(Crops by Season and Climate of Bangladesh)
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। তবে এদেশের কৃষি এখনো বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিকশিত হয়নি। সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এতে করে ফলন বাড়লেও এগুলোর অবৈজ্ঞানিক ব্যবহারে পরিবেশ ও খাদ্য দূষণ বেড়েছে। অবশ্য প্রত্যন্ত অঞ্চলে (পাহাড়ি ও চর এলাকায়) এখনও সনাতন পদ্ধতির চাষাবাদ চালু আছে।
বৃষ্টিপাতের পানি এদেশের কৃষির প্রধানতম অবলম্বন। সময়মতো বৃষ্টিপাত না হলে, অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলে অথবা অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর অন্তর্গত। বাংলাদেশের উৎপাদিত কৃষি ফসলসমূহ এদেশের জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে বিন্যস্ত হয়।
বাংলাদেশের ঋতু: বাংলাদেশকে বলা হয় ষড়ঋতুর দেশ। তবে জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের বিচারে বর্তমানে ছয়টি ঋতু খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না। প্রকৃত অর্থে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণের উপর নির্ভর করে এদেশে সুষ্পষ্টভাবে তিনটি ঋতু পরিলক্ষিত হয়। যথা:
ক. গ্রীষ্মকাল (মার্চ মে); খ. বর্ষাকাল (জুন অক্টোবর) এবং গ. শীতকাল (নভেম্বর ফেব্রুয়ারি)।
বাংলাদেশের প্রধান প্রধান ঋতু ও ঋতুভিত্তিক উৎপাদিত ফসল
ক. গ্রীষ্মকাল: বাংলাদেশে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল হিসেবে পরিচিত। এ সময় নিচের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়-
i. তাপমাত্রা খুব বেশি থাকে, ii. সর্বোচ্চ তাপমাত্রা যথাক্রমে ৩৪০ ও ২১° সে., iii. গড় তাপমাত্রা ২৮° সে., iv. এপ্রিল উষ্ণতম মাস, v. গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৫১ সে.মি., vi. পানির অভাবে মাঠ ঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যায়, vii. মাঝে মাঝে কালবৈশাখী ঝড় হয়, viii. মোট বৃষ্টিপাতের ২০% গ্রীষ্মকালে হয়ে থাকে।
উৎপাদিত কৃষি ফসল: বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালে উৎপাদিত প্রধান কৃষি ফসল হচ্ছে- ধান, পাট, আখ, সবজি প্রভৃতি।
খ. বর্ষাকাল: জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত সময়কালকে বাংলাদেশে বর্ষাকাল বলা হয়। বাংলাদেশে মোট বৃষ্টিপাতের ৮০ শতাংশ এই সময় সংঘটিত হয়। বর্ষাকালের বৈশিষ্ট্যসমূহ হচ্ছে-i. গড় তাপমাত্রা ২৭০ সে., ii. শৈলোৎক্ষেপ প্রক্রিয়ায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, iii. বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়ে
যায়, iv. বর্ষাকালে প্রায়ই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে অতিবর্ষণে বন্যার সৃষ্টি হয়। উৎপাদিত কৃষি ফসল: বর্ষাকালে আউশ ধান, পাট, মিষ্টি কুমড়া, পুঁইশাক, বাতাবিলেবু, কাকরোল, বিভিন্ন প্রকার শাকসবজি পাওয়া যায়।
গ. শীতকাল: বাংলাদেশে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময়কালকে শীতকাল হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তবে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাস ব্যতীত শীতের প্রাদুর্ভাব খুব বেশি লক্ষ করা যায় না। এ সময় আর যেসব বৈশিষ্ট্য দেখা যায় সেগুলো হচ্ছে-
i. বৃষ্টিপাত প্রায় হয় না বললেই চলে (১০ সেন্টিমিটারের কম), ii. উত্তর-পূর্ব দিক থেকে মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়, iii. গড় তাপমাত্রা থাকে ১৭.৭° সে., iv. বায়ুপ্রবাহ শুষ্ক ও আর্দ্রতাহীন থাকে।
উৎপাদিত কৃষি ফসল: শীতকালে বাংলাদেশে উৎপাদিত ফসলের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার ডাল, তেলবীজ, আলু, পিঁয়াজ, ধনিয়া, রসুন, তুলা প্রভৃতি প্রধান।
| কৃষিকাজের নিয়ামক | কৃষিকাজ মানুষের আদিমতম পেশা। ভূমিকর্ষণ বা চাষের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করাকে কৃষি বলে। কৃষিকাজ জলবায়ুর ওপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল। জলবায়ুর উপাদানসমূহ হচ্ছে- তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ প্রভৃতি। পলি সঞ্চয়ের কারণে নদ-নদীর উভয় তীর কৃষি চাষের জন্য উত্তম। উর্বর মৃত্তিকায় ভালো ফসল জন্মে থাকে। কৃষিকাজের জন্য ট্রাক্টর, উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ব্যয় প্রভৃতির জন্য প্রচুর অর্থ প্রয়োজন হয়। এছাড়া পৃথিবীর যে অঞ্চলে যে পণ্যের চাহিদা বা বাজার থাকে, সে অঞ্চলে সেই ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। কোনো স্থানে জনসংখ্যা বেশি হলে কৃষিপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। একটি দেশের কৃষিক্ষেত্রের উন্নয়ন ও প্রসার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতির ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে। |
| ধান | ধান পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে পৃথিবীর অধিকাংশ ধান উৎপন্ন হয়। উচ্চভূমি অপেক্ষা সমতল ও নিম্নভূমি ধান চাষের উপযোগী। এতে বার্ষিক ১০০ ২৫০ সে.মি. বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন হয়। ধানবীজের অঙ্কুরোদগমের জন্য ১৬° সে. অপেক্ষা অধিক তাপমাত্রা প্রয়োজন। পলিযুক্ত উর্বর এঁটেল-দোঁআশ মাটি ধান চাষের সর্বাধিক উপযোগী। তাছাড়া স্বল্প বৃষ্টিপাত বিশিষ্ট বা শুষ্ক অঞ্চলে নদী থেকে সেচের মাধ্যমে ধানের চাষ হয়। ধান উৎপাদনে চীন বিশ্বে প্রথম। চীনের হুনান প্রদেশে প্রচুর ধান উৎপন্ন হয় বলে একে 'ধানের আধার' বলা হয়। উন্নয়নশীল দেশে ধান চাষের জন্য বিরাজমান সমস্যাগুলো হলো- জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মূলধনের অভাব, মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীলতা, অদক্ষ শ্রমিক, উন্নত বীজের অভাব, সার ও পানিসেচের অভাব, অনুন্নত পরিবহন ও যাতায়াত ব্যবস্থা ইত্যাদি। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদসহ উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক ও সেচের ব্যবস্থা করা একান্ত প্রয়োজন। |
| গম | গম এক প্রকার দানাদার খাদ্যশস্য। গম নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলের ফসল। উত্তর আমেরিকার প্রেইরি তৃণভূমির নদী অববাহিকা 'পৃথিবীর রুটির ঝুড়ি' নামে পরিচিত। গম চাষের জন্য তাপমাত্রা ১৫০-২০০ সে. এবং বার্ষিক গড়ে ৩০-১০০ সে.মি. বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। কর্দমময় দোআঁশ মৃত্তিকা গম চাষের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট। চীন পৃথিবীর শীর্ষ গম উৎপাদনকারী দেশ। এদেশে শীত ও বসন্তকালীন উভয় প্রকার গম চাষ হয়। বর্তমান বিশ্বের মোট উৎপাদিত গমের প্রায় ১৬ শতাংশ বিশ্ববাজারে প্রবেশ করে। সাধারণত উন্নত দেশগুলো গম রপ্তানি করে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো তা আমদানি করে। |
| আখ | আখ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের ফসল। ভারতীয় উপমহাদেশের মৌসুমি অঞ্চল আখের আদিভূমি। চুন, পটাশ ও নাইট্রোজেনযুক্ত মৃত্তিকা ও লাভা গঠিত কৃষ্ণ মৃত্তিকা এবং পানি জমে থাকে না এরূপ উঁচু ও ঢালু জমিতে আখ চাষ ভালো হয়। এতে ১৯০-২৭° সে. তাপমাত্রা এবং ১২৫-১৭৫ সে.মি. বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। আখ উৎপাদনে ব্রাজিল বিশ্বে প্রথম। উন্নয়নশীল বিশ্ব নানা সমস্যার কারণে আখ চাষে তেমন উন্নতি লাভ করতে পারে নি। আখ চাষের সমস্যাগুলো সুষ্ঠু সমাধান করতে পারলে উন্নয়নশীল বিশ্বে আখের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে। |
| চা | চা পৃথিবীর জনপ্রিয় পানীয়। এটি ক্রান্তীয় অঞ্চলের উদ্ভিদ। ভারতের আসাম এবং চীনের পার্বত্য এলাকা চায়ের আদিভূমি। সমুদ্রপৃষ্ঠের ৬০০ থেকে ১২০০ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট পার্বত্য ঢালু অঞ্চলে চা বাগান গড়ে তোলা হয়। উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ ও অধিক আর্দ্র জলবায়ু চা চাষের জন্য উপযোগী। নাইট্রোজেনযুক্ত কিছুটা অম্লধর্মী, লৌহ মিশ্রিত এবং আগ্নেয় ভস্মযুক্ত মৃত্তিকায় চা গাছ জন্মাতে পারে। এশিয়া তথা বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় চা উৎপাদনকারী দেশ চীন। যুক্তরাজ্য চায়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। |
| কৃষির ক্ষেত্র | ভূমিকর্ষণ বা চাষ করার মাধ্যমে ফসল উৎপাদনকে কৃষিকাজ বলে। শস্য উৎপাদন কৃষির প্রধানতম ক্ষেত্র। বিশ্বের মোট কৃষিখাতের প্রায় ৬০ শতাংশ লোক শস্য উৎপাদনের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। উন্নয়নশীল দেশসমূহে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পশুপালন শুরু হয়েছে। বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষি খাত হচ্ছে মৎস্য সম্পদ। প্রাণীজ আমিষের চাহিদা পূরণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সামুদ্রিক মাছ এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। মিঠা পানির মাছ প্রধানত অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হয়। |
| কৃষি সংস্থা | স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বাংলাদেশ সরকার কৃষি বিষয়ক কর্মকাণ্ডকে প্রাধান্য দিয়ে কৃষিবিষয়ক উচ্চতর গবেষণার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- SRDI, BARC, BARI, BRRI, BADC, BAEC, BJRI, AIS, বাংলাদেশের কৃষি ও ভেটেনারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ প্রভৃতি। মূলত কৃষি বিষয়ক ফসল ও বীজ সম্পর্কিত গবেষণা, পরামর্শ প্রদান, রোগ নির্ণয় ও দমন কৌশল উদ্ভাবন, নতুন জাত উদ্ভাবন প্রভৃতি ক্ষেত্রে এসব সংস্থাগুলো অবদান রয়েছে। |
| কৃষি প্রযুক্তি | কৃষিকাজ জলবায়ুর উপর নির্ভরশীল। তবে বর্তমানে ব্যাপকভাবে না হলেও সীমিতি পরিসার আমাদের কৃষকেরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লিব পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তারা জমি চাষে গরুর পরিবর্তে ট্রাক্টর বা কলের লাজাল, পাওয়ার টিলার ব্যবহার করছেন। সেচের ক্ষেত্রে ডিজেল বা বিদ্যুৎ চালিত সেচযন্ত্র, বীজ বপনে ড্রামসিডার, ফসল কাটার ক্ষেত্রে হারভেস্টার মেশিন, ফসল সংরক্ষণে অত্যাধুনিক হিমাগার ব্যবহার করছেন। ফলে উৎপাদন বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। |
| ঋতুভিত্তিক ফসল | বাংলাদেশের কৃষিকে 'মৌসুমি বায়ুর জুয়া খেলা' বলা হয়। এ দেশের কৃষিকে ঋতুভিত্তিক গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীতকালীন এই তিনভাগে ভাগ করা যায়। গ্রীষ্মকালে (মার্চ-মে) উৎপাদিত ফসলগুলো হলো- ধান, আখ, পাট, বিভিন্ন সবজি। বর্ষাকালীন (জুন-অক্টোবর) ফসলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- আউশ ধান, পাট, মিষ্টি কুমড়া, পুঁইশাক, বাতাবিলেবু। আর শীতকালে (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি) উৎপাদিত ফসল হলো-ডাল, তেলবীজ, আলু, পিয়াজ, রসুন, তুলা, বিভিন্ন শাক ও সবজি। |
কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
Read more