আহত হয়। ১১ জুন, ২০০৭ সালে চট্টগ্রামে ভূমিধসে ৫৯ জন শিশুসহ ১২৮ জনের মৃত্যু ঘটে, ১৫০ জনের বেশি আহত হয় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং সর্বশেষ অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে ২০১৭ সালে ১২ই জুন রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজারে ভূমিধস ঘটে যাতে ১৫২ জন লোক মারা যায়।
ভূমিধস রোধে করণীয় : বাংলাদেশে ভূমিধস যতটা না প্রাকৃতিক কারণে সংঘটিত হয় তার চেয়ে অনেক বেশি হয় মানবসৃষ্ট কারণে। তাই ভূমিধস রোধে মানুষকে তার অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড থেকে সচেতন হতে হবে। এ লক্ষ্যে করণীয়-
i. ভবনাদি ও ভৌত কাঠামো নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ; ii. বৃষ্টির পানির কার্যকর নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা; iii. পাহাড়ি ঢালের বক্ষনিধন বন্ধ করা; এবং iv. ভূমি ব্যবহারে মৃত্তিকা ক্ষয়রোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(River)
ভূপৃষ্ঠের পরিবর্তন সাধনকারী প্রাকৃতিক শক্তিসমূহের মধ্যে নদীর ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। নদী কোনো উঁচু স্থান থেকে উৎপত্তি লাভ করে একটি সুনির্দিষ্ট খাতে নিম্নঢাল অভিমুখে পানি প্রবাহিত করে। সাধারণত উচ্চ পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ গলে নিম্নঢালে প্রবাহিত হয়ে হ্রদ বা সমুদ্রে পতিত হলে তাকে নদী বলে। যেমন- গঙ্গা নদী হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপত্তি লাভ করে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এছাড়া মালভূমি বা পার্বত্য ভূমিরূপে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঝরণাধারা (যেমন- বৃষ্টির পানি থেকে সৃষ্ট) মিলিত হয়ে নিম্ন ঢালে নদীরূপে প্রবাহিত হয়। যেমন- বাংলাদেশের কর্ণফুলী, সাঙ্গু, নাফ, হালদা প্রভৃতি।
নদী উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত ক্ষয়সাধন, পরিবহন ও সঞ্চয় কাজ করে থাকে। নদীর ক্ষয়কাজের দ্বারা গিরিখাত, বর্তুলাকার গর্ত, সর্পিল বাঁক ইত্যাদি বৈচিত্র্যময় ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়। আবার সঞ্চয় কাজের ফলে প্লাবন সমভূমি, বদ্বীপ, বাঁকবিশিষ্ট নদী, অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের মত ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক গতিতে পার্বত্য ভূমিরূপের খাড়া ঢালের জন্য নদীতে খরস্রোত থাকে। ফলে এ গতিতে নদীর ক্ষয়সাধনের ক্ষমতা অনেক বেশি থাকে।
নদীর পর্যায় (Stages of river)
উৎস হতে মোহনায় পতিত হওয়া পর্যন্ত নদীর গতিপথকে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়। যেমনঃ (১) পার্বত্য অবস্থা বা ঊর্ধ্বগতি, (২) সমভূমি অবস্থা বা মধ্যগতি এবং (৩) বদ্বীপ অবস্থা বা নিম্নগতি।
(১) পার্বত্য অবস্থা বা ঊর্ধ্বগতি (Mountain Phase): ঊর্ধ্বগতি হলো নদীর প্রাথমিক অবস্থা। পর্বতের যে স্থান থেকে নদীর উৎপত্তি হয়েছে সেখান থেকে সমভূমিতে পৌছানো পর্যন্ত অংশকে নদীর ঊর্ধ্বগতি বলে। ঊর্ধ্বগতি অবস্থায় নদী ভূমি ক্ষয় করে এবং ক্ষয়িত পদার্থ পরিবহন করে। পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিভাগ ঢালু ও উঁচুনিচু থাকে বলে নদীর গতিবেগ ঘণ্টায় ২৪-৩২ কি.মি. পর্যন্ত হয়ে থাকে। প্রবল স্রোতের আঘাতে ভূত্বক হতে শিলা ভেঙে পড়ে এবং তা নিম্নদিকে গড়িয়ে অগ্রসর হয়। পার্বত্য অবস্থায় নদীর পার্শ্বক্ষয় অপেক্ষা নিম্নক্ষয়ই বেশি হয়ে থাকে। ফলে গিরিখাত, ক্যানিয়ন, খরস্রোত, জলপ্রপাত প্রভৃতির সৃষ্টি হয়।

পার্বত্য অবস্থায় নদীর প্রধান কাজ ক্ষয়সাধন হলেও অনেক সময় নদীর ঢাল কমে নদীর গতি হ্রাস পেলে অথবা হঠাৎ অধিক পরিমাণ প্রস্তরখণ্ড আসলে নদী তা সম্পূর্ণরূপে বহন করতে না পেরে সামান্য কিছু সঞ্চয় করে। এ প্রকারে নদীবাহিত বিভিন্ন পদার্থগুলো অল্প ঢালযুক্ত অঞ্চলে সঞ্চিত হয়। নদী হঠাৎ উচ্চভূমি হতে নিম্নভূমিতে পতিত হলে সেখানে পলি জমা হয়ে পলল পাখা বা পলল কোণ গঠিত হয়। কখনও কখনও পাহাড়ের পাদদেশে প্রস্তরখণ্ড, নুড়ি, বালি প্রভৃতি জমা হয়ে একটি বিস্তীর্ণ সমভূমির সৃষ্টি করে। ভারতের শিবালিক পর্বতের পাদদেশে এরূপ সমভূমি গঠিত হতে দেখা যায়।
(২) সমভূমি অবস্থা বা মধ্যগতি (Plain or Middle Phase): পার্বত্য অঞ্চল পার হয়ে নদী যখন সমভূমির উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় তখন এর প্রবাহকে সমভূমি অবস্থা বা মধ্যগতি বলে। মধ্যগতিতে নদীর বিস্তার ঊর্ধ্বগতি অবস্থার তুলনায় অনেক বেশি হয় কিন্তু গভীরতা উর্ধ্বগতি অবস্থার তুলনায় অনেক কমে যায়। নদী উপত্যকার গভীরতা হ্রাস পাওয়ায় পানি ধারণ ক্ষমতাও কমে যায়। ফলে বর্ষাকালে নদী স্ফীত হয়ে মধ্যগতিতে নদীর দুই দিকের নিম্নভূমিসমূহকে বন্যায় প্লাবিত করে এবং পলি দ্বারা ভরাট হয়ে সমভূমির আকার ধারণ করে। একে প্লাবন সমভূমি বলে। এ প্রবাহে নদী ক্রমশ ধীরগতি সম্পন্ন হয় এবং বাধা এড়িয়ে আঁকাবাঁকা পথে চলতে থাকে। সমভূমি অবস্থায় নদীর ক্ষয় ও পরিবহন কার্য তত প্রবল নয়। এ অবস্থায় নদীর সঞ্চয়কার্য শুরু হয়।
(৩) বদ্বীপ অবস্থা বা নিম্নগতি (Delta or Lower Phase): নদীর জীবনচক্রের শেষ পর্যায় হলো নিম্নগতি। এ অবস্থায় স্রোত একেবারে কমে যায়। নদীর নিম্নক্ষয় বন্ধ হলেও পার্শ্বক্ষয় হয় যথেষ্ট পরিমাণে। ফলে নদী উপত্যকা খুব চওড়া ও অগভীর হয়। নিম্নগতিতে স্রোতের বেগ কমে যাওয়ায় পানিবাহিত বালুকণা, কাদা নদীগর্ভে ও মোহনায় সঞ্চিত হয়ে নদীর গতিপথে বাধার সৃষ্টি করে। নদীর গতি বাধা পেয়ে তা দুই দিক দিয়ে চলে যায়। কালক্রমে নদীমুখে পলি সঞ্চিত হয়। ফলে নদীতলে ভূভাগ উঁচু হয়ে মাত্রাহীন গ্রিক ডেল্টা 'A' কিংবা বাংলা 'ব' এর আকার ধারণ করে ত্রিকোণাকার দ্বীপের সৃষ্টি করে। একে বদ্বীপ (delta) বলে। বদ্বীপ গঠন ব্যতীত এ অংশে নদীর খাত পরিবর্তন, নদীর অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ, প্লাবন সমভূমি প্রভৃতি বিভিন্ন ভূমিরূপ দেখতে পাওয়া যায়।
ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(Erosional Landforms of River)
নদীর গতিবেগের দ্বারা যে ক্ষয় সাধন হয় এবং এর ফলে যে ভূমিরূপের সৃষ্টি হয় তাকে নদীর ক্ষয়জাত ভূমিরূপ বলে।
নদীর এ ক্ষয়কাজ প্রধানত প্রাথমিক গতিতে অধিক, মধ্যগতিতে মধ্যম এবং নিম্নগতিতে নেই বললেই চলে।
নিচে নদীর প্রতিটি গতিতে যে ক্ষয়জাত ভূমিরূপের সৃষ্টি হয় তার বিবরণ দেওয়া হলো-
ক. প্রাথমিক গতিতে ক্ষয়জাত ভূমিরূপ:
১. 'V' আকৃতির উপত্যকা: প্রাথমিক গতিতে নদীর পার্শ্বক্ষয় অপেক্ষা নিম্নক্ষয় অধিক হয়। এজন্য নদীখাত অধিক গভীর হয়ে ইংরেজি 'V' অক্ষরের রূপ ধারণ করে। এজন্য নদীর এরূপ উপত্যকাকে 'V' আকৃতির উপত্যকা বলে। যেমন: পার্বত্য চট্টগ্রামের কর্ণফুলি নদীর উপত্যকা।

২. স্পার: উৎস থেকে নিম্নঢালে যাওয়ার সময় নদী এক পাড় (তীর) থেকে অন্য পাড়ে আঘাত করে অগ্রসর হয়। অবশ্য এ অবস্থায় তলদেশেরও ক্ষয় চলতে থাকে। নদীর এ ধরনের গতিধারার ফলে পর্বতগাত্রসমূহ ক্ষয় হয়ে এমনভাবে অবস্থান করে যেন দুটি করাতের দাঁতসমূহ মুখোমুখি পরস্পরের সাথে লেগে আছে। পাহাড়ের পার্শ্বদেশগুলো এভাবে পরস্পরের দিকে ঝুঁকে থাকা ভূমিরূপকে স্পার বলে। যেমন: হিমালয় পর্বতের জেনেভা স্পার (Geneva spur)।

৩. গিরিখাত: নদীর প্রবল স্রোতধারা খাড়া পর্বতগাত্র বেয়ে নিচের দিকে প্রবাহিত হলে নদীখাত ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং ক্ষয়িত পদার্থ স্রোতের সাথে বহুদূর চলে যায়। এমতাবস্থায় বড় বড় পাথরসমূহ একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পতিত হলে গভীর ও সংকীর্ণ নদীখাতের সৃষ্টি হয়। এরূপে সৃষ্ট খাতকে গিরিখাত বলে। সিন্ধু নদে অনেক গিরিখাত আছে।

৪. ক্যানিয়ন: গিরিখাতগুলো অধিক গভীর ও খাড়া ঢালবিশিষ্ট হলে এদেরকে ক্যানিয়ন বলে। উত্তর আমেরিকার কলোরাডো নদীর গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন পৃথিবী বিখ্যাত।
৫. জলপ্রপাত: পার্বত্য অবস্থায় নদীস্রোত কোনো কঠিন শিলাস্তর থেকে কোমল শিলাস্তরে উপনীত হলে কোমল স্তরটি অধিক ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ফলে কঠিন শিলাস্তরটি কোমল শিলাস্তর অপেক্ষা অধিক উচ্চে অবস্থান করে এবং জলধারা খাড়াভাবে নিচের দিকে পতিত হয়। জলের এরূপ পতনকে জলপ্রপাত বলে। বাংলাদেশের মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত এর উদাহরণ।

৬. খরস্রোত: পাহাড়ের ঢালু জায়গায় মাটি পর্যায়ক্রমে কঠিন ও কোমল থাকতে পারে। এমতাবস্থায় নদীস্রোত কোমল শিলাকে আস্তে আস্তে ক্ষয় করে কিন্তু কঠিন শিলা পূর্বাবস্থায় থেকে যায়। এতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলপ্রপাতের সৃষ্টি হয়। এসব জলপ্রপাত সারিবদ্ধভাবে উপর থেকে নিচের দিকে অবস্থান করে বলে এখানে নদীর স্রোত লাফাতে লাফাতে নিচের দিকে পড়ে। এরূপ প্রবাহমান সারিবদ্ধ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলপ্রপাতকে খরস্রোত বলে। যেমন: জর্জিয়ার ইনগুড়ি (Inguri) নদীতে এরূপ খরস্রোত দেখা যায়।

৭. কাসকেড : নদীপ্রবাহ সুষম ঢালপথে নিচের দিকে প্রবাহিত হলে তাকে কাসকেড বলে। মিশরের নীলনদে এ ধরনের কাসকেড রয়েছে।
৮. সুড়ঙ্গপথ বা প্রাকৃতিক সেতু: অনেক সময় নদীপথ নিচের চুন জাতীয় মৃত্তিকা ক্ষয় করলে উপরের কঠিন শিলা পূর্বাবস্থায়ই থেকে যায়। এতে কঠিন শিলাটি সেতুর ন্যায় অবস্থান করে, যা প্রাকৃতিক সেতু নামে পরিচিত। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ (Utah) রাজ্যের কলোরাডো নদীর প্রাকৃতিক সেতু।
৯. বর্তুলাকার গর্ত: বর্ষাকালে নদীর গতিবেগ দ্রুত বৃদ্ধি পেলে নদীর পানি অনেক সময় ক্ষুদ্র পরিসরে গোলাকার ঘূর্ণিপ্রবাহ সৃষ্টি করে। এ ঘূর্ণন অনেক সময় নদীগর্ভে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি করে যা বর্তুলাকার গর্ত নামে আখ্যায়িত। বাংলাদেশে প্রবল বর্ষার সময় পানি প্রবাহ বেশি থাকায় পদ্মা ও মেঘনার মিলিত স্থানে এ ধরনের ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়।

খ. মধ্যগতিতে ক্ষয়জাত ভূমিরূপ:
১. সর্পিল বাঁক: মধ্যগতিতে নদী অববাহিকায় শিলা নরম থাকায় পানির স্রোতের আঘাতে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এমতাবস্থায় নদী এঁকেবেঁকে অগ্রসর হয়। নদীর গতিপথে এ ধরনের ভূমিরূপকে সর্পিল বাঁক বলা হয়। বাংলাদেশে বহু সর্পিল বাঁক বিশিষ্ট নদী রয়েছে। যেমন: সুরমা নদী।

২. নদীছেদন: নদী আঁকাবাঁকা অবস্থায় চলতে থাকলে এবং বাঁকের বৃদ্ধি ঘটলে নদী আঁকাবাঁকা পথ ছেড়ে কোনো এক সময় হঠাৎ সোজা পথ বেছে নেয়। এ সোজা পথকেই নদীছেদন বলে। যেমন: পদ্মার শাখা মধুমতি নদী।
৩. নদীমঞ্চ: মধ্যগতিতে নদীর পানি অসমানভাবে হ্রাস বৃদ্ধির ফলে নদী অসমানভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং সিঁড়ির ন্যায় ভূপ্রকৃতির সৃষ্টি করে। এরূপ ভূপ্রকৃতিকে নদীমঞ্চ বলে। যেমন: মেঘনা নদীর নিম্ন অববাহিকা।
গ. নিম্নগতিতে ক্ষয়জাত ভূমিরূপ: নদীর নিম্নগতিতে ক্ষয়জাত ভূমিরূপ হয় না বললেই চলে। তবে বদ্বীপ অঞ্চলের চরসমূহ বন্যা, জোয়ার, নদীর গতি পরিবর্তন বা অন্য কোনো নৈসর্গিক কারণে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে নতুন ভূমিরূপের সৃষ্টি করতে পারে।
নদীর ক্ষয়কার্য একটি চলমান প্রক্রিয়া। বস্তুত ভূত্বকের পরিবর্তনকারী শক্তিসমূহের মধ্যে নদীর দ্বারাই ভূত্বকের সর্বাধিক পরিবর্তন সাধিত হয়ে থাকে।
ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(Depositional Landforms of River)
মধ্য এবং নিম্নগতিতে নদীবাহিত পাথরখণ্ড, নুড়ি, কাঁকর, বালি, পলি প্রভৃতি নদীখাতে সঞ্চিত হতে থাকে। নদীর উচ্চ প্রবাহে অপেক্ষাকৃত বড় আকারের ভারি পদার্থ যেমন- পাথর এবং নিম্নপ্রবাহে অর্থাৎ মোহনার নিকটবর্তী স্থানে অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের পদার্থ যেমন- বালি, নুড়ি ধীরে ধীরে সঞ্চিত হতে থাকে। একে নদীর অবক্ষেপণ কাজ বলে। নদীর অবক্ষেপণ কাজের ফলে নদী অববাহিকা ভরাট হয় এবং নদীর মধ্যে চর ও মোহনার কাছে বদ্বীপ গঠিত হয়। নদী দ্বারা সৃষ্ট সঞ্চয়জাত ভূমিরূপকে নিম্নলিখিত তিন ভাগে ভাগ করা যায়; যথা-
ক. প্রাথমিক গতিতে সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ :
১.পললপাখা: পার্বত্য অঞ্চলে নদী খাড়া ঢাল বেয়ে সমভূমিতে পতিত হলে নদীর স্রোতবেগ অনেক কমে যায়। ফলে নদীবাহিত পলি, বালি, কাঁকর, নুড়ি, প্রভৃতি পাহাড়ের পাদদেশে সঞ্চিত হয়ে হাতপাখার ন্যায় যে ভূমিরূপের সৃষ্টি করে তাকে পললপাখা বলে। চীনের জিনজিয়াং-এ কুনলুন পর্বতের পাদদেশে এরূপ ভূমিরূপ দেখা যায়।

২. পললকোণ: পলিজকোণ স্বল্প দূর পর্যন্ত বিস্তৃত, যা পাদদেশের মৃত্তিকার কাঠিন্যের ওপর নির্ভর করে। নদীববাহিত অপেক্ষাকৃত বৃহৎ শিলাখণ্ড (coarse material) দ্বারা পললকোণ সৃষ্টি হয়। যেমন- নিউজিল্যান্ডের সাউথ আইল্যান্ডে দেখা যায়।
৩. পাদদেশীয় পলল সমভূমি: পার্বত্য গতি নদীর পললকোণের বিস্তার বাড়তে বাড়তে পাদদেশের অব্যবহৃত অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত যে ভূমিরূপের সৃষ্টি করে তাকে পাদদেশীয় পলল সমভূমি বলে। বাংলাদেশের রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলে পাদদেশীয় সমভূমি দেখা যায়।
খ. মধ্যগতিতে সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ:
১. প্লাবন সমভূমি: বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাতের ফলে নদী দুকূল উপচে বন্যার সৃষ্টি করে। বন্যা শেষে বন্যাকবলিত এলাকায় পলির স্তর লক্ষ করা যায়। এভাবে বহুকাল অতীত হলে বন্যাকবলিত এলাকায় এক সমভূমির সৃষ্টি হয়। একে প্লাবন সমভূমি বলে। যেমন- যমুনার প্লাবন সমভূমি।

২. প্রাকৃতিক বাঁধ : বন্যার সময় নদীর উভয়কূল প্লাবিত হলে নদীবাহিত ভারি পদার্থসমূহ নদীর তীরে সঞ্চিত হয়। এতে নদী তীরে উঁচু বাঁধের ন্যায় ভূমিরূপের সৃষ্টি করে। এরূপ ভূমিরূপকে প্রাকৃতিক বাঁধ বলে। যেমন-মহানন্দা নদীর তীরে দেখা যায়।

৩. পশ্চাৎ ঢাল: প্রাকৃতিক বাঁধের পরে এক ধীর ও শান্ত ঢাল লক্ষ করা যায়। এ ঢালকে পশ্চাৎ ঢাল বলে। যেমন-মৌলভীবাজারের মনু নদীর ঢাল।
৪. পশ্চাৎ জলাভূমি: প্রাকৃতিক বাঁধের পশ্চাতে নদীর পলি সঞ্চয় ক্রমশ কম হওয়ায় তা নিম্নভূমিরূপে অবস্থান করে। বর্ষার পরে বন্যার পানি সরে গেলে এ নিম্নভূমিতে জল আবদ্ধ অবস্থায় থেকে যায়। প্রাকৃতিক বাঁধের পশ্চাতে অবস্থিত এরূপ জলাবদ্ধ ভূমিকে পশ্চাৎ জলাভূমি বলে। বাংলাদেশের অধিকাংশ নদীর স্বাভাবিক বাঁধের পশ্চাৎ জলাভূমি রয়েছে। যেমন-ঢাকা জেলার ধলেশ্বরী নদীর পশ্চিম প্রান্তের প্রাকৃতিক বাঁধের পশ্চাৎ দিকে এক 'বৃহৎ পশ্চাৎ জলাভূমি দেখতে পাওয়া যায়।

৫. বাঁকের চর: আঁকাবাঁকা নদীর যে তীরে স্রোত আঘাত হানে ঠিক তার বিপরীত দিকে পলি সঞ্চয়ের মাধ্যমে এক চরভূমির সৃষ্টি করে। একে বাঁকের চর বলে। মহানন্দা নদীতে এরূপ চর রয়েছে।
বালুচর: নদীর তলদেশে বালি, নুড়ি, কাদা ইত্যাদি জমা হয়ে যে নতুন চর সৃষ্টি হয় তাকে বালুচর বলে। বাংলাদেশের প্রায় সব নদীতেই বালুচর রয়েছে। বুড়িগঙ্গা নদীর কামরঙ্গীর চর, পদ্মা নদীর চিলমারী চর ও চর ভদ্রাসন, যমুনার চর কাজলা, মেঘনার চর দীঘলন্দ্র, চর আড়ালিয়া প্রভৃতি বৃহৎ চরের উদাহরণ।

৬. অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ: আঁকাবাঁকা নদীর মধ্যবর্তী সংকীর্ণ স্থানে কোনো এক প্লাবনের সময় ক্ষয়প্রাপ্ত হলে ঐ নদী তার পুরাতন বাঁকা পথটি পরিত্যাগ করে নতুন এক সোজাপথে প্রবাহিত হয়। ফলে পুরাতন খাতটি একটি হ্রদে পরিণত হয়। এরূপ হ্রদের আকৃতি অনেকটা অশ্বের ক্ষুরের ন্যায় বলে একে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ বলে। মিসিসিপি নদীতে এরূপ হ্রদ রয়েছে।

৭. কর্দম ছিপি: অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের মুখে প্রতিবছর পলি জমে জমে কোনো সময়ে হ্রদের উভয় মুখই বন্ধ হয়ে যায়। এ বন্ধ মুখকেই কর্দম ছিপি বলে। যেমন- মিসিসিপি নদীতে এরূপ ভূমিরূপ দেখা যায়।

৮. নদীমঞ্চ : শুষ্ক থেকে বর্ষাকাল পর্যন্ত নদীর পানির হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। ফলে নদীর পলিসমূহও ধাপে ধাপে সঞ্চিত হয়। একেই নদীধাপ বা নদীমঞ্চ বলে। যেমন- বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা প্রভৃতি নদী।

গ. নিম্নগতিতে সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ:
বদ্বীপ : নিম্নগতিতে নদীর স্রোতবেগ খুবই কমে যায়। ফলে নদীবাহিত পলি, বালি, কাঁকর প্রভৃতি তলানিরূপে নদীতে সঞ্চিত হতে থাকে। এ তলানি প্রথমে নদীর মোহনায় বিভিন্ন চরের সৃষ্টি করে। পরে চরসমূহের মধ্য দিয়ে নদীর স্রোতধারা বিচ্ছিন্ন হলে ত্রিকোণাকার এক নতুন ভূমিরূপের সৃষ্টি করে। এরূপ নতুন ভূমিরূপ মাত্রাহীন বাংলা 'Δ' অক্ষরের ন্যায় বলে একে বদ্বীপ বলে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গাঙ্গেয় বদ্বীপ বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত।

ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(River Bank Erosion)
সংজ্ঞা: পানি প্রবাহের কারণে নদীখাতে সৃষ্ট পার্শ্বক্ষয়কে নদীভাঙণ বলে। নদীভাঙনের কারণ: নদী ভাঙন বহুবিধ কারণে সংঘটিত হতে পারে। প্রধান কারণগুলোর মধ্যে বন্যা, অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, নদী ব্যবস্থাপনার ত্রুটি, অববাহিকাতে অতিরিক্ত বৃক্ষ কর্তন, নদীখাত থেকে অপরিকল্পিত বালু ও পাথর উত্তোলন প্রভৃতি ভাঙন ত্বরান্বিত করে। নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বাংলাদেশের নদী ভাঙনের প্রভাবক হিসাবে চিহ্নিত করা যায়-
১. নদীখাত অতিরিক্ত নিম্ন কিংবা পরিপূর্ণ হয়ে যাওয়া-এক্ষেত্রে অতিশয় খাড়া পাড় মাধ্যাকর্ষণজনিত টানে ভেঙে পড়ে। পরিপূর্ণ খাতের ক্ষেত্রে স্রোতের তোড়ে ভাঙন সৃষ্টি হয়।
২. প্লাবনের সময়ে নদী পাড়ের মৃত্তিকাতে দ্রুত পানি প্রবাহিত হয়ে তা আলগা হয়ে যায় এবং স্রোতের সাথে বহুদূর প্রবাহিত হয়।
৩. পাহাড়ি ঢলে নদীতীরের মৃত্তিকা সম্পৃক্ত ও আলগা হয়ে ভাঙনের সৃষ্টি হয়।
৪. নদীখাতের মধ্যে স্রোতের দিক ও বেগ পরিবর্তনের ফলে সম্মুখভাগে ভগ্নতট এবং অপর পাড়ে ঢালু ভূমির সৃষ্টি হয়।
৫. নদীর তরঙ্গের আঘাতও ভাঙনের অন্যতম কারণ।
৬. অতিরিক্ত বর্ষণের ফলে অববাহিকার পানি দ্রুত নদীখাতের দিকে ধাবিত হবার সময় তীর ভাঙনের সূচনা হয়।
৭. নদী উপত্যকা থেকে অপরিকল্পিত এবং অতিমাত্রায় বালু ও পাথর উত্তোলন ভাঙনের একটি কারণ। বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীতে বর্তমানে এই প্রক্রিয়ায় ভাঙনের সৃষ্টি হচ্ছে। যেমন- সুরমা।

নদীভাঙন প্রতিকার (Remedies of River Bank Erosion)
১. নদীর দু'তীরে বেড়ি বাঁধ নির্মাণ সাধারণভাবে ভাঙন প্রতিরোধের একটি প্রধান উপায়।
২. বর্ষা মৌসুমে নদী থেকে পানি অপসারণ করে (যেমন- খাল কেটে) স্রোতপ্রবাহ স্বাভাবিক খাত বরাবর রাখতে পারলে ভাঙন নিয়ন্ত্রিত হয়।
৩. বেড়িবাঁধের উপর গাছপালা লাগালেও মৃত্তিকার বাঁধন শক্ত থাকে।
৪. বাঁকের মুখে তলদেশ থেকে তীরভূমি পর্যন্ত পাথর বা সিমেন্টের বার ফেলে ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
নদীভাঙন নদীমাতৃক দেশের স্বাভাবিক চিত্র। এটি নদীশাসনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও সম্পূর্ণ প্রতিরোধ সম্ভবপর নয়।
ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(River System of Bangladesh)
বাংলাদেশের নদীগুলো সারাদেশে জালের মতো বিস্তৃত। নদীর চলার পথে কখনও কখনও ছোট ছোট অন্যান্য নদী বা জলধারা এসে মিলিত হয়ে প্রবাহদান করে-এগুলো উপনদী নামে পরিচিত। যেমন- পদ্মার উপনদী মহানন্দা। আবার কোনো নদী থেকে স্রোতধারা ভিন্ন পথে প্রবাহিত হলে তাকে শাখা নদী বলে। যেমন- মধুমতী পদ্মার শাখা নদী। একটি নদী; এর শাখা এবং উপনদী একত্রে একটি নদীপ্রণালি বা নদীব্যবস্থা (river system) গঠন করে।
বাংলাদেশে প্রায় ৭০০টি নদী, শাখা নদী ও উপনদীর সমন্বয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নদীব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের নদ-নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪,১৪০ কি.মি.। নদীব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের নদীমালাকে চারটি প্রধান নদীব্যবস্থা বা নদী প্রণালিতে বিভক্ত করা যেতে পারে। যেমন-(১) ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীব্যবস্থা, (২) গঙ্গা-পদ্মা নদীব্যবস্থা, (৩) সুরমা-মেঘনা নদীব্যবস্থা এবং (৪) চট্টগ্রাম অঞ্চলের নদ-নদীসমূহ।

১. ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীব্যবস্থা: এ নদীব্যবস্থা প্রায় ২৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং বাংলাদেশের উত্তরাংশ থেকে গঙ্গার সঙ্গে মিলিত হওয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। বাংলাদেশের বাইরে এই নদী ব্যবস্থা প্রায় ৫,৮৩,০০০ বর্গ কিলোমিটারের একটি নিষ্কাশন অঞ্চলসহ ২,৮৫০ কিলোমিটার সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে এসেছে। ব্রহ্মপুত্র নদী তিব্বতের মানস সরোবর থেকে সাংপো নামে উৎপন্ন হয়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশের মধ্য দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নামে প্রবাহিত হয়েছে। প্রবাহপথে পাঁচটি প্রধান উপনদী থেকে ব্রহ্মপুত্র পানি সংগ্রহ করেছে যার মধ্যে আসামের ডিবং (dibang) এবং লোহিত (lohit); বাংলাদেশের তিস্তা প্রখ্যাত। এ ধারা পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার মাজাহরালীতে দক্ষিণ দিকে মোড় নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এখান থেকে নদীর নাম হয়েছে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা। অধিকতর ক্ষেত্রে যমুনা নামেই পরিচিত। এ ধারা দক্ষিণে ২৭৭ কি.মি. প্রবাহিত হয়ে আরিচার কাছে আলেকদিয়ায় পদ্মা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এ মিলিত ধারা পদ্মা নামে দক্ষিণ-পূর্বদিকে প্রায় ২১২ কি.মি. প্রবাহিত হয়ে চাঁদপুরের নিকট মেঘনায় পতিত হয়েছে।
করতোয়া যমুনার দীর্ঘতম উপনদী। এর মূলধারা ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার বৈকুণ্ঠপুর জলাভূমিতে উৎপন্ন হয়ে পঞ্চগড় জেলার ভিটগড়ের কাছে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এরপর দিনাজপুর জেলার খানসামার নিকট থেকে এটি আত্রাই নামে পরিচিত। সেখান থেকে দক্ষিণ দিকে সমাধি ঘাট পর্যন্ত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। এ ধারা পুনরায় রাজশাহী জেলার দেওয়ানপুরে বাংলাদেশে প্রবেশ করে বরেন্দ্রভূমির মধ্য অংশকে পূর্ব ও পশ্চিমে বিভক্ত করে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে। সবশেষে দক্ষিণ-পূর্বে মোড় নিয়ে পাবনার বাঘাবাড়ির কাছে যমুনায় পতিত হয়েছে। আত্রাই নদীর নিম্নাংশ দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবহমান। করতোয়ার অন্য একটি অংশ জলপাইগুড়ি জেলায় উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে আত্রাই নদীতে পতিত হয়েছে। করতোয়ার এ অংশ পাবনা-করতোয়া নামে পরিচিত।
ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর বামতীরে ধলেশ্বরী নদীর পূর্ব পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য শাখা নদী নেই। তবে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র বাহাদুরাবাদের নিকট থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মোড় নিয়ে জামালপুর ও ময়মনসিংহ শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভৈরব বাজারের নিকট মেঘনায় পতিত হয়েছে। ১৭৮৭ সালে আসামে সংঘটিত প্রলয়ঙ্করী বন্যার ফলে ব্রহ্মপুত্র নদের বর্তমান যমুনা নদী বরাবর স্থানান্তরের পূর্বে এটিই ছিল ব্রহ্মপুত্রের প্রধান ধারা। এ নদীর শাখানদীগুলো হচ্ছে বংশী, বানার, শ্রীকালী ও সাতিয়া। বংশী নদী দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে তুরাগ নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে মিলিত স্রোতধারা ঢাকার অদূরে বুড়িগঙ্গায় পতিত হয়েছে। বানার, শ্রীকালী ও সাতিয়ার মিলিত প্রবাহ শীতলক্ষ্যা নামে প্রবাহিত হয়ে মুন্সিগঞ্জের নিকট ধলেশ্বরীর সঙ্গে মিলেছে। ধলেশ্বরী যমুনা নদীর দক্ষিণ তীরের বড় শাখানদী। এটি দক্ষিণে মুন্সিগঞ্জের কাছে শীতলক্ষ্যায় পতিত হয়েছে। শীতলক্ষ্যা আরও দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে গজারিয়ার নিকট মেঘনায় পতিত হয়েছে।
২. গঙ্গা-পদ্মা নদীব্যবস্থা: এটি বৃহত্তর গঙ্গা নদী প্রণালির একটি অংশ। হিমালয় পর্বতের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে সৃষ্ট ভাগীরথী এবং মধ্য হিমালয়ের নন্দাদেবী শৃঙ্গের উত্তরে অবস্থিত গুরওয়াল থেকে সৃষ্ট অলোকনন্দা নদীর মিলিত ধারা গঙ্গা নাম ধারণ করে ভারতের হরিদ্বারের কাছে সমভূমিতে পৌঁছেছে। এ ধারা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে রাজমহল পাহাড়ের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করে। এরপর রাজশাহী জেলায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকায় ১১২ কি.মি. প্রবাহিত হয়ে কুষ্টিয়া জেলার উত্তর প্রান্তে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এদেশে নদীটির নাম পদ্মা। আরিচার কাছে যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়ে পদ্মা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়। চাঁদপুরের কাছে নদীটি মেঘনার সাথে মিলিত হয়েছে। পদ্মার মোট দৈর্ঘ্য ৩২৪ কি.মি.।
উত্তর দিক থেকে আগত পদ্মার প্রধান উপনদী মহানন্দা। পশ্চিমবঙ্গের সর্ব উত্তরের দার্জিলিং-এর নিকটবর্তী পাহাড় শ্রেণি থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার উপর দিয়ে নদীটি প্রবাহিত হয়। এই নদী পঞ্চগড়ের তেতুঁলিয়া সীমান্ত এলাকা হয়ে ভারতের পূর্ণিয়া ও মালদহ জেলা অতিক্রম করে নবাবগঞ্জের কাছে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এখান থেকে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে গোদাবাড়ীর কাছে পদ্মায় পতিত হয়েছে। নাগর, টাঙ্গন ও পুনর্ভবা মহানন্দার উপনদী।
বড়াল পদ্মার বামতীরের শাখানদী। এ নদী চারঘাটের কাছে উৎপন্ন হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে আটঘড়িয়ার কাছে দুভাগে ভাগ হয়ে মূল স্রোত নন্দনকুজা নামে প্রবাহমান। পদ্মার আরেকটি শাখানদী ইছামতি। এটি পাবনা শহরের দক্ষিণে গঙ্গা থেকে বের হয়ে পাবনা শহরকে দুভাগ করে উত্তর পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে বেড়া থানার পাশ দিয়ে হুরাসাগরে পড়েছে। বর্তমানে এ নদীর উজানে পাবনা শহরের কাছে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে সচল ধারা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটি এখন নিষ্কাশন খাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
৩. সুরমা-মেঘনা নদীব্যবস্থা: বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদী হলো মেঘনা। পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপাত সম্পন্ন অঞ্চলের একটি ধারা (drains) মেঘনা নদীর মাধ্যমে নিষ্কাশিত হয় (মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত প্রায় ১,০০০ সে.মি.)। নদীটির উৎপত্তি ভারতের শিলং ও মেঘালয় পাহাড়ে। এর প্রধান উৎস বরাক নদী। বরাক-মেঘনার মিলিত দৈর্ঘ্য ৯৫০ কিলোমিটারের মধ্যে বাংলাদেশে ৩৪০ কিলোমিটার অবস্থিত। সিলেট জেলার অমলশিদে বাংলাদেশ সীমান্তে বরাক নদী দুই ভাগে ভাগ হয়ে সুরমা ও কুশিয়ারা নদী গঠন করেছে। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর মধ্যবর্তী এলাকাটি হাওর এলাকা যা বর্ষা মৌসুমে গভীরভাবে প্লাবিত থাকে। সুরমা ও কুশিয়ারা মারকুলির কাছে পুনরায় মিলিত হয় এবং মেঘনা নামে ভৈরব হয়ে প্রবাহিত হয়ে চাঁদপুরে পদ্মা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। ত্রিপুরা পাহাড় থেকে উৎপন্ন গোমতী ও খোয়াই নদী মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। মেঘালয় ও আসাম থেকে উৎপন্ন আরও কতগুলো পাহাড়ি স্রোতধারা মেঘনার সাথে মিশেছে। ভৈরব বাজার পর্যন্ত সুরমা-মেঘনা নদী প্রণালির নিষ্কাশন এলাকার মোট আয়তন প্রায় ৮০২,০০০ বর্গ কি.মি. যার মধ্যে ৩৬,২০০ বর্গ কি.মি. বাংলাদেশে অবস্থিত।
৪. চট্টগ্রাম অঞ্চলের নদীব্যবস্থা: দেশের অন্যান্য নদী প্রণালি থেকে এই নদী প্রণালি বিচ্ছিন্ন। এই অঞ্চলের প্রধান নদী কর্ণফুলী, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। এর উৎপত্তিস্থল মিজোরামের (ভারত) লুসাই পাহাড়ে। এটি রাঙামাটি এবং বন্দর নগরী চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পতেঙ্গার কাছে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত। কাপ্তাই নামক স্থানে এই নদীর উপর বাঁধ নির্মাণ করে দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। এ অঞ্চলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদী হলো- ফেনী, মুহুরী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, বাকখালি এবং নাফ।
এই চারটি বৃহৎ নদী প্রণালির মাধ্যমে প্রায় ১৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চলের পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে নদীগুলো তাদের সর্বোচ্চ পরিমাণে প্রবাহিত হয় এবং মোট প্রবাহমাত্রা দাঁড়ায় প্রায় ১৪০,০০০ কিউসেক এবং শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ ৭,০০০ কিউসেক হ্রাস পায়।
ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(River Made Landforms in Bangladesh)
বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত বিভিন্ন নদী দ্বারা যেসব ভূমিরূপের সৃষ্টি হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
১। ক্ষয়জাত ভূমিরূপ: বাংলাদেশের নদীগুলোর মধ্যেও নিম্নগতি দেখা যায়। এ পর্যায়ে ক্ষয়কাজের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ কম হয়ে থাকে। তথাপি এখানে কিছু ক্ষয়জাত ভূমিরূপ দেখা যায়। যেমন-
ক) নদীসোপান : বাংলাদেশের অনেক নদীতে নদীসোপান ভূমিরূপ দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে। যেমন- ধলেশ্বরী, বানার, বংশী প্রভৃতি নদীতে এ ভূমিরূপ দেখা যায়।
খ) জলপ্রপাত: বাংলাদেশের বান্দরবান শহরের নিকটে শৈলপ্রপাত নামক স্থানে এবং মৌলভীবাজার জেলার মাধবকুন্ড এলাকায় জলপ্রপাত লক্ষ করা যায়।
গ) নদীছেদন: নদী যখন বাঁক সৃষ্টি করে প্রবাহিত হয় তখন নদী চলার পথে নরম শিলা কেটে প্রবাহিত হয়। ফলে অনেক সময় নদী বাঁকা পথ পরিহার করে সোজা পথে প্রবাহিত হয়। নদীর এ অবস্থাকে নদীছেদন বলে। বাংলাদেশের পদ্মা, যমুনা প্রভৃতি নদীতে এ ধরনের ভূমিরূপ দেখা যায়।
২। সঞ্চয়জাতের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ: বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলো ব্যাপকভাবে সঞ্চয়কার্যের ফলে ভূমিরূপ সৃষ্টি করে। যেমন-
ক) পাদদেশীয় পলল সমভূমি: বাংলাদেশের রংপুর ও দিনাজপুর জেলার নদীসমূহ দ্বারা এ ধরনের ভূমিরূপ লক্ষ করা যায়।
খ) প্লাবন সমভূমি: বাংলাদেশের অধিকাংশ নদী দ্বারা সঞ্চয়কাজের ফলে প্লাবন সমভূমি লক্ষ করা যায়। নদী যখন শেষ পর্যায়ে উপনীত হয় তখন এর বহন ক্ষমতা হ্রাস পায়, ফলে বর্ষাকালে দুপাড় উপচে পানি প্রবাহিত হয়ে পলি সঞ্চিত হয়ে প্লাবন সমভূমির সৃষ্টি করে।
গ) নদীর বাঁক : বাংলাদেশের পদ্মা, যমুনা প্রভৃতি নদীতে এ ধরনের ভূমিরূপ লক্ষ করা যায়।
ঘ) অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ : বাংলাদেশের পদ্মা নদীর ক্ষেত্রে এ ধরনের ভূমিরূপ লক্ষ করা যায়। এছাড়া বাংলাদেশের নদীব্যবস্থায় সৃষ্ট ভূমিরূপের মধ্যে প্রাকৃতিক বাঁধ, পশ্চাৎ জলাভূমি, বদ্বীপ প্রভৃতি অন্যতম।
নদী শাসন (River Training)
নদীর উপর মানুষ তার প্রয়োজনে বিভিন্ন স্থাপনা সৃষ্টি করে। এভাবে নদীর উপর বাঁধ বা সেতু নির্মাণ করে বা অন্য কোনো প্রয়োজনে নদী প্রবাহে বাঁধা সৃষ্টি করা হলে একে নদীশাসন বলে। বাংলাদেশে নদীশাসন বলতে যেসব বাঁধ দেখা যায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে তিস্তা বাঁধ। এই বাঁধ কৃষিকাজের সুফলের জন্য তৈরি করা হলেও এর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার কারণে নদীর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বিঘ্নিত হচ্ছে। তেমনি গঙ্গার উপর ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে যে নদীশাসন করছে তাতে বাংলাদেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বর্ষাকালে বাংলাদেশের পানির প্রয়োজন না হলেও ভারত থেকে নদী শাসিত এই ফারাক্কা বাঁধ বন্যার সৃষ্টি করে।
নদীশাসনের লক্ষ্য-
i. নদীর তরলদেশ ও তীরকে ক্ষয় বা ভাঙন থেকে রক্ষা করা।
ii. নদী প্রবাহকে নির্দিষ্ট খাতে ও দিকে রাখা।
iii. আশেপাশের ভূমি বা জমিকে বন্যামুক্ত রাখা।
iv. হাইড্রোলিক কাঠামো (স্রোতের গতি পানির পরিমাণ) ইত্যাদি ঠিক রাখা।
নদীশাসন কাজের যেসব ধরণ সাধারণত লক্ষ করা যায় সেগুলো হলো-
i. বাঁধ তৈরি, ii. নদী তীর রক্ষা, iii. গ্রোয়েন (groynes) নির্মাণ, vi. নদী খনন, v. তলদেশ রক্ষা।
ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(Movement of Plates)
পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশের আবরণ কতকগুলো প্লেট বা স্লাব দ্বারা গঠিত। অর্থাৎ ভূত্বক হচ্ছে মহাদেশ ও মহাসাগরের উপরিভাগ যা নমনীয়মণ্ডল তথা ম্যান্টেলের (mantle) উপরিভাগের ওপর দিয়ে সদা সর্বদা চলমান।

আমেরিকার ভূতত্ত্ববিদ এক্স.লি. পিচন (১৯৬৮) এর মতে, পৃথিবীতে ৭টি বৃহৎ পাত এবং ২০টি ক্ষুদ্র পাতের অবস্থান রয়েছে।
৭টি বৃহৎ প্লেট হলো:
১. প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত (Pacific plate);
২. ইউরেশিয়ান পাত (Eurasian plate);
৩. উত্তর আমেরিকান পাত (North American plate);
৪. দক্ষিণ আমেরিকান পাত (South American plate);
৫. আফ্রিকান পাত (African plate);
৬. অস্ট্রেলীয় পাত (Australian plate) এবং
৭. অ্যান্টার্কটিকান পাত (Antarctican plate) ।
এ প্লেটগুলো ম্যান্টেলের (upper mantle) উপরিভাগে এবং সমুদ্র তলদেশীয় ভূত্বকের (oceanic crust) নিচের অংশে অ্যাস্থিনোস্ফিয়ারের (Asthenosphere) উপরে ভেসে রয়েছে। অ্যাস্থিনোস্ফিয়ারের উপরের ভাগ পিচ্ছিল বা তৈলাক্ত পদার্থের দ্বারা গঠিত যার উপরে অবস্থিত প্লেটগুলো সদা চলমান রয়েছে। প্লেটগুলোর এ চলাচলই হলো পাত সঞ্চালন। বিভিন্ন প্লেটের গতির ফলে ভূত্বকের পরিবর্তন সাধিত হয় এবং বিভিন্ন ধরনের ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়।
পাত সঞ্চালন গতি (Plate Movement): সঞ্চালন পাতগুলোর গতির ধরনের উপর নির্ভর করে পাত সঞ্চালন গতিকে
নিম্নোক্ত ৩ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
১. সংকোচন গতি (Compressional movement);
২. সম্প্রসারণ গতি (Extensional movement) এবং
৩. পার্শ্বীয় গতি (Lateral movement)।
প্লেটের গতির কারণ: প্লেটের গতিময়তার পেছনে কোন কোন শক্তি কাজ করছে তা এখনও পুরোপুরি সুস্পষ্ট নয়। প্লেটের গতির কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন বিজ্ঞানী নানা মত পোষণ করেন। সাধারণভাবে প্লেটের গতির কারণ হিসাবে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে উল্লেখ করা হয়ে থাকে:
১. পরিচলন স্রোত (Convection current);
২. আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত (Volcanic eruption);
৩. ঘনত্বের তারতম্য (Density difference);
৪. চৌম্বকত্বের তারতম্য ও চুম্বক মেরুর পরিবর্তন (Magnetic anomaly and change of magnetic pole);
৫. ভূমিকম্প (Earthquake);
৬. জোয়ার-ভাটা (Tidal action);
৭. কেন্দ্রাতিগ ও কেন্দ্রাভিগ বল (Centrifugal and centripetal force);
৮. ধাক্কা ও টান প্রক্রিয়া (Push and pull mechanism);
৯. নিম্নভিমুখী টেনে নেওয়ার তত্ত্ব (Subductional drag hypothesis) এবং
১০. উত্তপ্ত বিন্দুতে টেনে নেওয়ার তত্ত্ব (Hot Spot drag theory) ।
পরিচলন স্রোত: আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, পর্বত ও মালভূমি ইত্যাদি সৃষ্টির জন্য শক্তির প্রয়োজন। এ শক্তির উৎস হিসেবে বিজ্ঞানীগণ ভূঅভ্যন্তরে ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, প্লুটোনিয়াম এবং রেডিয়াম প্রভৃতি পদার্থের তেজস্ক্রিয়তাকে দায়ী করেন। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এ সকল পদার্থের তেজস্ক্রিয়তা হতে ভূঅভ্যন্তরে পরিচলন স্রোতের সৃষ্টি হয় এবং এ পরিচলন স্রোতই প্লেটসমূহকে চলাচলে সহায়তা করে।

ভূঅভ্যন্তরে উত্তপ্ত তরল পদার্থ বিভিন্ন গ্যাসের সংস্পর্শে আরও উত্তপ্ত হয়ে পরিচলন স্রোতের সৃষ্টি করে। অর্থাৎ পরিচলন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অ্যাস্থিনোস্ফিয়ারে গলিত ম্যাগমা উভয় দিকে ধাবিত হয়ে প্লেট স্থানান্তর করে বলে ধারণা করা হয়।
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত: আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পৃথিবীর অভ্যন্তরস্থ লাভা বের হয়ে আসার মুহূর্তে পার্শ্ববর্তী প্লেটে প্রচণ্ড চাপ ও ধাক্কার ফলে প্লেটে গতিময়তা তৈরি হতে পারে।
ঘনত্বের তারতম্য: ভূঅভ্যন্তরস্থ গলিত পদার্থের স্তরে ঘনত্বের তারতম্যও প্লেট চলাকালে গতি সঞ্চার করতে পারে।
চৌম্বকত্বের তারতম্য: চুম্বকত্বের তারতম্য ও চুম্বক মেরুর স্থান পরিবর্তনের কারণেও প্লেট চলাচল করে।
ভূমিকম্প: পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ভূমিকম্প হলে ঐ সকল অঞ্চলের প্লেটের ওপর তার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ প্লেট গতিপ্রাপ্ত হতে পারে।
জোয়ার-ভাটা: পৃথিবীর অভ্যন্তরের গলিত পদার্থ সবসময় চলমান। এর মধ্যে যখন জোয়ার-ভাটা দেখা দেয় তখন জোয়ারের ফলে সৃষ্ট স্ফীত অংশ প্লেটের ওপর প্রচণ্ড চাপ দেয়, ফলে উপরস্থ প্লেটে গতির সঞ্চার হতে পারে।
কেন্দ্রাতিগ ও কেন্দ্রাভিগ বল: ঘূর্ণায়মান পৃথিবীর ওপর সব সময় দুটি বল কার্যরত। একটি কেন্দ্রাভিগ বা অন্তর্মুখী বল
যা পৃথিবীর সকল বস্তুকে নির্জের কেন্দ্রের দিকে টেনে রাখতে চায় এবং অন্যটি বহির্মুখী বা কেন্দ্রাতিগ বল যা, পৃথিবীর সকল বস্তুকে বাইরে নিক্ষেপ করতে চায়। ফলে এ দুটির মধ্যে ভারসাম্যের সৃষ্টি হয় ঠিকই, কিন্তু প্লেটগুলোকে সঞ্চালন ঘটাতে সাহায্য করে।
ধাক্কা ও টান পদ্ধতি: কোনো কারণে অ্যাস্পেনোস্ফিয়ারের নিচের গলিত পদার্থ আয়তনে বৃদ্ধি পেলে এটি ভূপৃষ্ঠকে উপরের দিকে ধাক্কা দেয় এবং তার ফলে প্লেট সঞ্চালন হয়। দুটি প্লেটের যেকোনো একটি ভূকম্পনের কারণে নিম্নে অবনমিত হলে এর আকর্ষণে অপর প্লেটটি আকর্ষিত হয়ে নিম্নে অবনমিত হয়। তাছাড়া ভূঅভ্যন্তরে তাপমাত্রা ভূপৃষ্ঠ অপেক্ষা অনেক বেশি। তাই ভূঅভ্যন্তরের উত্তপ্ত গলিত ধূম, ভস্ম ও ম্যাগমা সর্বদাই বাইরে চলে আসতে চায় এবং ভূপৃষ্ঠের দিকে প্রবল চাপ প্রয়োগ করে ধাক্কা দিয়ে প্লেট চলাচলে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

নিম্নাভিমুখী টেনে নেওয়ার তত্ত্ব: পৃথিবীপৃষ্ঠের গভীর খাতসমূহ প্লেট সীমান্তের সাথে সম্পর্কিত। যেখানে গভীর খাত
আছে সেখানে পৃথিবীপৃষ্ঠ গভীরভাবে ভেতরে ঢুকে গেছে। যে কোনো গভীরতায় ভূপৃষ্ঠের শক্ত প্লেটসমূহ ম্যান্টেল অপেক্ষা কঠিন। অবনমিত প্লেট নিচের দিকে ম্যান্টেলের উত্তপ্ত পদার্থের সংস্পর্শে গলে যায় এবং নিচের দিকে টানের সৃষ্টি করে এবং এ টানই প্লেটসমূহকে চলাচল করতে সহায়তা করে।
উত্তপ্ত বিন্দুতে টেনে নেওয়ার তত্ত্ব: উত্তপ্ত বিন্দু (hot spot) বলতে প্রকৃতপক্ষে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতস্থলকেই বোঝানো হয়েছে। বিজ্ঞানীগণ প্রায় ১০০ উত্তপ্ত বিন্দু আবিষ্কার করেছেন। ম্যান্টেল থেকে উত্থিত এক প্রকার পললের ন্যায় লাভাই উত্তপ্ত বিন্দু। এগুলোর আকর্ষণ বা টান প্লেট চলাচলে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
ভূমিরুপ পরিবর্তন . খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(Earthquake)
ভূত্বক পরিবর্তনকারী প্রক্রিয়াসমূহ প্রতিনিয়ত ক্রিয়াশীল। বৈচিত্র্যময় ভূপৃষ্ঠের আকস্মিক বা দ্রুত পরিবর্তনকারী শক্তিগুলোর মধ্যে ভূমিকম্প অন্যতম। ভূঅভ্যন্তরের বা ভূপৃষ্ঠে ক্রিয়াশীল শক্তিসমূহের কারণে ভূমিকম্প সংঘটিত হয়ে থাকে। ভূমিকম্প স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ভূপৃষ্ঠের ব্যাপক পরিবর্তন আনে, যার ফলে জানমালে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। কোনো ধরনের পূর্ব লক্ষণ ছাড়াই ভূমিকম্প সংঘটিত হয়ে থাকে।
"An Earthquake is a sudden tremor or movement of the earth's crust, which originates naturally at or below the surface." (coursehero.com)অর্থাৎ ভূমিকম্প হলো ভূত্বকের হঠাৎ কম্পন বা সঞ্চালন যা' প্রাকৃতিকভাবে ভূপৃষ্ঠে বা তার তলদেশে সংঘটিত হয়।
ভূমিকম্পের কারণ: নিম্নলিখিত প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক কারণসমূহের জন্য ভূমিকম্প সংঘটিত হয়ে থাকে।
প্রাকৃতিক কারণ: ভূমিকম্পের কারণ অনুসন্ধানকালে ভূবিদগণ লক্ষ করেন পৃথিবীর কয়েকটি বিশেষ অঞ্চলে অধিক ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। তাদের মতে, নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালা, ভূগঠন প্লেটসমূহের সীমান্ত অঞ্চলে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে। তারা ভূমিকম্পের যে কারণসমূহ সনাক্ত করেছেন সেগুলো হচ্ছে-
i. প্লেটগতির তারতম্যের ফলে ভূত্বকে যে ফাটল বা চ্যুতির সৃষ্টি হয় তা ভূকম্পন ঘটিয়ে থাকে। প্লেটের পার্শ্বীয় সম্প্রসারণ অথবা সংকোচন গতি ভূমিকম্পের প্রধান কারণ।
ii. ভূঅভ্যন্তরে বা ভূত্বকের নিচে ম্যাগমার সঞ্চারণ অথবা চ্যুতিরেখা বরাবর চাপমুক্ত হওয়ার কারণে ভূকম্পন হয়ে থাকে।
iii. প্লেটের পার্শ্বীয় গতির কারণে ভূগর্ভে শিলাচ্যুতি ঘটে থাকে। এ স্থানচ্যুত শিলা নিচের স্থিতিস্থাপক শিলায় ধাক্কা খেয়ে ভূত্বকের নিচে ফিরে এসে প্রচণ্ড আঘাত করে যা স্থিতিস্থাপক প্রতিক্ষেপন নামে পরিচিত। পৃথিবীর বড় বড় ভূমিকম্প ঐ প্রক্রিয়ায় সংঘটিত হয়। এ প্রকার ভূমিকম্পে ভূত্বক নতুন অবস্থা পরিগ্রহ করে।
iv. ভূঅভ্যন্তরে স্থানচ্যুত শিলাসমূহের সংঘর্ষের ফলে ভূত্বকে ধাক্কা লেগে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
v. প্লেট সীমানা বরাবর মহাসাগরের জলরাশি অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারে প্রবেশ করলে প্রচন্ড উত্তাপে ঐ বিপুল জলরাশি বাষ্পে পরিণত হয়ে ভূত্বকের নিচে সজোরে আঘাত করে। এ প্রক্রিয়ায় আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও ভূমিকম্প একইসঙ্গে সংঘটিত হয়ে থাকে। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ভূমিকম্পের অন্যতম প্রধান কারণ। এ অগ্ন্যুৎপাতের সময় সন্নিহিত এলাকায় অনিবার্যভাবেই প্রচণ্ড ভূমিকম্প হয় এবং ভূত্বকে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগ্নেগিরির অগ্ন্যুৎপাত ও তৎসহ ভূমিকম্পের কারণে ইন্দোনেশিয়ার ক্লাকাতোয়া দ্বীপ সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত হয়।
vi. উত্তপ্ত পৃথিবী ক্রমশ তাপ বিকিরণের মাধ্যমে শীতল হচ্ছে। ভূপৃষ্ঠ যথেষ্ট শীতল হলেও ভূত্বকের উত্তপ্ত নিম্নস্তর এখনও তাপ বিকিরণের মাধ্যমে শীতল হয়ে সংকুচিত হচ্ছে। ফলে উভয় স্তরের মধ্যে আয়তনগত সমতা বিনষ্ট হওয়ার কারণে অনেক সময় ভূমিকম্প হয়ে থাকে।
vii. ভূঅভ্যন্তরে অধিক তাপে গলিত পদার্থ অথবা প্রবিষ্ট পানির পরিচলন স্রোতের তারতম্যের প্রভাবে ভূত্বক কেঁপে ওঠে।
অপ্রাকৃতিক কারণ: মানুষের নানা ধরনের কর্মকান্ড কিছু ক্ষেত্রে ভূকম্পনের জন্য দায়ী। যেমন-
i. খনি অঞ্চলে খননকার্যের ফলে যে খালি জায়গার সৃষ্টি হয় তথায় দুর্ঘটনাবশত কখনও কখনও ভূমি ধসে পড়ে। ফলে নিকটবর্তী কিছু দূর পর্যন্ত ভূমিকম্প হয়।
ii. ভূগর্ভে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটলে এর প্রভাবে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
iii. ভূতাত্ত্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যও মাঝে মাঝে বিস্ফোরণের মাধ্যমে মৃদু ভূমিকম্প ঘটে থাকে।
iv. জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির কারণে অবাধে বন উজাড় হচ্ছে এবং মৃত্তিকা ক্ষয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে, মানব বসতি কিংবা নগরায়ণের কারণে অবাধে পাহাড় কাটার ফলে ভূপৃষ্ঠের উপরের চাপ হ্রাস পাচ্ছে। দীর্ঘদিন এ ধরনের প্রক্রিয়া চলার কারণে ভূত্বকের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে ভূমিকম্প হতে পারে।
ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(Consequence of Earthquake)
ভূমিকম্পের ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ। আর কোনো প্রাকৃতিক শক্তি এত অল্প সময়ে জানমাল এবং প্রকৃতির এত বেশি ক্ষতি করতে পারে না। এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে ভূপৃষ্ঠের এবং জানমালের যে ক্ষতি সাধিত হয় তা নিচে দেওয়া হলো-
i. ভূমিকম্পের ফলে ভূত্বকে অনেক ফাটল ও চ্যুতির সৃষ্টি হয়। এ ফাটল ও চ্যুতির মধ্য দিয়ে উষ্ণ পানি, কর্দম, বালি প্রভৃতি নির্গত হয় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে। এছাড়া চ্যুতি সৃষ্টিকালে মধ্যবর্তী ভূভাগ বসে গিয়ে গ্রস্ত উপত্যকা এবং উপরে উত্থিত হয়ে স্তূপ পর্বতের সৃষ্টি করে।
ii. ভূমিকম্পের ফলে কখনো কখনো সমুদ্রতল উপরে ভেসে উঠে আবার কখনও কখনও উপকূলভাগ সমুদ্রতলে ডুবে যায়। যেমন: ১৯২৩ সালের ভূমিকম্পে জাপানের সাগামী উপসাগরের অংশবিশেষ ২১৫ মিটার উপরে উঠে যায়।
iii. ভূমিকম্পের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয় বা 1 নদীতল উপরে উঠে শুকিয়ে যায়। ১৯৫০ সালে আসামের দিবং নদীর গতি এভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল। ১৮৮৭ সালে এক ভূমিকম্পে আমাদের দেশের ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তিত হয়। পরবর্তীতে তা যমুনা নামে নতুন পথে প্রবাহিত হচ্ছে।
iv. ভূমিকম্পের ফলে কখনও উচ্চভূমি সমুদ্রের পানিতে নিমজ্জিত হয় আবার সমুদ্রের তলদেশের কোনো কোনো স্থান উঁচু হয়ে দ্বীপের সৃষ্টি করে। ১৮৯৯ সালের ভূমিকম্পে কচ্ছ উপসাগরের উপকূলের প্রায় ৫,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা সমুদ্রগর্ভে হারিয়ে যায়।
ভূমিকম্প কীভাবে পরিমাপ করা হয়?
আমেরিকান বিজ্ঞানী সি. আর রিখটার ১৯৩৫ সালে ভূমিকম্পের তীব্রতা নির্ণয়ের জন্য যে স্কেল প্রবর্তন করেন, তা রিখটার স্কেল হিসেবে খ্যাত। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মান নিম্নরূপ-
| ক্রম নং | রিখটার স্কেল মান | তীব্রতার মাত্রা | ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ |
| ১. | ৩ এর কম | অতি মৃদু | কেবল যন্ত্রে ধরা পড়বে। |
| ২. | ৩-৩.৯ | মৃদু | যন্ত্রে ধরা পড়বে। মৃদু বোঝা যাবে। |
| ৩. | ৪-৪.৯ | হালকা | দরজা-জানালায় কাপুনি। পানিতে আলোড়ন। |
| ৫-৫.৯ | মধ্যম | দেওয়ালে ফাটল, জনমনে আতঙ্ক। স্বল্প ক্ষয়ক্ষতি। | |
| ৫. | ৬-৬.৯ | শক্তিশালী | ভূমিধ্বস, কাঁচা বাড়ি ধ্বংস, দালানে ফাটল। |
| ৬. | ৭-৭.৯ | প্রবল | ভূমিধ্বস, পাকা দালানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। ভূমিতে ফাটল, হিমানী সম্প্রপাত। |
| ৭. | ভয়াবহ | জনপদ বিধ্বস্ত। ব্যাপক সম্পদ ও প্রাণহানি। ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি। |
v. ভূমিকম্পের প্রবল ঝাঁকুনিতে ভূপৃষ্ঠে আনুভূমিক পার্শ্বচাপের প্রভাব পড়ে। ফলে এটি কুঁচকে ভাঁজের সৃষ্টি করে। (হিমালয় পর্বতমালায় এরূপ ভাজ দেখা যায়)।
vi. ভূমিকম্পের ফলে পার্বত্য অঞ্চলে হিমানী সম্প্রপাত হয়। আল্পস পার্বত্য অঞ্চলে এরূপ দেখা যায়।
vii. ভূমিকম্পের ফলে উঁচু পর্বত থেকে শিল্যাচ্যুতি বা পাহাড়ে ভূমিধস ঘটে।
viii. ভূমিকম্পের ফলে সমুদ্রের পানি তীর থেকে অনেক নিচে নেমে যায়। আবার পরক্ষণেই ভীষণ গর্জন সহকারে ১৫-২০ ফুট উঁচু হয়ে উপকূল ভাগে বন্যার সৃষ্টি হয়। গভীর সমুদ্র বা মহাসাগরে ভূমিকম্প সংঘটিত হলে তথায় ব্যাপক ধ্বংসাত্মক ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়।
একে জাপানি ভাষায় সুনামি প্রবাহ বলে। ২০০৪ সালের সুনামিতে ভারত মহাসাগরের উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৩ লক্ষ লোক প্রাণ হারায়।
ix. ভূমিকম্পের ফলে অসংখ্য ঘরবাড়ি, গাছপালা ও জীবজন্তুর ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি সাধিত হয়। ১৯৮৮ সালের ৭ডিসেম্বর রাশিয়ার আর্মেনিয়াতে প্রচণ্ড ভূমিকম্পে লক্ষাধিক লোক মাটির নিচে চাপা পড়ে এবং চার লক্ষাধিক লোক গৃহহীন হয়ে পড়ে।
ভূমিকম্পের তীব্রতা: ভূঅভ্যন্তরের যে স্থানে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয় তাকে কেন্দ্র বলে। কেন্দ্রের সোজা ওপরে ভূপৃষ্ঠস্থ বিন্দুর নাম উপকেন্দ্র। ভূমিকম্পের কেন্দ্র ভূঅভ্যন্তরের প্রায় ০৫-১১০০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থান করতে পারে। ভূমিকম্পের তীব্রতা অনুযায়ী পৃথিবীর একপ্রান্তে অবস্থিত ভূকম্পনকেন্দ্র হতে সৃষ্ট তরঙ্গমালা পৃথিবীর অপরপ্রান্ত পর্যন্ত পৌছাতে পারে। অবশ্য কেন্দ্র হতে তরঙ্গগুলো যতই দূরে অগ্রসর হয় ততই নিস্তেজ হয়ে পড়ে।

পৃথিবীর ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল: পৃথিবীর সর্বত্র ভূমিকম্পের প্রকোপ সমান নয়। বেশিরভাগ ভূমিকম্প (প্রায় ৯৫%)
পৃথিবীর অল্পস্থান জুড়ে হয়ে থাকে, যা আয়তনে দীর্ঘ ও সরু। পৃথিবীর বৃত্তচাপীয় দ্বীপমালা (যেমনঃ জাপান, ফিলিপাইন), নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালা, আগ্নেয় মেখলা অঞ্চল ও সামুদ্রিক শৈলশিরাসমূহে অধিক ভূমিকম্প সংঘটিত হয়ে থাকে। ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলোকে তিনটি প্রধান অঞ্চলে বিভক্ত করা যায়।
ক. প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল: প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেটের বহিঃসীমানা বরাবর ভূমিকম্প প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
এখানে আগ্নেয়গিরিগুলো এ মহাসাগরকে মালার মতো বেষ্টন করে আছে বলে এ অঞ্চলকে আগ্নেয় মেখলা (Rings of Fire) বলা হয়ে থাকে। এ অঞ্চলের জাপান, ফিলিপাইন, চিলি, অ্যালিউসিয়ান দ্বীপপুঞ্জ এবং আলাস্কা প্রধান ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। পৃথিবীর অধিক ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ জাপানও এ অঞ্চলে অবস্থিত। এদেশে বার্ষিক প্রায় ৭,৫০০ টি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়ে থাকে। এ অঞ্চলে অগভীর, মাঝারি ও গভীর কেন্দ্র বিশিষ্ট ভূমিকম্প সংঘটিত হয়ে থাকে।
খ. ভূমধ্যসাগরীয় হিমালয় অঞ্চল : আল্পস পর্বত থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগরের উত্তর তীর হয়ে ককেশাস, ইরান
মালভূমি, হিমালয় পর্বতমালা, ইন্দোচীন ও পূর্বভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ হয়ে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত এ অঞ্চলটি বিস্তৃত। অগভীর ও মাঝারি গভীরতার কেন্দ্র বিশিষ্ট ভূমিকম্প এ অঞ্চলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ ইতালি এ অঞ্চলে অবস্থিত। এদেশে বার্ষিক প্রায় ৫০০টি ভূমিকম্প সংঘটিত হলো এটাকে l
গ. মধ্য আটলান্টিক-ভারত মহাসাগরীয় শৈলশিরা অঞ্চল: উত্তর-দক্ষিণ বরাবর মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা এবং ভারত মহাসাগরীয় শৈলশিরার সাথে মিলে এ অঞ্চলটি লোহিত সাগর বরাবর ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সাথে মিশেছে। এ সমস্ত গভীর ভূমিকম্পকেন্দ্রের বেশিরভাগ স্বাভাবিক চ্যুতি বরাবর অবস্থিত।

পৃথিবীর মধ্যে কোথাও এমন একবিন্দু স্থান নেই যা ভূমিকম্পের প্রভাব হতে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত। পৃথিবীর প্রায় ৫০ ভাগ ভূমিকম্পপ্রবণ কেন্দ্র নবীন ভঙ্গিল পাবর্ত্য এলাকায় অবস্থিত। শতকরা ৪০ ভাগ অপেক্ষাকৃত খাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত এবং অবশিষ্ট ১০ ভাগ পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে আছে। তাছাড়া সমুদ্রের তলদেশেও বহু ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল বিদ্যমান রয়েছে।
বিশ্বের কিছু উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্প১৮৩১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে চীনে ভূমিকম্পের রেকর্ড পাওয়া যায়। তবে পৃথিবীর সর্বত্র ভূমিকম্পের রেকর্ড খুব প্রাচীন নয়। নিচে কিছু উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্প বর্ণিত হলো- বিংশ শতাব্দীর পূর্বে
১. ১৫১১ সালে বার্নিওলা ভূমিকম্পে পূর্ব ইউরোপের স্লোভানিয়ার দু'টি শহর বিধ্বস্ত হয়।
২. ১৫৫৬ সালে চীনে শানসি প্রদেশের ভূমিকম্পে ৮,৩০,০০০ ব্যক্তি প্রাণ হারায়।
৩. ১৬৬৭ সালে ক্রোয়েশিয়ার ডুবরোভনিকে দুই তৃতীয়াংশ ভাগ জনগণ প্রাণ হারায়।
৪. ১৬৯৩ সালে গ্রেট সিসিলিয়ান ভূমিকম্পে লক্ষাধিক লোক প্রাণ হারায়।
৫. ১৭৫৫ সালে লিসবন ভূমিকম্প নামে পরিচিত ভূমিকম্পজনিত সুনামিতে ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপসমূহে ৬০,০০০-১,০০,০০০ লোক প্রাণ হারায়।
৬. ১৭৮৩ সালে ইতালির কালাব্রিয়াতে পর পর ছয়টি ভূমিকম্পে ৫০,০০০ লোক প্রাণ হারায়।
৭. ১৮১১ সালে নিউ মাদ্রিদ বলে খ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরী শহর ভূমিকম্পে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং মিসিসিপি নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়।
৮ ১৮৮৭ সালে আসামে ভমিকম্পে হাজার হাজার প্রাণহানি ছাড়াও ব্যাপক ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়
বিংশ শতাব্দী
১. ১৯০৬ সালে সানফ্রানসিসকো শহরে ভূমিকম্পে ৩,০০০ লোকের প্রাণহানি ঘটলেও সম্পদহানির পরিমাণ ছিল ৪০০ মিলিয়ন ডলার।
২. ১৯২৩ সালে হনসু দ্বীপের ভূমিকম্পে জাপানের টোকিও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ১,৪০,০০০ লোকের মৃত্যু হয়।
৩.. ১৯৬০ সালে গ্রেট চিলি ভূমিকম্পে সৃষ্ট সুনামি সমগ্র প্রশান্ত মহাসাগরে ব্যপ্তি লাভ করে এবং ৫,৭০০ লোকের প্রাণ ও সম্পদহানি ঘটায়।
৪. ১৯৭০ সালে পেরুতে ভূমিকম্পে ইয়ানগে শহর ভূমিধসে চাপা পড়ে ৪০,০০০ লোকের মৃত্যু হয়।
৫. ১৯৭২ সালে নিকারাগুয়ার মনোগুয়াতে ভূমিকম্প আঘাত হানলে ১০,০০০ লোক প্রাণ হারায় এবং শহরের ৯০% ধ্বংস হয়।
৬. ১৯৭৬ সালে চীনের তাংশান ভূমিকম্পে ২৫৫,০০০ লোকের মৃত্যু হয়।
৭. ১৯৭৬ সালে গুয়েতমালায় ভূমিকম্পে ২৩,০০০ লোকের মৃত্যু এবং ২,৫০,০০০ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়।
৮. ১৯৮৮ সালে আর্মেনিয়ার ভূমিকম্পে ২৫,০০০ লোকের প্রাণহানি ঘটে।
৯. ১৯৯০ সালে ইরানের জিলান ভূমিকম্পে ৩৫,০০০ লোকের মৃত্যু ঘটে।
১০. ১৯৯৩ সালে ভারতের মহারাষ্ট্রে ভূমিকম্পে ব্যাপক ধ্বংস ছাড়াও ৪৫,০০০ লোকের মৃত্যু হয়।
একবিংশ শতাব্দী
১. ২৬ জানুয়ারি, ২০০১ সালে গুজরাটে ২০,০০০ প্রাণহানি ঘটে; আহত হয় ১৬৭,০০০ জন। প্রায় চার লাখ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়।
২. ২৬ ডিসেম্বর, ২০০৩ সালে ইরানের ব্যাম নগরে ভূমিকম্পে ২৬,০০০ লোকের প্রাণহানি ঘটে।
৩. ২১ মে, ২০০৩ সালে আলজেরিয়ায় ভূমিকম্পে ২,২৬৬ জন প্রাণ হারায়। ১২,২৪৩টি ভবন ধসে পড়ে।
৪. ২৬ ডিসেম্বর, ২০০৪ সালে ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট ভূমিকম্পের ফলে সুনামির সৃষ্টি হয়। এতে প্রায় আড়াই লক্ষ লোক প্রাণ হারায়।
৫. ৮ অক্টোবর, ২০০৫ সালে কাশ্মীরে এক ভূমিকম্পে (পাকিস্তান অংশে) প্রায় ৮৭,০০০ লোক প্রাণ হারায়।
৬. ১২ মে, ২০০৮ সালে চীনের সিচুয়ান প্রদেশের ভূমিকম্পে ৬৯,০০০ প্রাণহানি ঘটে। ৪৮ লাখ লোক ঘরবাড়ি হারায়।
৭. ১২ জানুয়ারি, ২০১০ সালে হাইতিতে ভূমিকম্পে ৩,১৬,০০০ জন মৃত্যুবরণ করে।
৮. ১৪ এপ্রিল, ২০১০ সালে চীনের উশু, কিংঘাই অঞ্চলে ভূমিকম্পে প্রায় তিন হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটে।
৯. ১১ মার্চ, ২০১১ সালে জাপানে এক ভূমিকম্পে প্রায় ১৬,০০০ মৃত্যুবরণ করে।
১০. ২৫ এপ্রিল, ২০১৫ সালে নেপালে সংঘটিত ভূমিকম্পে ৮,০০০ লোকের প্রাণহানির সাথে ১৮,০০০ জন আহত হয়।
(Volcanic Eruption)
ভূপৃষ্ঠের ফাটল বা ছিদ্রপথে ভূঅভ্যন্তরস্থ বাষ্প, ধূম্র, ভস্ম কিংবা অ্যাসথেনোস্ফিয়ারের গলিত পদার্থ সজোরে বিস্ফোরণসহ অথবা বিস্ফোরণ ছাড়া ধীরে ধীরে নির্গত হতে পারে যাকে অগ্ন্যুৎপাত বলে। অগ্ন্যুৎপাতের ফলে নির্গত ভস্ম, গলিত লাভা এবং অন্যান্য পদার্থ জমাট বেঁধে বিভিন্ন আকারের সুউচ্চ কিংবা স্বল্পোচ্চ ভূমিরূপ সৃষ্টি করে যেগুলো আগ্নেয়গিরি নামে পরিচিত। ইতালির ভিসুভিয়াস, আইসল্যান্ডের হ্যাকলা, হাওয়াই দ্বীপের মৌনলোয়া এবং জাপানের ফুজিয়ামা প্রভৃতি বিশ্বের বিখ্যাত আগ্নেয়গিরি।


আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণ: বিভিন্ন কারণে ভূপৃষ্ঠের দুর্বল অংশে ছিদ্রপথে কিংবা ফাটলের মধ্য দিয়ে অগ্ন্যুৎপাত বা লাভা উদগিরণ হতে পারে। তন্মধ্যে নিম্নলিখিত কারণসমূহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:
(i) পৃথিবীর অধিকাংশ আগ্নেয়গিরি প্লেট সীমানায় অবস্থিত। পাশাপাশি দুটি প্লেট দুদিকে সরে গেলে ঐ সময় ভূগর্ভস্থ গলিত ও অর্ধগলিত পদার্থ, বাষ্প ও ভস্ম ইত্যাদি প্রবলবেগে বাইরে উৎক্ষিপ্ত হয়ে অগ্ন্যুৎপাত ঘটায়।
(ii) বিচূর্ণীভবন, ক্ষয়ীভবন ও নগ্নীভবনের ফলে ভূপৃষ্ঠের কোনো কোনো অংশ কখনও কখনও ক্ষয়প্রাপ্ত হলে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের চাপ হ্রাস পায়। এতে ভূঅভ্যন্তরের গলিত ম্যাগমা ও গ্যাসীয় পদার্থসমূহের চাপ বৃদ্ধি পায় এবং কোনো অংশ দিয়ে প্রবলবেগে ভূপৃষ্ঠের বাইরে চলে আসে এবং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত সৃষ্টি হয়।
(iii) ভূঅভ্যন্তরে খনিজসমূহে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটলে তাপ ও বায়বীয় পদার্থের সৃষ্টি হয়। এ সকল পদার্থ ভূত্বকে প্রচণ্ড চাপ দেয় এবং কখনও তা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভূত্বকে ফাটল সৃষ্টির মাধ্যমে অগ্ন্যুৎপাত ঘটায়।
(iv) ভূঅভ্যন্তরে রেডিয়াম, থোরিয়াম ও ইউরেনিয়াম প্রভৃতি তেজস্ক্রিয় পদার্থ কখনও কখনও ভূগর্ভে প্রচন্ড তাপের সৃষ্টি করে। এতে ভূগর্ভাস্থ পদার্থসমূহ আয়তনে বৃদ্ধি পায়। ফলে ভূত্বক ফেটে গিয়ে অগ্ন্যুৎপাতের সৃষ্টি হয়।
(v) ভূপৃষ্ঠের পানি কখনও কখনও কোনো ফাটল বা ছিদ্রপথের মাধ্যমে ভূঅভ্যন্তরে প্রবেশ করলে তা ভূঅভ্যন্তরের তাপে বাষ্পে পরিণত হয় এবং উপরস্থ ভূপৃষ্ঠে ফাটলের সৃষ্টি করে অগ্ন্যুৎপাতে সাহায্য করে।
(vi) ভূআন্দোলনের ফলে কখনও কখনও ভূপৃষ্ঠ ফেটে যায়। ফলে ভূগর্ভস্থ গলিত লাভা এ ফাটলের মধ্য দিয়ে প্রবলবেগে ভূপৃষ্ঠে এসে উপনীত হয়। এতেও আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি হয়।
(vii) ভূপৃষ্ঠ সর্বদাই তাপ বিকিরণ করে শীতল ও সংকুচিত হচ্ছে। এতে ভূঅভ্যন্তরের সাথে ভূত্বকের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এ কারণে ভূত্বকে চ্যুতি ও ভাঁজের সৃষ্টি হয়। এ ফাটল দিয়ে লাভা উদগিরণ হয়ে আগ্নেয় পর্বতের সৃষ্টি করে।
(viii) ভূত্বকের শিলারাশির চাপের হ্রাস এবং ভূগর্ভে সঞ্চিত বাষ্পরাশির চাপ বৃদ্ধির ফলে কঠিন উত্তপ্ত শিলা তরল হয় এবং আয়তনে বৃদ্ধি পায়। ম্যাগমা গহ্বরে সঞ্চিত এসব তরল শিলা বা ম্যাগমা ভূত্বকের দুর্বল স্থান ভেদ করে ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে অগ্ন্যুৎপাত ঘটায়।
ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(Consequence of Volcanic Eruption)
অগ্ন্যুৎপাতের অনিবার্য ফল হিসেবে সন্নিহিত এলাকায় ভূমিকম্প হয়। তাই আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে যুগপৎ ভূপৃষ্ঠের অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিসহ কোনো কোনো স্থানে এর দ্বারা সামান্য সুফলও পাওয়া যায়। নিচে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলাফল বর্ণনা করা হলো-
সুফল (মঙ্গলকর প্রভাব):
(i) আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ভূগর্ভস্থ লাভা ভূপৃষ্ঠে সঞ্চিত হয়ে পর্বতের সৃষ্টি করে। এরূপে সৃষ্ট পর্বতকে আগ্নেয় পর্বত বলে। যেমন- ইতালির ভিসুভিয়াস পর্বত।
(ii) আগ্নেয়গিরির ফলে ভূপৃষ্ঠের বিস্তৃত অঞ্চলে লাভা সঞ্চিত হয়ে মালভূমির সৃষ্টি করে। যেমন- ভারতের দাক্ষিণাত্যের মালভূমি।
(iii) সাগরের তলদেশে আগ্নেয়গিরির লাভা সঞ্চিত হয়ে অনেক সময় দ্বীপের সৃষ্টি করে। যেমন- প্রশান্ত মহাসাগরের হাওয়াই দ্বীপ।
(iv) মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে বৃষ্টির পানি সঞ্চিত হয়ে হ্রদের সৃষ্টি করে। যেমন- আলাস্কার মাউন্টকার্টমা হ্রদ।
(v) আগ্নেয়গিরির লাভা কোনো নিম্নভূমিতে সঞ্চিত হয়ে সমভূমির নদীতে লাভা সঞ্চিত হয়ে সমভূমির সৃষ্টি করেছে।
(vi) আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ভূগর্ভস্থ লাভা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ ভূপৃষ্ঠে সঞ্চিত হয়ে জমির উর্বরতা শক্তিকে বাড়িয়ে দেয়। যেমন- দাক্ষিণাত্যের উর্বর মালভূমি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
(vii) কখনও কখনও কোনো নিম্নাঞ্চলে লাভা সঞ্চিত হয়ে সমভূমির সৃষ্টি করে এবং এতে প্রচুর ফসল উৎপাদিত হয়।
(viii) বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মৃত আগ্নেয়গিরি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং দেশি বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
(ix) ভূগর্ভ বিভিন্ন প্রকার খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। অগ্ন্যুৎপাতের সময় এসব খনিজ সম্পদ লাভার সাথে মিশ্রিত অবস্থায় ভূপৃষ্ঠে এসে উপনীত হয়। মানুষ তা সংগ্রহ করে তার কল্যাণে ব্যবহার করে।
কুফল (ক্ষতিকর প্রভাব):
(i) আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় তা ভূপৃষ্ঠের বরফ গলিয়ে নিকটবর্তী নিচু এলাকায় অতি দ্রুত ব্যাপক কর্দম প্রবাহ ও বন্যার সৃষ্টি করে।
(ii) অনেক সময় আগ্নেয়গিরির লাভা, ভস্ম, ছাই ঊর্ধ্বাকাশে উঠে যায়, এর ফলে সূর্য রশ্মির আপতন মাত্রা হ্রাস পায়। ফলে ফসল উৎপাদন হ্রাস পায় এবং শীত বেড়ে যায়।
(iii) বিস্ফোরক আগ্নেয়গিরি যখন প্রচণ্ড বেগে অগ্ন্যুৎপাত ঘটায় তখন তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
(iv) কখনও কখনও লোকালয়ে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত সংঘটিত হয়। এতে প্রচুর প্রাণহানি ঘটে। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোতে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ১০ হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটেছিল।
(v) আগ্নেয়গিরির লাভার চাপে কখনও কখনও ভূত্বকের অংশবিশেষ নিচে নেমে যায় এবং গভীর খাতের সৃষ্টি করে। সুমাত্রা ও জাভার মধ্যবর্তী অংশে অগ্ন্যুৎপাতের ফলে নদীগর্ভে লাভা জমে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়।
জেনে রাখো:
১৮৭৯ খ্রীষ্টপূর্বে ইতালির পম্পেই নগরীর মাউন্ট ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ২০০ লোক লাভা ও ছাই ভস্মের নিচে চাপা পড়ে এবং নগরটি সম্পূর্ণরূপে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। অগ্ন্যুৎপাতের ফলে বাতাসে উৎক্ষিপ্ত অতিরিক্ত ছাই ভস্ম আকাশে বিমান চলাচলে বাধার সৃষ্টি করে। ২০১১ সালে আইসল্যান্ডে সংঘটিত অগ্ন্যুৎপাতে বায়ুমণ্ডলে ভস্মের পরিমাণ এত বেড়ে গিয়েছিল যে, গোটা ইউরোপের বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছিল।
প্রকৃতির সৃষ্ট আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ভূপৃষ্ঠের যে পরিবর্তন সাধিত হয় তাতে সুফল ও কুফল উভয়ই পরিলক্ষিত হয়। মোটকথা, প্রকৃতির ইচ্ছাই এখানে বড় কথা। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে পৃথিবীর প্রাণিজগতের যে পরিমাণ উপকার হয় তার চেয়ে ক্ষতির পরিমাণটাই বেশি। প্রকৃতির এ ভয়াবহ রূপকে আধুনিক মানবসভ্যতা এখনও জয় করতে পারেনি।
আগ্নেয়গিরি ও আগ্নেয়দ্বীপ (Volcano and volcanic island)
আগ্নেয়গিরি ও আগ্নেয় দ্বীপ সমুদ্রের তলদেশের সাধারণ ভূমিরূপ এবং এটি সাধারণত সমুদ্র তলদেশ থেকে এক কিলোমিটার (০.৬ মাইল) বা তারও অধিক উচ্চে অবস্থান করে। প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে দশ হাজারেরও বেশি আগ্নেয়গিরি রয়েছে। ভূভাগের অধিকাংশ আগ্নেয়গিরির ক্রিয়া সমুদ্র খাতের প্রান্তের নিকটে বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরের চারদিকে সংঘটিত হয়ে থাকে।
অনেক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি মধ্যসামুদ্রিক শৈলশিরায় বা দ্বীপ বলয় থেকে বাইরে সমুদ্র খাতের মধ্যস্থলে দেখা যায়। সামুদ্রিক আগ্নেয়গিরি কখনো আলাদাভাবে আবার কখনো অনেকগুলো একসাথে দেখা যায়। গভীর সমুদ্রের তলদেশে যত আগ্নেয়গিরি আছে এগুলোর অধিকাংশই পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত। সবচেয়ে বড়গুলোর চূড়া পানির ওপরে এসে দ্বীপের সৃষ্টি করেছে। হাওয়াই দ্বীপ এমনি ধরনের আগ্নেয় দ্বীপ। পার্শ্ববর্তী সমুদ্র তলদেশ থেকে প্রায় ৯ কি.মি. (প্রায় ৫.৬ মাইল) উচ্চতাবিশিষ্ট হাওয়াই আগ্নেয় দ্বীপপুঞ্জ মহাদেশের সর্ববৃহৎ পর্বতের চেয়েও বড়।
বক্রাকারে সজ্জিত দ্বীপপুঞ্জ ও তার ভেতরের দিকে জীবন্ত আগ্নেয়গিরিগুলো গিরিখাতের সাথে সম্পৃক্ত বলে এগুলোকে দ্বীপ বলয় (island arc) বলে। এ ধরনের মহাদেশ ও মহাসাগরের সীমানা হচ্ছে সক্রিয় পর্বত গঠনকারী অঞ্চল। এ অঞ্চলে বড় ধরনের ভূআন্দোলনের ফলে ঘন ঘন ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত হয়ে থাকে। দ্বীপ বলয় প্রশান্ত মহাসাগরে খুব বেশি দেখা যায়। আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরে এগুলোর সংখ্যা কম। মহাদেশ ও কিছু কিছু বড় দ্বীপ বলয় গোষ্ঠীর (island arc system) মধ্যে অগভীর উপকূলীয় সাগর রয়েছে; যেমন জাপান ও ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জের প্রান্তে আছে।

ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(Tsunami)
সুনামি (Tsunami) একটি জাপানি শব্দ। 'সু' অর্থ 'বন্দর' এবং 'নামি' অর্থ 'ঢেউ'। সুতরাং, সুনামি অর্থ হলো 'বন্দরের ঢেউ'। আবার, জাপানি ভাষায় এর অর্থ হলো 'পোতাশ্রয়ের ঢেউ'। সুনামির ঢেউ সমুদ্রের স্বাভাবিক ঢেউয়ের মতো নয়। এটা সাধারণ ঢেউয়ের চেয়ে অনেক বিশালাকৃতির; অতি দ্রুত ফুঁসে ফুলে ওঠা জোয়ারের মতো যা উপকূল ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি করে। সুনামির পানির ঢেউগুলো উঁচু হয়ে একের পর এক আসতেই থাকে, তাই একে 'ঢেউয়ের রেলগাড়ি' বা 'ওয়েভ ট্রেন' বলা হয়। সুনামির ফলে সৃষ্ট সামুদ্রিক ঢেউয়ের উচ্চতা ৩০ মি. পর্যন্ত এবং গতিবেগ ১০০ কি.মি./ঘন্টার চেয়ে বেশি হতে পারে।
সুনামির কারণ (Causes of Tsunami)
ভূমিকম্প ও অগ্ন্যুৎপাতের পর সুনামিকে পৃথিবীব্যাপী তৃতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সমুদ্র তলদেশে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিধস সুনামি সৃষ্টি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। হঠাৎ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বিশাল জলরাশির সরে যাওয়া সুনামির অন্যতম কারণ এবং সাধারণত মাধ্যাকর্ষণ শক্তি দ্বারা পানি আরও ফুলে ওঠে লক্ষ লক্ষ টনের বিশাল ঢেউ তৈরি করে। আর এই ঢেউ যত বেশি তীরভূমির কাছাকাছি যায় তত বেশি দীর্ঘ হয়ে ভয়ঙ্কর জলোচ্ছ্বাসে রূপ নেয়। সুনামি সৃষ্টির ক্ষেত্রে জোয়ার কোনো ভূমিকা রাখে না।
অগ্ন্যুৎপাত: আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে সুনামি সৃষ্টি হয়। এতে করে মহাসাগরীয় ভূত্বকের নিচে দুর্বল শিলাস্তর ধসে পড়ে। ফলে বিশাল ঢেউ সৃষ্টি হয় এবং তা তীরে আছড়ে পড়ে। ২০১৮ সালের ২২ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপে আনাক ক্রাকাতুয়া আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুৎপাতের ফলে আংশিক ধসে পড়লে সুনামির সৃষ্টি হয়।
ভূমিধস : উপকূলে বড় ধরনের ভূমিধস হলে সুনামি হতে পারে। আবার পানির নিচের ভূমিধসও সুনামির জন্য দায়ী। ১৯৫৮ সালে লিটুয়া উপকূলে ভূমিধসের কারণে আলাস্কায় সুউচ্চ ঢেউ সৃষ্টি হয়। এর ফলে সৃষ্ট সুনামিতে দুজন লোক মারা যায়।
ভূমিকম্প: পাত সঞ্চালনের কারণে সৃষ্ট ভূমিকম্প সুনামির জন্য দায়ী। প্লেটগুলো সঞ্চালনের ফলে প্লেট সীমানায় বিশাল জলরাশি সরে গিয়ে বড় ধরনের ঢেউ সৃষ্টি করে। ফলে সুনামি হয়। ১৯৪৬ সালে রিকটার স্কেলে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে অ্যালিউসিয়ান দ্বীপপুঞ্জ ও আলাস্কায় সুনামি সংঘটিত হয়।
সুনামির ফলাফল (Consequence of Tsunami)
সমুদ্র উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সুনামি দ্বারা ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়ে থাকে। মহাসাগর ও সাগরের তলদেশে প্লেটের গতির কারণে সৃষ্ট প্রচণ্ড ভূমিকম্প সুনামি সৃষ্টির কারণ। এতে সমুদ্রের পানির ঢেউয়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ৫০০ থেকে ৮০০ মাইল পর্যন্ত হতে পারে। খোলা সমুদ্রে ঢেউয়ের উচ্চতা তিন ফুট পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু ঢেউ যতই তীরের দিকে যায়, ততই শক্তি সঞ্চয় করে এবং উচ্চতা বাড়ে। তখন ঢেউয়ের এক মাথা থেকে আরেক মাথার দূরত্ব হতে পারে ১০০ মাইল পর্যন্ত। অগভীর পানিতে সুনামি ধ্বংসাত্মক জলোচ্ছ্বাসে রূপ নেয়। অগ্রসরমান জলরাশি ভয়ঙ্কর স্রোত সৃষ্টি করে নেমে যাবার আগে ১০০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। উপকূলের ব্যাপক এলাকা প্লাবিত করতে পারে। উপকূলীয় জনপদ নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। সুনামির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, ভূমিকম্পের মতো সুনামি সম্পর্কেও পূর্বাভাস দেওয়া যায় না। ফলে সুনামির সৃষ্টি হলে উপকূলীয় জনপদের লোকজনদের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ইতিহাসের ভয়ঙ্কর পাঁচটি সুনামি:
বৃহৎ আকারের সুনামি হলেই তা ধ্বংসাত্মক হয় না। কেননা তীরবর্তী এলাকায় সম্পদ ও স্থাপনা থাকার উপর তা নির্ভরশীল। এ প্রেক্ষিতে ইতিহাসের ধ্বংসকারী পাঁচটি সুনামি হলো:
১. সুমাত্রা, ইন্দোনেশিয়া- ২৬ ডিসেম্বর, ২০০৪
সুমাত্রা উপকূলে প্রায় ৩০ কি.মি. গভীরে ৯.১ মাত্রার ভূমিকম্পে সাগরতলে চ্যুতি এলাকায় ১৩০০ কি.মি. দীর্ঘ অঞ্চলে সাগরতলে খাড়াভাবে শিলাচ্যুতি ঘটে। এ সুনামির ঢেউ ৫০ মিটার উঁচু হয়ে প্রায় ৫ কি.মি. অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে।
এই ঢেউ মহাপ্লাবনে রূপ নিয়ে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারত, থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ প্রভৃতি দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়া ছাড়িয়ে কেনিয়া, সোমালিয়াসহ ১২টি আফ্রিকান দেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। জলোচ্ছ্বাসে তিন লাখের মতো মানুষ নিহত হয়। একমাত্র ইন্দোনেশিয়ায় সুমাত্রার আচেহ প্রদেশে নিহত হয়েছে এক লাখ দশ হাজার মানুষ। তারপর বেশি লোক নিহত হয়েছে শ্রীলঙ্কায়। সুনামির জলোচ্ছ্বাসে ভারত মহাসাগরের বহু ছোট ছোট দ্বীপ সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এসব দ্বীপে বসবাসকারী বহু আদিবাসী গোষ্ঠী প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
২. উত্তর প্রশান্ত উপকুল, জাপান- ১১ মার্চ, ২০১১
প্রায় ১০ মিটার উঁচু সুনামির ঢেউ ঐদিন জাপানের পূর্ব উপকূলে ১৮,০০০ লোকের মৃত্যুর কারণ হয়। ভূঅভ্যন্তরে ২৪.৪ কি.মি. গভীরে সৃষ্ট ৯.০ মাত্রার ভূমিকম্প ছিল এ দুর্যোগের কারণ। প্রায় সাড়ে চার লাখ লোক এ দুর্যোগে গৃহহীন হয়ে পড়ে।
৩. লিসবন, পর্তুগাল- ১ নভেম্বর, ১৭৫৫
পতুর্গাল এবং দক্ষিণ স্পেনের পশ্চিম উপকূলের বেশ কয়েকটি শহর এ দিন সুনামিতে আক্রান্ত হয়। সাগরের ঢেউয়ের উচ্চতা কোথাও কোথাও ছিল ৩০ মিটার উঁচু। ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট এ সুনামিতে পর্তুগাল, মরক্কো ও স্পেনে প্রায় ৬০,০০০ লোকের প্রাণহানি ঘটে।
৪. ক্রাকাতোয়া, ইন্দোনেশিয়া- ২৭ আগস্ট, ১৮৮৩
ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ছিল এ সুনামি সৃষ্টির কারণ। ৩৭ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়েছিল সাগরের ঢেউ। প্রায় ৪০,০০০ লোক এতে মৃত্যুববরণ করে।
৫. এনসুয়ান্দা সাগর, জাপান- ২০ সেপ্টেম্বর, ১৪৯৮
কী, মিকাওয়া, সুরুগু, ইজু ও সাগমির উপকূলে ৮.৩ মাত্রার ভূমিকম্পে এদিন জাপানে সুনামি সংঘটিত হয়। উপকূলীয় এলাকায় সব বাড়িঘর এতে ধুয়ে মুছে যায় এবং প্রায় ৩১,০০০ লোকের প্রাণহানি ঘটে।
ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(Slow Altering Movement)
আকস্মিক পরিবর্তনকারী শক্তি ছাড়াও ভূপৃষ্ঠের উপর আর এক ধরনের শক্তি কাজ করে যার ফলে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ভূপৃষ্ঠ তার রূপ পরিবর্তন করে থাকে। অত্যন্ত ধীরে পরিবর্তন করে বলে এই শক্তিকে বলা হয় ধীর পরিবর্তনকারী শক্তি বা আলোড়ন। যেমন- মহাদেশ ও পর্বত গঠনকারী আলোড়ন। এ ধরনের আলোড়ন উল্লম্ব কিংবা আনুভূমিকভাবে কাজ করে তবে এতে ভূপৃষ্ঠের পরিবর্তন সাধনে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
১. মহীভাবক আলোড়ন, যা উল্লম্বভাবে কাজ করে; এবং
২. গিরিজনি আলোড়ন, যা আনুভূমিকভাবে কাজ করে।
১.মহীভাবক আলোড়ন: মহীভাবক আলোড়ন উল্লম্বভাবে ক্রিয়াশীল। ফলে ভূপৃষ্ঠ খাড়াভাবে উপর ও নিচে উঠা-নামা করে। ব্যাপক আকারে মহাদেশজুড়ে সাধারণত এরূপ আলোড়ন হয় বলে একে মহীভাবক আলোড়ন বলা হয়। মহীভাবক অর্থ মহাদেশ গঠনকারী।
মহীভাবক আলোড়নের ফলে বিশালায়তন ভূমি ও অন্যান্য মালভূমি, চ্যুতি, স্রস্ত উপত্যকা, স্তূপ পর্বত প্রভৃতি সৃষ্টি হয়। এ আলোড়নের ফলে পূর্ব আফ্রিকা ও জর্ডানের স্রস্ত উপত্যকাসমূহ, রাইন নদীর স্রস্ত উপত্যকা ইত্যাদি গঠিত হয়েছে।

২. গিরিজনি আলোড়ন: গিরিজনি আলোড়ন আনুভূমিকভাবে হয়। ভূঅভ্যন্তরীণ তাপীয় পরিচলন স্রোতের ফলে ভূগর্ভে সঞ্চিত বাষ্পের চাপে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের শিলাসমূহের ওপর চাপের বিভিন্নতার ফলে পার্শ্বদিকে আলোড়নের সৃষ্টি হয়। এর ফলে আনুভূমিকভাবে অবস্থিত স্তরসমূহ উভয়দিক থেকে চাপের সম্মুখীন হয় এবং আস্তে আস্তে কিছু অংশ কুঁচকে যায়, কোনো অংশবিশেষ উঁচু হয়ে উঠে অথবা নিচে নেমে যায়। পার্শ্বদিকে প্রবাহমান এ প্রকার আলোড়নকে আনুভূমিক আলোড়ন বলে। এ আলোড়ন বিশালায়তনের ভঙ্গিল পর্বতের সৃষ্টি করে বলে একে গিরিজনি আলোড়ন বলে। এ আলোড়নের ফলে এশিয়ার হিমালয়, ইউরোপের জুরা এবং আফ্রিকার আটলাস পর্বতমালার সৃষ্টি হয়েছে। এ আলোড়নের সাথে প্লেটসঞ্চালন ও পরিচলন স্রোত জড়িত।
পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগে উত্তপ্ত বস্তুর মধ্যে তাপ ও চাপের পার্থক্যজনিত কারণে ভূআলোড়নের সৃষ্টি হয়। এটি আকস্মিক অথবা ধীরগতিসম্পন্ন হতে পারে এবং ভূপৃষ্ঠের ওপর আনুভূমিক অথবা উল্লম্বভাবে হতে পারে। ভূআন্দোলনের আকস্মিক পরিবর্তনের নিয়ামক হিসেবে যেমন ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরি ক্রিয়াশীল তেমনি ধীর পরিবর্তনের ফলে পর্বত, মালভূমি, সমভূমি, হ্রদ, সাগর ও গভীর খাতের সৃষ্টি হয়ে থাকে। সুতরাং ভূপৃষ্ঠে বৈচিত্র্যময় ভূমিরূপ সৃষ্টিতে অন্যান্য প্রক্রিয়াগুলোর সাথে ভূআলোড়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
পৃথিবীর ধীর পরিবর্তনকারী নিয়ামকসমূহ (Factors of Slow Changes of the Earth)
ভূপৃষ্ঠ সর্বদা পরিবর্তনশীল। আর এ পরিবর্তন আকস্মিক ও ধীর উভয় রকমের হয়ে থাকে। নানা প্রকার বাহ্যিক ও প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে ভূপৃষ্ঠে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে যে ব্যাপক পরিবর্তন হয় তাকে ধীর পরিবর্তন বলে। আর এ ধীর পরিবর্তনে যে নিয়ামকগুলো প্রভাব রাখে তা হলো বায়ুর কার্য, বৃষ্টির কার্য, নদীর কার্য, হিমবাহের কার্য, সমুদ্রের কার্য ইত্যাদি। নিম্নে ধীর পরিবর্তনকারী নিয়ামকগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
১. বায়ুর কাজ: বায়ুতে থাকা অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও জলীয়বাষ্প রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় শিলার বিচ্ছেদ ও ক্ষয়সাধন করে থাকে। বায়ুর ক্ষয়কার্য মরুভূমিতে অধিক দেখা যায়। মরু এলাকা শুষ্ক, প্রায় বৃষ্টিহীন এবং গাছপালা শূন্য হয়ে থাকে। গাছপালা কম থাকার কারণে মরু এলাকার মৃত্তিকা সুদৃঢ় হয় না। এছাড়া দিনের বেলায় সূর্যের তাপে এবং রাতের শীতলতায় শিলার সংকোচন ও প্রসারণের ফলেও মাটির সংবদ্ধতা শিথিল হয়ে যায়। ফলে বায়ুপ্রবাহের দ্বারা এ অঞ্চলের শিলা সহজেই বাহিত হয়ে ধীর পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষয়সাধন করে।
২. বৃষ্টির কাজ: বৃষ্টির পানি ভূপৃষ্ঠের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় ভূপৃষ্ঠকে ব্যাপকভাবে ক্ষয় করে থাকে। প্রবাহিত হওয়ার সময় পানি শিলাকে আংশিকভাবে ক্ষয় ও আলগা করে এবং ক্ষয়প্রাপ্ত শিলাকে অপসারিত করে। বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে কর্ষিত জমির মাটি বৃষ্টির পানির দ্বারা অপসারিত হয়। আবার পর্বতের মধ্যে কর্দম স্তরের উপর অনেক ভারি শিলা হেলানো অবস্থায় থাকে। পর্বতের ফাটল দিয়ে পানি প্রবেশ করে কাদার স্তরকে গলিয়ে দেয়। এতে বড় শিলাস্তর কাদার উপর থাকতে না পেরে নিচে ধসে পড়ে। একে মৃত্তিকাপাত বলে। এভাবে অনেকদিন ধরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ধীর পরিবর্তন হয়। ..
৩. হিমবাহের কাজ: হিমবাহের দ্বারাও ভূপৃষ্ঠের কোনো কোনো অঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষয় হয়ে থাকে। হিমবাহ নিচে নামার সময় এর নিচের প্রস্তরখণ্ড পর্বতগাত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেক দূরে গিয়ে পতিত হয়। পর্বতগাত্রের মধ্যে যদি ছিদ্র থাকে তাহলে তার ভিতর পানি প্রবেশ করে বরফে পরিণত হয়ে প্রস্তরগুলোকে আলগা করে দেয়। ফলে হিমবাহের চাপে এটি পর্বতগাত্র থেকে সহজেই পৃথক হয়ে যায়। এই কার্য হিমবাহ দ্বারা অনেকদিন ধরে ধীরে ধীরে হয় বলে এটি ভূপৃষ্ঠের ধীর পরিবর্তনের একটি উদাহরণ।
৪. নদীর কাজ: যেসব প্রাকৃতিক শক্তি ভূপৃষ্ঠের প্রতি নিয়ত ধীর পরিবর্তন করছে তাদের মধ্যে নদীর কাজ অন্যতম।
নদী যখন পর্বতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় তখন স্রোতের আঘাতে বাহিত নুড়ি, কর্দম প্রভৃতির ঘর্ষণে নদীগর্ভ ও পার্শ্বক্ষয় হয়। পার্বত্য অবস্থায় নদীর স্রোতের বেগ বেশি থাকে। এতে নদী নিম্ন ভূমির দিকে অগ্রসর হতে থাকে এবং কোনো সঞ্চয় হতে পারে না। যখন নদী সমভূমিতে আসে তখন নদী ক্ষয় এবং সঞ্চয় দুটোই করে। নদীর চলার পথে যেখানে নরম শিলা পাবে নদী ঠিক সেদিক দিয়ে ক্ষয় করে অগ্রসর হয়। ক্ষয়কৃত নরম শিলা অবক্ষেপণ করে বিভিন্ন ভূমিরূপ গঠন করে। এভাবে নদী ক্ষয় ও সঞ্চয় করতে করতে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। অনেকদিন ধরে এভাবে ক্ষয় ও সঞ্চয় কাজ চলে বলে একে নদীর দ্বারা সৃষ্ট ধীর পরিবর্তন বলে।
৫. সমুদ্রের কাজ: মাঝে মাঝে সমুদ্র উপকূলের পাহাড় থেকে বড় বড় প্রস্তরখণ্ড সমুদ্রে এসে পড়ে। পরবর্তীতে এসব প্রস্তরখণ্ড সমুদ্রস্রোত, সমুদ্রতরঙ্গ ও জোয়ার-ভাটার ফলে নুড়ি ও বালুকাতে পরিণত হয়। সমুদ্র উপকূলের জোয়ার-ভাটা, সমুদ্রস্রোত প্রভৃতিও প্রতিনিয়ত শিলাকে ভেঙে খণ্ড-বিখণ্ড করছে। সমুদ্রতরঙ্গ যখন প্রচণ্ড আকার ধারণ করে তখন তার ধাক্কায় উপকূলের শিলা ভেঙে পড়ে। এছাড়া জোয়ার-ভাটা ও সমুদ্রস্রোতের প্রভাবেও উপকূলের শিলা ভেঙে যায়।
ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই
(Weathering)
নানাবিধ শক্তির প্রভাবে শিলারাশির চূর্ণবিচূর্ণ ও বিশ্লিষ্ট হওয়ার প্রক্রিয়াকে বিচূর্ণীভবন বলে। বিচূর্ণীভবনের ফলে ভূত্বকের উপরিস্তরের শিলা ভেঙেচুরে শিথিল হয়ে পড়ে, কিন্তু অপসারিত হয় না। আবহাওয়ার উপাদানসমূহের ক্রিয়ায় বিচূর্ণীভবন হয়ে থাকে। বিচূণীভবন প্রক্রিয়া প্রধানত তিনটি- যান্ত্রিক, রাসায়নিক ও জৈবিক।
যান্ত্রিক বিচূণীভবন (Physical Weathering)
বিভিন্ন প্রকার বাহ্যিক প্রাকৃতিক শক্তিসমূহের দ্বারা শিলাস্তর ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হওয়াকে যান্ত্রিক বিচূর্ণীভবন বলে। এটি মূলত উত্তাপের দ্রুত পরিবর্তন (তাপমাত্রার বৃদ্ধি ও হ্রাস) প্রক্রিয়া দ্বারা সংঘটিত হয়। মরু অঞ্চল ও উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল এবং উচ্চ অক্ষাংশে যান্ত্রিক বিচূর্ণীভবন লক্ষ করা যায়। নিচে বিভিন্ন যান্ত্রিক বিচূর্ণীভবন প্রক্রিয়া আলোচিত হলো-
ক. উত্তাপের তারতম্যের কারণে বিচূর্ণীভবন: দিনরাতের উষ্ণতা এবং ঋতুভেদে উত্তাপের পার্থক্যের জন্য শিলাগুলো অসমানভাবে সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। এ সংকোচন বা প্রসারণ ক্রমাগত চলার ফলে শিলারাশি এক সময় খন্ড খন্ড হয়ে যায়। একে সংকোচন-প্রসারণজাত বিচূর্ণীভবন বা তাপীয় বিচূর্ণীভবন বলে।

উত্তাপের ভিত্তিতে যান্ত্রিক বিচূর্ণীভবন আবার চার প্রকারে সংঘটিত হয়। যেমন-
১. স্তর মোচন: অনেক সময় শিলা উত্তপ্ত হলে নিচে বা পাশে প্রসারিত হতে না পেরে উপরের দিকে প্রসারিত হয়। এর ফলে শিলার উপরের স্তরটি অভ্যন্তরের শীতল শিলাস্তর হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পেয়াজের খোসার ন্যায় খুলে যায়। শিলার এরূপ বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রক্রিয়াকে বল্কল মোচন বা স্তর মোচন (exfoliation) বলা হয়। স্তর মোচন-পদ্ধতিতে কখনও বৃহৎ শিলার উপরের স্তর সরে গেলে কিছুটা গোলাকৃতি ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়। একে স্তর মোচন গম্বুজ (exfoliation dome) বলে।

২. প্রস্তর চাঁই-এর বিচ্ছিন্নকরণ: দিনের বেলায় সূর্যতাপে শিলারাশির উপরের স্তর নিচের স্তর অপেক্ষা অধিক উত্তপ্ত হয়। ফলে শিলার মধ্যে পীড়নের (stress) সৃষ্টি হয়। এ পীড়ন একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা অতিক্রম করলে শিলার মধ্যে সমান্তরাল ও উল্লম্ব ফাটলের সৃষ্টি হয় এবং এ ফাটলের স্থান হতে শিলারাশি কোনো এক সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিচূর্ণীভবনের এ প্রক্রিয়াকে প্রস্তর চাঁই-এর বিচ্ছিন্নকরণ (block disintegration) বলা হয়। পাললিক শিলা দ্বারা গঠিত অঞ্চলে এ ধরনের বিচূর্ণীভবন দেখা যায়। যেমন- ভারতের মধ্যপ্রদেশ।

৩.খণ্ডীকরণ: মরু অঞ্চলে দিনের বেলায় প্রচণ্ড উত্তাপ অনুভূত হয়। কিন্তু হঠাৎ এ সময় বৃষ্টিপাত হলে শিলারাশি দ্রুত শীতল ও সংকুচিত হওয়ার সময় ফেটে যায় এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিলাখণ্ডে পরিণত হয়। বিচূর্ণীভবনের এ প্রক্রিয়াকে খন্ডীকরণ বলা হয়।

৪. ক্ষুদ্রকণা বিশরণ: যেসব শিলা বিভিন্ন খনিজের সংমিশ্রণে গঠিত সেসব শিলার খনিজসমূহ সূর্যতাপে অসমানভাবে প্রসারিত ও সংকুচিত হয়। এর ফলে শিলার মধ্যে টান পড়ে এবং এগুলো ভেঙে কোনো এক সময় চূর্ণবিচূর্ণ হয়। বিচূর্ণীভবনের এ প্রক্রিয়াকে ক্ষুদ্রকণা বিশরণ (granular disintegration) বলা হয়। মরু অঞ্চলে সন্ধ্যার সময় পিস্তলের গুলির ন্যায় যে শব্দ শোনা যায় তা ক্ষুদ্রকণা বিশরণের শব্দ।
মরু অঞ্চলে দিন ও রাতের তাপের ব্যাপক পার্থক্য হয়ে থাকে। ফলে শিলাসমূহে প্রতিনিয়ত সম্প্রসারণ ও সংকোচনের ফলে প্রথমে স্তর মোচন, তারপর খন্ডীকরণ এবং অবশেষে ক্ষুদ্রকণা বিশরণের মাধ্যমে বালি, ধূলিকণায় পরিণত হয়। একে শিলার বিচূর্ণীকরণ বলে। এ প্রক্রিয়া মৃত্তিকা গঠনের সাথে সম্পৃক্ত।
খ . তুষারের দ্বারা বিচূর্ণীভবন: উচ্চ অক্ষাংশ বা পার্বত্য অঞ্চলে দিনের বেলায় বরফগলা পানি ভূত্বকের ফাটল বা
ছিদ্রপথে মাটির ভেতরে প্রবেশ করে। কিন্তু রাতের বেলায় প্রচণ্ড শীতে এ বরফগলা পানি পুনরায় বরফে পরিণত হয় এবং আয়তনে ১০% বৃদ্ধি পায়। ফাটলের পার্শ্বদেশে এতে প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি হয়। ফলে শিলারাশি ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রস্তরখণ্ডে পরিণত হয় এবং বিচূর্ণীভবনে সহায়তা করে। পর্বতগাত্রের কোণাকৃতিতে এরূপ প্রস্তরখণ্ড সঞ্চিত হলে তাকে স্ত্রী (scree) বা ট্যালাস (tallus) বলা হয়।

গ. পানির দ্বারা বিচূর্ণীভবন: পানির দ্বারা সাধারণত তিনটি প্রক্রিয়ায় শিলার বিচুণীভবন সংঘটিত হয়। যথা-
i. বৃষ্টির ফোঁটার আঘাতে শিলার উপরের অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। সাধারণত বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে বৃষ্টির ফোঁটার আঘাতে এ ধরনের ক্ষয় হয়ে থাকে। সাধারণত পাললিক শিলায় এ ধরনের প্রক্রিয়া বেশি কাজ করে।
ii. কোনো কোনো সময় বৃষ্টির পানি পাললিক শিলার ফাটল ও রূপান্তরিত শিলার ছিদ্র দিয়ে শিলার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে সূর্যের তাপে পানি বাষ্পে পরিণত হলে শিলা পুনরায় শুকিয়ে যায়। এরূপে ক্রমাগতভাবে আর্দ্র ও শুষ্ক হওয়ার ফলে শিলা দুর্বল হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিলাখণ্ডে পরিণত হয়। শিলার পর্যায়ক্রমিক ভেজা ও শুকনো অবস্থার মাধ্যমেও শিলা চূর্ণবিচূর্ণ হয়।
iii. উপকূল এলাকায় জোয়ার-ভাটার কারণে শিলা পর্যায়ক্রমে পানি শোষণ করে ফুলে যায় এবং পরে শুকিয়ে যায়। আবার ওপরের শুষ্ক অংশ যখন সংকোচিত হয় ভেতরের অংশ তখন অপেক্ষাকৃত আর্দ্র থেকে যায়। এ অবস্থায় শিলার গঠন দুর্বল হয়ে ভেঙে যায়। পর্যায়ক্রমে এ প্রক্রিয়া চলতে থাকায় শিলারাশি চূর্ণবিচূর্ণ হয়।
ঘ. চাপমুক্ত হওয়া: ভূঅভ্যন্তরে সৃষ্ট আগ্নেয় ও রূপান্তরিত শিলা ওপরের পাললিক শিলা স্তরের চাপে সঙ্কুচিত অবস্থায় থাকে। উপরের শিলাস্তর অপসারিত হলে ভূঅভ্যন্তরের শিলার ওপর চাপ হ্রাস পায়। ফলে এ সমস্ত শিলা কিছুটা সম্প্রসারিত হয়। এ অবস্থায় শিলার ওপরের স্তর নিচের মূল শিলা থেকে ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে যায়। গ্রানাইট জাতীয় শিলায় এ ধরনের বিচূণীভবন দেখা যায়।
ঙ. লবণ কেলাস গঠনের মাধ্যমে: দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুমে শিলার ফাটল বরাবর ভেতরের পানি কৈশিক শক্তির (capillary force) টানে উপরে উঠে আসে। এ পানিতে লবণ দ্রবীভূত থাকায় পানি বাষ্পীভূত হওয়ার পর ফাটলে লবণ থেকে যায়। ক্রমান্বয়ে এ লবণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে শিলার বহির্ভাগ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানাকৃতিতে ভেঙে যায়। আমাদের দেশে ইটের দালানে এ ধরনের প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল দেখা যায় যাকে সাধারণভাবে 'লোনা ধরা' বলে। শুষ্ক অঞ্চলে এ প্রক্রিয়ায় ব্যাপকভাবে শিলা বিচূর্ণীভূত হয়।
চ. মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাব: উচ্চ পর্বতের খাড়া ঢালে কোনো শিলাখণ্ড আলগা হলে তা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে নিচে পতিত হয় এবং ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়। আবার পতিত এ শিলার আঘাতেও পর্বতের পাদদেশের শিলাসমূহ ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয় এবং বিচূণীভবন সংঘটিত হয়।
Read more