(Coal)
বিশ্বে শক্তি উৎপাদনকারী জ্বালানিসমূহের মধ্যে কয়লা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রধান খনিজ সম্পদ। উদ্ভিদ ও প্রাণির দেহাবশেষ থেকে কয়লার সৃষ্টি হয়। ভূঅভ্যন্তরে লক্ষ লক্ষ বছরে জমাকৃত উদ্ভিদের কাণ্ড, গুঁড়ি, শাখা-প্রশাখা, পাতা নানারূপে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তিত হয়ে কয়লায় পরিণত হয়। প্রায় ৩০ কোটি বছর পূর্বে কার্বনিফেরাস যুগে ভূআলোড়নজনিত (Earth movement) কারণে পৃথিবীর আদি বনভূমি মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। ভূগর্ভে চাপ ও প্রচণ্ড তাপের প্রভাবে এই চাপা পড়া বনভূমি কালক্রমে কয়লায় পরিণত হয়। প্রাচীনকাল থেকেই কয়লা মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শিল্প বিপ্লবের (১৭৫০-১৮৫০) পর থেকে কয়লার বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে।
কয়লার শ্রেণিবিভাগ
কার্বনের পরিমাণের উপর ভিত্তি করে কয়লাকে চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। যথা: ১. পিট, ২. লিগনাইট, ৩. বিটুমিনাস এবং ৪. অ্যানথ্রাসাইট।
থেকে ৩৫ শত পিট: এটি কয়লার প্রাথমিক পর্যায়। ।। এতে কার্বনের পরিমাণ ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। এ কয়লা জ্বালালে প্রচুর ধোঁয়া নির্গত হয়।
লিগনাইট: ইহা নিকৃষ্ট মানের কয়লা। এতে কার্বনের পরিমাণ ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ। এতে কম পরিমাণে তাপ উৎপন্ন হয়।
বিটুমিনাস: এতে কার্বনের পরিমাণ ৫০ থেকে ৮৫ শতাংশ। কার্বনের পরিমাণ অনুযায়ী এই কয়লাকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা:
i. স্টিম কয়লা: কার্বনের পরিমাণ ৮০ শতাংশের বেশি।
ii. হাউসহোল্ড কয়লা: কার্বনের পরিমাণ ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ।
iii. কোকিং কয়লা: কার্বনের পরিমাণ ৫০ শতাংশের কম।
অ্যানথ্রাসাইট: এ জাতীয় কয়লায় কার্বনের পরিমাণ ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এটি উজ্জ্বল বর্ণের হয়ে থাকে।
কয়লার উৎপাদন ও বণ্টন
কয়লা বিশ্বের অন্যতম প্রধান খনিজ সম্পদ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কয়লা পাওয়া যায়। তবে এ সমস্ত দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারত, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, ইউক্রেন, কাজাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, পোল্যান্ড প্রভৃতি দেশ প্রধান। নিচে এই দেশগুলোর বর্ণনা দেওয়া হলো-
১. চীন: পৃথিবীর শীর্ষ কয়লা উৎপাদনকারী দেশ হচ্ছে চীন। চীনের অধিকাংশ কয়লা বিটুমিনাস ও অ্যানথ্রাসাইট শ্রেণির। এদেশের শানসি, জেকোয়ান, আনহুই, হুনান, হুবেই, লিয়াওনিং প্রভৃতি প্রদেশে কয়লা খনিগুলো অবস্থিত। চীনের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেশি থাকায় খুব কম কয়লা বিদেশে রপ্তানি হয়।
২. যুক্তরাষ্ট্র: পৃথিবীর সর্বাধিক কয়লা সন্যিত আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এই দেশের কয়লা উন্নতমানের অ্যানথ্রাসাইট শ্রেণির। যুক্তরাষ্ট্রের কয়লা খনিগুলো পেনসিলভানিয়ার অ্যাপালেশিয়ান পার্বত্য অঞ্চল, নিউ অরলিন্স, হিউস্টন, রকি পার্বত্য অঞ্চল, পোর্টল্যান্ড প্রভৃতি অঞ্চলে অবস্থিত। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কয়লা রপ্তানি করে থাকে।
৩. ইন্দোনেশিয়া: পৃথিবীর তৃতীয় শীর্ষ কয়লা উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়া। দক্ষিণ সুমাত্রা, দক্ষিণ ও পূর্ব কালিমান্তাস দ্বীপে দেশটির কয়লা খনিগুলো অবস্থিত।
৪. ভারত: দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতই একমাত্র কয়লা সমৃদ্ধ দেশ। ভারতের দুই তৃতীয়াংশ কয়লা পাওয়া যায় পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্যে। অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে ছত্তিশগড়, তামিলনাড়ু প্রভৃতি প্রদেশে কয়লা খনিগুলো অবস্থিত। ভারত তার অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে (মিয়ানমার, থাইল্যান্ড) কয়লা রপ্তানি করে থাকে।
৫. অস্ট্রেলিয়া: বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম কয়লা উৎপাদনকারী দেশ অস্ট্রেলিয়া। দেশটির প্রধান খনিসমূহ নিউসাউথ ওয়েলসের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত। এছাড়া নিউক্যাসেল, কুইন্সল্যান্ড, ভিক্টোরিয়া এবং তাসমানিয়ায় প্রচুর কয়লা উত্তোলন করা হয়। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে অস্ট্রেলিয়া প্রচুর কয়লা বিদেশে রপ্তানি করে থাকে।

৬.রাশিয়া: রাশিয়া পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম কয়লা উৎপাদনকারী দেশ। এদেশের কুজনেস্ক কয়লাক্ষেত্র পৃথিবী বিখ্যাত। বৈকাল হ্রদ ও সাইবেরিয়ার নদী অঞ্চলে উৎকৃষ্ট শ্রেণির বিটুমিনাস ও লিগনাইট কয়লা পাওয়া যায়। এছাড়া ইউরাল পর্বতের উত্তরাংশ, শাখালিন দ্বীপ, লোনা ও ভূজুজ অববাহিকা, মধ্য সাইবেরিয়ায় প্রচুর উন্নতমানের কয়লা উৎপাদিত হয়।
৭. দক্ষিণ আফ্রিকা: পৃথিবীর সপ্তম কয়লা উৎপাদনকারী দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা। দেশটির প্রধান কয়লা খনিগুলো নাটাল, জোহানেসবার্গ, ট্রান্সভাল ও কেপপ্রদেশে অবস্থিত। এদেশের কয়লা উন্নতমানের। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা কয়লা রপ্তানি করে।
৮. কলম্বিয়া: বিশ্বের অষ্টম কয়লা উৎপাদনকারী দেশ কলম্বিয়া। দেশটির কয়লা মধ্যম থেকে অনেকটা নিচু প্রকৃতির পিট ও বিটুমিনাস শ্রেণির।
৯. পোল্যান্ড: পৃথিবীর নবম কয়লা উৎপাদনকারী দেশ পোল্যান্ড। দেশটির অধিকাংশ কয়লা খনি সাইলেশিয়া মালভূমি অঞ্চলে অবস্থিত। এছাড়া ডমব্রোভা অববাহিকা ও ক্যারাকাউ এ প্রচুর কয়লা পাওয়া যায়। পোল্যান্ডের কয়লা উৎকৃষ্ট বিটুমিনাস প্রকৃতির।
১০. কাজাকিস্তান: পৃথিবীর দশম কয়লা উৎপাদনকারী দেশ কাজাকিস্তান। দেশটির মধ্যভাগে অবস্থিত কারাগান্দা অঞ্চলে উৎকৃষ্ট শ্রেণির বিটুমিনাস কয়লা পাওয়া যায়। দেশটি পৃথিবীর অন্যতম কয়লা রপ্তানিকারক দেশ।
সারণি ৫.৫: পৃথিবীর প্রধান কয়লা উৎপাদনকারী দেশসমূহ (মিলিয়ন টন, ২০১৭)
| দেশের নাম | উৎপাদন | মোট সঞ্চিতি |
| ১. চীন | ১৮২৮.৮ | ১৩৮,৮১৯ |
| ২. যুক্তরাষ্ট্র | ৩৬৪.৫ | ২৫০,২১৯ |
| ৩. ইন্দোনেশিয়া | ৩২৩.৩ | ৩৭,০০০ |
| ৪. ভারত | ৩০৮.০ | ১,০১,৩৬৩ |
| ৫. অস্ট্রেলিয়া | ৩০১.১ | ১৪৭,৪৩৫ |
| ৬. রাশিয়া | ২২০.২ | ১৬০,৩৬৪ |
| ৭. দক্ষিণ আফ্রিকা | ১৪৩.২ | ৯,৮৯৩ |
| ৮. কলম্বিয়া | ৫৭.৯ | ৪,৮৮১ |
| ৯. পোল্যান্ড | ৪৭.৫ | ২৬,৪৭৯ |
| ১০. কাজাকিস্তান | ৫০.৬ | ২৫,৬০৫ |
| বিশ্বের মোট পরিমাণ | ৩৯১৬.৮. | ১,০৫,৭৮২ |
উৎস: BP Statistical Review of World Energy-2018
কয়লার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য: কয়লা রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া প্রথম। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া (২য়),
রাশিয়া (৩য়), যুক্তরাষ্ট্র (৪র্থ), কলম্বিয়া (৫ম), দক্ষিণ আফ্রিকা (ষষ্ঠ), কানাডা (৭ম), পোল্যান্ড (১১তম) প্রভৃতি পৃথিবীর প্রধান কয়লা রপ্তানিকারক দেশ। আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে জাপান (১ম), চীন (২য়), ভারত (৩য়), দক্ষিণ কোরিয়া (৪র্থ), জার্মানি (৬ষ্ঠ), ফ্রান্স (১২তম), ইতালি (১৪তম), সুইডেন, কানাডা, পাকিস্তান প্রভৃতি অন্যতম। (সূত্র: World Coal Association, 2019)।
কয়লার অর্থনৈতিক গুরুত্ব: কয়লা একটি উৎকৃষ্ট জ্বালানি। তাপ উৎপাদন ছাড়াও কয়লার নানাবিধ ব্যবহার আছে। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ কয়লা ব্যবহার করে আসছে। ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পরে কয়লার ব্যবহার ও গুরুত্ব ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। কয়লার কতিপয় ব্যবহার
ক. জ্বালানি হিসাবে: বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি শক্তির ৬০% আসে কয়লা থেকে (সূত্র: IEA, 2019)। কয়লা একটি উৎকৃষ্ট জ্বালানি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইট প্রস্তুত করতে এবং তাপ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে কয়লা ব্যবহার করা হয়।
খ. লৌহ ও ইস্পাত শিল্পে: শিল্প বিকাশে কয়লা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের ন্যায় কতিপয় ভারি শিল্প কয়লার ওপর নির্ভরশীল। কয়লার প্রচুর ব্যবহারের কারণে লোহা ও ইস্পাত শিল্প স্থাপন কয়লা প্রাপ্তির ওপর নির্ভর করে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের পেলসিলভানিয়ায় কয়লা ভিত্তিক শিল্প গড়ে ওঠেছে।
গ. যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থায়: কয়লা থেকে উৎপন্ন পীচ, আলকাতরা প্রভৃতি সড়ক তৈরিতে বহুল ব্যবহৃত হয়। পূর্বে জাহাজ ও রেলগাড়ির স্টিম ইঞ্জিনে কয়লা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমান সময়েও পৃথিবীর অনেক দেশে এই ইঞ্জিন চালিত যানবাহনের প্রচলন রয়েছে। যেমন- ভারত।
ঘ. গৃহস্থালির কাজে: গৃহস্থালির রান্নাবান্না করা, ঘরে তাপ দেওয়া (শীত প্রধান দেশে) প্রভৃতি কাজে কয়লা ব্যবহৃত হয়। অবশ্য বর্তমান সময়ে ধোঁয়া উৎপন্ন হওয়ার কারণে ঘরের কাজে কয়লার ব্যবহার অনেক কমে গেছে।
ঙ. কয়লার উপজাত হিসেবে: কয়লা থেকে বিভিন্ন প্রকার দ্রব্য উপজাত হিসেবে উৎপন্ন হয়। আলকাতরা, পীচ, সুগন্ধি, রঙিন ফিল্ম, সেলাই সুতা প্রভৃতি অসংখ্য প্রকারের উপজাত দ্রব্যাদি কয়লা থেকে পাওয়া যায়। এই সমস্ত দ্রব্যাদি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন কাজে লাগে।
কয়লার চাহিদা বিশ্বব্যাপী। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যেখানে কয়লার প্রয়োজন নেই। বিশ্বব্যাপী কয়লা অনুসন্ধান, খনি থেকে উত্তোলন, পরিবহন প্রভৃতি কাজে অসংখ্যা জনশক্তির প্রয়োজন হয়। ফলে যে সমস্ত অঞ্চলে কয়লা খনি অবস্থিত সেই অঞ্চলের অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কয়লা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
খনিজ ও শক্তি সম্পদ-মো: আবদুল কুদ্দুস স্যারে লেখা বই
Read more