(Demographic Elements of Population)
জনমিতি হচ্ছে জনসংখ্যার বৈশিষ্ট্যগত জ্ঞান। জনমিতিতে জনসংখ্যার বৈশিষ্ট্যগত পরিবর্তনের গাণিতিক বিশ্লেষণ করা হয়ে থাকে। জনমিতিতে জনসংখ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো হচ্ছে-
১. আকার (size)
২.ঘনত্ব (density)
৩.বয়স কাঠামো (age structure)
৪. উৎপাদনশীলতা (Productivity) ও জন্মহার (birthrate)
৫. মৃত্যুহার (death rate)
৬. লিঙ্গ অনুপাত (sex ratio)
১. আকার (size): জনসংখ্যার জনমিতিক উপাদানগুলোর মধ্যে এর আকারগত বৈশিষ্ট্য সর্বাগ্রে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জনসংখ্যার আকার বলতে কোনো একক অঞ্চলে অন্তর্ভুক্ত মানুষের মোটসংখ্যা বোঝানো হয়ে থাকে। বিশ্ব ব্যাংক এর এক তথ্যে দেখা যায় যে, ১৯৯০ সালে সমগ্র পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার পরিমাণ ছিল ৫২৫ কোটি। ১৯৯৯ সালের বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল ৬০০ কোটি। ২০০৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬৮ কোটি। ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে বিশ্বের জনসংখ্যা ৭০০ কোটি ছাড়িয়ে যায়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এভাবে চলতে থাকলে ২০২৪ ও ২০৪৫ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা হবে যথাক্রমে ৮০০ ও ৯০০ কোটি। পৃথিবীর মহাদেশগুলোর মধ্যে এশিয়া মহাদেশে সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা বিদ্যমান।
সারণি-২.১: বিশ্ব জনসংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি
| সাল | জনসংখ্যা (বিলিয়ন) |
| ১৮০০ | ০.৯ |
| ১৯০০ | ১.৬৫ |
| ১৯৬০ | ৩ |
| ১৯৮০ | 8.8 |
| ২০১৫ | ৭.৪ |
| ২০৪০ | (সম্ভাব্য) ৯.২ |
| ২১০০ | (সম্ভাব্য) ১১.২ |
সূত্র: UN and HYDE: Ourworldindata.org
সারণি-২.২: মহাদেশভিত্তিক জনসংখ্যার ঘনত্ব ও বণ্টন (২০১৮)
| মহাদেশ | জনসংখ্যা (২০১৮) | আয়তন (বর্গ কি. মি.) | ঘনত্ব (বর্গ কি.মি.-এ) | বিশ্ব জনসংখ্যার অংশীদার (%) |
| এশিয়া | ৪,৫৪৫,১৩৩,০৯৪ | ৩১,০৩৩,১৩১ | ১৪৬ | ৫৯.৫৫ |
| আফ্রিকা | ১,২৮৭,৯২০,৫১৮ | ২৯,৬৪৮,৪৮১ | ৪৩ | ১৬.৮৭ |
| ইউরোপ | ৭৪২,৬৪৮,০১০ | ২২,১৩৪,৯০০ | ৩৪ | ৯.৭৩ |
| মহাদেশ | জনসংখ্যা (২০১৮) | আয়তন (বর্গ কি. মি.) | ঘনত্ব (বর্গ কি.মি.-এ) | বিশ্ব জনসংখ্যার অংশীদার (%) |
| উত্তর আমেরিকা | ৫৮৭,৬১৫,৯৭৬ | ২১,৩২৯,৯২৬ | ২৮ | ৭.৭০ |
| দক্ষিণ আমেরিকা | ৪২৮,২৪০,৫১৫ | ১৭,৪৬১,১১২ | ২৫ | ৫.৬১ |
| অস্ট্রেলিয়া | ৪১,২৬১.২১২ | ৮,৪৮৬,৪৬০ | ৫ | ০.৫৪ |
সূত্র: worldometers.2019
এশিয়া মহাদেশের জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৪.৪ বিলিয়ন যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০%। পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশ হচ্ছে চীন ও ভারত এবং এখানে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৩৭% লোকের বসবাস।
সারণি-২.৩: পৃথিবীর জনবহুল ১০টি দেশ (২০১৮)
| ক্রম | দেশ | জনসংখ্যা (মিলিয়নে) | ক্রম | দেশ | জনসংখ্যা (মিলিয়নে) |
| ১ | চীন | ১,৪১৫ | ৬ | পাকিস্তান | ২১০ |
| ২ | ভারত | ১,৩৫৪ | ৭ | নাইজেরিয়া | ১৯৫ |
| ৩ | যুক্তরাষ্ট্র | ৩২৬ | ৮ | বাংলাদেশ | ১৬৬ |
| ৪ | ইন্দোনেশিয়া | ২৬৬ | ৯ | রাশিয়া | ১৪৩ |
| ৫ | ব্রাজিল | ২০০ | ১০ | মেক্সিকো | ১৩০ |
Source: US Census Bureau, 30 June, 2018
রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে জনসংখ্যার আকারগত বৈশিষ্ট্যের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। জনমিতিক প্রক্রিয়ায় বিশেষ করে পরিবর্তন প্রক্রিয়ার আকারগত বৈশিষ্ট্যের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। আকারগত বৈশিষ্ট্য জনসংখ্যার মোট বৃদ্ধির পরিমাণকে প্রভাবিত করে।
২. ঘনত্ব (Density): ঘনত্ব বলতে সাধারণভাবে কোনো বস্তুর উপাদানগত দৃঢ়তা বা সংবদ্ধতা বোঝানো হয়ে থাকে। জনসংখ্যার ঘনত্ব বলতে বিভিন্ন মানুষের সংবদ্ধতা তথা জনবসতির নিবিড়তা বোঝানো হয়ে থাকে। ঘনত্বের দ্বারা ভূমির ওপর জনসংখ্যার চাপের তীব্রতা প্রকাশ পেয়ে থাকে। গাণিতিকভাবে কোনো দেশের জনসংখ্যাকে ঐ দেশের আয়তন দিয়ে ভাগ করলে জনসংখ্যার ঘনত্ব পাওয়া যায়।
সারণি ২.৪: ঘনত্বের ভিত্তিতে জনবহুল দেশের তালিকা (২০১৮)
| ক্রম | দেশ | আয়তন (বর্গ কিমি) | ঘনত্ব (বর্গ কি.মি.-এ) |
| ১ | মোনাকো | ২.০২ | ২৬,১০৫ |
| ২ | মেকাও | ৩০.৫ | ২১,১৫১ |
| ৩ | সিঙ্গাপুর | ৭১৯.২ | ৮,২৭৪ |
| ৪ | হংকং | ৬.৩৪ | ৭,০৭৫ |
| ৫ | বাহরাইন | ৭৫৭ | ২,০৬১ |
| ক্রম | দেশ | আয়তন (বর্গ কিমি) | ঘনত্ব (বর্গ কি.মি.-এ) |
| ৬ | মালদ্বীপ | ২৯৮ | ১,৪৮১ |
| ৭ | মাল্টা | ৩১৫ | ১,৩৫০ |
| ৮ | বাংলাদেশ | ১,৪৭,৫৭০ | ১,২৭৮ |
| ৯ | বারমুডা | ৫৩.২ | ১,২২১ |
উপরে প্রদত্ত পৃথিবীর জনবহুল রাষ্ট্রগুলোর ঘনত্ব পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বসতির নিবিড়তা ও সংবদ্ধতার দিক থেকে এদের মধ্যে ব্যাপক তারতম্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে তুলনা করা যেতে পারে। জনসংখ্যার আকারগত বৈশিষ্ট্যে উভয় দেশ প্রায় সমপর্যায়ভুক্ত। কিন্তু ঘনত্বের দিক থেকে উভয় দেশের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান। উল্লেখ্য, জনবহুলতা তথা কোনো স্থানে জনসংখ্যার যে সমাবেশ বা পুঞ্জীভবন তা নির্ভর করে প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নানাবিধ ভৌগোলিক উপাদানের ওপর। সমতলভূমি, উর্বর মৃত্তিকা, নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু, স্থল ও নৌপথে যাতায়াতের বিশেষ সুবিধা, শিল্পের কেন্দ্রায়ন, রাজধানী ও অন্যান্য শহর বন্দরের অবস্থান ইত্যাদি জনসংখ্যার ঘনত্বকে প্রভাবিত করে থাকে।
৩. বয়স কাঠামো (Age Structure): কোনো ব্যক্তি জনসংখ্যার কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে পারে না। জনসংখ্যার বয়স কাঠামো কোনো দেশের অর্থনৈতিক সামাজিক অবস্থার প্রকাশ ঘটায়, জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক পরিমাপ করতে হলে জনসংখ্যাকে বিভিন্ন বয়স শ্রেণিতে বিভক্ত করা প্রয়োজন। প্রজনন ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে কোনো জনসংখ্যাকে সাধারণভাবে তিনটি বয়স শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়ে থাকে, যথা-
i. শিশু ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক: সাধারণত ১৪ অথবা ১৯ বছরের কম বয়স্কদের শিশু বা অপ্রাপ্ত বয়স্ক ধরা হয়।
ii. প্রাপ্ত বয়স্ক: ১৫ থেকে ৫৯ কিংবা ১৫ থেকে ৬৪, অথবা ১৯ থেকে ৫৯ কিংবা ১৯ থেকে ৬৪ বছর বয়স্কদের প্রাপ্তবয়স্ক বলা হয়।
iii. বৃদ্ধ: ৬০ বছর ও তদুর্ধ্ব অথবা ৬৫ বছর ও তদুর্ধ্ব বয়স্কদের বৃদ্ধ বলে ধরা হয়।
কোনো দেশের জনসংখ্যার বয়স কাঠামো জনসংখ্যার পিরামিডের মাধ্যমে দেখানো যায়। যদিও জনসংখ্যা কাঠামো সবসময় পিরামিডের আকার ধারণ নাও করতে পারে। আবার উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশের জনসংখ্যা পিরামিডও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।
৪. উৎপাদনশীলতা ও জন্মহার (Productivity and Birth rate): নারীদের সন্তান ধারণ করার ক্ষমতা বা সামর্থ্যকে সমাজবিজ্ঞানী ও জনবিজ্ঞানীগণ Fecundity বা উর্বরতা এবং প্রকৃত সন্তান ধারণ অর্থাৎ সন্তান জন্মদানকে Fertility বা প্রজননশীলতা বলে অভিহিত করে থাকেন। কোনো দেশের উন্নতিতে প্রজননশীলতা বা বংশবৃদ্ধির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। প্রজননশীলতা যেমন কোনো সমাজের অস্তিত্ব বিপন্ন করতে পারে, তেমনি অতি প্রজননশীলতা বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। সামাজিক ও জনমিতিক পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় প্রজননশীলতার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। প্রজননশীলতা পরিমাপ করার জন্য জনমিতিতে কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সেগুলো হলো:
i. স্থূল বা অশোধিত জন্মহার (Crude Birth Rate - CBR)
ii. স্বাভাবিক জন্মহার (Natural or Physiological Birth Rate - NBR)
iii. সাধারণ প্রজননশীলতা হার (General Fertility Rate - GFR)
iv. প্রজননশীলতা অনুপাত (Fertility Ratio)
V. বয়স নির্দিষ্ট জন্মহার (Age Specific Birth Rate - ASFR)
vi. মোট জন্মহার (Total Birth Rate - TFR)
vii. স্থূল প্রজনন হার (Gross Reproduction Rate - GRR)
viii. নীট প্রজনন হার (Net Reproduction Rate - NRR)
৫. মৃত্যুহার (Death rate): জনসংখ্যার আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মৃত্যুহার। মৃত্যুহার জনসংখ্যার বৃদ্ধি প্রক্রিয়াকে যেমন প্রভাবিত করে তেমনি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে থাকে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে যে সময় ও স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, অকাল ও অত্যধিক মৃত্যুর ফলে তা বিঘ্নিত হতে পারে। মৃত্যুহার বিভিন্নভাবে পরিমাণ ও প্রকাশ করা যেতে পারে। নিম্নে মৃত্যুহার পরিমাপের কয়েকটি পদ্ধতি এত দেওয়া হলো
i. স্কুল বা অশোধিত মৃত্যুহার (Crude Death Rate - CDR)
ii. বয়স নির্দিষ্ট মৃত্যুহার (Age Specific Death Rate - ASDR)
iii. শিশু মৃত্যুহার (Infant Mortality Rate - IMR)
iv. প্রমিত মৃত্যুহার (Standardified Death Rate - SDR)
v. জন্মকালীন আয়ু প্রত্যাশা (Expectation of Life in Birth
কোনো দেশের মৃত্যুহার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্যতম কারণগুলো হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঝড়, ভূমিকম্প, বন্যা, দুর্ভিক্ষ, মহামারী। এছাড়াও রয়েছে যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ, রোগ, দুর্ঘটনা ইত্যাদি।
৬. লিঙ্গ অনুপাত (Sex ratio): নারী-পুরুষ অনুপাত বা লিঙ্গ অনুপাত একটি গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক উপাদান। Sex-ratio বলতে প্রতি হাজারে নারী-পুরুষের সংখ্যা অথবা নারীতে পুরুষ সংখ্যাকে বুঝায়। যেমন: তিনটি ভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে এই অনুপাত দেখানো যায়।
i. প্রতি ১০০ বা ১০০০ মহিলার মধ্যে পুরুষ সংখ্যা অথবা এর বিপরীত।
ii. মোট জনসংখ্যায় মহিলা বা পুরুষের সংখ্যা।
iii. দশমিক আকারে নারী বা পুরুষের সংখ্যা।
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
Read more