(Mineral & Energy Resources of Bangladesh)
খনিজ সম্পদ যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ খনিজ সম্পদে তেমন সমৃদ্ধ নয়। যথেষ্ট প্রযুক্তিগত জ্ঞান, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং পর্যাপ্ত অর্থের বরাদ্দ না থাকায় বাংলাদেশে খনিজ সম্পদের অনুসন্ধান ও আহরণ কাজ উল্লেখযোগ্যভাবে অগ্রগতি লাভ করছে না। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যতীত অন্যান্য খনিজ সম্পদের পরিমাণ খুবই নগণ্য। চাহিদা পূরণের জন্য তাই বাংলাদেশকে প্রচুর পরিমাণ খনিজ সম্পদ আমদানি করতে হয়। এ দেশের প্রধান খনিজ সম্পদগুলোর মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, খনিজ তেল, চুনাপাথর, চীনামাটি, সিলিকাবালি, কঠিন শিলা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

ক. প্রাকৃতিক গ্যাস
বাংলাদেশের প্রধান খনিজ সম্পদ হচ্ছে প্রাকৃতিক গ্যাস। এদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস উচ্চ মাত্রার মিথেন সমৃদ্ধ এবং উন্নতমানের। ১৯৫৫ সালে সিলেটের হরিপুরে প্রথম গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ দেশে সর্বমোট ২৭টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এদেশের প্রধান প্রধান গ্যাসক্ষেত্রগুলো হচ্ছে তিতাস, হবিগঞ্জ, সিলেট, বাখরাবাদ, রশিদপুর, সেমুতাং, বেগমগঞ্জ, ফেনী, কামতা, ফেঞ্চুগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, ভোলা প্রভৃতি।
সারণি ৫.৬: বাংলাদেশের গ্যাস ক্ষেত্র এবং সঞ্চিতি (বিলিয়ন ঘনফুট)।
| গ্যাস ক্ষেত্র | উৎপাদনরত কূপ সংখ্যা | প্রাথমিক উত্তোলনযোগ্য মজুদ (GIIP) | ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উৎপাদন | ক্রমপুঞ্জিত উৎপাদন জুন-২০১৮ পর্যন্ত | অবশিষ্ট গ্যাসের মজুদ জুলাই ২০১৮ |
| তিতাস | ২৬ | ৮১৪৮.৯ | ১৯৫.২ | ৪৫১৮.৭ | ১৪৮৪,৩ |
| হবিগঞ্জ | ৭ | ৩৬৮৪.০ | ৭৯.৯ | ২৩৯৩.০ | ২৫৪.০ |
| বাখরাবাদ | ৬ | ১৭০১.০ | ১২.০ | ৮২১.৮ | ৪০৯.৭ |
| কৈলাশটিলা | 8 | ৩৬১০,০ | ২৩.০ | ৬৮২,৩ | ২০৭৭.৭ |
| রশিদপুর | ৫ | ৩৬৫০.০ | ১৯.৫ | ৬১৫.৪ | ১৮১৭.৬ |
| সিলেট | ১ | ৩৭০.০ | ১.৮ | ২১৪.৪ | ১০৪.৫ |
| গ্যাস ক্ষেত্র | উৎপাদনরত কূপ সংখ্যা | প্রাথমিক উত্তোলনযোগ্য মজুদ (GIIP) | ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উৎপাদন | ক্রমপুঞ্জিত উৎপাদন জুন-২০১৮ পর্যন্ত | অবশিষ্ট গ্যাসের মজুদ জুলাই ২০১৮ |
| মেঘনা | ১ | ১২২.১ | ৪.৬ | ৬৮.২ | ১.৭ |
| নরসিংদী | ২ | ৩৬৯.০ | ১০.০ | ১৯৬.১ | ৮০.৭ |
| বিয়ানীবাজার | ২ | ২৩০.৭ | ৩.৫ | ১০০.৬ | ১০২.৪ |
| ফেঞ্চুগঞ্জ | ২ | ৫৫৩.০ | ৪.৭ | ১৫৭.০ | ২২৪.০ |
| সালদা | ১ | ৩৭৯.৯ | ১.১ | ৮৯.৬ | ১৮৯.৪ |
| শাহবাজপুর | ৩ | ৯২০.০ | ১৫.৩ | ৪৭.৬ | ৫৯৬.৪ |
| সেমুতাং | ২ | ৬৫৩.৮ | ০.৫ | ১২.৯ | ৩০৪.৮ |
| সুন্দলপুর | ১ | ৬২.২ | ০.৯ | ১০.৯ | ২৪.২ |
| শ্রীকাইল | ৩ | ২৪০,০ | ১২.৯ | ৭৪.৩ | ৮৬.৭ |
| বেগমগঞ্জ | ০ | ১০০.০ | ০.০০ | ০.৯ | ৬৯.১ |
| জালালাবাদ | ৭ | ১৪৯১.০ | ৯১.৯ | ১২৩৪.২ | ০.০০ |
| মৌলভীবাজার | ৬ | ১০৫৩.০ | ১২.৪ | ৩১৬.৩ | ১১১.৭ |
| বিবিয়ানা | ২৬ | ৮৩৫০.০ | ৪৪৬.৪ | ৩৩৭৯.৩ | ২৩৭৪.৭ |
| বাঙ্গুরা | ৫ | ১১৯৮.০ | ৩২.৯ | ৪১০,৩ | ১১১.৭ |
| মোট | ১১০ | ৩৬৮৮৬.৬ | ৯৬৮.৫ | ১৫৩৪৩.৬ | ১০৭৮৯.৫ |
উৎপাদনে যায় নাই | |||||
| কুতুবদিয়া | ৬৫.০ | ০.০ | ০.০ | ৪৫.৫ | |
| ভোলা নর্থ | ৬০০ | ০.০ | ০.০ | ৪২০.০ | |
| মোট | ৬৬৫.০ | ০.০ | ০.০ | ৪৬৫.৫ | |
উৎপাদন স্থগিত | |||||
| সাঙ্গু | ৮৯৯.৬ | ০.০ | ৪৮৭.৯ | ৮৯.৯ | |
| ছাতক | ১০৩৯.০ | ০.০ | ২৬.৫ | ৪৪৭.৫ | |
| কামতা | ৭১.৮ | ০.০ | ২১.১ | ২৯.২ | |
| রূপগঞ্জ | ৪৮.০ | ০.৩ | ৬২.৪ | ৬২.৬ | |
| ফেনী | ১৮৫.২ | ০.৩ | ০.৭ | ৩২.৯ | |
| মোট | ২২৪৩.৬ | ০.৩ | ৫৯৮.৫ | ৬৬২.১ | |
| সর্বমোট | ক+খ+গ (বিসিএফ) | ৩৯৭৯৫.২ | ৯৬৮.৮ | ১৫৯৪২.২ | ১১৯১৭.১ |
| সর্বমোট | ট্রিলিয়ন ঘনফুট | ৩৯.৮ | ০.৯৭ | ১৫.৯ | ১১.৯ |
উৎস: পেট্রোবাংলা, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, ২০১৯

মোট সঞ্চিতির পরিমাণ: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৯ অনুযায়ী, এদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মোট সঞ্চিতির পরিমাণ ৩৯.৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট এবং প্রাথমিক উত্তোলনযোগ্য মজুদের পরিমাণ ২৭.৮১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। জুলাই-২০১৮ সময়ে উত্তোলনযোগ্য নীট মজুদের পরিমাণ প্রায় ১১.৯২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। সূত্র: পেট্রোবাংলা, ২০১৯।
প্রাকৃতিক গ্যাসের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও ব্যবহার
বাংলাদেশের শিল্প কারখানাতে প্রাকৃতিক গ্যাস জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জ্বালানির শতকরা ৭৩ ভাগই প্রাকৃতিক গ্যাস দ্বারা পূরণ করা হয় (পেট্রোবাংলা-২০১৯)। কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করা হয়। যেমন- সিদ্ধিরগঞ্জ, শাহজীবাজার, আশুগঞ্জ, ঘোড়াশাল ইত্যাদি। প্রাকৃতিক গ্যাস সার কারখানাগুলোতে (আশুগঞ্জ) কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কীটনাশক, ওষুধ, রাবার, প্লাস্টিক, কৃত্রিম তন্তু প্রভৃতি তৈরির জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও চা বাগান, কৃষি ও পরিবহনখাত, গৃহস্থালির কাজে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
সারণি- ৫.৭: খাতওয়ারি প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার (বিলিয়ন ঘনফুট)
| বছর | বিদ্যুৎ | ক্যাপটিক | সার | শিল্প | চা-বাগান | বাণিজ্যিক | গৃহস্থালি | সি.এন.জি | মোট |
| ২০১৬-১৭ | ৪০৩.৬ | ১৬০.৫ | ৪৯.১ | ১৬৩.১ | ১.০ | ৮.৭ | ১৫৪.৪ | ৪৭.০ | ৯৮৭.৩ |
| ২০১৭-১৮ | ৩৯৮.৬ | ১৬০.৫ | ৪৩.০ | ১৬৬.৬ | ০.৯ | ৮.২ | ১৫৮.০ | ৪৬.২ | ৯৮২.০ |
সূত্র: পেট্রোবাংলা, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, ২০১৯
খ. কয়লা
কয়লা বাংলাদেশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য খনিজ সম্পদ। বহুবছর যাবত এদেশে কয়লা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, বাংলাদেশে ১০০০ মিটার নিচে অত্যন্ত উন্নতমানের কয়লা প্রাপ্তির সম্ভাবনা আছে, তবে তা. উত্তোলন অনেক ব্যয়বহুল। বাংলাদেশে ১৯৫৯ সালে বগুড়া জেলার কুচসা নামক স্থানে সর্বপ্রথম কয়লার সন্ধান পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে বগুড়ার জামালগঞ্জ, রংপুরের পীরগঞ্জ ও খালাসপীর, দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া, দীঘিপাড়া ও ফুলবাড়ি, ফরিদপুরের বাগিয়া প্রভৃতি স্থানে কয়লাক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়া গোপালগঞ্জ এবং খুলনার চান্দা ও রাখিয়াবিলে প্রচুর পীট কয়লার সন্ধান পাওয়া গেছে।
সারণি ৫.৮: বাংলাদেশে আবিষ্কৃত কয়লার ক্ষেত্রসমূহ ও সঞ্চিতির পরিমাণ (২০১৮)
| কয়লার ক্ষেত্র | সঞ্চিতির পরিমাণ (মিলিয়ন মেট্রিক টন) | |
| ১ | বড়পুকুরিয়া, দিনাজপুর | ৩৯০ |
| ২ | খালাসপীর, রংপুর | ৬৮৫ |
| ৩ | জামালগঞ্জ, জয়পুরহাট | ৫৪৫০ |
| ৪ | ফুলবাড়িয়া, দিনাজপুর | ৫৭২ |
| ৫ | দীঘিপাড়া, দিনাজপুর | ৮৬৫ |
| সর্বমোট | ৭৯৬২ |
উৎস: জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উন্নয়ন বিভাগ, ২০১৮
কয়লার ব্যবহার: বাংলাদেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে কয়লা ব্যবহৃত হয়। যেমন-বর্তমানে বড় পুকুরিয়া থেকে উত্তোলিত কয়লার ৬৫ শতাংশ বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে। অবশিষ্ট ৩৫ শতাংশ কয়লা ব্যবহৃত হচ্ছে ইটভাটা, কলকারখানাসহ অন্যান্য খাতে। এছাড়া কুটির শিল্প ও গৃহস্থালির কাজে কয়লা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
গ. খনিজ তেল
তেল এক ধরনের তরল হাইড্রোকার্বন বা পেট্রোলিয়ামজাত খনিজ, যা গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সম্পদের পর্যায়ভুক্ত। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় ভূতাত্ত্বিক পরিবেশ ও মৃত্তিকার গঠন কাঠামো পেট্রোলিয়াম সঞ্চিতির দিক থেকে সম্ভাবনাময়। বিশেষ করে সিলেট এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভাঁজযুক্ত এলাকা ভূবিজ্ঞানীদের মতে তেল প্রাপ্তির দিক থেকে সম্ভাবনাময়। সিলেটের হরিপুরে ১৯৫৫ সালে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হওয়ার সময় থেকেই তেল সঞ্চিতির সম্ভাবনা সম্পর্কে আশার সঞ্চার হয়। অবশেষে ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বর মাসে এই গ্যাসক্ষেত্র এলাকায় সপ্তম কূপ খননের সময় তেল সঞ্চিতির সন্ধান পাওয়া যায়। এই ক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন ৬০০ ব্যারেল হারে অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করা হয়। মৌলভিবাজার জেলার বরমচালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় তেলক্ষেত্র অবস্থিত। এ ক্ষেত্র হতে দৈনিক প্রায় ১২০০ ব্যারেল তেল উত্তোলিত হয়।
ব্যবহার: বাংলাদেশে প্রাপ্ত খনিজ তেল অশোধিত এবং নিম্নমানের। এই তেল পরিশোধন যথেষ্ট ব্যয়বহুল হওয়ায় খনি থেকে উত্তোলন অলাভজনক। শক্তি উৎপাদনের জন্য জ্বালানি হিসেবে এই তেল ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম তন্তু, রঞ্জক দ্রব্য, কীটনাশক উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে পেট্রোলিয়ামের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে।

ঘ. চুনাপাথর: এটি বাংলাদেশের অন্যতম একটি খনিজ। বাংলাদেশের সিলেট ও বগুড়া অঞ্চলে চুনাপাথর সঞ্চিতির সন্ধান পাওয়া গেছে। সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার সীমান্ত সংলগ্ন বাগলীবাজার, লালঘাট এবং টাকেরঘাট নামক স্থানে স্বল্প গভীরতায় (৬-৭৬ মিটার) চুনাপাথরের ক্ষেত্র রয়েছে। এর মধ্যে বাগলিবাজারে ১৭ মিলিয়ন, লালঘাটে ৯.৮ মিলিয়ন, টাকেরঘাটে ২.২ মিলিয়ন টন চুনাপাথর মজুদ আছে। বগুড়া অঞ্চলের জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে এবং নওগাঁর পত্নীতলায় অবস্থিত চুনাপাথর ক্ষেত্র অধিক গভীরতায় (৫১৭-৫৪৮ মিটার) অবস্থিত। খনি দুটিতে মজুদের পরিমাণ প্রায় ২৭০ মিলিয়ন টন। এছাড়া নওগাঁর বাদলগাছি উপজেলায় ২,২৭০ ফুট গভীরতার এ খনিজটির সন্ধান পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপ সেন্টমার্টিনে প্রায় ১ মিলিয়ন মেট্রিক টন চুনাপাথর সঞ্চিত রয়েছে। সূত্র: বাংলাপিডিয়া।
ব্যবহার: আমাদের দেশে চুনাপাথরের বহুবিধ ব্যবহার রয়েছে। ঘর নির্মাণে, সিমেন্ট প্রস্তুতিতে, গ্লাস ও কাগজ শিল্পে এবং সাবান ও ব্লিচিং পাউডার তৈরিতে চুনাপাথর ব্যবহৃত হয়।
ঙ. কঠিন শিলা: বাংলাদেশের রাজশাহী, বগুড়া, দিনাজপুর এবং রংপুর অনঞ্চলে কঠিন শিলাক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। দেশে কঠিন শিলার মোট মজুদের পরিমাণ ১৭১ মিলিয়ন টন, যার মধ্যে উত্তোলনযোগ্য প্রায় ১০১ মিলিয়ন টন। দিনাজপুর এবং রংপুর অঞ্চলের কঠিন শিলাক্ষেত্র স্বল্প গভীরতায় অবস্থিত বিধায় এখানকার শিলাক্ষেত্র বাণিজ্যিক উত্তোলনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। দিনাজপুরের রানীপুকুরে প্রায় ৩০ কোটি মেট্রিক টন কঠিন শিলা সঞ্চিত রয়েছে। মধ্যপাড়ায় ভূপৃষ্ঠের ১২২ থেকে ১২৫ মিটার গভীরতা পর্যন্ত পুরু এই স্তরে আনুমানিক ৪০ কোটি মেট্রিক টন কঠিন শিলা সঞ্চিত রয়েছে।
ব্যবহার: বাংলাদেশে রেলপথ ও রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং বাঁধ ও সেতু নির্মাণে কঠিন শিলা ব্যবহৃত হয়।
চ. চীনা মাটি: ময়মনসিংহের উত্তর সীমান্ত সংলগ্ন বিজয়পুরে ১৯৫০-এর দশকে শ্বেত মৃত্তিকার সন্ধান পাওয়া যায়। গারো পাহাড় সন্নিহিত এই শ্বেত মৃত্তিকার স্তর পার্শ্ববর্তী পলল গঠিত সমভূমি এলাকা থেকে কিছুটা উঁচুতে অবস্থিত। দুই থেকে সীমিত পরিসরে চার মিটার পর্যন্ত পুরু এবং এ স্তরে আনুমানিক দুই লক্ষ মেট্রিক টন শ্বেত মৃত্তিকা সঞ্চিত রয়েছে। এই ক্ষেত্র থেকে শ্বেত মৃত্তিকা উত্তোলিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের অন্যান্য কয়েকটি এলাকাতে শ্বেত মৃত্তিকার সন্ধান পাওয়া গেছে। যেমন- শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি, নওগাঁ জেলার পত্নীতলা, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলায় চীনা মাটির সন্ধান পাওয়া গেছে।
ব্যবহার: বাসনপত্র, শৌখিন দ্রব্যাদি (প্লেট, টাইলস), বৈদ্যুতিক ইনস্যুলেটর, সেনিটারি সরঞ্জাম, কাগজ ও বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক শিল্পে (সিরামিকস্) চীনামাটি ব্যবহৃত হয়।
ছ. কাঁচবালি: বাংলাদেশের সিলেট জেলার লালঘাট, শাহজিবাজার, ছাতিয়া, শেরপুরের বালিয়াজুরী ও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম এলাকায় বেলে পাথর ও কাঁচবালি সঞ্চিত রয়েছে।
ব্যবহার: বিভিন্ন ধরনের কাঁচ প্রস্তুতিতে, রাসায়নিক দ্রব্য, রং ও অগ্নিরোধক ইট তৈরিতে কাঁচবালি ব্যবহৃত হয়।
জ. তেজস্ক্রিয় বালি: কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্র সৈকতে মোনাজাইট, জিরকন, ইলমেনাইট, ব্যাটাইল প্রভৃতি তেজস্ক্রিয় খনিজ উপাদানের সন্ধান পাওয়া গেছে। সাধারণ বালি থেকে এসব ভারি খনিজ পৃথক করে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যবহার করা সম্ভব।
ব্যবহার: ইস্পাত ও সিরামিক শিল্প, আণবিক চুল্লিতে এ ধরনের খনিজের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়।
ঝ. খনিজ লবণ: বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে অন্তত তিনটি ঝরণার সন্ধান পাওয়া গেছে যেগুলোর পানি লবণাক্ত। সমুদ্রের পানি থেকে এ দেশে বহু প্রাচীনকাল থেকে খাদ্য লবণ আহরণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, চাঁদপুর, বরগুনা প্রভৃতি এলাকায় সমুদ্রের পানি থেকে লবণ আহরণ শিল্প গড়ে উঠেছে। ব্যবহার: চামড়া সংরক্ষণ, কষ্টিক সোডা প্রস্তুতিতে এবং বিভিন্ন রাসায়নিক শিল্পে এই লবণের চাহিদা রয়েছে। খাদ্য, ওষুধ, সার ও রাসায়নিক শিল্পে এবং চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে খনিজ লবণ ব্যবহৃত হয়।
ধাতব খনিজ
ঞ.লৌহ আকরিক: দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার ইসবপুর গ্রামে আগ্নেয়শিলার স্তরে লৌহ আকরিক (ম্যাগনেটাইট) সঞ্চিত রয়েছে। বিশেষ করে শিলার চিড় বা ফাটল বরাবর ভূগর্ভের ১৩০০-১৬৫০ ফুট গভীরে লোহার স্তর পাওয়া গেছে। খনিটির আয়তন প্রায় ১০ বর্গ কি.মি.। খনিটিতে প্রায় ৫০০-৬০০ মিলিয়ন টন লোহাসহ মূল্যবান পদার্থ রয়েছে। এটি বাংলাদেশের ১ম লোহার খনি। এখানকার লোহার মান ৬০ শতাংশের উপরে।
ট. গ্রানাইট: দিনাজপুর জেলার মধ্যপাড়ায় বাংলাদেশের একমাত্র গ্রানাইট পাথরের খনি অবস্থিত। ২০০৭ সাল থেকে এ পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নামনাম ২০০৭ সালে খনিটি নির্মাণ শেষ করে এবং উৎপাদনে নিয়ে আসে। খনিটি ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ আবিষ্কার করে। এখানে প্রায় এক বর্গকিলোমিটার এলাকায় অতি অল্প গভীরতায় গ্রানাইট পাথরের মজুত রয়েছে। খনিটিতে মজুদের পরিমাণ ১৭ কোটি ৪০ লাখ টন, যার প্রায় ৪২ শতাংশ উত্তোলনযোগ্য। বছরে ১৬ লাখ টন করে উত্তোলনের মাত্রা ধরে নির্মিত এই খনি থেকে ৭০ বছর ধরে উত্তোলন করা যাবে।
অবকাঠামো উন্নয়নকাজে, যেমন বৃহৎ সেতু, সড়ক ও মহাসড়ক, নদীশাসন, নদীভাঙন রোধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে এই কঠিন শিলার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
খনিজ ও শক্তি সম্পদ-মো: আবদুল কুদ্দুস স্যারে লেখা বই
Read more