hsc

পাঠ-৯: তৈরি পোশাক শিল্প

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

13

(Garment Industries)

বাংলাদেশের দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক শিল্প প্রায় একক উৎস হিসেবে কাজ করছে। তৈরি পোশাক বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ সালে মোট রপ্তানির প্রায় ৮৬.২% আসে এই খাত থেকে।

বাংলাদেশ পোশাক শিল্প বিকাশের ইতিহাস: বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের ইতিহাস খুব পুরনো নয়। ১৯৬০-এর
দশকের দিকে এদেশে প্রথম তৈরি পোশাক শিল্প স্থাপিত হয়। স্থানীয় চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই এটি গড়ে ওঠে। বিশ্ব অর্থনীতিতে ১৯৫০-এর দশকে উন্নত দেশসমূহে শ্রমিক ইউনিয়ন উচ্চ মজুরির দাবিতে খুব শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ঐ সময় তারা শ্রমিকদের নিম্ন মজুরির বিনিময়ে এ শিল্পখাতকে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হংকং, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় স্থানান্তর করে। পরবর্তীকালে উন্নত দেশগুলো MFA (Multi Fibre Agreement)-এর মাধ্যমে উচ্চ রপ্তানিযোগ্য দেশগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে। তখন উৎপাদনকারীরা আরও কম মজুরির দেশে এ শিল্পকে স্থানান্তর করে। এরই ফলে বাংলাদেশ ১৯৮০ সালে তৈরি পোশাক শিল্পে বিনিয়োগ লাভ করে এবং উৎপাদন শুরু করে।

১৯৮০ এর দশকে বাংলাদেশে মাত্র ৫০টি কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে এ শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮৪-৮৫ সালে এর সংখ্যা ছিল ৩৮৪টি। ২০০০-২০০১ সালে এ সংখ্যা উত্তীর্ণ হয় ৩৪৮০ টিতে এবং বর্তমানে (২০১৯) এ শিল্পের কারখানা সংখ্যা ৪৬২১টির অধিক (সূত্র- BGMEA-2019)।

পোশাক শিল্প গড়ে ওঠার কারণ: নিম্নলিখিত কারণে বাংলাদেশে পোশাক শিল্প বিকাশ লাভ করেছে, যথা-

১.প্রাকৃতিক কারণ
i. অনুকূল জলবায়ু বাংলাদেশের উষ্ণ আর্দ্র জলবায়ুতে শ্রমিকরা অধিক সময় কারখানায় কাজ করতে পারে। তাছাড়া পোশাক শিল্পের জন্য কাপড় তৈরিতেও এ জলবায়ু সহায়ক।
ii. কাঁচামাল: দেশি ও বিদেশি মিলগুলো থেকে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল তথা বস্ত্র সংগ্রহ করে থাকে।
iii. শক্তিসম্পদ : পর্যাপ্ত শক্তিসম্পদের আধিক্য বাংলাদেশে পোশাক শিল্প গড়ে উঠতে সহায়তা করছে।

২. অর্থনৈতিক কারণ

i.মূলধন: বিভিন্ন ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিগুলো থেকে পর্যাপ্ত ঋণ পাওয়ার সুবিধা থাকায় মূলধনের কোনো অসুবিধা হয় না।
ii.শ্রমিক: জনবহুল এদেশে সুলভ শ্রমিকের প্রাচুর্য লক্ষ করা যায়। অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের শ্রমিকের মজুরি অনেক কম। ফলে শ্রমিকের সহজলভ্যতার কারণে এদেশে প্রচুর তৈরি পোশাক শিল্প গড়ে ওঠেছে।
iii.পরিবহন: সমুদ্রপথে বিভিন্ন দেশের সাথে বাংলাদেশের সুলভ যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকায় এ শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি ও তৈরি পোশাক রপ্তানিতে সুবিধা রয়েছে।
iv. বাজার: বিদেশে বাংলাদেশি পোশাকের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে।

৩. সাংস্কৃতিক কারণ

সরকারি উদ্যোগ: সরকারের সহযোগিতা দেশে পোশাক শিল্পের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

তৈরি পোশাক শিল্পের অবস্থান ও বণ্টন: বাংলাদেশের পোশাক শিল্পগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা এ তিনটি অঞ্চলেই গড়ে ওঠেছে। নিচে পোশাক শিল্পের বণ্টন মানচিত্রের মাধ্যমে দেখানো হলো:

তৈরি পোশাকের রপ্তানি বাণিজ্য: বাংলাদেশ প্রতি বছর তৈরি পোশাক রপ্তানি করে সর্বাধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে।
বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানিতে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, যুক্তরাজ্য, কানাডা, 'অস্ট্রেলিয়াতেও তৈরি পোশাক রপ্তানি করা হয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের রপ্তানিকৃত পণ্যগুলো হলো শার্ট, পাজামা, ট্রাউজার, জ্যাকেট, জিন্স প্যান্ট, পুলওভার, নাইট ড্রেস, শীতকালীন পোশাক, গেঞ্জি, সোয়েটার, গ্লোভস ইত্যাদি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-২০১৯ সালে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ ৩৪.৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে, যা মোট রপ্তানির ৮৬.২ শতাংশ। শুরুর দিকে ১৯৮৩-৮৪ সালে যা ছিল মোট রপ্তানির মাত্র ৩.৮৯ শতাংশ।

তৈরি পোশাক শিল্পের সমস্যা: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন। সমস্যাগুলো হলো:
১. নিম্নমানের কাঁচামাল আমদানি: বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পসমূহকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বিদেশি বাজার থেকে ক্রয় করতে হয়। এতে করে দেশীয় পোশাক প্রস্তুতকারকদের খরচ বেড়ে যায়।
২. দক্ষ শ্রমিকের অভাব: বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম সমস্যা হলো দক্ষ শ্রমিকের অভাব। বাংলাদেশে বিভিন্ন গার্মেন্টসে যে শ্রমিক কাজ করে তাদের শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগই অশিক্ষিত, আধাদক্ষ বা অদক্ষ মহিলা।
৩. মুষ্টিমেয় কয়েক শ্রেণির পোশাক রপ্তানি: বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো মুষ্টিমেয় কয়েক প্রকার তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীলতা। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ১১৫ প্রকার তৈরি পোশাকের চাহিদা রয়েছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে মাত্র ১০ থেকে ১৫ প্রকার পোশাক তৈরি হয়। বাংলাদেশ পোশাক শিল্পের বহুমুখীকরণের অভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে বিস্তৃতি লাভ করতে পারছে না।

৪. আমদানিকারক কর্তৃক কোটা আরোপ: বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অন্যতম সমস্যা হলো আমদানিকারক বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানির ওপর কোটা আরোপ করে। ফলে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে সংকট দেখা দেয় এবং অনেকগুলো ছোট ছোট পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়।

৫. রপ্তানি. ক্ষেত্রে বিলম্ব: আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকগণ। বিদেশ থেকে সুতা প্রাপ্তিতে বিলম্ব, শুল্ক জটিলতা প্রভৃতি কারণে সময়মত পোশাক সরবরাহ করতে পারে না। এক্ষেত্রে আমদানিকারকগণ তাদের অর্ডার নাকচ করে দেয় এবং রপ্তানি বিঘ্নিত হয়।

৬. আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা: বাংলাদেশ বেশ কিছু রপ্তানিকারক দেশের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন। চীন, ভারত, হংকং, সিংগাপুর, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশ তৈরি পোশাক শিল্পে যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য বাংলাদেশকে এসব দেশের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।

পোশাক শিল্প উন্নয়নের উপায়:

১. মজুরি প্রদান: বাংলাদেশে শ্রম আইন অনুযায়ী পোশাক শিল্পে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস নির্ধারিত। তবে বাংলাদেশের অনেক পোশাক কারখানাতেই অতিরিক্ত সময় কাজ করানো হয়। এই অতিরিক্ত কাজের মজুরি প্রদান করতে হবে। এছাড়া নারীদেরকে পুরুষদের সমান মজুরি প্রদান করতে হবে। তাতে নারীরা কাজে উৎসাহী হবে ও পোশাক শিল্পের উন্নয়ন ঘটবে।

২. কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতকরণ: পোশাক কারখানাগুলোতে কাজের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। কারখানায় পর্যাপ্ত আলো বাতাসের ব্যবস্থা রাখতে হবে। অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা রাখতে হবে। আপদকালীন সময়ে দ্রুত বাইরে বের হওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এছাড়া কারখানার ভিতরে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাতে পোশাক কর্মীর স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি কমবে ও কর্মস্পৃহা বাড়বে।

৩. বেতন-ভাতা প্রদান: পোশাক শিল্পে কর্মরত মহিলা শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি, মাতৃত্বকালীন ছুটি ভাতা, ক্ষতিপূরণ, বোনাস ইত্যাদি ব্যবস্থা করতে হবে। তাতে অধিক মহিলা কর্মী পোশাক শিল্পে যোগদান করবে ও উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।

৪. নারীদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি: পোশাক শিল্পে কর্মরত মহিলারা অদক্ষ হওয়ার কারণে কম মজুরিতে কাজ করে। যদি তাদেরকে উপযুক্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগ দেওয়া যায়, তবে কাজের গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে।

৫. প্রয়োজনীয় ঋণ প্রাপ্তি: শিল্প ঋণ প্রাপ্যতা পোশাক শিল্প বিকাশের আরেকটি কারণ। বিনিয়োগ ও উৎপাদন ব্যবধানের স্বল্পতার কারণে ও দ্রুত উৎপাদন ব্যয় ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দ্রুত ও সহজশর্তে এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে প্রবাহ আরও বাড়াতে হবে।

৬. শিল্পনীতির বাস্তবায়ন: বাংলাদেশে পোশাক শিল্প উন্নয়নে সরকারের উদার শিল্পনীতির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। বর্তমান সরকার বেসরকারি খাতে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে উৎসাহ প্রদান করছে। তৈরি পোশাক শিল্প মূলত বেসরকারি খাতেই গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন প্রকার কর রেয়াত, নিম্ন সুদের হার ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে সরকার তৈরি পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ প্রদান করছে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের সচেতন করতে হবে।

বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের দ্রুত প্রসার ও বিকাশ ঘটেছে। পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্প স্থাপনের জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইপিজেড (EPZ- Export Processing Zones) প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। উল্লিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আগামী বছরগুলোতে তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে আরো উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে বলে আশা করা যায়।

খনিজ ও শক্তি সম্পদ-মো: আবদুল কুদ্দুস স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...