hsc

পাঠ-১০: কৃষির ক্ষেত্র: ফসল উৎপাদন, পশুপালন, বনায়ন ও মৎস্য চাষ

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

13

(Sector of Agriculture: Crop Production, Herding, Afforestation and Fish Cultivation)

ইতিপূর্বে আমরা কৃষিকাজ কাকে বলে সে সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আমরা জেনেছি যে, ভূমিকর্ষণ তথা চাষ ও বীজ বপনের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনকে কৃষিকাজ বলে। তবে যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে কৃষির সংজ্ঞায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে কৃষিকাজ শুধু ফসল উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্য চাষ, পশুপালন, শস্য উৎপাদন সবকিছুতেই বিস্তৃত হয়েছে। কৃষির ক্ষেত্রসমূহকে আমরা তাই চার ভাগে ভাগ করতে পারি। যথা:

ফসল উৎপাদন: শস্য তথা ফসল উৎপাদন কৃষির প্রধানতম এবং প্রাচীনতম ক্ষেত্র। বিভিন্ন প্রকার শস্য নিয়ে কৃষির এই ক্ষেত্র গঠিত। মূলত খাদ্যশস্য এবং অর্থকরী এই দুই ধরনের ফসল নিয়ে শস্য উৎপাদন ক্ষেত্র গঠিত। বর্তমান বিশ্বে মোট আবাদি জমির অধিকাংশ ব্যবহৃত হয় খাদ্যশস্য উৎপাদনে। অবশিষ্ট জমি অর্থকরী ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। পৃথিবীর প্রধান প্রধান খাদ্যশস্যসমূহের মধ্যে ধান, গম, যব, ভুট্টা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া অর্থকরী ফসলসমূহের মধ্যে ডাল, তৈলবীজ, ইক্ষু, আলু, তামাক, পাট, রেশম, রাবার, চা প্রভৃতি প্রধান। বিশ্বের মোট কৃষিখাতের প্রায় ৬০ শতাংশ লোক শস্য উৎপাদনের সাথে জড়িত। গোটা বিশ্বের মানুষের বেঁচে থাকা এবং কৃষি বিষয়ক বাণিজ্যের প্রধানতম খাত হচ্ছে শস্য উৎপাদন খাত।

পশুপালন: পশুপালন বলতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ, উট, ঘোড়া, হাঁস, মুরগি, কুকুর, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, কুমির, সাপ প্রভৃতি পালনকে বুঝানো হয়ে থাকে। প্রাচীনকালে যাযাবর অবস্থায় মানুষ জীবিকার উদ্দেশ্যে পশুপালন করলেও বর্তমানে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পশুপালন হয়ে থাকে। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে বিশাল আকারে পশুপালন কেন্দ্র দেখতে পাওয়া যায়। যেমন- নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা। খামারে উৎপাদিত দুধ, মাংস, পশম, হাড়, চামড়া এবং ঐ সমস্ত প্রাণীর ছোট বাচ্চা, ডিম প্রভৃতি দেশের অভ্যন্তরীণ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হয়। উন্নয়নশীল দেশসমূহে সীমিত পরিসরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পশুপালন সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হয়েছে। যেমন- ভারত, কলম্বিয়া, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা।

বনায়ন: বন হতে প্রাপ্ত জ্বালানি কাঠ, বাঁশ, বেত, মোম, মধু, রাবার, প্রভৃতি নিয়ে এই কৃষিখাত গঠিত। সমগ্র বিশ্বজুড়ে কমবেশি এই খাত প্রচলিত আছে। পরিবেশ রক্ষায় বনায়ন খাতের গুরুত্ব অপরিসীম।

মৎস্য চাষ: সমগ্র বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিখাত হচ্ছে মৎস্য সম্পদ খাত। আত্মকর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, প্রাণিজ আমিষ সরবরাহ ও বৈদেশিক বাণিজ্যে এই খাত খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। মৎস্য সম্পদ দুই ধরনের হয়ে থাকে; যথা- মিঠা পানির ও সামুদ্রিক। পৃথিবীর অনেক উন্নত রাষ্ট্র; যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রাজিল, ব্রিটেন আর্জেন্টিনা, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে সরাসরি জড়িত। প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সামুদ্রিক মাছ এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। উন্নত রাষ্ট্রসহ অপেক্ষাকৃত অনুন্নত ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রসমূহ মিঠা পানির মাছ চাষের সাথে জড়িত। মিঠা পানির মাছ প্রধানত অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হয়।

কৃষির প্রকারভেদ (Classification of Agriculture)

পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী যেমন কৃষির সৃষ্টি হয়, তেমনি কৃষিক্ষেত্রও অনেক ভাগে বিভক্ত করা হয়। নিচে তা আলোচনা করা হলো-

১. প্রগাঢ় বা নিবিড় কৃষি: যে কৃষি পদ্ধতির মাধ্যমে জমিতে ক্রমাগত প্রচুর শ্রমিক নিয়োগ করে, সার দিয়ে এবং মূলধন খাটিয়ে ভূমির যতটুকু উৎপাদন করার ক্ষমতা আছে তার সবটুকু উৎপাদন করা হয় তাকে প্রগাঢ় কৃষি বলে। এ কৃষিব্যবস্থায় জমি কখনো ফেলে রাখা হয় না। যেসব দেশে লোকসংখ্যার তুলনরায় জমির পরিমাণ কম সেখানে এ ধরনের কৃষিক্ষেত্রের প্রচলন আছে। দেশসমূহ: চীন, জাপান, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ইত্যাদি দেশ।

২. ব্যাপক কৃষি: যে কৃষি ব্যবস্থায় বিস্তৃত এলাকা জুড়ে আধুনিক কৃষি যন্ত্রের সাহায্যে ব্যাপকভাবে কৃষিকাজ করা হয় তাকে ব্যাপক কৃষি বলে। যেসব অঞ্চলে লোকসংখ্যা কম অথচ বিস্তৃত কৃষিযোগ্য জমি রয়েছে সেখানে ক্রমশ বেশি জমি পরিষ্কার করে ট্রাক্টর, রিপার, হারভেস্টর, থ্রেসার, পাওয়ার টিলার প্রভৃতি আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করে ব্যপক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করা হয়। এ রীতির চাষে কম শ্রমিক ও কম মূলধন নিয়োগ করে প্রচুর ফসল উৎপাদন করা সম্ভব।
দেশসমূহ: কানাডা, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও রাশিয়া।

৩. বাগিচা কৃষি: কোনো একটি এলাকায় শস্য রোপণ করে সেখানে থেকে একটানা ১৫-২০ বছর পর্যন্ত শস্য আহরণ করাকে বাগিচা কৃষি বলে। এক্ষেত্রে বড় বড় বাগিচা তৈরি করে বাণিজ্যিক প্রয়োজনে কৃষিকাজ করা হয়।
দেশসমূহ: বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কার চা চাষ, মালয়েশিয়ার রাবার চাষ, ঘানার কোকো চাষ ইত্যাদি।

৪. মিশ্র কৃষি: যে কৃষিব্যবস্থায় একই ভূমিতে বাণিজ্যিক পশুপালন ও শস্যচাষ উভয় একই সাথে হয়ে থাকে তাকে মিশ্র কৃষি বলে। একই কৃষি খামার থেকে ধান, পাট, মেসতা, তিল, সরিষা, মরিচ, তরিতরকারি প্রভৃতি বিভিন্ন প্রকার ফসল উৎপাদন করা হয় এবং অবসর সময়ে পশুপালন ও হাঁস-মুরগি প্রতিপালন করা হয় বলে এরূপ কৃষি পদ্ধতিকে 'বহুমুখী কৃষি' নামেও অভিহিত করা হয়।
দেশসমূহ: আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং উত্তর-পশ্চিম ইউরোপীয় দেশসমূহ।

৫. স্থানান্তরিত কৃষি: যে কৃষি পদ্ধতিতে আবাদি জমি পরিবর্তনের সাথে সাথে কৃষকদের বসতিও স্থানান্তর হয় তাকে স্থানান্তরিত কৃষি বলে। এ পদ্ধতিতে অরণ্যবেষ্টিত অঞ্চল পরিষ্কার করে চাষাবাদের যোগ্য করে আবাদ করা হয়। এ কৃষিব্যবস্থায় দুই-তিন বছর অন্তর জমি বদল করা হয়।

দেশসমূহ: নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় এশিয়ার বনাঞ্চল, মধ্য আফ্রিকার কঙ্গো অববাহিকা, দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার অরণ্য এলাকা এবং বাংলাদেশের ও মায়ানমারের পাহাড়ি অঞ্চলেও এই চাষ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।

৬. সবজি চাষ বা ট্রাক ফার্মিং: বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সবজি চাষকে ট্রাক ফার্মিং বলে। একে Market Gardening-ও বলা হয়। সবজি দ্রুত পচনশীল দ্রব্য হওয়ায় সাধারণত কোনো শহরের নিকটেই এই ধরনের চাষাবাদ হয়ে থাকে, যাতে উৎপাদিত পণ্যের দ্রুত বিক্রয় নিশ্চিত করা যায়।
দেশসমূহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় উৎপাদিত সবজি নিউইয়র্কে বাজারজাত করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও উত্তর-পশ্চিম ইউরোপেরও এই ধরনের চাষাবাদ দেখা যায়।

কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...