(Comparison of Bangladesh & Indian Industries)
ভারত এবং বাংলাদেশ পাশাপাশি অবস্থিত দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র। আর প্রতিবেশী হিসেবে দেশ দুটি একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। শিল্পক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশেষ উন্নত নয়। ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর হতে স্বাধীনতা প্রাপ্তি পর্যন্ত দেশে যেসব শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। তুলনামূলকভাবে ভারত শিল্প ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি লাভ করেছে।
বাংলাদেশের শিল্পসমূহ: বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিল্পের বিশেষ অবদান রয়েছে। পূর্বে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে শিল্পের অবদান খুব সামান্য' হলেও বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৮ অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ সালে GDP তে শিল্পের অবদান ৩৫.১৪ শতাংশ। বাংলাদেশের শিল্পকে তিনভাগে ভাগ করা হয়।
যথা- (১) ক্ষুদ্র শিল্প; (২) মাঝারি শিল্প; (৩) বৃহৎ শিল্প।
১. ক্ষুদ্র শিল্প: বাংলাদেশের শিল্প আইন অনুসারে, যে শিল্প কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা ২০ জন বা তার চেয়ে কম তাকে ক্ষুদ্র শিল্প বলে। স্বল্প পুঁজি, অল্প সংখ্যক কর্মচারী নিয়ে একক মালিকানা, অংশীদারিত্ব অথবা সমবায়ভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে তাকে ক্ষুদ্র শিল্প বলে। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ক্ষুদ্র শিল্পগুলো হলো: রেশম, চামড়া, বিড়ি, লবণ, তাঁত, অলঙ্কার, আসবাব শিল্প ইত্যাদি।
২. মাঝারি শিল্প: বাংলাদেশের কারখানা আইন অনুযায়ী, যেসব শিল্পে ২০ জনের বেশি কিন্তু ২৩০ জনের কম শ্রমিক নিয়োগ করা হয় তাকে মাঝারি শিল্প বলে। এ শিল্পে বৃহৎ শিল্পের মতো আধুনিক কারিগরি ও প্রযুক্তিগত কৌশল অবলম্বন করা হয়। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য মাঝারি শিল্পগুলো হলো: নাইলন, সাবান, দিয়াশলাই, অ্যালুমিনিয়াম শিল্প ইত্যাদি।
৩. বৃহৎ শিল্প: যে সকল শিল্পে ২৩০ জনের বেশি শ্রমিক নিয়োগ করা হয় তাকে বৃহৎ শিল্প বলে। এ শিল্পে বড় পরিসর, অধিক কারিগরি ও প্রযুক্তিগত কৌশল দরকার হয়। বাংলাদেশের বৃহৎ শিল্পগুলোর মধ্যে পাট, কাগজ, চিনি, সিমেন্ট, সার ইত্যাদি বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
ভারতের শিল্প: ভারত শিল্পে উন্নত। বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পরে ভারতকে তৃতীয় দেশ হিসাবে ধরা হয়। ভারতের মোট জিডিপির দুই-তৃতীয়াংশ আসে শিল্পখাত থেকে। ভারতের উল্লেখযোগ্য শিল্পসমূহ হলো-পোশাক, খাদ্য, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রাসায়নিক, সিমেন্ট, স্টিল ও ইস্পাত, সফটওয়ার, খনিজ ও পেট্রোলিয়াম শিল্প। এছাড়াও ভারতের অন্যান্য শিল্পগুলো হচ্ছে কৃষি, মোটর, সিনেমা, স্বর্ণ শিল্প ইত্যাদি।
বাংলাদেশ ও ভারতের শিল্পের তুলনা:
১. পাট শিল্প: বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্পের মধ্যে এক সময় প্রধান ছিল পাট শিল্প। পৃথিবীর সর্বপ্রধান পাট' উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও ১৯৫১ সালের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশে পাটকল প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অথচ বাংলাদেশের উৎপাদিত পাটের ওপর নির্ভর করে সে সময় কলকাতায় ১০৮টি পাটকল প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ পাট শিল্পে বেশ উন্নতি লাভ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের আওতাধীন ১৩টি ছোট, ৭টি মাঝারি ও ৬টি বৃহৎ পাটকল রয়েছে। এছাড়াও বেসরকারি পাটকলের সংখ্যা ২৮১টি।
২. চা শিল্প: বাংলাদেশ চা শিল্পে উন্নতি লাভ করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১১৬টি চা কারখানা রয়েছে। বাংলাদেশের সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের পর্যাপ্ত পরিমাণ চা বাগান এদেশের চা শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছে। ভারতেও চা শিল্প ১৭২ বছর আগে থেকে বিস্তার লাভ করেছে। ভারতের জাতীয় অর্থনীতিতে চা শিল্পের বিশেষ অবদান রয়েছে।
৩. চিনি শিল্প: বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণ ইক্ষু উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও চিনি শিল্প সেভাবে বিস্তার লাভ করেনি। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৫টি চিনি কল থাকলেও ইক্ষুর অভাবে কলগুলোতে ক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন হচ্ছে না। বাংলাদেশ চিনি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। ফলে বিদেশ থেকে চিনি আমদানি করতে হয়। অপরপক্ষে, ভারত চিনি উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়। ভারতে সর্বমোট ৩১৮টি চিনির কল আছে।
৪. সিমেন্ট শিল্প: বাংলাদেশে সিমেন্টের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বড় ও মাঝারি আকারের ১২৩টি সিমেন্ট কারখানা রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে বেশকিছু ক্ষুদ্র সিমেন্ট প্লান্ট রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ এ শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিছু রপ্তানিও করছে। ভারতে ১০টি বৃহৎ সিমেন্ট প্লান্ট এবং প্রায় ৩০০টি ক্ষুদ্র সিমেন্ট প্লান্ট আছে। সিমেন্ট উৎপাদনে ভারত বিশ্বে দ্বিতীয়। দেশটির বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২৮৬ মিলিয়ন টন।
৫. সার শিল্প: বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ এবং আগের তুলনায় বর্তমানে সারের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে বার্ষিক প্রায় ২১ লক্ষ টন সারের প্রয়োজন। ফলে দেশের চাহিদা মেটাতে প্রচুর পরিমাণ সার আমদানি করতে হয়। বর্তমানে দেশে ৯টি সার কারখানা রয়েছে। ভারত সার শিল্পেও যথেষ্ট উন্নতি লাভ করেছে। গত ৫০ বছর ধরে ভারত সার উৎপাদন করে আসছে এবং সার উৎপাদনে ভারত বিশ্বে তৃতীয়।
৬. লৌহ ও ইস্পাত শিল্প: যেকোনো শিল্পে লৌহ ও ইস্পাতজাত শিল্পপণ্যের ব্যবহার রয়েছে। শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি
তৈরিতে লৌহ ও ইস্পাতের ব্যবহার অনস্বীকার্য। বাংলাদেশ লৌহ ও ইস্পাত শিল্পে বিশেষ উন্নতি লাভ করেনি। অন্যদিকে, ভারত লৌহ শিল্পে উন্নতি লাভ করেছে। গত ৪০০ বছর ধরে ভারতে লৌহ শিল্প প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। বর্তমানে ভারত এ শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং লৌহ ও ইস্পাত উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বিশ্বে যথাক্রমে ৩য় ও ২য় স্থানের অধিকারী।
৭. পোশাক শিল্প: বাংলাদেশ পোশাক শিল্পে বেশ অগ্রগতি লাভ করেছে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে বিভিন্ন গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি করে থাকে। বাংলাদেশে ৪,৬২১ টির অধিক পোশাক কারখানা রয়েছে। ভারতও পোশাক শিল্পে উন্নতি লাভকরেছে। তবে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে শ্রমিক সহজলভ্য হওয়ায় কম খরচে উৎপাদন সম্ভব।
৮. খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প: ভারত বিশ্বের অন্যতম খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী দেশ। কিন্তু আন্তর্জাতিক খাদ্য বাণিজ্যের ১.৫% আসে ভারত থেকে। তবে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের তেমন প্রসার হয়নি।
৯. সফট্ওয়ার ও তথ্য প্রযুক্তি ভিত্তিক শিল্প: ভারতে সফট্ওয়্যার শিল্পের উন্নতি থেকে বোঝা যায় যে, ভারত তথ্য ও প্রযুক্তিতে উন্নত। ভারতের অর্থনীতিতে সিনেমা, বিজ্ঞাপন শিল্পেরও বিশেষ অবদান রয়েছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে এ ধরনের শিল্পের প্রসার ঘটেনি। কম্পিউটার হার্ডওয়্যার ও ইলেকট্রিক শিল্পেও বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় পিছিয়ে আছে।
১০. রাসায়নিক শিল্প: ভারতের রাসায়নিক শিল্প সংখ্যা প্রায় ৭০,০০০। এসব শিল্প হতে বাণিজ্যিক পণ্য যেমন প্লাস্টিক, প্রসাধনী, কীটনাশক, সার প্রভৃতি উৎপাদন করে থাকে। ভারত বিশ্বের ১৩ তম রাসায়নিক দ্রব্য রপ্তানিকারক দেশ। বাংলাদেশে বৃহৎ আকারে না হলেও ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের রাসায়নিক দ্রব্যাদি রপ্তানি করে।
উপরিউক্ত আলোচনায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশ শিল্পের দিক থেকে ভারতের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশে রয়েছে সুষ্ঠু নীতিমালার অভাব, দক্ষ শ্রমিক, প্রযুক্তি ও কাঁচামালের অভাব। এর ফলে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ প্রায় সবক্ষেত্রেই অনেক পিছিয়ে আছে।
বাংলাদেশে শিল্পের উন্নয়নের জন্য করণীয়:
১. শিল্পবান্ধব আইন প্রণয়ন;
২. কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান শিল্প স্থাপন করতে চাইলে তাকে অবশ্যই যৌথভাবে করতে হবে;
৩. দেশে যে সকল শিল্পের সম্ভাবনা রয়েছে সেগুলোর প্রতি নজর দেওয়া;
৪. কৃষি ও কৃষিপণ্য ভিত্তিক শিল্প স্থাপন;
৫.. খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপন করা যেতে পারে;
৬. মোটরসাইকেল ও মোটর গাড়ি ভিত্তিক শিল্প স্থাপন;
৭. কম্পিউটার ও হার্ডওয়্যার শিল্প স্থাপন;
৮. ইলেকট্রনিক্স শিল্প স্থাপন;
৯. মোবাইল ও টেলিফোন শিল্প স্থাপন;
১০. ডেইরি শিল্প স্থাপন;
:
১১. শ্রমিকদের কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদান;
১২. কারখানা যেন বন্ধ না হয় সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদি।
খনিজ ও শক্তি সম্পদ-মো: আবদুল কুদ্দুস স্যারে লেখা বই
Read more