hsc

পাঠ-১৪: শিল্পায়ন, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

13

(Industrialization, Proper Management and Political Stability)

বিশ্ব আজ মানুষের হাতের মুঠোয়। কারণ শিল্পবিপ্লবের ফলে মানুষের জীবনযাপন হয়েছে ভোগের ও বিলাসিতার। কোনো দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে শিল্পের উন্নয়ন। বিশ্বের কতিপয় দেশ (যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান) শিল্পের ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি লাভ করেছে আবার কতিপয় দেশ বিভিন্ন কারণে শিল্পের আশীর্বাদ থেকে পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ তেমন একটি দেশ যে দেশ শিল্পায়নের ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।
শিল্পায়ন: শিল্পায়ন বলতে একটি বিশেষ প্রক্রিয়াকে বোঝায় যার মাধ্যমে কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র একটি প্রাথমিক বা কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে মাধ্যমিক, অকৃষিভিত্তিক বা দ্রব্য প্রক্রিয়াজাতকরণ তথা নতুন শিল্পভিত্তিক সমাজব্যবস্থার দিকে ধাবিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ Steven M. Shelfrin তার "Economics Principles in action (2003) বইয়ে বলেন,

"Industrialization is the period of social and economic change that transform a human group from an agriaran society into an industrial one" অর্থাৎ শিল্পায়ন হচ্ছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন, যা একটি কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থাকে শিল্পভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় পরিণত করে।

শিল্পায়ন মূলত বৃহৎ আধুনিকায়নের এমন একটি পদ্ধতি যেখানে সামাজিক পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

শিল্পায়নে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: বাংলাদেশে ঔপনিবেশিক শোষণ, নির্যাতন, রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ও বিপ্লবের ফলে শিল্পায়নের তেমন বিকাশ ঘটতে পারেনি। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শোষণ, বৈষম্য, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক রাজনীতির হস্তক্ষেপ প্রভৃতি কারণে এদেশের শিল্প বিকাশ লাভ করতে পারেনি। বাংলাদেশের শিল্পায়নে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা:

১. উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণ: কোনো শিল্পের প্রসারের জন্য তার প্রধান লক্ষ্যসমূহ আগেই ঠিক করে নিতে হবে। সেই অনুযায়ী শ্রমিক, মূলধন বিনিয়োগ করতে হবে।
২. নিত্য নতুন উদ্ভাবন: সঠিক ব্যবস্থাপনার আরেকটি দিক হলো এর মাধ্যমে নতুন উদ্ভাবনে উৎসাহিত হয়। কীভাবে নতুন প্রযুক্তি ও ধারণা নিয়ে আরো ভালো পণ্য উৎপাদন সম্ভব হবে তা নিশ্চিত করতে হবে। নিত্য নতুন উদ্ভাবন শিল্পকে আরো মজবুত করে তোলে।
৩. সঠিক দিকনির্দেশনা: কোনো শিল্পের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা অতি গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ফলেই সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান সম্ভব, যা শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, নৈপুণ্য ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক।

৪. শ্রমিকদের কর্মপ্রেরণা প্রদান: সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিভিন্ন নতুন নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে, যা শ্রমিকদের আরো ভালোভাবে কাজে উৎসাহিত করে। শ্রমিকদের জন্য যথাযথ বেতন, ভাতা, স্বাস্থ্যসুবিধা প্রদানের মাধ্যমে তাদের সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এর ফলে ঐ শিল্প আরো লাভজনক ও উৎপাদনশীল শিল্পে পরিণত হয়।

৫. কম খরচে অধিক পণ্য উৎপাদন: সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার আরেকটি অতি প্রয়োজনীয় দিক হলো স্বল্প খরচে অধিক পণ্য উৎপাদন ও মুনাফা অর্জনের ব্যবস্থা গ্রহণ। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক যেমন- পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের ফলে কম খরচে অধিক মুনাফা অর্জন সম্ভব।

৬. সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার: সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রাকৃতিক ও মানবিক উভয় সম্পদের ব্যবহার সুনিশ্চিত করতে হবে। আমাদের আবিষ্কৃত প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন: প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, চুনাপাথর, কাঁচবালি ইত্যাদির আহরণ ও এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া সহজলভ্য উপাদানের সঠিক ব্যবহার ও ঘাটতি পূরণের মাধ্যমে সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

৭. দক্ষ মানবসম্পদ নির্ধারণ: শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রসার অনেকাংশে নির্ভর করে শ্রমিকের কর্মদক্ষতার ওপর। সেক্ষেত্রে অবশ্যই যোগ্যতাসম্পন্ন ও দক্ষ জনশক্তি নির্বাচন করতে হবে। এর ফলে পণ্যের গুণগত মান উন্নত হবে এবং বিশ্বব্যাপী বাজার বৃদ্ধি পাবে।

৮. শিল্পের ভারসাম্য স্থাপন: সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন পরিবর্তনশীল অবস্থার সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করতে সহায়ক। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সমস্যার ফলে শিল্পের বাজার বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকে। এ অবস্থায় কীভাবে শিল্পকারখানা সঠিকভাবে পরিচালনা করা যায় তা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায়।

৯. সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন: শিল্পের উন্নয়ন হলে সেই সাথে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পায় এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। এছাড়াও ভালো মানের পণ্য ক্রেতাদের আগ্রহ বৃদ্ধি করে ও উন্নত জীবনযাত্রার দিকে ধাবিত করে। শিল্পের উন্নয়নের সাথে সাথে সামাজিক অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটে।

১০. অর্থনৈতিক উন্নয়ন: সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা শিল্পোন্নয়নের অন্যতম শর্ত। বিশ্ব অর্থনীতির তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য শিল্পের বিকাশ অতীব জরুরি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়ন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তা:

১. উৎপাদন প্রক্রিয়া ঠিক রাখা: রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতা বিশ্বের অনুন্নত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। যা শিল্প কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত করে এবং উদ্যোক্তাকে লোকসানের সম্মুখীন করে।
২. বিদেশী বিনিয়োগ নিশ্চিতকরণ: রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করলে বিদেশি সহায়ক প্রতিষ্ঠানগুলো উপযুক্ত সময়ে প্রয়োজনীয় নিয়ামক যোগান দিতে পারে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগও এ কারণে নিরুৎসাহিত হয়।
৩. উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়ী মনোভাবে উৎসাহিতকরণ: রাজনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকলে উদ্যোক্তাগণ বিনিয়োগে উৎসাহ পান। অপরপক্ষে ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন, শিল্পনীতি পরিবর্তন উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়ী মনোভাবকে নিরুৎসাহিত করে।

খনিজ ও শক্তি সম্পদ-মো: আবদুল কুদ্দুস স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...