(Positive Factors of River and Sea Port Establishment in Bangladesh)বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। অসংখ্য খাল-বিল,
নদী-নালা এদেশে জালের মতো ছড়িয়ে আছে। ভূতাত্ত্বিক গঠনগত দিক দিয়ে বলা যায় যে, বাংলাদেশ উত্তর হতে দক্ষিণ দিকে ক্রমান্বয়ে ঢালু এবং নদ-নদীগুলো সেভাবেই প্রবাহিত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে সাত শতাধিক নদ-নদী ছাড়াও দেশের দক্ষিণে রয়েছে দিগন্ত বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর। সাগর ও নদীর অপূর্ব মেলবন্ধনের কারণে বাংলাদেশে একদিকে যেমন ব্যস্ত সমুদ্র বন্দর গড়ে উঠেছে অপরদিকে এদেশের নদীগুলোর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে অসংখ্য নদী বন্দর। বর্তমানে এদেশে তিনটি সমুদ্র বন্দর ছাড়াও ৩৩টি নদী বন্দর বিদ্যমান আছে।

ক. অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ: বাংলাদেশে নৌ ও সমুদ্রবন্দর গড়ে ওঠার প্রধান অনুকূল পরিবেশ হচ্ছে প্রাকৃতিক।
এদেশে সমুদ্র বন্দর গড়ে ওঠার জন্য অনুকূল ভৌগোলিক অবস্থান, পশ্চাৎভূমি, সমুদ্র তলদেশের ভূপ্রকৃতি, ভূতাত্ত্বিক গঠন, নদ-নদীর সংখ্যা প্রভৃতি বিষয়সমূহ ধনাত্মক নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। নিচে এই সমস্ত অনুকূল পরিবেশ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:-
১. ভৌগোলিক অবস্থান: এদেশে নদীও সমুদ্র বন্দর গড়ে ওঠার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটকের ভূমিকা
পালন করছে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব ও পশ্চিম দিকে জুড়ে স্থলভাগ দ্বারা বেষ্টিত থাকলেও সমগ্র দক্ষিণদিক জুড়ে দিগন্ত বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর অবস্থিত। ফলে এদেশে একাধিক সমুদ্র বন্দর গড়ে ওঠার চমৎকার প্রাকৃতিক সুযোগ রয়েছে।
২. পশ্চাৎভূমি: বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত। উত্তরে নেপালের কোল ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকা হিমালয় পর্বত, পূর্বে ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, অরুণাচল প্রদেশ, মিজোরাম প্রভৃতি প্রদেশ নিয়ে সুবিস্তৃত পশ্চাৎভূমির অবস্থান হওয়ায় এদেশে সমুদ্র বন্দর গড়ে উঠেছে। উল্লিখিত দেশগুলোর সাথে রাজনৈতিক সমঝোতা হলে তারা আমাদের বন্দর ব্যবহার করতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশে সমুদ্র বন্দরের ব্যাপ্তি অনেক বৃদ্ধি পাবে।
যেকোনো দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসারের জন্য প্রয়োজন বন্দরের উন্নতি। এ উন্নতি নির্ভর করে পশ্চাৎভূমির উপর। বন্দরের উন্নতি পশ্চাৎভূমির আয়তন, জনবসতির ঘনত্ব এবং যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল।
পশ্চাৎভূমির আয়তন: পণ্যদ্রব্যের উৎপাদন নির্ভর করে পশ্চাৎভূমির আয়তনের উপর। কারণ বেশি আয়তনের পশ্চাৎভূমিতে পণ্যদ্রব্যও অধিক উৎপন্ন হয়। যা বন্দরের রপ্তানি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
পশ্চাৎভূমির বসতি: বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর দুটির ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে। কারণ ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের জনগণের চাহিদা মিটাতে প্রচুর পরিমাণে পণ্যদ্রব্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
পশ্চাৎভূমির যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা: বন্দরে উন্নতি নির্ভর করে পশ্চাৎভূমির উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর। পশ্চাৎভূমির উন্নত যোগাযোগ এবং পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে পশ্চাৎভূমির উৎপাদিত পণ্যদ্রব্য ও কাঁচামাল সহজেই বন্দরের মাধ্যমে রপ্তানি ও আমদানিকৃত পণ্যদ্রব্য সহজেই দেশের বিভিন্ন স্থানে বহন করা যায়।
৩. বিস্তৃত মহীসোপান: বাংলাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত বঙ্গোপসাগরের তলদেশের ভূমিরূপ এমন যে, এখানে সুবিস্তৃত মহীসোপান অঞ্চল রয়েছে যা বন্দর গড়ে ওঠার পক্ষে সহায়ক। অনুকূল অবস্থার কারণে এদেশে একাধিক সমুদ্র বন্দর গড়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
৪. ভূতাত্ত্বিক কারণ: ভূতাত্ত্বিক গঠনগত কারণে বাংলাদেশ সহ গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ উত্তর হতে দক্ষিণ দিকে ক্রমান্বয়ে ঢালু হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। একই কারণে বাংলাদেশের উপর দিয়ে অসংখ্য নদী সমুদ্রে গিয়ে পতিত হয়েছে। এই সমস্ত নদীর তীরে নৌবন্দর গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে নদীবন্দর গড়ে ওঠার জন্যও চমৎকার ভৌগোলিক পরিবেশ বিদ্যমান। নদীমাতৃক এ দেশে অসংখ্য নদী জালের মতো গোটা বাংলাদেশকে জড়িয়ে আছে। দেশে বর্তমানে প্রায় সাত শতাধিক নদী রয়েছে। নদ-নদীর সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে এদেশে স্বাভাবিকভাবেই অনেক নৌবন্দর গড়ে উঠেছে। আমরা যদি আমাদের নদ নদী সমূহকে অধিক পরিকল্পিত ও সচেতনভাবে ব্যবহার করতে পারতাম তবে এদেশে অনেক নদী নাব্যতা হারাত না এবং আমাদের দেশে আরো অধিক নৌবন্দর গড়ে উঠতে পারত।
খ. সামাজিক পরিবেশ/অপ্রাকৃতিক পরিবেশ: বাংলাদেশে সমুদ্র ও নৌ বন্দর গড়ে ওঠার জন্য অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের পাশাপাশি সামাজিক বা অপ্রাকৃতিক পরিবেশও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এদেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, সংস্কৃতি, কর্মসংস্থান, বাণিজ্য প্রভৃতি নৌ ও সমুদ্র বন্দর গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। নিম্নে কতিপয় সামাজিক/অপ্রাকৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
১. অর্থনৈতিক: অন্য যে কোনো পরিবহন মাধ্যম অপেক্ষা নদীপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন অর্থনৈতিভাবে লাভজনক। এই কারণে সুযোগ থাকলে এদেশের মানুষ নৌপথে ভ্রমণে অধিক আগ্রহী হয়। লোকজনের আগ্রহের কারণে এদেশে অধিক নৌ বন্দর গড়ে উঠেছে।
২. আরামদায়ক: জলপথে ভ্রমণ শুধু আর্থিক দিক দিয়ে লাভজনক নয় বরং এটি অনেক আরামদায়ক। এ কারণে সুদূর অতীতকাল থেকে মানুষ নৌপথে ভ্রমণে আগ্রহী। মানুষের আরামপ্রিয়তার কারণে প্রয়োজনের তাগিদেই এদেশে অনেক নদী বন্দর গড়ে উঠেছে।
৩. নিরাপদ: বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, বহিঃশত্রুর আক্রমণ, হরতাল, গোলোযোগ প্রভৃতি নানাবিধ কারণে সড়ক, রেল বা বিমানপথে যাতায়াত বিঘ্নিত হতে পারে। কিন্তু জলপথ এদিক থেকে অনেক নিরাপদ। এটি সহজে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা নেই। এজন্য নদীপথের ব্যবহার অনেক বেশি। সঙ্গত কারণেই এদেশে অনেক নদী বন্দর গড়ে উঠেছে।
৪. ভূরাজনৈতিক অবস্থান: বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক দিক থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ থেকে সমগ্র বাংলাদেশ ছাড়াও নেপাল, ভুটান, ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যসমূহ এমনকি চীনের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সাথে বাণিজ্য করা যায়। বিশেষ করে নেপাল ও ভূটানের কোনো সমুদ্র বন্দর না থাকায় উত্ত দেশসমূহের সমুদয় বাণিজ্যের কর্মকান্ড বাংলাদেশের সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা যায়। এই দিকগুলো মাথায় রেখে বাংলাদেশে বিদ্যমান সমুদ্র বন্দর দুটির আধুনিকায়নসহ নতুন সমুদ্র বন্দর তৈরির যৌক্তিকতা রয়েছে।
৫. কর্মসংস্থান: বাংলাদেশে নদী ও সমুদ্র বন্দরকে ঘিরে বন্দর কেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। যেমন- শ্রমিক, নৌযান চালক, নৌযান মেরামতকারী, নৌযান প্রস্তুতকারী, ব্যবসায়ী প্রভৃতি। এই সমস্ত পেশার মানুষের জীবিকা নির্বাহ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এদেশে নতুন নতুন নৌবন্দর সৃষ্টি করা যেতে পারে।
৬. বাণিজ্য: বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে নৌ ও সমুদ্র বন্দরের প্রভাব অনেক বেশি। আমাদের দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৭৫ ভাগ সমুদ্রপথে সংঘটিত হয়। আমাদের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দরের প্রভাব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার নৌপথে পণ্য পরিবহন অনেক সুলভ হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের সিংহভাগ পণ্য নৌপথে পরিবহন করা হয়ে থাকে। এ কারণে এদেশে সমুদ্র ও নদী বন্দরসমূহ গড়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
পরিবহন ও যোগাযোগ-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
Read more