সুনামি (পাঠ-৭)

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.1k

(Tsunami)

সুনামি (Tsunami) একটি জাপানি শব্দ। 'সু' অর্থ 'বন্দর' এবং 'নামি' অর্থ 'ঢেউ'। সুতরাং, সুনামি অর্থ হলো 'বন্দরের ঢেউ'। আবার, জাপানি ভাষায় এর অর্থ হলো 'পোতাশ্রয়ের ঢেউ'। সুনামির ঢেউ সমুদ্রের স্বাভাবিক ঢেউয়ের মতো নয়। এটা সাধারণ ঢেউয়ের চেয়ে অনেক বিশালাকৃতির; অতি দ্রুত ফুঁসে ফুলে ওঠা জোয়ারের মতো যা উপকূল ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি করে। সুনামির পানির ঢেউগুলো উঁচু হয়ে একের পর এক আসতেই থাকে, তাই একে 'ঢেউয়ের রেলগাড়ি' বা 'ওয়েভ ট্রেন' বলা হয়। সুনামির ফলে সৃষ্ট সামুদ্রিক ঢেউয়ের উচ্চতা ৩০ মি. পর্যন্ত এবং গতিবেগ ১০০ কি.মি./ঘন্টার চেয়ে বেশি হতে পারে।

সুনামির কারণ (Causes of Tsunami)

ভূমিকম্প ও অগ্ন্যুৎপাতের পর সুনামিকে পৃথিবীব্যাপী তৃতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সমুদ্র তলদেশে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিধস সুনামি সৃষ্টি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। হঠাৎ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বিশাল জলরাশির সরে যাওয়া সুনামির অন্যতম কারণ এবং সাধারণত মাধ্যাকর্ষণ শক্তি দ্বারা পানি আরও ফুলে ওঠে লক্ষ লক্ষ টনের বিশাল ঢেউ তৈরি করে। আর এই ঢেউ যত বেশি তীরভূমির কাছাকাছি যায় তত বেশি দীর্ঘ হয়ে ভয়ঙ্কর জলোচ্ছ্বাসে রূপ নেয়। সুনামি সৃষ্টির ক্ষেত্রে জোয়ার কোনো ভূমিকা রাখে না।

অগ্ন্যুৎপাত: আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে সুনামি সৃষ্টি হয়। এতে করে মহাসাগরীয় ভূত্বকের নিচে দুর্বল শিলাস্তর ধসে পড়ে। ফলে বিশাল ঢেউ সৃষ্টি হয় এবং তা তীরে আছড়ে পড়ে। ২০১৮ সালের ২২ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপে আনাক ক্রাকাতুয়া আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুৎপাতের ফলে আংশিক ধসে পড়লে সুনামির সৃষ্টি হয়।
ভূমিধস : উপকূলে বড় ধরনের ভূমিধস হলে সুনামি হতে পারে। আবার পানির নিচের ভূমিধসও সুনামির জন্য দায়ী। ১৯৫৮ সালে লিটুয়া উপকূলে ভূমিধসের কারণে আলাস্কায় সুউচ্চ ঢেউ সৃষ্টি হয়। এর ফলে সৃষ্ট সুনামিতে দুজন লোক মারা যায়।

ভূমিকম্প: পাত সঞ্চালনের কারণে সৃষ্ট ভূমিকম্প সুনামির জন্য দায়ী। প্লেটগুলো সঞ্চালনের ফলে প্লেট সীমানায় বিশাল জলরাশি সরে গিয়ে বড় ধরনের ঢেউ সৃষ্টি করে। ফলে সুনামি হয়। ১৯৪৬ সালে রিকটার স্কেলে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে অ্যালিউসিয়ান দ্বীপপুঞ্জ ও আলাস্কায় সুনামি সংঘটিত হয়।

সুনামির ফলাফল (Consequence of Tsunami)

সমুদ্র উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সুনামি দ্বারা ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়ে থাকে। মহাসাগর ও সাগরের তলদেশে প্লেটের গতির কারণে সৃষ্ট প্রচণ্ড ভূমিকম্প সুনামি সৃষ্টির কারণ। এতে সমুদ্রের পানির ঢেউয়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ৫০০ থেকে ৮০০ মাইল পর্যন্ত হতে পারে। খোলা সমুদ্রে ঢেউয়ের উচ্চতা তিন ফুট পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু ঢেউ যতই তীরের দিকে যায়, ততই শক্তি সঞ্চয় করে এবং উচ্চতা বাড়ে। তখন ঢেউয়ের এক মাথা থেকে আরেক মাথার দূরত্ব হতে পারে ১০০ মাইল পর্যন্ত। অগভীর পানিতে সুনামি ধ্বংসাত্মক জলোচ্ছ্বাসে রূপ নেয়। অগ্রসরমান জলরাশি ভয়ঙ্কর স্রোত সৃষ্টি করে নেমে যাবার আগে ১০০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। উপকূলের ব্যাপক এলাকা প্লাবিত করতে পারে। উপকূলীয় জনপদ নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। সুনামির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, ভূমিকম্পের মতো সুনামি সম্পর্কেও পূর্বাভাস দেওয়া যায় না। ফলে সুনামির সৃষ্টি হলে উপকূলীয় জনপদের লোকজনদের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ইতিহাসের ভয়ঙ্কর পাঁচটি সুনামি:

বৃহৎ আকারের সুনামি হলেই তা ধ্বংসাত্মক হয় না। কেননা তীরবর্তী এলাকায় সম্পদ ও স্থাপনা থাকার উপর তা নির্ভরশীল। এ প্রেক্ষিতে ইতিহাসের ধ্বংসকারী পাঁচটি সুনামি হলো:

১. সুমাত্রা, ইন্দোনেশিয়া- ২৬ ডিসেম্বর, ২০০৪
সুমাত্রা উপকূলে প্রায় ৩০ কি.মি. গভীরে ৯.১ মাত্রার ভূমিকম্পে সাগরতলে চ্যুতি এলাকায় ১৩০০ কি.মি. দীর্ঘ অঞ্চলে সাগরতলে খাড়াভাবে শিলাচ্যুতি ঘটে। এ সুনামির ঢেউ ৫০ মিটার উঁচু হয়ে প্রায় ৫ কি.মি. অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে।
এই ঢেউ মহাপ্লাবনে রূপ নিয়ে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারত, থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ প্রভৃতি দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়া ছাড়িয়ে কেনিয়া, সোমালিয়াসহ ১২টি আফ্রিকান দেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। জলোচ্ছ্বাসে তিন লাখের মতো মানুষ নিহত হয়। একমাত্র ইন্দোনেশিয়ায় সুমাত্রার আচেহ প্রদেশে নিহত হয়েছে এক লাখ দশ হাজার মানুষ। তারপর বেশি লোক নিহত হয়েছে শ্রীলঙ্কায়। সুনামির জলোচ্ছ্বাসে ভারত মহাসাগরের বহু ছোট ছোট দ্বীপ সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এসব দ্বীপে বসবাসকারী বহু আদিবাসী গোষ্ঠী প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

২. উত্তর প্রশান্ত উপকুল, জাপান- ১১ মার্চ, ২০১১
প্রায় ১০ মিটার উঁচু সুনামির ঢেউ ঐদিন জাপানের পূর্ব উপকূলে ১৮,০০০ লোকের মৃত্যুর কারণ হয়। ভূঅভ্যন্তরে ২৪.৪ কি.মি. গভীরে সৃষ্ট ৯.০ মাত্রার ভূমিকম্প ছিল এ দুর্যোগের কারণ। প্রায় সাড়ে চার লাখ লোক এ দুর্যোগে গৃহহীন হয়ে পড়ে।

৩. লিসবন, পর্তুগাল- ১ নভেম্বর, ১৭৫৫
পতুর্গাল এবং দক্ষিণ স্পেনের পশ্চিম উপকূলের বেশ কয়েকটি শহর এ দিন সুনামিতে আক্রান্ত হয়। সাগরের ঢেউয়ের উচ্চতা কোথাও কোথাও ছিল ৩০ মিটার উঁচু। ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট এ সুনামিতে পর্তুগাল, মরক্কো ও স্পেনে প্রায় ৬০,০০০ লোকের প্রাণহানি ঘটে।

৪. ক্রাকাতোয়া, ইন্দোনেশিয়া- ২৭ আগস্ট, ১৮৮৩
ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ছিল এ সুনামি সৃষ্টির কারণ। ৩৭ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়েছিল সাগরের ঢেউ। প্রায় ৪০,০০০ লোক এতে মৃত্যুববরণ করে।

৫. এনসুয়ান্দা সাগর, জাপান- ২০ সেপ্টেম্বর, ১৪৯৮
কী, মিকাওয়া, সুরুগু, ইজু ও সাগমির উপকূলে ৮.৩ মাত্রার ভূমিকম্পে এদিন জাপানে সুনামি সংঘটিত হয়। উপকূলীয় এলাকায় সব বাড়িঘর এতে ধুয়ে মুছে যায় এবং প্রায় ৩১,০০০ লোকের প্রাণহানি ঘটে।

ভূমিরূপ পরিবর্তন. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...