hsc

পাঠ-৮: সার শিল্প

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

14

(Fertilizer Industry)

কৃষিপ্রধান দেশে কৃষির উন্নতির জন্য সার অতি প্রয়োজনীয় উপকরণ। কেননা কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য জমিতে সার প্রয়োগ করা জরুরি। বাংলাদেশে জৈব সারের সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। এক্ষেত্রে কৃত্রিম সারের ব্যবহার অনস্বীকার্য। বর্তমানে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য রাসায়নিক সারের ব্যবহার ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২১ লক্ষ টন সারের প্রয়োজন।

সার শিল্প স্থানীয়করণের কারণ:

১. পর্যাপ্ত কাঁচামাল: প্রাকৃতিক গ্যাস সার শিল্পের অন্যতম কাঁচামাল, যা দেশেই উত্তোলিত হচ্ছে;
২. অনুকূল জলবায়ু: বাংলাদেশের জলবায়ু সার শিল্পের উপযোগী;
৩. শক্তি সম্পদের সহজলভ্যতা: প্রাকৃতিক গ্যাস বাংলাদেশের সার শিল্প বিকাশে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে;

৪. সার শিল্পের সরকারি ভর্তুকি ও মূলধন সরবরাহ;
৫. ব্যাপক অভ্যন্তরীণ চাহিদা;
৬. সুলভ ও তুলনামূলক সস্তা শ্রমিক;
৭. যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন।

সার শিল্পের উৎপাদন: স্বাধীনতার পূর্বে বাংলাদেশে ফেঞ্জুগঞ্জ এবং ঘোড়াশাল সার কারখানায় সার উৎপাদনের পরিমাণ খুবই কম ছিল। ১৯৭১ সালের পর অনেক সার কারখানা গড়ে উঠে। এই শিল্পের উৎপাদন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানায় বার্ষিক অ্যামোনিয়াম সালফেট উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১২,৫০০ টন এবং ইউরিয়া ১.১৭লক্ষ টন। ঘোড়াশাল সার কারখানায় বার্ষিক ইউরিয়া উৎপাদনের পরিমাণ ৩ লক্ষ ৪০ হাজার মেট্রিক টন। ২০১৭-২০১৮ সালে এই উৎপাদনের পরিমাণ ৮,৫৯,৩৫৩ মেট্রিক টন।

সারণি-৬.৭: বাংলাদেশের সার উৎপাদন (মেট্রিক টন হিসেবে)

সালউৎপাদন
২০১৪-২০১৫১০,২৮,১৫৭
২০১৫-২০১৬১,০১০,৪৬৬
২০১৬-২০১৭১,২২০,৮৯০
২০১৭-১৮৮,৫৯,৩৫৩

উৎস: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুারো; সূত্র: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৯, পৃষ্ঠা-২৪৮

সার শিল্পের বণ্টন: বাংলাদেশের সার শিল্পের বণ্টন নিচে বিভাগ অনুসারে দেখানো হলো:

১. ঢাকা বিভাগ: ঢাকা বিভাগে নরসিংদীর ঘোড়াশাল সার কারখানা, পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা, জামালপুরের সরিষাবাড়ি থানার তারাকান্দিতে যমুনা সার কারখানা অবস্থিত। এদের মধ্যে ঘোড়াশাল সার কারখানা ১৯৭০ সালে নির্মিত হলেও এর উৎপাদন শুরু হয় ১৯৭২ সাল থেকে। পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা ১৯৮১ এবং যমুনা সার কারখানা ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই তিনটি সার কারখানাতে কাঁচামাল হিসেবে তিতাস গ্যাস ব্যবহৃত হয়।

২. চট্টগ্রাম বিভাগ: এই বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানা, চট্টগ্রামের ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) সার কারখানা ও চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা গড়ে উঠেছে। আশুগঞ্জ সার কারখানা ১৯৮১ সালে, টিএসপি সার কারখানা ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সার কারখানাগুলোর কাঁচামাল হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হয়।

৩. সিলেট বিভাগ: এই বিভাগের সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা, অ্যামোনিয়া সালফেট কারখানা, হবিগঞ্জ জেলার হবিগঞ্জ সার কারখানা উল্লেখযোগ্য। ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় যা দেশের প্রথম।

এখানে কাঁচামাল হিসেবে হরিপুরের প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করা হয়। অ্যামোনিয়াম সালফেট কারখানা ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানার উদ্বৃত্ত অ্যামোনিয়া কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে। হবিগঞ্জ সার কারখানা হবিগঞ্জের প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে সার উৎপাদন করে।

সারণি-৬.৮: বাংলাদেশের সারকারখানায় উৎপাদিত সার ও উৎপাদন ২০১৯

বাংলাদেশের সার কারখানাবার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা (হাজার মেট্রিক টন)
নামউৎপাদিত সার
ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি লিমিটেডইউরিয়া৪৭০
ট্রিপল সুপার ফসফেট কমপ্লেক্স লিমিটেডSSP, ASP১০০
কাফকো (কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কো. লিমিটেড)ইউরিয়া-
আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডইউরিয়া৫২৮
পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি লিমিটেডইউরিয়া৯৫
চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডইউরিয়া৫৬১
যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডইউরিয়া৫৬১
ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডDAP৫২৮
শাহজালাল সার কারখানা লিমিটেডইউরিয়া৫৮১

৪. খুলনা বিভাগ: খুলনা বিভাগে খুলনা ট্রিপল সুপার ফসফেট কারখানায় কাঁচামাল হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হয়। এই কারখানায় টিএসপি ও নাইট্রোজেন উৎপাদন করা হয়।

সারের বাণিজ্য: বাংলাদেশ ইউরিয়া সার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তবে টিএসপি ও অ্যামোনিয়াম উৎপাদন দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা অপেক্ষা কম। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পরও দেশের বাইরে ইউরিয়া সার রপ্তানি করতে সক্ষম। অন্যদিকে, টিএসপি, অ্যামোনিয়াম ও এমপি আমাদেরকে বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশ' অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৮ অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্ববাজার থেকে ১১১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সার আমদানি করে।

সারণি-৬.৯: বাংলাদেশের সার আমদানি

সালপরিমাণ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)
২০১১-২০১২১৩৮১
২০১২-২০১৩১১২৮
২০১৩-২০১৪১০২৬
২০১৪-২০১৫১৩৩৯
২০১৫-২০১৬১১১৭
২০১৬-২০১৭৭৩৭
২০১৭-২০১৮১০০৬

উৎস: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৯, পৃষ্ঠা-৩০৫

সার শিল্পের সমস্যা:

১. কাঁচামালের ঘাটতি: সার শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাবে অধিকাংশ কারখানা ক্ষমতা অনুযায়ী সার উৎপাদন করতে পারে না।
২. শক্তি সম্পদের অপ্রতুলতা: কয়লা, খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের অপ্রতুলতার দরুন নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।
৩. যন্ত্রপাতির অভাব: প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশের অভাব সার শিল্পের অন্যতম সমস্যা।
৪. দক্ষ শ্রমিকের অভাব: এ শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকের অধিকাংশ অজ্ঞ, অশিক্ষিত এবং অদক্ষ।
৫. মূলধনের অভাব: দেশে মূলধনের অভাবের কারণে বিদেশ থেকে সময়মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক দ্রব্য আমদানি করা সম্ভব হয় না।
৬. বিবিধ কারণ: প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতা, অব্যবস্থাপনা, সততার অভাব, দুর্নীতি, সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাব প্রভৃতি সার শিল্পের উন্নতিতে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে।

সার শিল্পের সমস্যার সমাধান: বাংলাদেশের সার শিল্পের সমস্যাসমূহের সম্ভাব্য সমাধান হলো:

১. প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহের ব্যবস্থা;
২. সার শিল্পে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ;
৩. প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ;
৪. প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ শ্রমিক নিয়োগ;
৫. দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়ন;
৬. উন্নত যোগাযোগ ও যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ;
৭. সঠিক শিল্পনীতি প্রণয়ন।

উপরের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারলে বাংলাদেশের সার শিল্পের সম্ভাবনা আরো উজ্জ্বল হবে।

খনিজ ও শক্তি সম্পদ-মো: আবদুল কুদ্দুস স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...