(Forest Area of Bangladesh)
কোনো দেশের স্থান বিশেষে অনেকটা এলাকাজুড়ে যখন ছোট, মাঝারি বা বড় ধরনের বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য গাছের সমাবেশ ঘটে তখন তাকে বনভূমি বলে। কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে সে দেশের মোট আয়তনের ২৫% বনভূমি থাকা আবশ্যক। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে আছে ১৭.৫০%, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। দেশের মোট বনভূমির অধিকাংশ খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগে অবস্থিত।
বাংলাদেশের বনজ সম্পদের শ্রেণিবিন্যাস (Classification of Forest in Bangladesh)
জলবায়ু ও মৃত্তিকার গুণাগুণের তারতম্যের কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের উদ্ভিদ দেখতে পাওয়া যায়। উদ্ভিদগোষ্ঠী অনুসারে বাংলাদেশের বনভূমিকে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। যথা-

১. ক্রান্তীয় চিরহরিৎ ও পতনশীল পত্রযুক্ত বৃক্ষের বনভূমি
২. পতনশীল পত্রযুক্ত বৃক্ষের বনভূমি
৩. গরান বা স্রোতজ বনভূমি
১. ক্রান্তীয় চিরহরিৎ ও পতনশীল পত্রযুক্ত বৃক্ষের বনভূমি: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বদিকের পাহাড়ি এলাকাসমূহ যেমন- বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলায় এ বনভূমি দেখা যায়। এ বনভূমির আয়তন প্রায় ১৫,৩২৬ বর্গকিলোমিটার।
এ এলাকায় বনভূমি গড়ে ওঠার কারণগুলো হলো- স্বল্প জনবসতি, অত্যধিক বৃষ্টি (৩০০ সে.মি.-এর বেশি), পরিমিত উত্তাপ (৩৪° সে.), বেলেপাথর ও কর্দমযুক্ত পাহাড়ি মৃত্তিকা।
এ বনভূমিতে পতনশীল পত্রযুক্ত বৃক্ষের মধ্যে কড়ই, সেগুন, গামার, গর্জন, জারুল ও শিমুল উল্লেখযোগ্য; চিরহরিৎ বৃক্ষের মধ্যে ময়না, চাপালিশ ও তেলসুর উল্লেখযোগ্য। বাঁশ, বেত, ইত্যাদিও এ বনে পাওয়া যায়। প্রাণীর মধ্যে বন্যকুকুর, হাতি, সাপ, হরিণ, বাইসন ইত্যাদি প্রাণী ও নানা ধরনের পাখি পাওয়া যায়।
এ বনভূমির যথেষ্ট অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। যেমন: কাগজ শিল্পের প্রধান কাঁচামাল বাঁশ এ বন থেকে পাওয়া যায়, গর্জন ও জারুল রেলওয়ের স্লিপার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এ বন থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন জীবজন্তুর শিং, চামড়া ও দাঁতের যথেষ্ট বাণিজ্যিক গুরুত্ব রয়েছে। বেত দ্বারা চেয়ার, টেবিল, শীতল পাটি, চাটাই, মাদুর ইত্যাদি তৈরি হয়। এ বনভূমির ঘাস ও নলখাগড়া সিলেটের কাগজ ও মন্ড কলে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
২. পতনশীল পত্রযুক্ত বৃক্ষের বনভূমি: এ শ্রেণির বনভূমি ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও গাজীপুর জেলায় এবং সামান্য কিছু উত্তরাঞ্চলের রংপুর, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও জেলায় দেখা যায়। এ বনভূমির আয়তন ১,৭৫০ বর্গকিমি। বনভূমির বেশির ভাগ টাঙ্গাইল, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ জেলায় অবস্থিত। প্রচুর বৃষ্টিপাত, পর্যাপ্ত পরিমাণে তাপমাত্রা, লৌহজাত পদার্থমিশ্রিত হলুদ-লাল রঙের বালি, কর্দম ও আঁটসাঁট মৃত্তিকা ইত্যাদি কারণে এ বনভূমি গড়ে ওঠে।

শীতকালে শুষ্কাবস্থা বিরাজমান থাকায় এ বনভূমির বৃক্ষাদির পাতা ঝরে যায়। ফলে একে পতনশীল পত্রযুক্ত বৃক্ষের বনভূমি বলা হয়। এ বনে শাল, গজারি, কাঁঠাল, নিম, কড়ই, ছাতিম, কুচি, কুম্ভী, বহেরা, হরিতকী, ইত্যাদি বৃক্ষ পাওয়া যায়। বানর, হাতি, হরিণ, বন্যকুকুর ও বিভিন্ন ধরনের পাখি দেখা যায়। এই বনভূমির প্রায় ৯৫% ভাগ বৃক্ষই হচ্ছে শাল। তাই এর অপর নাম শালবন।
এ বনভূমির শাল ও গজারি বৃক্ষ ঘরের খুঁটি ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শাল বৃক্ষ বৈদ্যুতিক তারের খুঁটি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, ঘরবাড়ি নির্মাণেও এ বৃক্ষ ব্যবহৃত হয়। টেক্সটাইল ও অন্যান্য মিলে মাড় দেওয়ার কাজে ছাতিম ব্যবহৃত হয়। এ বন থেকে প্রাপ্ত বাঁশ ও বেত ঘরবাড়ির প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। কুচি বৃক্ষ দ্বারা ছাতার বাঁট এবং বাকল দ্বারা ওষুধ তৈরি হয়।
৩. গরান বা স্রোতজ বনভূমি: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে সমুদ্র উপকূলের লবণাক্ত ও জোয়ার-ভাটা প্রভাবিত শুষ্ক নিবাসের উদ্ভিদকে স্রোতজ বনভূমি বলা হয়। এ বনভূমি খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় অধিক এবং বরগুনা জেলায় সামান্য পরিমাণ রয়েছে। বাংলাদেশের একক বৃহত্তম এ বনভূমি সুন্দরবন নামে খ্যাত। এ বনভূমির আয়তন ৬,৭৮৬ বর্গকিলোমিটার।
এ বনভূমি গড়ে ওঠার কারণ হলো: প্রচুর বৃষ্টিপাত (২০০-৩০০ সে.মি.), পরিমিত উত্তাপ, বিরল জনবসতি, সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা ও লবণাক্ত পানির প্রভাব।
সুন্দরী, গরান, গেওয়া, ধুন্দল, কেওড়া, আসুর, বাইন, গোলপাতা, বীণা, পশুর ইত্যাদি এ বনভূমির উল্লেখযোগ্য বৃক্ষ। এ বনভূমিতে হরিণ, বানর, বাঘ, শুকর, কুমির, বনবিড়াল, সাপ ও বিভিন্ন ধরনের পাখি পাওয়া যায়। ম্যানগ্রোভ বনভূমি জীববৈচিত্র্যের জন্য সমৃদ্ধ। UNESCO ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে ৫২২তম World Heritage (বিশ্ব ঐতিহ্য) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

এ বনভূমির গরান জ্বালানি কাঠ হিসেবে, পেন্সিল তৈরিতে ধুন্দল, গোলপাতা ঘরের চালের ছাউনির কাজে, সুন্দরী বৃক্ষ গৃহ ও নৌকা নির্মাণে এবং বৈদ্যুতিক ও টেলিগ্রামের খুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গেওয়া কাঠ নিউজপ্রিন্ট কাগজ ও দিয়াশলাই তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এ বন থেকে প্রাপ্ত পশুর চামড়ার বিশ্ববাজারে চাহিদা রয়েছে।
বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মৃত্তিকা বনজ সম্পদ বৃদ্ধির অনুকূলে। তবুও আমাদের দেশে যে বনভূমি রয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। অথচ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হ্রাসে বনভূমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুন্দরবনসহ দেশের অন্যান্য বনভূমির যথাযথ সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের ওপর নজর দেওয়া তাই সকলের দায়িত্ব।
জীবমণ্ডল - তাপস কুমার মজুমদার স্যার এর লেখা বই
Read more