Agriculture

কৃষি মানুষের প্রাচীনতম পেশা। জীবনধারণের জন্য ভূমি চাষ করে মানুষ যখন ফসল ফলাতে শিখল তখন থেকেই কৃষির উদ্ভব। এই পেশাই পরবর্তীকালে মানুষের স্থায়ী বসতি নির্মাণে উৎসাহী করে তোলে এবং সভ্যতার শুরু হয়। শুধু জীবনধারণের প্রধানতম অবলম্বনই নয়, বিশ্বজুড়ে শিল্পের কাঁচামাল ও নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রীর বেশিরভাগই আসে কৃষি থেকে। তাই কৃষি প্রথম শ্রেণির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিশ্বের প্রতিটি দেশেই অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কৃষি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। উন্নত বিশ্বে কৃষির অবস্থান এরূপ নয়, তবে তাদের কৃষিখাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাণিজ্যভিত্তিক। তবে পৃথিবীর সব দেশেই কৃষিকার্য ভৌগোলিক নিয়ামক দ্বারা প্রভাবিত।
কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মিসেস তুরিন যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে তা ফলপ্রসূ কৃষি সম্প্রসারণ সেবাদানের মাধ্যমে কৃষি যন্ত্র ব্যবহারে আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া সম্পাদন করে থাকে।
শফিকের বাবা বিএডিসিতে চাকরি করে বলে তাদের কলেজ থেকে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী শিক্ষা সফলে গিয়েছিল বিএডিসিতে। সেখানে শিক্ষার্থীরা অনেক বিষয়ে জ্ঞান লাভ করল।
দৈনিক পত্রিকা পড়ে হাবিব জানতে পারল বাংলাদেশে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত উত্তর-পূর্ব দিক হতে মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়। ফলে এই সময় বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে এবং শীতের প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যায়।
(Geographical Factors of Agriculture)
কৃষিকাজের ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Agriculture. শব্দটি আবার দুটি ল্যাটিন শব্দ 'Agros' এবং 'cultura'-এর সমন্বয়ে গঠিত। 'Agros' অর্থ মাটি বা ভূমি এবং 'Cultura' শব্দের অর্থ চাষ করা। অর্থাৎ ভূমিকর্ষণ বা চাষ করার মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করাকেই কৃষি বলে। এটি মানুষের আদিমতম পেশা। এটি উন্নয়নের মূলভিত্তি।
কৃষির সংজ্ঞা: মানুষের প্রাচীনতম পেশাকে বিভিন্ন কৃষি বিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। যেমন-
- 'কৃষি হলো ভূমি চাষাবাদের বিজ্ঞান ও শিল্প।'- R.L. kohen (2006).
- 'Agriculture is a science, Industry and Business'. G.O Brrayen.
- 'কৃষি হলো এক ধরনের সৃষ্টি সম্পর্কিত কর্ম, যা সেচ কৌশলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়'- অধ্যাপক এ. আর. খান।
কৃষিকাজের উপর প্রভাব বিস্তারকারী ভৌগোলিক উপাদানসমূহকে মূলত ৩ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

নিচে কৃষিতে প্রভাব বিস্তারকারী ভৌগোলিক নিয়ামকসমূহ বর্ণনা করা হলো:
ক. প্রাকৃতিক নিয়ামক (Physical factors): কৃষিকাজের প্রাকৃতিক নিয়ামকসমূহ হচ্ছে-
১. জলবায়ু: কৃষিকাজ জলবায়ুর ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি পদ্ধতি জলবায়ু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ধান ক্রান্তীয় মৌসুমি (বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড) এবং গম নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু অঞ্চলে (পাকিস্তান, উত্তর আমেরিকার প্রেইরি) ভালো জন্মে।
তাপমাত্রা: প্রতিটি কৃষি ফসলের জন্য একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা ছাড়া ফসলের উৎপাদন সম্ভব নয়। তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদিত হয়।
যেমন- ধান ও গম উৎপাদনের জন্য যথাক্রমে ১৬-২৭ এবং ১০-১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা প্রয়োজন।
বৃষ্টিপাত: কৃষিকাজে বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন অত্যধিক। পানি ছাড়া উদ্ভিদের জন্ম ও বিকাশ লাভ সম্ভব হয় না। আবার সব ধরনের ফসলের জন্য একই পরিমাণ বৃষ্টিপাত প্রযোজ্য নয়। যেমন- ১৫০ থেকে ২৫০ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চলে ধান চাষ ভালো হয়।
আর্দ্রতা: আর্দ্রতার উপর ফসলের জন্ম ও বৃদ্ধি নির্ভরশীল। আর্দ্রতাপূর্ণ অঞ্চলে কৃষিকাজের উন্নতি হয়। যেমন- থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ। অন্যদিকে আর্দ্রতাহীন শুষ্ক অঞ্চলে কৃষিকাজ সম্ভব নয়। যেমন- আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি অঞ্চল।
বায়ুপ্রবাহ: বায়ুপ্রবাহ উদ্ভিদের পরাগায়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও বৃষ্টিপাত সংঘটনে বায়ুপ্রবাহের ভূমিকা আছে। যেমন- ধান ও গমের পরাগায়ণ বায়ুর মাধ্যমেই হয়ে থাকে।
২.ভূপ্রকৃতি: ভূমির অবস্থা এবং সমুদ্রতল থেকে এর উচ্চতার ওপর নির্ভর করে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ফসল জন্মে। সমতল ভূমিতে যত নিবিড়ভাবে কৃষিকাজ করা যায়, পাহাড়ি অঞ্চলে তা সম্ভব হয় না। কৃষির ওপর ভূপ্রকৃতির ভূমিকা তাই অনেক বেশি। যেমন- পাহাড়ি ঢালু জমিতে চা, কফি, রাবার প্রভৃতি এবং সমতল ভূমিতে ধান, পাট, সরিষা ভালো হয়।
৩. মৃত্তিকা: মৃত্তিকা কৃষির মূল্যবান উপাদান। উর্বর মৃত্তিকায় ভালো ফসল জন্মে, আবার অনুর্বর মৃত্তিকায় তা সম্ভব হয় না। মৃত্তিকার ধরন ভেদেও ফসল উৎপাদনে ভিন্নতা দেখা যায়। যেমন- বাংলাদেশের উর্বর পলি-দোআঁশ মৃত্তিকায় ধান ভালো জন্মে l
৪. নদ-নদী: নদ-নদী পানির অন্যতম প্রধান উৎস। তাছাড়া পলি সখ্যয়ের কারণে নদীর দুই তীরের মৃত্তিকা উর্বর হয়ে ওঠে। ফলে নদী অববাহিকা অঞ্চলে ব্যাপক কৃষিকাজ হয়ে থাকে।
খ. অর্থনৈতিক নিয়ামক (Economic factors): কৃষিকাজের ওপর অর্থনৈতিক নিয়ামকের প্রভাব অপরিসীম।
১. মূলধন: চাষের জন্য ট্রাক্টর, উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক ক্রয়, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ব্যয় প্রভৃতি বাবদ অনেক অর্থ প্রয়োজন হয়। পর্যাপ্ত মূলধন ছাড়া তাই কৃষিকাজ সম্ভব নয়।
২. শ্রমিক: বাংলাদেশের ন্যায় উন্নয়নশীল দেশসমূহ কৃষিকাজের জন্য এখনো শ্রমিকের ওপর নির্ভর করে থাকে। জমি চাষ, সেচ প্রদান, ফসল সংগ্রহ, মাড়াই করা প্রভৃতি কাজের জন্য অনেক শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। তাই সময়মতো পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া গেলে কৃষিকাজ ভালো হয়।
৩. পরিবহন: উৎপাদিত পচনশীল ও অন্যান্য পণ্যসামগ্রী বাজারজাতকরণের জন্য উন্নত ও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সময়মতো ফসল বাজারজাতকরণ করা না গেলে উৎপাদনের কোনো মূল্য থাকে না।
৪. বাজার: আধুনিক বাজারব্যবস্থা কৃষি উৎপাদনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। পৃথিবীর যে অঞ্চলে যে পণ্যের চাহিদা বা বাজার থাকে, সে অঞ্চলে সেই ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। যেমন- শ্রীলংকায় চা, মালয়শিয়ায় রাবার চাষ।
গ. সাংস্কৃতিক নিয়ামক (Cultural factors): কতিপয় সাংস্কৃতিক উপাদানের উপরও কৃষিকাজ নির্ভর করে। যেমন-
১. জনসংখ্যা: কোনো স্থানে জনসংখ্যা বেশি হলে কৃষিপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। ফলে পণ্য উৎপাদনের তাগিদ বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে, জনসংখ্যা কম থাকলে কম চাহিদার কারণে কৃষিপণ্য কম উৎপাদিত হয়।
২. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: আধুনিক কৃষি অনেকাংশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর। অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশসমূহ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকায় তারা কৃষিতে অনগ্রসর। যেমন- মালদ্বীপ, বাংলাদেশ। অপরপক্ষে, ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন, যন্ত্রের সাহায্যে চাষাবাদ ও সেচ প্রদান, ফসল মাড়াই করা প্রভৃতি কাজে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে উন্নত দেশসমূহ কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করছে। যেমন- চীন, জাপান।
৩. দৃষ্টিভঙ্গি: মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কৃষিজ উৎপাদনকে প্রভাবিত করে থাকে। যেমন- উন্নত দেশের কৃষকদের মূল লক্ষ্য থাকে মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে সমৃদ্ধি লাভ। তারা সেই অনুযায়ী ফসল চাষ করে থাকে। পক্ষান্তরে, দরিদ্র দেশসমূহের কৃষকেরা সর্বাগ্রে নিজেদের জীবনধারণের জন্য পণ্য উৎপাদন করে থাকে।
৪. সরকারি নীতি: একটি দেশের কৃষিক্ষেত্রের উন্নয়ন ও প্রসার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতির ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে। যেমন: বাংলাদেশ সরকার সারের উপর ভর্তুকি দিয়ে থাকে। আবার অনেক সময় দেশীয় উৎপাদন রক্ষা করতে বিদেশে কম মূল্যে পেলেও কৃষিপণ্য আমদানি করা হয় না।
কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
(Factors of Rice Production)
ধান Oryza বর্গের তৃণজাতীয় দানাদার ফসল। এর বৈজ্ঞানিক নাম Oryza sativa. এটা পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য (১ম গম)।
ধান চাষের অনুকূল ভৌগোলিক উপাদান
বিভিন্ন প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উপাদান ধান চাষের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। যেমন-
ক. প্রাকৃতিক উপাদান: যেসব প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর ধান চাষের সাফল্য নির্ভর করে সেগুলো হলো-
১.ভূপ্রকৃতি: উচ্চভূমি অপেক্ষা সমতল ও নিম্নভূমি ধান চাষের উপযোগী। বিশ্বের প্রায় ৯০ ভাগ ধান নদী গঠিত প্লাবন সমভূমি এবং বদ্বীপ সমভূমি অন্যলে উৎপন্ন হয়। যেমন- দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া।
বৃষ্টিবহুল পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ের গায়ে ধানের চাষ করা হয়। যেমন- জাপান।
২.জলবায়ু ধান চাষে জলবায়ু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে থাকে। জলবায়ুর উপাদানগুলোর মধ্যে বৃষ্টিপাত ও উত্তাপ এ দুটি উপাদানের ওপর ধান চাষের উৎপাদন নির্ভর করে।
i. বৃষ্টিপাত: ধান চাষের জন্য বার্ষিক গড় ১০০-২৫০ সে.মি. বৃষ্টিপাতের দরকার। তবে যেসব স্থানে বৃষ্টিপাত ১৭৫-২২৫ সে.মি. সেসব স্থানে ধানের ফসল ভালো হয়।
ii. তাপমাত্রা ধান চাষের জন্য সাধারণত সে. তাপমাত্রার প্রয়োজন। ধান বীজের অঙ্কুরোদগমের জন্য সে. অপেক্ষা অধিক তাপমাত্রা প্রয়োজন। চারা বৃদ্ধিকালীন সময় তাপমাত্রা সে. মধ্যে থাকা আবশ্যক। বিশ্বের প্রায় ৯৫ শতাংশ ধান উষ্ণ ও আর্দ্র অঞ্চলে উৎপন্ন হয়।
iii. বায়ুপ্রবাহ: বায়ুপ্রবাহ ফসলের পরাগায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া প্রবাহমান বাতাস মৃত্তিকার নাইট্রোজেনের স্বল্পতা দূর করতে সহায়তা করে।
৩. মৃত্তিকা: পলিযুক্ত উর্বর এঁটেল-দোঁআশ মাটি ধান চাষের জন্য সর্বাধিক উপযোগী। কারণ এ ধরনের মাটি অধিক পরিমাণ পানি ধারণ করে রাখতে সক্ষম।
৪. পানির সান্নিধ্য: ধানের জমিতে পানির ঘাটতি হলে আশানুরূপ ফসল পাওয়া যায় না। তাই নদী, হ্রদ, বিল, ঝিল প্রভৃতি অঞ্চলে ধানের চাষ বেশি হয়ে থাকে। তাছাড়া স্বল্প বৃষ্টিযুক্ত বা শুষ্ক অঞ্চলে নদী থেকে সেঁচের মাধ্যমে ধানের চাষ করা হয়। যেমন- সিন্ধু ও নীল নদ অববাহিকার ধান চাষ।
খ. অর্থনৈতিক উপাদান: ধান চাষের জন্য নিচের অর্থনৈতিক উপাদানগুলোর বিশেষ প্রয়োজন হয়।
১. মূলধন: ধান চাষের জন্য উন্নতমানের বীজ, সার, কীটনাশক, পশু ও যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং শ্রমিকের মজুরি প্রদান বাবদ প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়।
২. শ্রমিক: ভূমি চাষ, বীজ বপন, চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, ধানকাটা, মাড়াই করা প্রভৃতি কাজের জন্য প্রচুর দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন।
৩. পরিবহন ধান চাষের জন্য শ্রমিক, যন্ত্রপাতি, বীজ, সার প্রভৃতি সরবরাহ এবং উৎপাদিত ধান বাজারজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং সরবরাহের জন্য উন্নত ও সুলভ পরিবহনের প্রয়োজন হয়।
৪. বাজার: অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজার ধান উৎপাদনের জন্য আবশ্যক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে ধানের বাজার থাকায় বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ ধান এ অন্যলে উৎপাদিত হয়।
গ.সাংস্কৃতিক উপাদান: সাংস্কৃতিক উপাদানের মধ্যে উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক, যন্ত্রপাতি, শিক্ষা ও সরকারি উদ্যোগ প্রভৃতি ধান চাষে বিশেষ প্রভাব ফেলে। ধান চাষের উন্নতি ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা একান্ত প্রয়োজন।
কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
(Worldwide Production, Distribution and Economic Importance of Rice)
ধান প্রধানত মৌসুমি অঞ্চলের ফসল। জনবহুল দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে পৃথিবীর অধিকাংশ ধান উৎপন্ন হয়ে থাকে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশ, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব চীন, জাপান, কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে বিশ্বের প্রায় ৯০% ধান উৎপন্ন হয়ে থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি অববাহিকা, ইতালির পো নদী অববাহিকা, দক্ষিণ আমেরিকার ওরিনকো নদী অববাহিকা প্রভৃতি সুপ্রসিদ্ধ ধান উৎপাদক অঞ্চল। FAO এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বিশ্বে মোট ৭৮২০ লক্ষ মেট্রিক টন ধান উৎপন্ন হয়।
সারণি-৪.১: বিশ্বের ধান উৎপাদন (২০১৮)
(লক্ষ মেট্রিক টন হিসাবে)
| দেশের নাম | উৎপাদনের পরিমাণ |
| ১. চীন | ২১৪১ |
| ২. ভারত | ১৭২৬ |
| ৩. ইন্দোনেশিয়া | ৮৩০ |
| ৪. বাংলাদেশ | ৫৬৪ |
| ৫. ভিয়েতনাম | 88০ |
| ৬. থাইল্যান্ড | ৩২১ |
| ৭. মিয়ানমার | ২৫৪ |
| ৮. ফিলিপাইন | ১৯০ |
| ৯. ব্রাজিল | ১১৭ |
| ১০. পাকিস্তান | ১০৮ |
| ১১. সমগ্র বিশ্ব | ৭৮২০ |
পৃথিবীর প্রধান প্রধান ধান উৎপাদনকারী দেশ
১. চীন: ধান উৎপাদনে চীন বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকারী দেশ। চীনের হোয়াংহো, ইয়াং সিকিয়াং ও সেচুয়ান অববাহিকা এবং হুনান প্রদেশে প্রচুর ধান জন্মে। হুনান প্রদেশে অত্যধিক ধান উৎপন্ন হয় বলে একে 'ধানের আধার' (rice bowl) বলা হয়।

২. ভারত: ধান উৎপাদনে ভারত বিশ্বে দ্বিতীয়। দেশটির আসাম, মাদ্রাজ, বিহার, উড়িষ্যা, উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশ, ত্রিপুরা, অন্ধ্র প্রদেশ, কর্ণাটক প্রভৃতি রাজ্যে প্রচুর ধান উৎপন্ন হয়।
৩.ইন্দোনেশিয়া: ধান উৎপাদনে ইন্দোনেশিয়ার স্থান বিশ্বে তৃতীয়। এ দেশের জাভা অঞ্চল ধান উৎপাদনে প্রসিদ্ধ।
৪. বাংলাদেশ: বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ধান উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকা অঞ্চল ও সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলের জেলাসমূহে সর্বাধিক ধান উৎপন্ন হয়।
৫. ভিয়েতনাম: ধান উৎপাদনে ভিয়েতনামের স্থান বিশ্বে পঞ্চম। দেশটির মেকং নদীর বদ্বীপ অঞ্চল ও উত্তর ভিয়েতনামের লোহিত অববাহিকায় প্রচুর পরিমাণে ধান উৎপন্ন হয়।
৬.থাইল্যান্ড: ধান উৎপাদনে থাইল্যান্ড বর্তমান বিশ্বে যষ্ঠ। থাইল্যান্ডের সর্বত্রই ধানের চাষ হয়। তবে মেনাব নদীর অববাহিকা ও বদ্বীপ অঞ্চলেই বেশি ধান জন্মে।
৭. মিয়ানমার: ধান উৎপাদনে মিয়ানমারের স্থান বিশ্বে সপ্তম। ইরাবতী নদীর বদ্বীপ ভূমি এ দেশের ধান উৎপাদনের প্রধান অঞ্চল।
৮. ফিলিপাইন: ধান উৎপাদনে ফিলিপাইনের স্থান বর্তমানে বিশ্বে অষ্টম। ফিলিপাইনের সুজন দ্বীপের সমভূমি ও সোপান ভূমি ধান উৎপাদনে প্রসিদ্ধ।
৯. ব্রাজিল: ব্রাজিল বিশ্বে নবম ধান উৎপাদনকারী দেশ। এ দেশের আমাজন নদীর উপত্যকা ও আটলান্টিক উপকূলে প্রচুর ধান জন্মে।
১০. পাকিস্তান: ধান উৎপাদনে দেশটির স্থান দশম। দেশটির নিম্ন সিন্ধু অববাহিকা, পাঞ্জাব সমভূমি, পেশোয়ার উপত্যকা, পশ্চিম কাশ্মির প্রভৃতি অঞ্চলে প্রচুর ধান উৎপন্ন হয়।
ধানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য
বিশ্বের কোনো দেশই সরাসরি ধান আমদানি বা রপ্তানি করে না। ধান থেকে চাল তৈরি করে বিশ্ববাজারে প্রেরণ করা হয়। বিশ্বে চাল রপ্তানিতে ২০১৮ সালে ভারত ১ম, থাইল্যান্ড ২য়, ভিয়েতনাম ৩য় ও পাকিস্তান ৪র্থ স্থানে রয়েছে। অপরদিকে, ২০১৮ সালে বিশ্বের দেশগুলো প্রায় ২১.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের চাল আমদানি এবং ২০.৭ বিলিয়ন ডলার ও সৌদি আরব ৩য় স্থানে রয়েছে। মূল্যের চাল রপ্তানি করে। ২০১৮ সালে আমদানিতে চীন ১ম, ইরান ২য় ও।
সারণি-৪.২: চালের বিশ্ববাণিজ্য (বিলিয়ন মার্কিন ডলার হিসেবে)
| রপ্তানি বাণিজ্য | আমদানি বাণিজ্য | ||
| দেশের নাম | ২০১৮ | দেশের নাম | ২০১৮ |
| ১. ভারত | ৭.৪ | ১. চীন | ১.৬ |
| ২. থাইল্যান্ড | ৫.৬ | ২. ইরান | ১.২ |
| ৩. ভিয়েতনাম | ২.২ | ৩. সৌদি আরব | ১.২ |
| ৪. পাকিস্তান | ২ | ৪.ইন্দোনেশিয়া | ১.০ |
| ৫. যুক্তরাষ্ট্র | ১.৭ | ৫. যুক্তরাষ্ট্র | ০.৯৫৯ |
| ৬. চীন | ০.৮৮৭ | ৬. বেনিন | ০.৯৩০ |
| ৭. ইটালি | ০.৬১৪ | ৭. ফিলিপাইন | ০.৭৩৭ |
| ৮. ব্রাজিল | ০.৪৬৮ | ৮. আইভরিকোস্ট | ০.৬৮৯ |
| ৯. উরুগুয়ে | ০.৪০০ | ৯. সংযুক্ত আরব আমিরাত | ০.৬৮২ |
| ১০. কম্বোডিয়া | ০.৩৭৫ | ১০. ইরাক | ০.৬৬৯ |
সূত্র: WTE, 2020
অনুকূল প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উপাদান ধান উৎপাদনে সহায়ক। বিশ্বের সর্বত্র ধান উৎপন্ন হলেও এশিয়া মহাদেশের দেশগুলোতে প্রচুর ধান উৎপন্ন হয়। ধান আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়নি। কারণ ধান উৎপাদনকারী দেশসমূহের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেশি থাকায় বিশ্ববাণিজ্যে এর প্রবেশ খুব সীমিত।
উন্নয়নশীল বিশ্বে ধান চাষের সমস্যা
উন্নয়নশীল বিশ্বে ধান চাষে কিছু সমস্যা বিরাজমান। সেগুলো হচ্ছে-
১. জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ
২. মূলধনের অভাব,
৩. ধানের বীজ স্বল্পতা,
৪. মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীলতা,
৫. আধাদক্ষ বা অদক্ষ শ্রমিক,
৬. সনাতন চাষ পদ্ধতি,
৭. উন্নত বীজের অভাব,
৮. সারের ঘাটতি,
৯. পানিসেচের অপর্যাপ্ততা,
১০. ভূমির অত্যধিক চাহিদা,
১১. ভূমির খণ্ডীকরণ,
১২. ভূমিহীন কৃষক,
১৩. কীটপতঙ্গের আক্রমণ,
১৪. অনুন্নত পরিবহন ব্যবস্থা,
১৫. গুদাম ও পণ্যাগারের স্বরা
১৬. বাজারজাতকরণের অসুবিধা,
১৭. শক্তি সম্পদের অভাব,
১৮. সমন্বিত কৃষিনীতির অভাব প্রভৃতি।
উন্নয়নশীল বিশ্বে ধান চাষের সমস্যার সমাধান
উন্নয়নশীল দেশের ধান চাষে বিরাজমান সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য বেশকিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন-
১. বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ,
২. কৃষি ঋণের ব্যবস্থা,
৩. উন্নতমানের বীজ সরবরাহ,
৪. সার ও কীটনাশক সরবরাহ,
৫. সেচব্যবস্থার উন্নতি,
৬. মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা,
৭. প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা,
৮. ভূমি সংস্কার আইন সংশোধন প্রভৃতি।
কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
(Factors of Wheat Production)
গম এক প্রকার দানাদার খাদ্যশস্য, যা পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের প্রধান খাবার। প্রাচীনকাল থেকে এর বিভিন্নমূখী ব্যবহার চলে আসছে। গম গ্রামিনি গোত্রভূক্ত তৃণজাতীয় উদ্ভিদ। গমের বৈজ্ঞানিক নাম Triticum aestivum। এর প্রধান জাতগুলোর আদিভূমি পাকিস্তান, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং উত্তর আমেরিকা। পরবর্তীকালে এসমস্ত অঞ্চল থেকে গম সারাবিশ্বে বিস্তার লাভ করেছে।
গম উৎপাদনের নিয়ামকসমূহ: গম উৎপাদনে বেশ কিছু নিয়ামক বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। সেগুলো হলো:
ক. প্রাকৃতিক নিয়ামক: গম উৎপাদনের প্রাকৃতিক নিয়ামকসমূহ নিম্নরূপ:
১. জলবায়ু গম মূলত নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের শস্য। গম চাষের আদর্শ তাপমাত্রা হচ্ছে ১৫০-২০°সে.। শস্যটি চাষের প্রাথমিক অবস্থায় তাপমাত্রা কম (১৮০°সে.) এবং ফসল পাকার সময় বেশি তাপমাত্রা (২২°সে.) থাকা প্রয়োজন। গম চাষের জন্য অবস্থান অনুসারে বার্ষিক গড়ে ৩০ থেকে ১০০ সে.মি. বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। যেমন- উত্তর আমেরিকার প্রেইরি, রাশিয়া।
২. মৃত্তিকা: কর্দমময় দোআঁশ মৃত্তিকা গম চাষের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট। লাভাগঠিত এবং লোয়েস মৃত্তিকাতেও গম চাষ ভালো হয়।
৩. ভূপ্রকৃতি: সমতল ভূমি গম চাষের জন্য উপযোগী। সহজে পানি সরে যেতে পারে এমন সমতল ভূমি গম চাষের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট। যেমন- বাংলাদেশের প্লাবন সমভূমি।
খ. আর্থ-সামাজিক নিয়ামক: গম চাষের জন্য আর্থ-সামাজিক নিয়ামকসমূহ নিম্নরূপ:
১. খাদ্যাভ্যাস: বিশ্বের নাতিশীতোষ্ণ ও শীতপ্রধান অঞ্চলের এক বিরাট জনগোষ্ঠীর প্রধান খাদ্য গম। বিশ্বের যেসব অঞ্চলে গমের চাহিদা আছে, সেখানে গমের চাষ বেশি হয়। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র।
২. জনবসতি: জনবসতির ঘনত্ব কম হলে অধিক চাষের জমি পাওয়া যায়। ফলে গম চাষ ভালো হয়। জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হলে জমি খণ্ড খণ্ড হয়ে যাওয়ায় গম উৎপাদন ভালো হয় না।
৩. কৃষি উপকরণ: বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যাপক এলাকায় গম চাষের জন্য আধুনিক ও উন্নত কৃষি উপকরণ-যেমন: ট্রাক্টর, হার্ভেস্টর প্রভৃতি প্রয়োজন।
৪. নগদ অর্থ: উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক, যান্ত্রিক পদ্ধতির চাষাবাদ, সেচ প্রভৃতি ব্যয় নির্বাহের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়। এ কারণে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল দেশসমূহে গম চাষের প্রসার বেশি হয়। যেমন- চীন, রাশিয়া।
৫. সংরক্ষণ সুবিধা: চাল অপেক্ষা গম দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়। কার্যকর ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের গম চাষকে প্রভাবিত করে।
৬. রপ্তানির সুযোগ: খাদ্যশস্যের মধ্যে গমের রপ্তানি বাণিজ্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বার্ষিক মোট উৎপাদিত গমের ১৫%-২০% বিশ্ব বাজারে প্রবেশ করে। রপ্তানির এ সুযোগ গ্রহণ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়া, প্রভৃতি দেশ অধিক পরিমাণ গম উৎপাদন করে থাকে।
৭. সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা: বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গম চাষ করতে হলে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা আবশ্যক। ফলে প্রয়োজনের সময় ভর্তুকি প্রদান করে গমের উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়।
কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
(Worldwide Production, Distribution and Economic Importance of Wheat)
বিশ্বের প্রধান গম উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়া, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানি, পাকিস্তান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, ইউক্রেন প্রভৃতি দেশ উল্লেখযোগ্য। বিশ্বের মোট উৎপাদিত গমের ৪৫% এশিয়ায়, ৩৩% ইউরোপে, ১১% উত্তর আমেরিকায়, ৪% দক্ষিণ আমেরিকায়, ৪% আফ্রিকায় এবং ৩% অস্ট্রেলিয়ায় উৎপাদিত হয়।
সারণি-৪.৩: মহাদেশভিত্তিক গম উৎপাদন (২০১৮)
| মহাদেশ | উৎপাদনের পরিমাণ (লক্ষ মেট্রিক টন) |
| ১. এশিয়া | ৩২৯৪ |
| ২. ইউরোপ | ২৪২১ |
| ৩. উত্তর আমেরিকা | ৮৩১ |
| ৪. আফ্রিকা | ২৯৩ |
| ৫. দক্ষিণ আমেরিকা | ২৭১ |
| ৬. অস্ট্রেলিয়া | ২১৩ |
| সমগ্র পৃথিবী | ৭৩২৩ |
উৎস: FAOSTAT. February, 2020
বিশ্বের প্রধান গম উৎপাদনকারী দেশ: বিশ্বের প্রধান, গম উৎপাদনকারী দেশসমূহ নিম্নরূপ:
১. চীন: পৃথিবীর শীর্ষ গম উৎপাদনকারী দেশ চীন। এদেশে শীত ও বসন্তকালীন উভয় প্রকার গম চাষ করা হয়। উত্তর চীনের সমভূমি, ইয়াংসী ও হোয়াংহো নদী অববাহিকা অঞ্চল, সিচুয়ান প্রদেশ প্রভৃতি চীনের প্রধান গম উৎপাদনকারী অঞ্চল। FAO এর তথ্যমতে, বিশ্বের মোট গম উৎপাদনের প্রায় ১৮% চীনে উৎপাদিত হয়।
২. ভারত: বিশ্বের অন্যতম প্রধান গম উৎপাদনকারী দেশ হচ্ছে ভারত। দেশটি গম উৎপাদনে ২য় স্থানের অধিকারী। ভারতের উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রে ভালো গম উৎপাদিত হয়। ভারতে মূলত শীতকালীন গম বেশি উৎপন্ন হয়।
৩. রাশিয়া: দেশটি গম উৎপাদনে ৩য় স্থানে রয়েছে। রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলে বসন্তকালীন গম উৎপাদিত হয়। রাশিয়ার উৎপাদিত গম উৎকৃষ্ট মানের।
৪. যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর অন্যতম প্রধান গম উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ। গম উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ৪র্থ। যুক্তরাষ্ট্রে শীত ও বসন্তকালীন গম উৎপাদিত হয়ে থাকে। দেশটির মধ্য ও উত্তরাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে গম উৎপাদন বেশি হয়।
৫. কানাডা: গম উৎপাদনে কানাডা বিশ্বে পঞ্চম। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে চাষাবাদ করায় কানাডায় গম উৎপাদন অনেক বেশি। কানাডার প্রেইরি, আলবার্টা, ম্যানিটোবা প্রভৃতি অঞ্চলে প্রচুর গম উৎপাদন হয়। কানাডার দক্ষিণ ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর অর্থাৎ উভয় দেশের সীমান্তবর্তী প্রেইরি অঞ্চলজুড়ে এতো বেশি গম উৎপাদিত হয় যে, এই অঞ্চলকে 'বিশ্বের বুটির ঝুড়ি' (Bread Basket of the world) বলা হয়।
সারণি-৪.৪: বিশ্বের গম উৎপাদনকারী দেশ (লক্ষ মেট্রিক টন, ২০১৮)
| দেশ | উৎপাদনের পরিমাণ | দেশ | উৎপাদনের পরিমাণ |
| ১. চীন | ১৩১৪ | ৬. পাকিস্তান | ২৫৯ |
| ২. ভারত | ৯৯৭ | ৭. ইউক্রেন | ২৪৭ |
| ৩. রাশিয়া | ৭২১ | ৯. তুরস্ক | ২০০ |
| ৪. যুক্তরাষ্ট্র | ৫১৩ | ৮. অস্ট্রেলিয়া | ২০৯ |
| ৫. কানাডা | ৩১৮ | ১০. ইরান | ২০৯ |
উৎস: FAO STAT. February, 2020
৬. পাকিস্তান: পাকিস্তান বিশ্বের ষষ্ঠ এবং এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম গম উৎপাদনকারী দেশ। পাঞ্জাব প্রদেশে সবচেয়ে বেশি গম উৎপন্ন হয়ে থাকে। পাকিস্তানের সিন্ধু ও
৭. ইউক্রেন: গম উৎপাদনে ইউক্রেন বিশ্বে সপ্তম স্থানের অধিকারী দেশ। দেশটির মধ্য ও দক্ষিণ মধ্যাঞ্চল গম চাষের জন্য প্রসিদ্ধ।
যা দেশ। দেশটির ি ৮. অস্ট্রেলিয়া: অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের অষ্টম গম উৎপাদনকারী দেশ। দেশটির ভিক্টোরিয়া, নিউসাউথ ওয়েলস প্রভৃতি প্রদেশে গম উৎপাদিত হয়।
৯. তুরস্ক: বর্তমানে গম উৎপাদনে তুরস্ক নবম স্থানে রয়েছে। তুরস্কের মানিসা, কনিয়া, ইকদির, দিয়ারবাকির, টোকাত প্রভৃতি প্রদেশে প্রচুর গম উৎপাদন হয়।
১০. ইরান: গম উৎপাদনে ইরান বিশ্বে দশম। ইরানের খুজেস্তান, গুলেস্তান, ফার্ম, ক্যারামন শাহ, কুদিস্তান প্রভৃতি প্রদেশে প্রচুর গম উৎপাদন হয়।

গমের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও বিশ্ববাণিজ্য সমগ্র পৃথিবী জুড়ে গম প্রধান খাদ্যশস্য। ফলে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দানাদার শস্যের মধ্যে গম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বর্তমান বিশ্বের মোট উৎপাদিত গমের প্রায় ১৬ শতাংশ বিশ্ববাজারে প্রবেশ করে। ২০১৭-১৮ সালে বিশ্বের দেশগুলো প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার মূল্যের গম- রপ্তানি এবং ৪১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের গম আমদানি করে। সূত্র- United States Department of Agriculture-2018.
সারণি-৪.৫: প্রধান প্রধান দেশের গমের আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ (২০১৮)
| দেশ | রপ্তানির পরিমাণ (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) | দেশ | আমদানির পরিমাণ (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) |
| ১. রাশিয়া | ৮.৪ | ১. ইন্দোনেশিয়া | ২.৬ |
| ২. কানাডা | ৫.৭ | ২. মিশর | ২.২ |
| ৩. যুক্তরাষ্ট্র | ৫.৪ | ৩. আলেজেরিয়া | ১.৮৪ |
| ৪. ফ্রান্স | ৪.১ | ৪. ইতালি | ১.৮২ |
| ৫. অস্ট্রেলিয়া | ৩.১ | ৫. ফিলিপাইন | ১.৭ |
| ৬. আর্জেন্টিনা | ২.৫ | ৬. জাপান | ১.৬ |
| ৭. ইউক্রেন | ২.৪ | ৭. ব্রাজিল | ১.৫ |
| ৮. জার্মানি | ১.২ | ৮. স্পেন | ১.৩৩ |
| ৯. রোমানিয়া | ১.২ | ৯. তুরস্ক | ১.২৯ |
| ১০. কাজিকিস্তান | ০.৯৭ | ১০. মেক্সিকো | ১.১৭ |
(Source: WTE-2020)
রপ্তানিকারক দেশ: রাশিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ইউক্রেন, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি প্রধান গম রপ্তানিকারক দেশ। দেশগুলো নিজেদের আভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিশ্ব বাজারে গম রপ্তানি করে থাকে।
আমদানিকারক দেশসমূহ: গম আমদানিকারক দেশগুলো অনিয়মিতভাবে বা অনির্ধারিতভাবে গম আমদানি করে
থাকে। যেমন- ভারত, পাকিস্তান, কিউবা প্রভৃতি দেশে গম আমদানির পরিমাণ বাড়ছে। আবার আলজেরিয়া, চীনে কমছে। ২০১৮ সালে প্রধান গম আমদানিকারক দেশের মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, মিশর, আলজেরিয়া, ব্রাজিল, জাপান, বাংলাদেশ, ইতালি, স্পেন, তুরস্ক, মেক্সিকো প্রভৃতি দেশ। বিশ্ব বাণিজ্যে গমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাধারণত উন্নত দেশগুলো গম রপ্তানি করে। অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলো তা আমদানি করে।
পরিশেষে বলা যায়, গমের রপ্তানি মূল্য অন্যান্য খাদ্যশস্য অপেক্ষা অধিক হওয়ায় উৎপাদনকারী দেশগুলো (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য) অনেক ক্ষেত্রে গমকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। আজ পর্যন্ত গম চাষের ওপর যত গবেষণা হয়েছে ততটুকু অন্য কোনো ফসলের জন্য হয়নি। খাদ্যমান বেশি থাকায় বিশ্বে গমের জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছেl
কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
(Factors of Sugarcane Production)
আখ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ফসল। এটি সরু ও লম্বা কাণ্ডবিশিষ্ট হয়। এ কাণ্ডের রস যথেষ্ট মিষ্টি। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এ রস থেকে চিনি উৎপাদন করা হয় বলে এর চাষের আওতা সম্প্রসারিত হয়েছে। পৃথিবীর মোট চিনির শতকরা প্রায় ৬৮ ভাগ আখ থেকে উৎপন্ন হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের মৌসুমি অঞ্চল আখের আদিভূমি। উর্বর দোঁআশ মৃত্তিকা, পরিমিত উত্তাপ ও বৃষ্টিপাত, পর্যাপ্ত মূলধন ও শ্রমিক সরবরাহ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ইত্যাদি আখ চাষের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।- আখ এর বৈজ্ঞানিক নাম Saccharum officinarum
আখ চাষের অনুকূল ভৌগোলিক নিয়ামক:
আখ চাষ কতগুলো ভৌগোলিক নিয়ামক দ্বারা প্রভাবিত। যেমন-
১. ভূপ্রকৃতি: পানি জমে থাকে না এরূপ উঁচু ও সামান্য ঢালু জমিতে আখ চাষ ভালো হয়।
২. মৃত্তিকা: চুন, পটাশ ও নাইট্রোজেনযুক্ত ও লাভা গঠিত কৃষ্ণ মৃত্তিকা আখ চাষের জন্য উপযোগী। তাছাড়া উর্বর দোআঁশ মৃত্তিকা আখ চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী।
৩. জলবায়ু: আখ চাষের জন্য ১৯০-২৭০ সে. তাপমাত্রা প্রয়োজন। সাধারণত ১২৫-১৭৫ সে.মি. বৃষ্টিপাতবিশিষ্ট অঞ্চলে আখ ভালো জন্মে। এছাড়া সমুদ্রের লোনা বাতাসের প্রভাবে আখের রসে চিনির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। উপরিউক্ত নিয়ামকগুলো অনুকূল থাকায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এবং পাকিস্তানের সিন্দু অববাহিকায় আখ চাষের প্রসার ঘটেছে।
অর্থনৈতিক উপাদানসমূহ: আখ চাষের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থ-সামাজিক উপাদানসমূহ হলো-
১. মূলধন: চারা, সার, কীটনাশক ও চাষের যন্ত্রপাতি ক্রয় ও পরিবহন ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রচুর মূলধনের দরকার।
২. শ্রমিক: আখের জমি তৈরি, চারা রোপণ, তত্ত্বাবধান, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, আখ কর্তন প্রভৃতি কাজে প্রচুর দক্ষ ও আধাদক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন।
৩. উন্নত পরিবহন ক্ষেত থেকে আখ দ্রুত চিনিকলে এবং সেখান থেকে বাজারে পাঠানোর জন্য উন্নত পরিবহন ও যাতায়াত ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক।
৪. বাজার: আখ চাষের জন্য অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির ব্যাপক চাহিদা থাকা আবশ্যক। উপরিউক্ত নিয়ামকগুলো অনুকূল থাকায় চীন, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশে আখ চাষের প্রসার ঘটেছে।
সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহ:
১.সার ও কীটনাশক: জমির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধির জন্য সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই দমন করার জন্য কীটনাশক প্রয়োজন।
২. চিনিকল প্রতিষ্ঠা: আখ চাষ বৃদ্ধির জন্য অধিকসংখ্যক চিনিকল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন।
৩. সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা: আখ চাষের সম্প্রসারণ তথা সার্বিক উন্নতির জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা একান্তভাবে প্রয়োজন।
৪. কৃষি ঋণ: স্বল্প সুদে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা আখ চাষের প্রসার ঘটাতে সহায়তা করে।
কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
(Production, Distribution and Economic Importance of Sugarcane)
আখ চাষের নিয়ামকগুলো অনুকূল থাকায় ব্রাজিল, চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মেক্সিকো, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন প্রভৃতি দেশে আখ চাষের প্রসার ঘটেছে।
সারণি-৪.৬: বিশ্বব্যাপী আখের উৎপাদন ও বণ্টন, ২০১৮
| দেশ | উৎপাদন (লক্ষ মেট্রিক টন) | দেশ | উৎপাদন (লক্ষ মেট্রিক টন) |
| ১. ব্রাজিল | ৭৪৬৮ | ৬. মেক্সিকো | ৫৬৮ |
| ২. ভারত | ৩৭৬৯ | ৭. কলম্বিয়া | ৩৬৩ |
| ৩. চীন | ১০৮৭ | ৮. অস্ট্রেলিয়া | ৩৩৫ |
| ৪. থাইল্যান্ড | ১০৪৪ | ৯. যুক্তরাষ্ট্র | ৩১৩ |
| ৫. পাকিস্তান | ৬৭২ | ১০. ফিলিপাইন | ২৪৭ |
উৎস: FAOSTAT. February 2020
নিচে বিশ্বের প্রধান আখ উৎপাদনকারী দেশগুলোর বিবরণ দেওয়া হলো:
১. ব্রাজিল: আখ উৎপাদনে ব্রাজিলের স্থান বিশ্বে প্রথম। দেশটির উত্তর-পূর্ব উপকূলবর্তী নিচুভূমি এবং পূর্ব-মধ্য মালভূমি, দক্ষিণ-পূর্বের সমুদ্র উপকূলে সর্বাধিক আখ চাষ হয়।
২. ভারত: আখ উৎপাদনে ভারত বিশ্বে দ্বিতীয়। দেশটির গাঙ্গেয় সমভূমি, উত্তর প্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক প্রধান আখ উৎপাদনকারী অঞ্চল।
৩. চীন: চীন বিশ্বের তৃতীয় আখ উৎপাদনকারী দেশ। চীনের ইয়াংসিকিয়াং নদীর উপত্যকা ও বদ্বীপ অঞ্চলে সর্বাধিক আখ চাষ হয়।
৪. থাইল্যান্ড থাইল্যান্ড বিশ্বের চতুর্থ আখ উৎপাদনকারী দেশ। থাইল্যান্ডের মধ্য-পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাংশ আখ উৎপাদনে বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ।
৫. পাকিস্তান: পাকিস্তান বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম আখ উৎপাদনকারী দেশ। পাকিস্তানের সিন্ধু নদের অববাহিকা, লাহোর, লায়ালপুর, শিয়ালকোট, মুলতান, ভাওয়ালপুর প্রভৃতি অঞ্চলে ব্যাপকভাবে আখের চাষ হয়।
৬. মেক্সিকো: আখ উৎপাদনে মেক্সিকোর অবস্থান বিশ্বে যষ্ঠ। দেশটির লিয়ন, ভেরাক্রুজ, নুইতো, টামাউলিপাশ প্রভৃতি এলাকায় ব্যাপকভাবে আখের চাষ হয়।
৭. কলম্বিয়া: কলম্বিয়া বর্তমানে বিশ্বের সপ্তম আখ উৎপাদনকারী দেশ।
৮. অস্ট্রেলিয়া: অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের অষ্টম আখ উৎপাদনকারী দেশ। দেশটির কুইন্সল্যান্ডের উত্তর-পূর্ব উপকূলীয় এলাকায় প্রচুর আখ উৎপাদিত হয়।
৯. ফিলিপাইন আখ উৎপাদনে বিশ্বে দেশটির অবস্থান দশম। দেশটির সুজন দ্বীপের সোপান এলাকায় আখের ফলন ভালো হয়।
১০.ইন্দোনেশিয়া: আখ উৎপাদনে ইন্দোনেশিয়ার স্থান বিশ্বে একাদশতম। এদেশের জাভা দ্বীপের লাভা গঠিত মৃত্তিকায় আখ ভালো জন্মে।

আখের বিশ্ববাণিজ্য
সারাবিশ্বে চিনির চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর সেজন্য আখ চাষের গুরুত্ব উত্তরোত্তর বাড়ছে। বিশ্বের কয়েকটি দেশে যথেষ্ট পরিমাণ আখ উৎপাদিত হলেও বিশ্ববাণিজ্যে এর পরিমাণ খুব কম। এশিয়ার দেশগুলোতে (পাকিস্তান, চীন, থাইল্যান্ড) ধান চাষের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় আখ উৎপাদন কমে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে (কলম্বিয়া, ব্রাজিল, চিলি) আখ উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৮ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রায় ২৭.৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের চিনি বিশ্ববাজারে রপ্তানি করে এবং ৩০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের চিনি আমদানি করে থাকে (সূত্র: WTE-2020) 1
সারণি-৪.৭: আখের (চিনি) বিশ্ববাণিজ্য-২০১৮
(বিলিয়ন ডলার হিসেবে)
| দেশ | রপ্তানি | দেশ | আমদানি |
| ১. ব্রাজিল | ৬.৫ | ১. ইন্দোনেশিয়া | ১.৮ |
| ২. থাইল্যান্ড | ২.৬ | ২. যুক্তরাষ্ট্র | ১.৭ |
| ৩. ফ্রান্স | ১.৪ | ৩. চীন | ১.০ |
| ৪. ভারত | ০.৯২ | ৪. মালয়েশিয়া | ০.৭৪ |
| ৫. জার্মানি | ০.৮০ | ৫. ইতালি | ০.৭২ |
সূত্রঃ WTEX, 2020
উন্নয়নশীল বিশ্বে আখ চাষের সমস্যা ও সমাধান
উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলো আখ চাষে তেমন উন্নতি লাভ করতে পারেনি। কারণ এসব দেশে আখ চাষ নানা সমস্যায় জর্জরিত। অধিকাংশ আখ উৎপাদনকারী দেশ কৃষিতে অনুন্নত। বিশ্বে আখ চাষের সমস্যা সমাধান করতে হলে ধারাবাহিক ও সমন্বিত কৃষি নীতির প্রয়োজন।
উন্নয়নশীল বিশ্বে আখ চাষের সমস্যা
উন্নয়নশীল দেশের আখ চাষে কিছু সমস্যা বিরাজমান। সেগুলো হলো-
১. প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাব,
২. কৃষি ঋণের স্বল্পতা,
৩. দক্ষ শ্রমিকের অপ্রতুলতা,
৪. অনুন্নত পরিবহন ব্যবস্থা,
৫. শক্তি সম্পদের অপ্রতুলতা,
৬. অনিশ্চিত বাজার,
৭. উন্নত সার ও কীটনাশকের অভাব,
৮. জলবায়ু পরিবর্তন,
৯. মৃত্তিকার গুণাগুণ,
১০. ক্ষুদ্র খামার ব্যবস্থা,
১১. কারিগরি জ্ঞান ও গবেষণার অভাব,
১২. সমন্বিত কৃষিনীতির অভাব প্রভৃতি।
উন্নয়নশীল বিশ্বে আখ চাষের সমস্যার সমাধান
উন্নয়নশীল বিশ্বে আখ চাষে বিরাজমান সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন-
১. পর্যাপ্ত কৃষিঋণের ব্যবস্থা,
২. বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির চাষাবাদ,
৩. উন্নতমানের আখের চারা সরবরাহ,
৪. উন্নতমানের সার ও কীটনাশক সরবরাহ,
৫. সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন,
৬. বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন,
৭. উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা,
৮. ভর্তুকি প্রদান ও অনুকূল দাম নির্ধারণ,
৯. সুষ্ঠু শ্রমিক ব্যবস্থাপনা,
১০. গুদামজাতকরণ সুবিধা,
১১. লোডশেডিংমুক্ত বিদ্যুৎ সরবরাঃ
১২. প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা,
১৩. গবেষণা বৃদ্ধি করা প্রভৃতি।
আখ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম অর্থকরী ফসল হওয়া সত্ত্বেও এর চাষাবাদে প্রতিবন্ধকতার অভাব নেই। এমতাবস্থায় উন্নয়নশীল বিশ্বে আখ চাষে বিরাজমান সমস্যাগুলোর সুষ্ঠু সমাধান করলে আখের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। ফলে দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে এবং জনগণের মাথাপিছু আয় ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পাবে।
কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
(Factors of Tea Production)
চা পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয়। চা মূলত ক্রান্তীয় অঞ্চলের উদ্ভিদ। স্বাভাবিকভাবে এ গাছ ৯ থেকে ১২ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে থাকে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পাতা ও কুঁড়ি সংগ্রহের সুবিধার্থে চা গাছ ১.৫ থেকে ২.৫ মিটার উঁচু থেকে ছেঁটে দেওয়া হয়। অতঃপর পাতা ও কুঁড়ি শুকিয়ে গুঁড়ো করে উষ্ণ পানি, সামান্য দুধ ও চিনির সাহায্যে পরিবেশন করা হয়। চা পানে শরীর ও মন সতেজ হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Camellia sinensis 1
অনুকূল নিয়ামক: চা বাগান তৈরির ৫ বছর পর থেকে নিয়মিতভাবে পাতা সংগ্রহ করা যায়। এভাবে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ বছর পাতা সংগ্রহ করা হয়। চা চাষ অর্থাৎ চা বাগান তৈরির উপযোগী নিয়ামকসমূহ নিচে বর্ণনা করা হলো
ক. প্রাকৃতিক নিয়ামকসমূহ:
১. জলবায়ু: উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ ও অধিক আর্দ্র জলবায়ু চা চাষের পক্ষে বিশেষ উপযোগী। চা গাছের বৃদ্ধিকালীন সময়ে তাপমাত্রা ২০° সে. অপেক্ষা বেশি হওয়া আবশ্যক। চা গাছ স্বল্প তাপমাত্রা সহ্য করতে পারলেও তীব্র শীত চা গাছের ক্ষতি সাধন করে।
২. বৃষ্টিপাত: নিরক্ষীয় এবং আর্দ্র মৌসুমি জলবায়ু চা চাষের জন্য বেশি উপযোগী। যেসব এলাকায় বছরে ১২৫ থেকে ৬২৫ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাত এবং শুষ্ক ঋতু ক্ষণস্থায়ী হয়, সেখানে চা গাছের পাতা ও কুঁড়ি দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
৩. ভূপ্রকৃতি: সমুদ্রপৃষ্ঠের ৬০০ থেকে ১২০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত পার্বত্য ঢালু অঞ্চলে চা বাগান গড়ে তোলা হয়। এরূপ অঞ্চল অপেক্ষাকৃত শীতল। সেখানে প্রবল বৃষ্টিপাত হলেও চা গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকে না। চা বাগান তৈরির জন্য এ ধরনের পরিবেশ একান্ত প্রয়োজন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা চা গাছের পাতার গুণগত মানকে প্রভাবিত করে। যেমন- সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২০০ মিটার এবং তার চেয়ে বেশি উচ্চতায় অবস্থিত বাগান থেকে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের চা পাতা সংগ্রহ করা হয়।
৪. মৃত্তিকা: নাইট্রোজেনযুক্ত কিছুটা অম্লধর্মী মৃত্তিকা চা গাছ জন্মানোর পক্ষে বিশেষ উপযোগী। লৌহ মিশ্রিত এবং আগ্নেয় ভস্মযুক্ত মৃত্তিকাতেও চা গাছ জন্মাতে পারে।
খ. আর্থ-সামাজিক নিয়ামকসমূহ:
১. সুলভ শ্রমের যোগান: চা বাগান তৈরি, চারা রোপণ, গাছের পরিচর্যা, নির্দিষ্ট সময় অন্তর পাতা ও কুঁড়ি সংগ্রহ প্রভৃতি কাজ কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভর করে। এসব কাজ যান্ত্রিক উপায়ে সম্পন্ন করা সহজ নয়। কাজেই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা বাগান গড়ে তোলার জন্য সুলভ শ্রমের যোগান থাকা আবশ্যক।
২. মৃত্তিকা ক্ষয়রোধ ও ছায়া সৃষ্টি: প্রখর সূর্য কিরণের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে চা গাছের পাতা ও কুঁড়ি রক্ষা এবং সজীব রাখার জন্য চা বাগানে ছায়া প্রদানকারী বৃক্ষের ব্যবস্থা রাখা হয়। এই বৃক্ষগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয় যে, বাগানের মৃত্তিকার ক্ষয়রোধ সম্ভব হয়।
কৃষি
৩. চারা তৈরি: চা বাগানের জন্য বিশেষ যত্ন সহকারে চারা তৈরি করা হয়। এ জন্য উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক কলাকৌশল দক্ষতা সহকারে কাজে লাগানো হয়। বাগানের বিকাশ সময়মতো ভালো জাতের চা গাছের চারা প্রাপ্তির ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল।
৪. সার ও কীটনাশকের যোগান: চা বাগানের মৃত্তিকায় নাইট্রেট এবং অন্যান্য উপাদানের ঘাটতি পূরণে সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয়। ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ থেকে গাছকে রক্ষার জন্য কীটনাশক ওষুধ প্রয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। এসবের যোগান চা বাগানের স্বাভাবিক বিকাশকে প্রভাবিত করে থাকে।
৫. প্রক্রিয়াজাতকরণ: চা বাগান থেকে যথাসময়ে পাতা ও কুঁড়ি সংগ্রহ করে তা প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এ কাজে প্রচুর দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন হয়।
৬. পরিবহন ও যোগাযোগ সুবিধা: চা বাগান থেকে পাতা সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাজারে প্রেরণ করা হয়। উন্নত সড়ক ও রেল পরিবহন এবং টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা এই প্রেরণ কার্যক্রমকে অনেক সহজ করে।
৭. পুঁজি: বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা বাগান গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট পুঁজি বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়।
৮. রপ্তানি সুবিধা: আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ একটি অঞ্চলে চা বাগান সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
(Worldwide Production, Distribution and Economic Importance of Tea)
এশিয়া মহাদেশে বিশ্বের প্রায় ৮০% চা উৎপন্ন হয়। আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং ইউরোপে অবশিষ্ট চা (২০%) উৎপন্ন হয়। অধিকাংশ চা বাগান এশিয়ার বৃষ্টিবহুল মৌসুমি এবং নিরক্ষীয় অঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় অবস্থিত। আফ্রিকার চা বাগানগুলো পূর্বাঞ্চলীয় বৃষ্টিবহুল পার্বত্য এলাকায় অবস্থিত।
সারণি-৪.৮: মহাদেশ ভিত্তিক চা পাতা উৎপাদন (২০১৭)
| মহাদেশ | জমি (হেক্টর) | মোট ফলন (মেট্রিক টন) |
| এশিয়া | ৩৭৫৯৭৯৬ | ৫৪৩৪৩৭০ |
| আফ্রিকা | ৩৮৪৮০১ | ৮১০২৬২ |
| দক্ষিণ আমেরিকা | ৪২৪৫৬ | ৮১০২৬২ |
| অস্ট্রেলিয়া | ৩৯৪৩ | ৫৫৮৯ |
| উত্তর আমেরিকা | ১৪৫৪ | ১০০৯ |
| ইউরোপ | ৭৩৬ | ৬৮৮ |
| সমগ্র বিশ্ব | ৪১৯৩১৭৬ | ৬৩৩৭৯৬৮ |
উৎস: FAOSTAT.February, 2020
প্রধান প্রধান চা উৎপাদনকারী দেশ
১. চীন: ধারণা করা হয়, চীনে সর্বপ্রথম বুনো অবস্থা থেকে চা গাছকে চায়ের আওতায় আনা হয়। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চা উৎপাদনকারী দেশ চীন। এখানে প্রধানত পাঁচ ধরনের চা উৎপাদিত হয়। যথা: কালো, সবুজ, জেসমিন, ওলো এবং ইস্টক চা। প্রধানত রপ্তানির উদ্দেশ্যে দেশটিতে কালো চা উৎপাদন করা হয়। ইয়াংসি নদীর দক্ষিণে অবস্থিত সিচুয়ান, হুনান, আনহুই, ফুকিয়েন প্রদেশের বর্ষণমুখর পার্বত্য ঢালে অধিক চা বাগান গড়ে উঠেছে।
২. ভারত: বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষস্থানীয় চা উৎপাদনকারী দেশ ভারত। এ দেশে কয়েক হাজার চা বাগান রয়েছে। বেশিরভাগ বাগান আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গের বৃষ্টিবহুল পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত। পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং এর চা বাগান থেকে বিশ্বমানের চা উৎপাদিত হয়। এখানকার চা বাগানগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২০০ মিটার বা তার চেয়ে বেশি উচ্চতায় অবস্থিত। মেঘালয় এবং দক্ষিণ ভারতের তামিলনাডু ও কেরালা রাজ্যে অবস্থিত বাগানগুলো থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চা পাতা সংগ্রহ করা হয়।
সারণি-৪.৯: পৃথিবীর প্রধান প্রধান দেশের চা উৎপাদন (২০১৮)
| দেশ | উৎপাদন (হাজার মেট্রিক টন) | দেশ | উৎপাদন (হাজার মেট্রিক টন) |
| ১. চীন | ২৬২৫ | ৬. তুরস্ক | ২৭০ |
| ২. ভারত | ১৩৪৫ | ৭. ইন্দোনেশিয়া | ১৪১ |
| ৩. কেনিয়া | ৪৯৩ | ৮. ইরান | ১০৯ |
| ৪. শ্রীলংকা | ৩০৪ | ৯. জাপান | ১০৯ |
| ৫. ভিয়েতনাম | ২৭০ | ১০. বাংলাদেশ | ১০৯ |
উৎস: FAOSTAT. February, 2020
৩. কেনিয়া: কেনিয়া বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী দেশ। ২০১৮ সালে এ দেশের চা উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৯৩ হাজার মেট্রিক টন। এ দেশ প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণ চা বিদেশে রপ্তানি করে।
৪. শ্রীলঙ্কা: ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপ দেশে অতি অল্প সময়ে চা চাষের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। শ্রীলঙ্কার পার্বত্য ভূপ্রকৃতি এবং ভৌগোলিক অবস্থান চা চাষে সহায়ক। এখানে পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে পাহাড়ের ঢালে প্রায় সারা বছরই বৃষ্টিপাত হয়। শ্রীলঙ্কার মধ্যভাগে অবস্থিত পর্বতকে ঘিরে চা বাগান গড়ে উঠেছে। নিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং আর্দ্রতার ঘাটতি না থাকায় বাগানের চা গাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে সারা বছর ধরে সপ্তাহে অন্তত দুবার চা পাতা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
৫. ভিয়েতনাম: চা উৎপাদনে ভিয়েতনাম বিশ্বে পঞ্চম। এখানে কালো, সবুজ এবং জেসমিন চা উৎপন্ন হয়।
৬. তুরস্ক: চা উৎপাদনে তুরস্কের অবস্থান বিশ্বে ষষ্ঠ। দেশটির কৃষ্ণ সাগরের তীরবর্তী জর্জিয়া সংলগ্ন এলাকায় অধিক বৃষ্টিপাত হয়। এ অঞ্চলের পার্বত্য ঢালে এ দেশের চা বাগানগুলো অবস্থিত।
৭. ইন্দোনেশিয়া: ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম জাভার পার্বত্য ঢালে বহু চা বাগান গড়ে উঠেছে। সুমাত্রা দ্বীপের উত্তরাংশে প্রচুর চা বাগান রয়েছে। এ দেশের চা বাগানগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের ৪৫০ থেকে ১৫০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত।
৮. বাংলাদেশ: চা উৎপাদনে দেশটি বিশ্বে দশম। বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য মতে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ২৭৯,৪৩৯ হেক্টর জমিতে ৯.৫ কোটি কেজি চা উৎপাদন করে, যা বিগত বছরের তুলনায় ১.৪০ কোটি কেজি বেশি। দেশের অধিকাংশ চা বাগানগুলো মৌলভীবাজার, সিলেট ও চট্টগ্রাম জেলায় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িয়া উঁচু ঢালসমূহে অবস্থিত। বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণ চা বিদেশে রপ্তানি করে। ২০১৮ সালে এদেশে চা আমদানি ও রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৫ ও ৬.৫ লাখ কেজি। (সূত্র: বাংলাদেশ চা বোর্ড)। যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান, সৌদিআরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশী চায়ের প্রধান ক্রেতা। দেশে মোট চা বাগানের সংখ্যা ১৬৭টি। মৌলভীবাজারে সবচেয়ে বেশি চা বাগান রয়েছে (৯২ টি)। এছাড়া হবিগঞ্জে ২৫টি, সিলেটে ১৯টি, চট্টগ্রামে ২২টি, পঞ্চগড়ে ৭টি, রাঙামাটিতে ২টি, ঠাকুরগাঁও এ ১টি চা বাগান রয়েছে।
৯. জাপান: আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এ দেশে চায়ের চাষ করা হয়। প্রচুর মৌসুমি বৃষ্টি, শ্রমিক ও আধুনিক প্রযুক্তিতে দেশের হনসু, শিকোকু ও কিউশুর পাহাড়িয়া অঞ্চলে চায়ের চাষ করা হয়। অভ্যন্তরীণ চাহিদা ব্যাপক থাকায় জাপান বিদেশ থেকে চা আমদানি করে।

চা এর বিশ্ববাণিজ্য ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব: চায়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্য চায়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের বহুসংখ্যক চা বাগান যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। যুক্তরাজ্যের কোম্পানিগুলো চা পাতা আমদানি করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডে তা রপ্তানি করে। এছাড়াও চীন, ভারত, কেনিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশ বিপুল পরিমাণ চা পাতা বিশ্বের অন্যান্য দেশে রপ্তানি করে।
সারণি-৪.১০: চা এর বিশ্ব বাণিজ্য ২০১৮ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)
| রপ্তানি | আমদানি | ||||
| অবস্থান | দেশ | পরিমাণ | অবস্থান | দেশ | পরিমাণ |
| ১. | চীন | ১৮০০ | ১ | রাশিয়া | ৪৯৭ |
| ২ | কেনিয়া | ১৪০০ | ২ | যুক্তরাষ্ট্র | ৪৮৭.৩ |
| ৩. | শ্রীলঙ্কা | ৯৪২ | ৩ | যুক্তরাজ্য | ৩৯৬ |
| ৪ | ভারত | ৭৬৩ | ৪ | সংযুক্ত আরব আমিরাত | ৩২৩ |
| ৫ | সংযুক্ত আরব আমিরাত | ২৯৫ | ৫ | মিশর | ৩১৮ |
| ৬ | জার্মানি | ২৫২ | ৬ | ইরান | ২৯২ |
| ৭ | ভিয়েতনাম | ২২৫ | ৭ | আফগানিস্তান | ২৯২ |
| ৮ | পোল্যান্ড | ২০৩ | ৮ | সৌদি আরব | ২৫২ |
| ৯ | জাপান, | ১৪২ | ৯ | জার্মানি | ২২৯ |
| ১০ | যুক্তরাজ্য | ১৪১ | ১০ | মরক্কো | ২২১ |
উৎস: WTEX, 2020
যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, জার্মানি, মরক্কো, জাপান প্রভৃতি দেশ চা পাতা আমদানি করে থাকে।
কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
(Sector of Agriculture: Crop Production, Herding, Afforestation and Fish Cultivation)
ইতিপূর্বে আমরা কৃষিকাজ কাকে বলে সে সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আমরা জেনেছি যে, ভূমিকর্ষণ তথা চাষ ও বীজ বপনের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনকে কৃষিকাজ বলে। তবে যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে কৃষির সংজ্ঞায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে কৃষিকাজ শুধু ফসল উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্য চাষ, পশুপালন, শস্য উৎপাদন সবকিছুতেই বিস্তৃত হয়েছে। কৃষির ক্ষেত্রসমূহকে আমরা তাই চার ভাগে ভাগ করতে পারি। যথা:

ফসল উৎপাদন: শস্য তথা ফসল উৎপাদন কৃষির প্রধানতম এবং প্রাচীনতম ক্ষেত্র। বিভিন্ন প্রকার শস্য নিয়ে কৃষির এই ক্ষেত্র গঠিত। মূলত খাদ্যশস্য এবং অর্থকরী এই দুই ধরনের ফসল নিয়ে শস্য উৎপাদন ক্ষেত্র গঠিত। বর্তমান বিশ্বে মোট আবাদি জমির অধিকাংশ ব্যবহৃত হয় খাদ্যশস্য উৎপাদনে। অবশিষ্ট জমি অর্থকরী ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। পৃথিবীর প্রধান প্রধান খাদ্যশস্যসমূহের মধ্যে ধান, গম, যব, ভুট্টা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া অর্থকরী ফসলসমূহের মধ্যে ডাল, তৈলবীজ, ইক্ষু, আলু, তামাক, পাট, রেশম, রাবার, চা প্রভৃতি প্রধান। বিশ্বের মোট কৃষিখাতের প্রায় ৬০ শতাংশ লোক শস্য উৎপাদনের সাথে জড়িত। গোটা বিশ্বের মানুষের বেঁচে থাকা এবং কৃষি বিষয়ক বাণিজ্যের প্রধানতম খাত হচ্ছে শস্য উৎপাদন খাত।
পশুপালন: পশুপালন বলতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ, উট, ঘোড়া, হাঁস, মুরগি, কুকুর, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, কুমির, সাপ প্রভৃতি পালনকে বুঝানো হয়ে থাকে। প্রাচীনকালে যাযাবর অবস্থায় মানুষ জীবিকার উদ্দেশ্যে পশুপালন করলেও বর্তমানে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পশুপালন হয়ে থাকে। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে বিশাল আকারে পশুপালন কেন্দ্র দেখতে পাওয়া যায়। যেমন- নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা। খামারে উৎপাদিত দুধ, মাংস, পশম, হাড়, চামড়া এবং ঐ সমস্ত প্রাণীর ছোট বাচ্চা, ডিম প্রভৃতি দেশের অভ্যন্তরীণ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হয়। উন্নয়নশীল দেশসমূহে সীমিত পরিসরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পশুপালন সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হয়েছে। যেমন- ভারত, কলম্বিয়া, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা।
বনায়ন: বন হতে প্রাপ্ত জ্বালানি কাঠ, বাঁশ, বেত, মোম, মধু, রাবার, প্রভৃতি নিয়ে এই কৃষিখাত গঠিত। সমগ্র বিশ্বজুড়ে কমবেশি এই খাত প্রচলিত আছে। পরিবেশ রক্ষায় বনায়ন খাতের গুরুত্ব অপরিসীম।
মৎস্য চাষ: সমগ্র বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিখাত হচ্ছে মৎস্য সম্পদ খাত। আত্মকর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, প্রাণিজ আমিষ সরবরাহ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে এই খাত খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। মৎস্য সম্পদ দুই ধরনের হয়ে থাকে; যথা- মিঠা পানির ও সামুদ্রিক। পৃথিবীর অনেক উন্নত রাষ্ট্র; যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রাজিল, ব্রিটেন আর্জেন্টিনা, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে সরাসরি জড়িত। প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সামুদ্রিক মাছ এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। উন্নত রাষ্ট্রসহ অপেক্ষাকৃত অনুন্নত ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রসমূহ মিঠা পানির মাছ চাষের সাথে জড়িত। মিঠা পানির মাছ প্রধানত অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হয়।
কৃষির প্রকারভেদ (Classification of Agriculture)
পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী যেমন কৃষির সৃষ্টি হয়, তেমনি কৃষিক্ষেত্রও অনেক ভাগে বিভক্ত করা হয়। নিচে তা আলোচনা করা হলো-
১. প্রগাঢ় বা নিবিড় কৃষি: যে কৃষি পদ্ধতির মাধ্যমে জমিতে ক্রমাগত প্রচুর শ্রমিক নিয়োগ করে, সার দিয়ে এবং মূলধন খাটিয়ে ভূমির যতটুকু উৎপাদন করার ক্ষমতা আছে তার সবটুকু উৎপাদন করা হয় তাকে প্রগাঢ় কৃষি বলে। এ কৃষিব্যবস্থায় জমি কখনো ফেলে রাখা হয় না। যেসব দেশে লোকসংখ্যার তুলনরায় জমির পরিমাণ কম সেখানে এ ধরনের কৃষিক্ষেত্রের প্রচলন আছে। দেশসমূহ: চীন, জাপান, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ইত্যাদি দেশ।
২. ব্যাপক কৃষি: যে কৃষি ব্যবস্থায় বিস্তৃত এলাকা জুড়ে আধুনিক কৃষি যন্ত্রের সাহায্যে ব্যাপকভাবে কৃষিকাজ করা হয় তাকে ব্যাপক কৃষি বলে। যেসব অঞ্চলে লোকসংখ্যা কম অথচ বিস্তৃত কৃষিযোগ্য জমি রয়েছে সেখানে ক্রমশ বেশি জমি পরিষ্কার করে ট্রাক্টর, রিপার, হারভেস্টর, থ্রেসার, পাওয়ার টিলার প্রভৃতি আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করে ব্যপক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করা হয়। এ রীতির চাষে কম শ্রমিক ও কম মূলধন নিয়োগ করে প্রচুর ফসল উৎপাদন করা সম্ভব।
দেশসমূহ: কানাডা, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও রাশিয়া।
৩. বাগিচা কৃষি: কোনো একটি এলাকায় শস্য রোপণ করে সেখানে থেকে একটানা ১৫-২০ বছর পর্যন্ত শস্য আহরণ করাকে বাগিচা কৃষি বলে। এক্ষেত্রে বড় বড় বাগিচা তৈরি করে বাণিজ্যিক প্রয়োজনে কৃষিকাজ করা হয়।
দেশসমূহ: বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কার চা চাষ, মালয়েশিয়ার রাবার চাষ, ঘানার কোকো চাষ ইত্যাদি।
৪. মিশ্র কৃষি: যে কৃষিব্যবস্থায় একই ভূমিতে বাণিজ্যিক পশুপালন ও শস্যচাষ উভয় একই সাথে হয়ে থাকে তাকে মিশ্র কৃষি বলে। একই কৃষি খামার থেকে ধান, পাট, মেসতা, তিল, সরিষা, মরিচ, তরিতরকারি প্রভৃতি বিভিন্ন প্রকার ফসল উৎপাদন করা হয় এবং অবসর সময়ে পশুপালন ও হাঁস-মুরগি প্রতিপালন করা হয় বলে এরূপ কৃষি পদ্ধতিকে 'বহুমুখী কৃষি' নামেও অভিহিত করা হয়।
দেশসমূহ: আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং উত্তর-পশ্চিম ইউরোপীয় দেশসমূহ।

৫. স্থানান্তরিত কৃষি: যে কৃষি পদ্ধতিতে আবাদি জমি পরিবর্তনের সাথে সাথে কৃষকদের বসতিও স্থানান্তর হয় তাকে স্থানান্তরিত কৃষি বলে। এ পদ্ধতিতে অরণ্যবেষ্টিত অঞ্চল পরিষ্কার করে চাষাবাদের যোগ্য করে আবাদ করা হয়। এ কৃষিব্যবস্থায় দুই-তিন বছর অন্তর জমি বদল করা হয়।
দেশসমূহ: নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় এশিয়ার বনাঞ্চল, মধ্য আফ্রিকার কঙ্গো অববাহিকা, দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার অরণ্য এলাকা এবং বাংলাদেশের ও মায়ানমারের পাহাড়ি অঞ্চলেও এই চাষ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।
৬. সবজি চাষ বা ট্রাক ফার্মিং: বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সবজি চাষকে ট্রাক ফার্মিং বলে। একে Market Gardening-ও বলা হয়। সবজি দ্রুত পচনশীল দ্রব্য হওয়ায় সাধারণত কোনো শহরের নিকটেই এই ধরনের চাষাবাদ হয়ে থাকে, যাতে উৎপাদিত পণ্যের দ্রুত বিক্রয় নিশ্চিত করা যায়।
দেশসমূহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় উৎপাদিত সবজি নিউইয়র্কে বাজারজাত করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও উত্তর-পশ্চিম ইউরোপেরও এই ধরনের চাষাবাদ দেখা যায়।
কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
(Major Sectors of Bangladesh Agriculture: Crop Production, Herding, Afforestation and Fish Cultivation)
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটে কৃষির ক্ষেত্রসমূহ আলোচনা করা হলো-
ক. শস্য উৎপাদনক্ষেত্র বিভিন্ন প্রকার শস্য নিয়ে বাংলাদেশে কৃষির এই ক্ষেত্র গঠিত। এটি বাংলাদেশে কৃষির বৃহত্তম
ক্ষেত্র। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৯ অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৪১৫.৭৪ মেট্রিক টন শস্য উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান শস্য হচ্ছে ধান, পাট, ডাল, তৈলবীজ, আলু, তামাক, শাকসব্জি, রেশম, চা প্রভৃতি। আমাদের মোট কৃষি উৎপাদনের প্রায় ৫৭% এর বেশি উৎপাদিত হয় শস্য উৎপাদন ক্ষেত্র থেকে। ধান এবং পাট যথাক্রমে বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য ও অর্থকরী ফসল। ।। পাট এদেশে "সোনালী আঁশ" নামে পরিচিত।
সারণি ৪.১১: খাদ্যশস্য উৎপাদন ২০১৮-২০১৯
(লক্ষ মেট্রিক টন)
| খাদ্যশস্য | পরিমাণ |
| আউশ | ২৭.০২ |
| আমন | ১৪১.৩৪ |
| বোরো | ১৯৬.২৩ |
| মোট চাল | ৩৬৪.৫৯ |
| গম | ১২.৮৭ |
| ভূট্টা | ৩৮.২৮ |
| সর্বমোট | ৪১৫.৭৪ |
খ. মৎস্য সম্পদ: বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিখাত হচ্ছে মৎস্য খাত। এদেশে আত্মকর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, প্রাণিজ আমিষ সরবরাহ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে মৎস্য খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের মৎস্য খাত আবার দুই ভাগে বিভক্ত। যথ- i) মিঠা পানির মৎস্য ও ii) সামুদ্রিক মৎস্য। দেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক জলাশয় ছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন মৎস্য খামার ও হ্যাচারী বৃদ্ধি পাওয়ায় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া দেশের উপকূলভাগে প্রায় সারাবছর জেলেরা বিভিন্ন সামুদ্রিক মৎস্য ধরে জীবিকা নির্বাহ করছে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি দ্রব্য হলো মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৯ অনুযায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এদেশে অভ্যন্তরীণ জলাশয় ও সামুদ্রিক উৎস থেকে মোট ৪৩.৮১ লক্ষ মেট্রিক টন মৎস্য উৎপাদিত হয়েছে। মুক্ত জলাশয় এবং বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে যথাক্রমে ৩য় ও ৫ম স্থানে রয়েছে (২০১৯)।
সারণি ৪.১২: মৎস্য খাতের বিভিন্ন উৎস হতে মাছের উৎপাদন (২০১৮-২০১৯)
(লক্ষ মেট্রিক টন)

গ. প্রাণিসম্পদ: কৃষির উপযোগ সৃষ্টি, গ্রামীণ পরিবহন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, প্রভৃতি ক্ষেত্রে পশু সম্পদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, ভেড়া, বিভিন্ন প্রকার পাখি প্রভৃতি আমাদের দেশে পশু সম্পদ হিসেবে পালন করা হয়। এ সমস্ত পশুপাখির মাংস, চামড়া, দুধ, ডিম, পশম, বাচ্চা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রয় করে আমরা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করি। বাংলাদেশের মোট কৃষি আয়ের ১৩.৪৬% প্রাণিসম্পদ খাত থেকে আসে। আমাদের দেশে যদি বাণিজ্যিকভাবে আরো ব্যাপক পরিসরে পশুপাখির খামার করা হতো, তাহলে আমরা আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারতাম।
সারণি ৪.১৩: প্রাণিসম্পদের পরিমাণ (২০১৮-২০১৯)
| প্রাণিসম্পদ | সংখ্যা (লক্ষ) |
| গরু | ২৪২ |
| মহিষ | ১৫ |
| ছাগল | ২৬২ |
| ভেড়া | ৩৫ |
| মোরগ-মুরগি | ২৮৬৯ |
| হাঁস | ৫৭১ |
সূত্র: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা- ২০১৯ (ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, পৃষ্ঠা-৮৮)
সারণি ৪.১৪: দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদন (২০১৭-২০১৮)
| দ্রব্য | উৎপাদন |
| দুধ | ৯৪.০৬ লক্ষ টন। |
| মাংস | ৭২.৬০ লক্ষ টন |
| ডিম | ১৫৫২০০ লক্ষটি |
সূত্র: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা- ২০১৯, পৃষ্ঠা-৮৮
ঘ. বনায়ন: বনায়ন বা সামাজিক বনায়ন কৃষিখাতের একটি নতুন ধারণা। কাঠ, বাঁশ, বেত, মোম, মধু, জ্বালানি কাঠ প্রভৃতি নিয়ে কৃষির এই ক্ষেত্রটি গঠিত। এই খাত থেকে মোট কৃষি আয়ের ৮% পাওয়া যায়। আমাদের (সব ধরনের বনভূমি মিলে) দেশের মোট আয়তনের ১৭.৫১% বনভূমি রয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় বনভূমির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে বনভূমির পরিমাণ যদি আরও বেশি থাকতো এবং আমরা যদি নির্বিচারে বন ধ্বংস না করতাম, তাহলে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেক লাভবান হতে পারতাম।
সারণি-৪.১৫: জিডিপিতে কৃষির বিভিন্ন খাতের অবদান (২০১৮-২০১৯)
| কৃষিখাত | মোট পরিমাণ (কোটি টাকা) |
| ১. শস্য উৎপাদন | ১৭১,৩০৮ |
| ২. মৎস্য সম্পদ | ৭৪,৮২৮ |
| ৩. প্রাণিসম্পদ | ৪৩,২১২ |
| ৪. বনজ সম্পদ | ৩১,৭৪৭ |
সূত্র: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৯, পৃষ্ঠা-২২৮।
উপরের আলোচনা এবং সারণী হতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এ কথা বলা যায় যে, বাংলাদেশে কৃষির বিভিন্ন খাতের মধ্যে শস্য উৎপাদন খাতই প্রধান। এই খাতের মধ্যে আবার অর্থকরী ফসলের তুলনায় খাদ্যশস্যকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে আছে মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও বনায়ন খাত। সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করলে এ সমস্ত খাত থেকে আমরা অধিক উপযোগ পেতে পারি।
কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
(Practical: Drawing of Bar Graph; Explanation of Production and Nature of Agriculture Using It)
মানব ভূগোল শাস্ত্রে সংখ্যাতাত্ত্বিক বা পরিমাণগত উপাত্ত উপস্থাপনের জন্য স্তম্ভলেখ চিত্র অধিক ব্যবহৃত হয়। কারণ এটি সহজে বুঝতে পারা যায়। পরস্পর সম্পর্কবিহীন তথ্যগুলোর মধ্যে তুলনামূলক বিচারের জন্য সাধারণত স্তম্ভলেখ চিত্র ব্যবহার করা হয়।
স্তম্ভলেখ চিত্র অঙ্কন করার সময় ছক কাগজ (Graph Paper) ব্যবহার করলে চিত্রটি সুন্দররূপে ফুটে ওঠে।
চিত্র অঙ্কনের জন্য কত স্কেল নিলে ভালো হয় প্রথমে তা নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ ক্ষুদ্রতম বর্গের দৈর্ঘ্যে কত একক ব্যবহার করলে চিত্রটি সুন্দর হয় তা ঠিক করে নিতে হয়। একক নির্ণয়ের সময় লক্ষ রাখতে হবে যে, লেখচিত্রের দীর্ঘতম স্তম্ভটি যেন কাগজের সীমারেখার মধ্যেই স্থান পায় এবং ক্ষুদ্রতম স্তম্ভটি তুলনামূলকভাবে খুব ক্ষুদ্র না হয়।
প্রতি এক বা অর্ধ ইঞ্চি পর পর এককগুলো চিত্রের এক পার্শ্বে ছক কাগজে চিহ্নিত করতে হবে।
প্রাপ্ত সংখ্যাগুলো একক অনুসারে হিসেব করে স্তম্ভগুলোর দৈর্ঘ্য নির্ণয় করতে হবে। প্রত্যেক স্তম্ভের প্রস্থ সমান হবে। কেবল দৈর্ঘ্য কম-বেশি হবে। ছক কাগজের বিস্তার অনুসারে স্তম্ভগুলোর প্রস্থ স্থির করতে হবে। স্তম্ভগুলো পৃথক পৃথকভাবে অথবা পরস্পর স্পর্শ করে অঙ্কন করা যাবে। পৃথকভাবে বিন্যস্ত স্তম্ভগুলোর মধ্যবর্তী ব্যবধান সমান হবে। লেখচিত্রটিতে কোন বিষয়টি দেখানো হচ্ছে তা চিত্রের উপরে বা নিচে সংক্ষেপে লিখে দিতে হবে।
স্তম্ভলেখ চিত্রের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন প্রদর্শন এবং উৎপাদনের প্রকৃতি ব্যাখ্যা:
কৃষি উৎপাদনের উপাত্ত প্রদর্শনে স্তম্ভলেখ চিত্র অঙ্কন করা যায়। এ চিত্রে X ও Y অক্ষে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের উপাত্ত দেয়া হয়। নিচের উপাত্ত থেকে একটি কৃষি উৎপাদনের স্তম্ভলেখ চিত্র অঙ্কন করা হলো:
সারণি ৪.১৬: খাদ্যশস্য উৎপাদন
(লক্ষ মেট্রিক টন) ২০১৭-২০১৮

| খাদ্যশস্য | পরিমাণ |
| আউশ | ২৭ |
| আমন | ১৪০ |
| বোরো | ১৯৫ |
| গম | ১১ |
| ভূট্টা | ৩৩ |
সূত্র: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা- ২০১৯, পৃষ্ঠা-২৩৯
উৎপাদনের প্রকৃতি ব্যাখ্যা
স্তম্ভলেখ থেকে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ২০১৮ সালে বিভিন্ন কৃষিজ পণ্যের মধ্যে বোরো ধানের উৎপাদন সবচেয়ে বেশি। এ কারণে এর স্তম্ভটি উপরের দিকে অধিক উত্থিত। আমন ধানের স্তম্ভটিও অধিক উঁচু। এ থেকে বোঝা যায়, এর উৎপাদনও অধিক। আবার গমের উৎপাদন সবচেয়ে কম হওয়ায় এর স্তম্ভটি অনেক নিচু।
কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
(Agricultural Organization of Bangladesh and Their Contributions on Production)
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। বাংলাদেশের অধিকাংশ লোক (শতকরা ৮০ ভাগ; সূত্র-BARC) প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি পেশায় নিয়োজিত। এদেশের অর্থনীতির প্রধান উৎস কৃষি। কিন্তু দুঃখের বিষয় দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ পরাধীন থাকায় এবং নেতৃত্বের অদূরদর্শিতার কারণে এদেশে কৃষিকাজ নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়নি। স্বাধীনতার পূর্বে এদেশের কৃষি ছিল সনাতন পদ্ধতির। জমি অত্যন্ত উর্বর হলেও প্রকৃতি নির্ভরতা ও প্রাচীন পদ্ধতির চাষাবাদের কারণে আশানুরূপ ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হতো না। তবে আশার কথা এই যে, স্বাধীনতা লাভের পর থেকে এদেশের সরকার কৃষি বিষয়ক কর্মকান্ডকে যথেষ্ট প্রাধান্য দিয়ে কৃষিবিষয়ক উচ্চতর গবেষণার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে। ফলে বাংলাদেশের কৃষি আজ বিশ্ব পর্যায়ে স্থান করে নিয়েছে।
বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কৃষিসংস্থা সমূহের বর্ণনা
১. মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (Soil Resources Development Institute-SRDI): কৃষিকাজে মাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বাংলাদেশের মাটি খুবই উর্বর। তবে কোন মাটিতে কী ধরনের ফসল জন্মে এবং কোন এলাকার মাটিতে কী ধরনের সমস্যা আছে এসমস্ত বিষয়ে উচ্চতর গবেষণার জন্য স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে মৃত্তিকা জরিপ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে এই সংস্থাই কাজের ব্যাপকতার কথা চিন্তা করে ১৯৮৩ সালে 'মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট' নামে নতুন কর্ম পরিধি নিয়ে কাজ শুরু করে। সংস্থাটি ঢাকার ফার্মগেটে অবস্থিত।
কৃষিতে অবদান : মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট মূলত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটির গুণাগুণ, বৈশিষ্ট্য, সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে কাজ করে থাকে। কোন মাটি কোন ধরনের ফসলের জন্য উত্তম সেই সংক্রান্ত পরামর্শ প্রদান সংস্থাটির অন্যতম উদ্দেশ্য। কোনো জমিতে আশানরূপ ফসল উৎপাদিত না হলে সেই জমির মাটি নিয়ে গবেষণা করে সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান প্রদান করে সংস্থাটি। এছাড়া এই সংস্থায় মাটি পরীক্ষার জন্য ৬টি ভ্রাম্যমাণ গাড়ি আছে। দেশের যেকোনো প্রান্তে গিয়ে মাটি পরীক্ষা করে যথার্থ পরামর্শ প্রদান এই সংস্থার প্রধান উদ্দেশ্য।
২. বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (Bangladesh Agricultural Research Council-BARC): বাংলাদেশের কৃষি সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণার জন্য ১৯৭৩ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কৃষি গবষেণা কাউন্সিল গঠিত হয়। ঢাকার ফার্মগেটে অবস্থিত সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে দেশের খ্যাতনামা কৃষি বিশেষজ্ঞগণ কাজ করেন।
কৃষিতে অবদান: বিভিন্ন কৃষি বিষয়ক গবেষণা, পরামর্শ প্রদান, গবেষণা তত্ত্বাবধান করা এবং বিভিন্ন কৃষি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন করা সংস্থাটির উদ্দেশ্য।
৩. বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (Bangladesh Agricultural Research Institute-BARI): ১৯০৮ সালে লর্ড কার্জন নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করেন। এ কৃষি সংস্থাটি নানা ধাপ পেরিয়ে ১৯৭৬ সালে BARI নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সংস্থাটির ৭টি গবেষণা কেন্দ্র এবং ২৮টি আঞ্চলিক উপকেন্দ্র রয়েছে। এর সদরদপ্তর গাজীপুরের জয়দেবপুরে অবস্থিত।
কৃষিতে অবদান: বাংলাদেশে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট একটি বৃহৎ সংস্থা। সব ধরনের কৃষি ফসল ও বীজ সম্পর্কে গবেষণা করে নতুন জাত উদ্ভাবন, রোগ নির্ণয়, কীটপতঙ্গ দমন কৌশল, কীটনাশক প্রয়োগ, নতুন কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন প্রভৃতি নানাবিধ কাজ করা এই সংস্থার প্রধান কাজ। সংস্থাটি এ পর্যন্ত ফসলের ২৯০টি জাত ও ৩১০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে।
৪. বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (Bangladesh Rice Research Institure-BRRI): ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট নামে নতুন করে যাত্রা শুরু করে। ঢাকার অদূরে গাজীপুরে প্রায় ৭৭ হেক্টর জায়গা জুড়ে BRRI এর কার্যালয় অবস্থিত। এছাড়া সারা দেশে সংস্থাটির ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয় আছে।
কৃষিতে অবদান: ধান বাংলাদেশের প্রধান কৃষি ফসল। এই ধান সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণা যেমন- ধানের উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন জাত উদ্ভাবন, রোগ নির্ণয়, কোন ধরনের মাটিতে কী ধরনের ধান জন্মে তা বের করা তথা ধান সংক্রান্ত যাবতীয় গবেষণা করা এই সংস্থার প্রধান কাজ।
৫. বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (Bangladesh Agricultural Development Corporation, BADC): East Pakistan Agricultural Development Corporation নামে ১৯৬১ সালে সংস্থাটির যাত্রা শুরু হয়। স্বাধীনতার পরে ১৯৭৬ সালে কৃষি ও কৃষকদের উন্নয়নকল্পে সংস্থাটি নতুনভাবে BADC নামে যাত্রা শুরু করে। ঢাকায় অবস্থিত সংস্থাটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন।
কৃষিতে অবদান: সমগ্র দেশের কৃষি ও কৃষকদের উন্নয়নকল্পে সংস্থাটি কাজ করে যাচ্ছে। কাজের সুবিধার্থে দেশের সকল উপজেলা পর্যায়ে এই সংস্থার কার্যালয় আছে। এই সংস্থাটি মূলত বিভিন্ন ফসলের বীজ সংরক্ষণ ও সময়মতো সরবরাহ, সেচ প্রদান, ফসল সংরক্ষণ ও সরবরাহ, সার সরবরাহ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে।
৬. বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন (Bangladesh Atomic Energy Commission-BAEC): পরমাণু শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিতে সব ধরনের উচ্চতর গবেষণার জন্য ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন গঠিত হয়। সংস্থার সদর দপ্তর ঢাকায় বাংলা একাডেমির পাশে এবং কার্যালয় সাভারের গণক বাড়িতে অবস্থিত।
কৃষিতে অবদান: মূলত বিভিন্ন ধরনের কৃষি ফসলের রোগ নির্ণয় ও দমন কৌশল আবিষ্কার এই সংস্থার কাজ।
৭. বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (Bangladesh Jute Research Institute-BJRI): পাট সংক্রান্ত
গবেষণার জন্য ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থার প্রধান কার্যালয় ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত।
কৃষিতে অবদান: পাটের নতুন জাত উদ্ভাবন, রোগ নির্ণয়, দমন কৌশল প্রভৃতি সংক্রান্ত গবেষণা করা এই
সংস্থার কাজ।
৮. কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (Agricultural University): বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের কৃষিতে বা কৃষি বিষয়ক কাজে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বাংলাদেশে এ পর্যন্ত চারটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এগুলো হলো-
ক. বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ; খ. শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা; গ. সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট; ঘ. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর। এছাড়া দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও (খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি) কৃষি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা ও পড়াশুনার সুযোগ আছে।
কৃষিতে অবদান: কৃষি বিষয়ক জ্ঞান আহরণ, উচ্চতর গবেষণার সুযোগ এ সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে।
৯. ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় (Veterinary University): পশু চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয় বিষয়ক পড়াশুনা ও উচ্চতর গবেষণার জন্য চট্টগ্রামে পূর্ণাঙ্গ ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও অন্যান্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ সংক্রান্ত পড়াশুনার সুযোগ আছে।
কৃষিতে অবদান : বিভিন্ন প্রাণীর রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাসেবা প্রদান সংক্রান্ত উচ্চতর পড়াশুনা ও গবেষণার সুযোগ প্রদান করা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রধান উদ্দেশ্য।
১০. কৃষি তথ্য সেবা (Agricultural Information Service-AIS): সব ধরনের কৃষি সেবা সংক্রান্ত তথ্য
পেতে ১৯৬৯ সালে এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো কৃষি ও কৃষক সংশ্লিষ্টদের কৃষিবিষয়ক জ্ঞান সমৃদ্ধকরণ।
কৃষিতে অবদান: কোথাও কোনো নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন হয়েছে কিনা, কোন এলাকায় ফসলের উৎপাদন ব্যবস্থা কেমন, কোন রোগের কী প্রতিরোধ ব্যবস্থা, নতুন চাষাবাদ পদ্ধতি প্রভৃতি সংক্রান্ত তথ্য এই সংস্থার মাধ্যমে জানা যায়।
কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
(Agriculture of Bangladesh and Modern Technology)
কৃষি বাংলাদেশের মানুষের প্রধান উপজীবিকা হলেও এদেশের কৃষি এখনো প্রকৃতি নির্ভর। প্রাচীন পদ্ধতিতে চাষাবাদ, সেচের জন্য বৃষ্টির ওপর অতি নির্ভরতা, ফসল আহরণ ও মাড়াই এ শ্রমিক নির্ভরতা, সনাতন সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রভৃতি কারণে আমাদের দেশে একর প্রতি ফসল উৎপাদন ক্ষমতা অনেক কম। এর ফলে আমরা প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারিনি। কিন্তু অন্যান্য উন্নত দেশের ন্যায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সহায়তায় নতুন নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন, আধুনিক পদ্ধতিতে সেচ ও চাষাবাদ, স্বয়ংক্রিয় ফসল মাড়াইকরণ যন্ত্র প্রভৃতি ব্যবহার করতে পারলে নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত ফসল রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হতো। এর ফলে কৃষকদের পাশাপাশি দেশবাসী আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারতো। তবে আশার কথা এই যে, স্বাধীনতা লাভের পর থেকে আমাদের কৃষিক্ষেত্রেও প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। ব্যাপকভাবে না হলেও সীমিত পরিসরে আমাদের কৃষকেরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
কৃষি ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার:
ক. জমি চাষে প্রযুক্তি: পূর্বে আমাদের দেশে গরু ও লাঙ্গলের সাহায্যে জমি চাষাবাদ করা হতো। এতে সময় যেমন বেশি লাগত, তেমনি ভালোভাবে চাষ করা যেত না। কিন্তু বর্তমানে উন্নতমানের 'ট্রাক্টর' বা কলের লাঙ্গলের সাহায্যে একদিনে অনেক জমি কর্ষণ করা যায়। ছোট ছোট খণ্ডের জমিতে বা বর্ষাকালে কাদা পানিতে কর্ষণ করার জন্য ছোট আকারের 'পাওয়ার টিলার' মেশিন বিশেষ উপযোগী। এই সমস্ত যন্ত্রের ব্যবহার কৃষিকাজকে অনেক সহজ ও সমৃদ্ধ করেছে।
খ. সেচের কাজে প্রযুক্তি: কিছুদিন পূর্বেও আমাদের দেশে জমিতে পানিসেচের একমাত্র উৎস ছিল বৃষ্টির পানি। । সেচ কৃষিকাজে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেসময় কোনো বছরে যদি কম বা দেরিতে বৃষ্টিপাত হতো, তাহলে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতো। কিন্তু বর্তমানে কৃষকগণ যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক বিভিন্ন সেচযন্ত্র ব্যবহার করে জমিতে সময়মতো পানি দিয়ে থাকেন। ডিজেল এবং বিদ্যুৎ চালিত এ সমস্ত সেচযন্ত্র মাটির গভীর থেকে পানি উত্তোলন করে কৃষি জমিতে সরবরাহ করে থাকে। ফলে বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত পানির নিশ্চয়তা বিধান করতে পারায় প্রচুর ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।
গ. বীজ বপনে প্রযুক্তি: বীজ বপনের জন্য বর্তমানে 'ড্রামসিডার' নামক আধুনিক যন্ত্র আবিষ্কার হয়েছে। এই যন্ত্রের আবিষ্কারক বাংলাদেশ। ড্রামসিডারের সাহায্যে অল্প পরিশ্রমে বিস্তীর্ণ জমিতে অত্যন্ত দ্রুত সারিবদ্ধ ও সুনিপুণভাবে বীজ বপন করা যায়। বর্তমানে ধানের চারা রোপনের ক্ষেত্রে 'রাইস ট্রান্সপ্লান্টার' ব্যবহৃত হয়। এর মাধ্যমে এক একর জমিতে চারা রোপন করতে সময় লাগে দুই ঘণ্টা। কৃষিতে এসব যন্ত্রের ব্যবহার আমাদের মূল্যবান সময়, শ্রম এবং অর্থের অপচয় রোধ করে।
ঘ. সার প্রয়োগে প্রযুক্তি: ফসলের পুষ্টি এবং দ্রুত বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করা আবশ্যক। শ্রমিকের দ্বারা হাতে হাতে সার প্রয়োগ করা সময়সাপেক্ষ এবং এর দ্বারা জমির সর্বত্র সার সুষমভাবে পড়ে না। এই অসুবিধা দূর করতে আমাদের দেশে সীমিত পরিসরে সার প্রয়োগের মেশিন ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই মেশিনের দ্বারা দ্রুত এবং জমির সর্বত্র সুষমভাবে সার ছিটানো সম্ভব।
ঙ. কীটনাশক প্রয়োগে প্রযুক্তি: সময়মতো কীটপতঙ্গ দমন করতে না পারলে ফসলের একটা বড় অংশ বিনষ্ট হয়। হাত দিয়ে কীটনাশক ব্যবহার করা সময় সাপেক্ষ এবং স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বর্তমানে আমাদের দেশে ছোট ছোট দেশীয় মেশিনের সাহায্যে কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়।
চ. ফসল সংগ্রহে প্রযুক্তি: সময়মতো জমি থেকে ফসল সংগ্রহ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকের মাধ্যমে ফসল কাটা বা সংগ্রহ করা ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। এজন্য বর্তমানে আমাদের দেশের কোনো কোনো স্থানে জমি থেকে ফসল সংগ্রহে 'হারভেস্টার মেশিন' এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই মেশিনের সাহায্যে অল্প সময়ে কয়েক একর জমির ফসল সংগ্রহ করা যায়। তবে সমস্যা হচ্ছে এই মেশিনের মাধ্যমে কেবল ধান, গম প্রভৃতি দানাদার জাতীয় ফসল সংগ্রহ করা যায়। পাট বা এ ধরনের তত্ত্ব জাতীয় ফসল সংগ্রহ করতে এবং ক্ষুদ্রাকারের জমিতে এই যন্ত্র ব্যবহার করা যায় না।
ছ. ফসল মাড়াইয়ে প্রযুক্তি: জমি থেকে ধান বা অন্যান্য ফসল বাড়িতে আনার পর মাড়াইয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের
শ্যালো মেশিন এবং হস্তচালিত মাড়াইকরণ মেশিন ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে 'কম্বাইন্ড হারভেস্টার' এর মাধ্যমে কৃষিখামারেই ধান কাটা থেকে শুরু করে ধান মাড়াই, ঝাড়া হয়ে একদম বস্তাবন্দী হয়ে বিক্রির জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। এতে সময় লাগে একর প্রতি মাত্র দেয় ঘণ্টা। স্থানীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এ সমস্ত মেশিন দামে সস্তা হওয়ায় অনেক কৃষক এটি ব্যবহার করেন।
জ. ফসল সংরক্ষণে প্রযুক্তি: পূর্বে যদি কোনো বছর কোনো একটি ফসলের ব্যাপক ফলন হতো তবে যথাযথ সংরক্ষণাগারের অভাবে ঐ ফসল সংরক্ষণ করা সম্ভব হতো না। ফলে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রায় প্রতি জেলায় আলু ও অন্যান্য পচনশীল পণ্য সংরক্ষণের জন্য অত্যাধুনিক 'হিমাগার' নির্মাণ করা হয়েছে। এই সমস্ত সংরক্ষণাগারে কৃষকগণ উদ্বৃত্ত ফসল নির্দিষ্ট ফি এর বিনিময়ে সংরক্ষণ করতে পারেন এবং প্রয়োজনে যেকোনো সময়ে বাজারজাত করতে পারেন। সংরক্ষণ সুবিধার ফলে একদিকে যেমন ফসলের অপচয় রোধ করা সম্ভব হয়েছে, অপরদিকে কৃষি পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় মূল্যহ্রাস পেয়েছে।
ঝ. পরিবহনে প্রযুক্তি: একসময় ছিল যখন বাংলাদেশে যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থা ভালো ছিল না। ফলে দেশের এক প্রান্তে উৎপাদিত পণ্য অন্য প্রান্তে সময়মতো পৌঁছানো সম্ভব হতো না। যেমন- উত্তরবঙ্গে উৎপাদিত কাঁচা শাকসবজি দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পৌছাতে অনেক সময় লাগতো। এর ফলে একদিকে পচনশীল পণ্যদ্রব্য পচে নষ্ট হতো; অন্যদিকে, সময়মতো পণ্যের সরবরাহ না থাকায় সম্পদের সুষম বণ্টন সম্ভব হতো না। কিন্তু বর্তমানে দেশের সর্বত্র রাস্তাঘাট উন্নত হওয়ায় এবং আধুনিক ও দ্রুতগতির যানবাহন থাকায় দেশের এক প্রান্তে উৎপাদিত পণ্য খুব অল্প সময়ে অন্য প্রান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়। এর ফলে দেশের সর্বত্র পণ্যের সুষম সরবরাহ সম্ভব হয় এবং কৃষক ভালো মূল্য পায়।
ঞ. গণমাধ্যম প্রযুক্তি: আজকাল দেশের সর্বত্র রেডিও, ডিশ সংযোগসহ টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, সংবাদপত্র প্রভৃতি পাওয়া যায়। ফলে দেশ-বিদেশের যেকোনো খবর দেশের যেকোনো প্রান্তের মানুষের কাছে মুহূর্তে পৌছানো সম্ভব হয়। এর ফলে দেশে নতুন জাতের কোনো ফসলের আবিষ্কার হলো কি না, উদ্ভিদ ও ফসলের রোগ, সেগুলোর প্রতিষেধক, নতুন চাষাবাদ পদ্ধতি, বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা, কোথায় পণ্যের কী দাম প্রভৃতি সম্পর্কে কৃষক জানতে পারে এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে পারে। কৃষকদের চাহিদার প্রতি লক্ষ রেখে এই সমস্ত গণমাধ্যমগুলোতে পৃথকভাবে কৃষিবিষয়ক খবর প্রকাশ করা হয়।
কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
(Crops by Season and Climate of Bangladesh)
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। তবে এদেশের কৃষি এখনো বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিকশিত হয়নি। সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এতে করে ফলন বাড়লেও এগুলোর অবৈজ্ঞানিক ব্যবহারে পরিবেশ ও খাদ্য দূষণ বেড়েছে। অবশ্য প্রত্যন্ত অঞ্চলে (পাহাড়ি ও চর এলাকায়) এখনও সনাতন পদ্ধতির চাষাবাদ চালু আছে।
বৃষ্টিপাতের পানি এদেশের কৃষির প্রধানতম অবলম্বন। সময়মতো বৃষ্টিপাত না হলে, অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলে অথবা অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর অন্তর্গত। বাংলাদেশের উৎপাদিত কৃষি ফসলসমূহ এদেশের জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে বিন্যস্ত হয়।
বাংলাদেশের ঋতু: বাংলাদেশকে বলা হয় ষড়ঋতুর দেশ। তবে জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের বিচারে বর্তমানে ছয়টি ঋতু খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না। প্রকৃত অর্থে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণের উপর নির্ভর করে এদেশে সুষ্পষ্টভাবে তিনটি ঋতু পরিলক্ষিত হয়। যথা:
ক. গ্রীষ্মকাল (মার্চ মে); খ. বর্ষাকাল (জুন অক্টোবর) এবং গ. শীতকাল (নভেম্বর ফেব্রুয়ারি)।
বাংলাদেশের প্রধান প্রধান ঋতু ও ঋতুভিত্তিক উৎপাদিত ফসল
ক. গ্রীষ্মকাল: বাংলাদেশে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল হিসেবে পরিচিত। এ সময় নিচের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়-
i. তাপমাত্রা খুব বেশি থাকে, ii. সর্বোচ্চ তাপমাত্রা যথাক্রমে ৩৪০ ও ২১° সে., iii. গড় তাপমাত্রা ২৮° সে., iv. এপ্রিল উষ্ণতম মাস, v. গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৫১ সে.মি., vi. পানির অভাবে মাঠ ঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যায়, vii. মাঝে মাঝে কালবৈশাখী ঝড় হয়, viii. মোট বৃষ্টিপাতের ২০% গ্রীষ্মকালে হয়ে থাকে।
উৎপাদিত কৃষি ফসল: বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালে উৎপাদিত প্রধান কৃষি ফসল হচ্ছে- ধান, পাট, আখ, সবজি প্রভৃতি।
খ. বর্ষাকাল: জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত সময়কালকে বাংলাদেশে বর্ষাকাল বলা হয়। বাংলাদেশে মোট বৃষ্টিপাতের ৮০ শতাংশ এই সময় সংঘটিত হয়। বর্ষাকালের বৈশিষ্ট্যসমূহ হচ্ছে-i. গড় তাপমাত্রা ২৭০ সে., ii. শৈলোৎক্ষেপ প্রক্রিয়ায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, iii. বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়ে
যায়, iv. বর্ষাকালে প্রায়ই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে অতিবর্ষণে বন্যার সৃষ্টি হয়। উৎপাদিত কৃষি ফসল: বর্ষাকালে আউশ ধান, পাট, মিষ্টি কুমড়া, পুঁইশাক, বাতাবিলেবু, কাকরোল, বিভিন্ন প্রকার শাকসবজি পাওয়া যায়।
গ. শীতকাল: বাংলাদেশে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময়কালকে শীতকাল হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তবে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাস ব্যতীত শীতের প্রাদুর্ভাব খুব বেশি লক্ষ করা যায় না। এ সময় আর যেসব বৈশিষ্ট্য দেখা যায় সেগুলো হচ্ছে-
i. বৃষ্টিপাত প্রায় হয় না বললেই চলে (১০ সেন্টিমিটারের কম), ii. উত্তর-পূর্ব দিক থেকে মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়, iii. গড় তাপমাত্রা থাকে ১৭.৭° সে., iv. বায়ুপ্রবাহ শুষ্ক ও আর্দ্রতাহীন থাকে।
উৎপাদিত কৃষি ফসল: শীতকালে বাংলাদেশে উৎপাদিত ফসলের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার ডাল, তেলবীজ, আলু, পিঁয়াজ, ধনিয়া, রসুন, তুলা প্রভৃতি প্রধান।
| কৃষিকাজের নিয়ামক | কৃষিকাজ মানুষের আদিমতম পেশা। ভূমিকর্ষণ বা চাষের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করাকে কৃষি বলে। কৃষিকাজ জলবায়ুর ওপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল। জলবায়ুর উপাদানসমূহ হচ্ছে- তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ প্রভৃতি। পলি সঞ্চয়ের কারণে নদ-নদীর উভয় তীর কৃষি চাষের জন্য উত্তম। উর্বর মৃত্তিকায় ভালো ফসল জন্মে থাকে। কৃষিকাজের জন্য ট্রাক্টর, উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ব্যয় প্রভৃতির জন্য প্রচুর অর্থ প্রয়োজন হয়। এছাড়া পৃথিবীর যে অঞ্চলে যে পণ্যের চাহিদা বা বাজার থাকে, সে অঞ্চলে সেই ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। কোনো স্থানে জনসংখ্যা বেশি হলে কৃষিপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। একটি দেশের কৃষিক্ষেত্রের উন্নয়ন ও প্রসার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতির ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে। |
| ধান | ধান পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে পৃথিবীর অধিকাংশ ধান উৎপন্ন হয়। উচ্চভূমি অপেক্ষা সমতল ও নিম্নভূমি ধান চাষের উপযোগী। এতে বার্ষিক ১০০ ২৫০ সে.মি. বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন হয়। ধানবীজের অঙ্কুরোদগমের জন্য ১৬° সে. অপেক্ষা অধিক তাপমাত্রা প্রয়োজন। পলিযুক্ত উর্বর এঁটেল-দোঁআশ মাটি ধান চাষের সর্বাধিক উপযোগী। তাছাড়া স্বল্প বৃষ্টিপাত বিশিষ্ট বা শুষ্ক অঞ্চলে নদী থেকে সেচের মাধ্যমে ধানের চাষ হয়। ধান উৎপাদনে চীন বিশ্বে প্রথম। চীনের হুনান প্রদেশে প্রচুর ধান উৎপন্ন হয় বলে একে 'ধানের আধার' বলা হয়। উন্নয়নশীল দেশে ধান চাষের জন্য বিরাজমান সমস্যাগুলো হলো- জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মূলধনের অভাব, মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীলতা, অদক্ষ শ্রমিক, উন্নত বীজের অভাব, সার ও পানিসেচের অভাব, অনুন্নত পরিবহন ও যাতায়াত ব্যবস্থা ইত্যাদি। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদসহ উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক ও সেচের ব্যবস্থা করা একান্ত প্রয়োজন। |
| গম | গম এক প্রকার দানাদার খাদ্যশস্য। গম নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলের ফসল। উত্তর আমেরিকার প্রেইরি তৃণভূমির নদী অববাহিকা 'পৃথিবীর রুটির ঝুড়ি' নামে পরিচিত। গম চাষের জন্য তাপমাত্রা ১৫০-২০০ সে. এবং বার্ষিক গড়ে ৩০-১০০ সে.মি. বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। কর্দমময় দোআঁশ মৃত্তিকা গম চাষের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট। চীন পৃথিবীর শীর্ষ গম উৎপাদনকারী দেশ। এদেশে শীত ও বসন্তকালীন উভয় প্রকার গম চাষ হয়। বর্তমান বিশ্বের মোট উৎপাদিত গমের প্রায় ১৬ শতাংশ বিশ্ববাজারে প্রবেশ করে। সাধারণত উন্নত দেশগুলো গম রপ্তানি করে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো তা আমদানি করে। |
| আখ | আখ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের ফসল। ভারতীয় উপমহাদেশের মৌসুমি অঞ্চল আখের আদিভূমি। চুন, পটাশ ও নাইট্রোজেনযুক্ত মৃত্তিকা ও লাভা গঠিত কৃষ্ণ মৃত্তিকা এবং পানি জমে থাকে না এরূপ উঁচু ও ঢালু জমিতে আখ চাষ ভালো হয়। এতে ১৯০-২৭° সে. তাপমাত্রা এবং ১২৫-১৭৫ সে.মি. বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। আখ উৎপাদনে ব্রাজিল বিশ্বে প্রথম। উন্নয়নশীল বিশ্ব নানা সমস্যার কারণে আখ চাষে তেমন উন্নতি লাভ করতে পারে নি। আখ চাষের সমস্যাগুলো সুষ্ঠু সমাধান করতে পারলে উন্নয়নশীল বিশ্বে আখের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে। |
| চা | চা পৃথিবীর জনপ্রিয় পানীয়। এটি ক্রান্তীয় অঞ্চলের উদ্ভিদ। ভারতের আসাম এবং চীনের পার্বত্য এলাকা চায়ের আদিভূমি। সমুদ্রপৃষ্ঠের ৬০০ থেকে ১২০০ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট পার্বত্য ঢালু অঞ্চলে চা বাগান গড়ে তোলা হয়। উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ ও অধিক আর্দ্র জলবায়ু চা চাষের জন্য উপযোগী। নাইট্রোজেনযুক্ত কিছুটা অম্লধর্মী, লৌহ মিশ্রিত এবং আগ্নেয় ভস্মযুক্ত মৃত্তিকায় চা গাছ জন্মাতে পারে। এশিয়া তথা বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় চা উৎপাদনকারী দেশ চীন। যুক্তরাজ্য চায়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। |
| কৃষির ক্ষেত্র | ভূমিকর্ষণ বা চাষ করার মাধ্যমে ফসল উৎপাদনকে কৃষিকাজ বলে। শস্য উৎপাদন কৃষির প্রধানতম ক্ষেত্র। বিশ্বের মোট কৃষিখাতের প্রায় ৬০ শতাংশ লোক শস্য উৎপাদনের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। উন্নয়নশীল দেশসমূহে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পশুপালন শুরু হয়েছে। বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষি খাত হচ্ছে মৎস্য সম্পদ। প্রাণীজ আমিষের চাহিদা পূরণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সামুদ্রিক মাছ এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। মিঠা পানির মাছ প্রধানত অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হয়। |
| কৃষি সংস্থা | স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বাংলাদেশ সরকার কৃষি বিষয়ক কর্মকাণ্ডকে প্রাধান্য দিয়ে কৃষিবিষয়ক উচ্চতর গবেষণার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- SRDI, BARC, BARI, BRRI, BADC, BAEC, BJRI, AIS, বাংলাদেশের কৃষি ও ভেটেনারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ প্রভৃতি। মূলত কৃষি বিষয়ক ফসল ও বীজ সম্পর্কিত গবেষণা, পরামর্শ প্রদান, রোগ নির্ণয় ও দমন কৌশল উদ্ভাবন, নতুন জাত উদ্ভাবন প্রভৃতি ক্ষেত্রে এসব সংস্থাগুলো অবদান রয়েছে। |
| কৃষি প্রযুক্তি | কৃষিকাজ জলবায়ুর উপর নির্ভরশীল। তবে বর্তমানে ব্যাপকভাবে না হলেও সীমিতি পরিসার আমাদের কৃষকেরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লিব পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তারা জমি চাষে গরুর পরিবর্তে ট্রাক্টর বা কলের লাজাল, পাওয়ার টিলার ব্যবহার করছেন। সেচের ক্ষেত্রে ডিজেল বা বিদ্যুৎ চালিত সেচযন্ত্র, বীজ বপনে ড্রামসিডার, ফসল কাটার ক্ষেত্রে হারভেস্টার মেশিন, ফসল সংরক্ষণে অত্যাধুনিক হিমাগার ব্যবহার করছেন। ফলে উৎপাদন বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। |
| ঋতুভিত্তিক ফসল | বাংলাদেশের কৃষিকে 'মৌসুমি বায়ুর জুয়া খেলা' বলা হয়। এ দেশের কৃষিকে ঋতুভিত্তিক গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীতকালীন এই তিনভাগে ভাগ করা যায়। গ্রীষ্মকালে (মার্চ-মে) উৎপাদিত ফসলগুলো হলো- ধান, আখ, পাট, বিভিন্ন সবজি। বর্ষাকালীন (জুন-অক্টোবর) ফসলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- আউশ ধান, পাট, মিষ্টি কুমড়া, পুঁইশাক, বাতাবিলেবু। আর শীতকালে (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি) উৎপাদিত ফসল হলো-ডাল, তেলবীজ, আলু, পিয়াজ, রসুন, তুলা, বিভিন্ন শাক ও সবজি। |
কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
Read more