hsc

পাঠ-১৪: বাংলাদেশের কৃষি ও আধুনিক প্রযুক্তি

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

14

(Agriculture of Bangladesh and Modern Technology)

কৃষি বাংলাদেশের মানুষের প্রধান উপজীবিকা হলেও এদেশের কৃষি এখনো প্রকৃতি নির্ভর। প্রাচীন পদ্ধতিতে চাষাবাদ, সেচের জন্য বৃষ্টির ওপর অতি নির্ভরতা, ফসল আহরণ ও মাড়াই এ শ্রমিক নির্ভরতা, সনাতন সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রভৃতি কারণে আমাদের দেশে একর প্রতি ফসল উৎপাদন ক্ষমতা অনেক কম। এর ফলে আমরা প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারিনি। কিন্তু অন্যান্য উন্নত দেশের ন্যায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সহায়তায় নতুন নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন, আধুনিক পদ্ধতিতে সেচ ও চাষাবাদ, স্বয়ংক্রিয় ফসল মাড়াইকরণ যন্ত্র প্রভৃতি ব্যবহার করতে পারলে নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত ফসল রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হতো। এর ফলে কৃষকদের পাশাপাশি দেশবাসী আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারতো। তবে আশার কথা এই যে, স্বাধীনতা লাভের পর থেকে আমাদের কৃষিক্ষেত্রেও প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। ব্যাপকভাবে না হলেও সীমিত পরিসরে আমাদের কৃষকেরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

কৃষি ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার:

ক. জমি চাষে প্রযুক্তি: পূর্বে আমাদের দেশে গরু ও লাঙ্গলের সাহায্যে জমি চাষাবাদ করা হতো। এতে সময় যেমন বেশি লাগত, তেমনি ভালোভাবে চাষ করা যেত না। কিন্তু বর্তমানে উন্নতমানের 'ট্রাক্টর' বা কলের লাঙ্গলের সাহায্যে একদিনে অনেক জমি কর্ষণ করা যায়। ছোট ছোট খণ্ডের জমিতে বা বর্ষাকালে কাদা পানিতে কর্ষণ করার জন্য ছোট আকারের 'পাওয়ার টিলার' মেশিন বিশেষ উপযোগী। এই সমস্ত যন্ত্রের ব্যবহার কৃষিকাজকে অনেক সহজ ও সমৃদ্ধ করেছে।

খ. সেচের কাজে প্রযুক্তি: কিছুদিন পূর্বেও আমাদের দেশে জমিতে পানিসেচের একমাত্র উৎস ছিল বৃষ্টির পানি। । সেচ কৃষিকাজে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেসময় কোনো বছরে যদি কম বা দেরিতে বৃষ্টিপাত হতো, তাহলে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতো। কিন্তু বর্তমানে কৃষকগণ যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক বিভিন্ন সেচযন্ত্র ব্যবহার করে জমিতে সময়মতো পানি দিয়ে থাকেন। ডিজেল এবং বিদ্যুৎ চালিত এ সমস্ত সেচযন্ত্র মাটির গভীর থেকে পানি উত্তোলন করে কৃষি জমিতে সরবরাহ করে থাকে। ফলে বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত পানির নিশ্চয়তা বিধান করতে পারায় প্রচুর ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।

গ. বীজ বপনে প্রযুক্তি: বীজ বপনের জন্য বর্তমানে 'ড্রামসিডার' নামক আধুনিক যন্ত্র আবিষ্কার হয়েছে। এই যন্ত্রের আবিষ্কারক বাংলাদেশ। ড্রামসিডারের সাহায্যে অল্প পরিশ্রমে বিস্তীর্ণ জমিতে অত্যন্ত দ্রুত সারিবদ্ধ ও সুনিপুণভাবে বীজ বপন করা যায়। বর্তমানে ধানের চারা রোপনের ক্ষেত্রে 'রাইস ট্রান্সপ্লান্টার' ব্যবহৃত হয়। এর মাধ্যমে এক একর জমিতে চারা রোপন করতে সময় লাগে দুই ঘণ্টা। কৃষিতে এসব যন্ত্রের ব্যবহার আমাদের মূল্যবান সময়, শ্রম এবং অর্থের অপচয় রোধ করে।

ঘ. সার প্রয়োগে প্রযুক্তি: ফসলের পুষ্টি এবং দ্রুত বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করা আবশ্যক। শ্রমিকের দ্বারা হাতে হাতে সার প্রয়োগ করা সময়সাপেক্ষ এবং এর দ্বারা জমির সর্বত্র সার সুষমভাবে পড়ে না। এই অসুবিধা দূর করতে আমাদের দেশে সীমিত পরিসরে সার প্রয়োগের মেশিন ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই মেশিনের দ্বারা দ্রুত এবং জমির সর্বত্র সুষমভাবে সার ছিটানো সম্ভব।

ঙ. কীটনাশক প্রয়োগে প্রযুক্তি: সময়মতো কীটপতঙ্গ দমন করতে না পারলে ফসলের একটা বড় অংশ বিনষ্ট হয়। হাত দিয়ে কীটনাশক ব্যবহার করা সময় সাপেক্ষ এবং স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বর্তমানে আমাদের দেশে ছোট ছোট দেশীয় মেশিনের সাহায্যে কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়।

চ. ফসল সংগ্রহে প্রযুক্তি: সময়মতো জমি থেকে ফসল সংগ্রহ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকের মাধ্যমে ফসল কাটা বা সংগ্রহ করা ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। এজন্য বর্তমানে আমাদের দেশের কোনো কোনো স্থানে জমি থেকে ফসল সংগ্রহে 'হারভেস্টার মেশিন' এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই মেশিনের সাহায্যে অল্প সময়ে কয়েক একর জমির ফসল সংগ্রহ করা যায়। তবে সমস্যা হচ্ছে এই মেশিনের মাধ্যমে কেবল ধান, গম প্রভৃতি দানাদার জাতীয় ফসল সংগ্রহ করা যায়। পাট বা এ ধরনের তত্ত্ব জাতীয় ফসল সংগ্রহ করতে এবং ক্ষুদ্রাকারের জমিতে এই যন্ত্র ব্যবহার করা যায় না।

ছ. ফসল মাড়াইয়ে প্রযুক্তি: জমি থেকে ধান বা অন্যান্য ফসল বাড়িতে আনার পর মাড়াইয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের
শ্যালো মেশিন এবং হস্তচালিত মাড়াইকরণ মেশিন ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে 'কম্বাইন্ড হারভেস্টার' এর মাধ্যমে কৃষিখামারেই ধান কাটা থেকে শুরু করে ধান মাড়াই, ঝাড়া হয়ে একদম বস্তাবন্দী হয়ে বিক্রির জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। এতে সময় লাগে একর প্রতি মাত্র দেয় ঘণ্টা। স্থানীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এ সমস্ত মেশিন দামে সস্তা হওয়ায় অনেক কৃষক এটি ব্যবহার করেন।

জ. ফসল সংরক্ষণে প্রযুক্তি: পূর্বে যদি কোনো বছর কোনো একটি ফসলের ব্যাপক ফলন হতো তবে যথাযথ সংরক্ষণাগারের অভাবে ঐ ফসল সংরক্ষণ করা সম্ভব হতো না। ফলে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রায় প্রতি জেলায় আলু ও অন্যান্য পচনশীল পণ্য সংরক্ষণের জন্য অত্যাধুনিক 'হিমাগার' নির্মাণ করা হয়েছে। এই সমস্ত সংরক্ষণাগারে কৃষকগণ উদ্বৃত্ত ফসল নির্দিষ্ট ফি এর বিনিময়ে সংরক্ষণ করতে পারেন এবং প্রয়োজনে যেকোনো সময়ে বাজারজাত করতে পারেন। সংরক্ষণ সুবিধার ফলে একদিকে যেমন ফসলের অপচয় রোধ করা সম্ভব হয়েছে, অপরদিকে কৃষি পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় মূল্যহ্রাস পেয়েছে।

ঝ. পরিবহনে প্রযুক্তি: একসময় ছিল যখন বাংলাদেশে যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থা ভালো ছিল না। ফলে দেশের এক প্রান্তে উৎপাদিত পণ্য অন্য প্রান্তে সময়মতো পৌঁছানো সম্ভব হতো না। যেমন- উত্তরবঙ্গে উৎপাদিত কাঁচা শাকসবজি দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পৌছাতে অনেক সময় লাগতো। এর ফলে একদিকে পচনশীল পণ্যদ্রব্য পচে নষ্ট হতো; অন্যদিকে, সময়মতো পণ্যের সরবরাহ না থাকায় সম্পদের সুষম বণ্টন সম্ভব হতো না। কিন্তু বর্তমানে দেশের সর্বত্র রাস্তাঘাট উন্নত হওয়ায় এবং আধুনিক ও দ্রুতগতির যানবাহন থাকায় দেশের এক প্রান্তে উৎপাদিত পণ্য খুব অল্প সময়ে অন্য প্রান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়। এর ফলে দেশের সর্বত্র পণ্যের সুষম সরবরাহ সম্ভব হয় এবং কৃষক ভালো মূল্য পায়।

ঞ. গণমাধ্যম প্রযুক্তি: আজকাল দেশের সর্বত্র রেডিও, ডিশ সংযোগসহ টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, সংবাদপত্র প্রভৃতি পাওয়া যায়। ফলে দেশ-বিদেশের যেকোনো খবর দেশের যেকোনো প্রান্তের মানুষের কাছে মুহূর্তে পৌছানো সম্ভব হয়। এর ফলে দেশে নতুন জাতের কোনো ফসলের আবিষ্কার হলো কি না, উদ্ভিদ ও ফসলের রোগ, সেগুলোর প্রতিষেধক, নতুন চাষাবাদ পদ্ধতি, বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা, কোথায় পণ্যের কী দাম প্রভৃতি সম্পর্কে কৃষক জানতে পারে এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে পারে। কৃষকদের চাহিদার প্রতি লক্ষ রেখে এই সমস্ত গণমাধ্যমগুলোতে পৃথকভাবে কৃষিবিষয়ক খবর প্রকাশ করা হয়।

কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...