hsc

পাঠ-৬: প্রাকৃতিক গ্যাস

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.2k

(Natural Gas)

পৃথিবীর কোনো কোনো অঞ্চলে গ্যাসীয় অবস্থায় হাইড্রোকার্বনের মিশ্রণ (HC) পাওয়া যায়। প্রকৃতিতে প্রাপ্ত এই ধরনের গ্যাসকে প্রাকৃতিক গ্যাস বলে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি উৎপাদনকারী খনিজ সম্পদ হচ্ছে এই গ্যাস। । মূলত এটি মিথেন (CH₁) সমৃদ্ধ গ্যাস। বিভিন্ন জৈবিক উপাদান (উদ্ভিদ ও প্রাণির দেহাবশেষ) থেকে এ গ্যাস সৃষ্টি হয়। বিদ্যুৎ ও বিভিন্ন শিল্পদ্রব্য (যেমন- সার) উৎপাদন এবং কারখানা ও পরিবহনে জ্বালানি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হয়।
প্রাকৃতিক গ্যাসের সঞ্চয়: রাশিয়া, ইরান, কাতার, সৌদি আরব, তুর্কেমিনিস্তান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা প্রভৃতি পৃথিবীর প্রধান প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে পরিচিত। বর্তমান বিশ্বে প্রাকৃতিক গ্যাসের মোট মজুদের পরিমাণ
৬৯৫১.৮ ট্রিলিয়ন ঘনফিট। (সূত্র: Statistical Review Of World Energy, 2019)

সারণি ৫.৪: বিশ্বের প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী দেশসমূহ (২০১৮)

অবস্থানদেশের নামউৎপাদন (বিলিয়ন কিউবিক মিটার)সঞ্চিতির পরিমাণ (ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট)
১.যুক্তরাষ্ট্র৮৩১.৮৪১৯.০৮
২.রাশিয়া৬৬৯.৫১৩৭৫.০
৩.ইরান২৩৯.৫১১২৭.৭
৪.কানাডা১৮৪.৭৬৫.৪
৫.কাতার১৭৫.৫৮৭২.১
৬.চীন১৬১.৫২১৪.৪
৭.অস্ট্রেলিয়া১৩০.১৮৪.৪
৮.নরওয়ে১২০.৬৫৬.৮
৯.সৌদি আরব১১২.১২০৮.১
১০আলজেরিয়া৯২.৩১৫৩.১
১১.ইন্দোনেশিয়া৭৩.২৯৭.৫
১২.মালয়েশিয়া৭২.৫৮৪.৫
১৩.সংযুক্ত আরব আমিরাত৬৪.৭২০৯.৭
১৪.তুর্কেমিনিস্তান৬১.৫৬৮৮.১
সমগ্র বিশ্ব৩৮৬৭.৯.৬৯৫১.৮

সূত্র: BP Statistical Review Of World Energy-2019

বিশ্বের প্রধান প্রধান প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী দেশসমূহ

১. যুক্তরাষ্ট্র: পৃথিবীর শীর্ষ প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস, লুইজিয়ানা, ক্যালিফোর্নিয়া, ওকলাহোমা প্রভৃতি অঞ্চলে প্রধান গ্যাসক্ষেত্রগুলো অবস্থিত। দেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদের পরিমাণ ৩০৮.৫ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার। ২০১৮ সালে দেশটির মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৮৩১.৮ বিলিয়ন ঘনফিট।
২. রাশিয়া: প্রাকৃতিক গ্যাসের সখ্যয় ও উত্তোলনের দিক থেকে রাশিয়া বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানের অধিকারী। রাশিয়ার গ্যাসক্ষেত্রগুলো কৃষ্ণসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চল, ভলগা অববাহিকা, শাখালিন দ্বীপপুঞ্জ প্রভৃতি অঞ্চলে অবস্থিত। দেশটিতে প্রাকৃতিক প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদের পরিমাণ ১৩৭৫ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট। । ২০১৮ সালে দেশটির মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৬৬৯.৫ বিলিয়ন ঘনফিট।
৩. ইরান: ইরান পৃথিবীর তৃতীয় প্রধান প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। ইরানের অধিকাংশ তেলক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হয়। হামদান, কেরামনশাহ, কুম, লালি প্রভৃতি এদেশের প্রধান গ্যাস উৎপাদনকারী অঞ্চল। দেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদের পরিমাণ ১১২৭.৭ ট্রিলিয়ন ঘন ফিট। ২০১৮ সালে দেশটির মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২৩৯.৫ বিলিয়ন ঘনফিট।

৪. কানাডা: প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনে কানাডা বিশ্বে চতুর্থ স্থানের অধিকারী। আলবার্টা প্রদেশের গ্রান্ডপ্রেইরি, ব্রিটিশ কলম্বিয়া রাজ্য, বুইকক্রিক এবং ব্লুবেরি অঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাসের খনিগুলো অবস্থিত। দেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদের পরিমাণ ৬৫.৪ ট্রিলিয়ন ঘনফিট। ২০১৮ সালে দেশটির মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৮৪.৭ বিলিয়ন ঘনফিট।
৫. কাতার: কাতার বিশ্বের পঞ্চম গ্যাস উত্তোলনকারী দেশ। আয়তনে ছোট হলেও দেশটি বর্তমানে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন গ্যাস ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে। দেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদের পরিমাণ ৮৭৯.৯ ট্রিলিয়ন ঘনফিট। ২০১৮ সালে দেশটির মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৭৫.৫ বিলিয়ন ঘনমিটার।
৬. চীন: চীন দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষেত্রগুলো থেকে বর্তমানে প্রচুর গ্যাস উত্তোলন করছে। দেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদের পরিমাণ ২১৪.৪ ট্রিলিয়ন ঘনফিট। ২০১৮ সালে দেশটির মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৬১.৫ বিলিয়ন ঘনমিটার।
৭. অস্ট্রেলিয়া: বিশ্বের সপ্তম প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ অস্ট্রেলিয়া। দেশটির উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ৮৪.৪ ট্রিলিয়ন ঘনফিট। ২০১৮ সালে দেশটি ১৩০.১ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস উত্তোলন করে।
৮. নরওয়ে: বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনকারী দেশ হচ্ছে নরওয়ে। নরওয়ের গ্যাসক্ষেত্রগুলো সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত। ২০১৮ সালে দেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদনের পরিমাণ ১২০.৬ বিলিয়ন ঘনমিটার। দেশটির মোট সঞ্চিতির পরিমাণ ছিল ৫৬.৮ ট্রিলিয়ন ঘনফিট।
৯. সৌদি আরব: তেল সমৃদ্ধ সৌদি আরবের তেলের খনি থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া যায়। প্রধান গ্যাসক্ষেত্রগুলো সাফানিয়া, আবু সাফা, মনিফা, দাহরান, দাম্মাম প্রভৃতি স্থানে অবস্থিত। দেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদের পরিমাণ ২০৮.১ ট্রিলিয়ন ঘনফিট। ২০১৮ সালে দেশটির মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১১২.১ বিলিয়ন ঘনমিটার।
১০. আলজেরিয়া: দেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদের পরিমাণ ১৫৩.১ ট্রিলিয়ন ঘনফিট। ২০১৮ সালে দেশটির মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৯২.৩ বিলিয়ন ঘনমিটার। আলজেরিয়ার হাসিমাসুদ, এদজাইল, বুগি প্রভৃতি স্থানে প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া যায়।
১১. মালয়েশিয়া: বিশ্বের ১২তম গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ মালয়েশিয়া। দেশটিতে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ৮৪.৫ ট্রিলিয়ন ঘনফিট। ২০১৮ সালে দেশটির মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৭২.৫ বিলিয়ন ঘনমিটার।
১২. তুর্কেমিনিস্তান: বিশ্বের ১৪ তম প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। দেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদের পরিমাণ ৬৮৮.১ ট্রিলিয়ন ঘনফিট। ২০১৮ সালে দেশটির মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৬১.৫ বিলিয়ন ঘনমিটার।

অন্যান্য দেশসমূহ: উপরিউক্ত দেশগুলো ছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ইন্দোনেশিয়া, নেদারল্যান্ডস, উজবেকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, নাইজেরিয়া, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, যুক্তরাজ্য, ওমান প্রভৃতি। বাংলাদেশও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন করে থাকে। এদেশের মোট মজুদের পরিমাণ প্রায় ৫.৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। ২০১৮ সালে দেশটি ২৭.৫ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস উত্তোলন করে। (সূত্র: Statistical Review of World Energy-2019)

প্রাকৃতিক গ্যাসের অর্থনৈতিক গুরুত্ব

প্রাকৃতিক গ্যাস বিশ্বের অন্যতম প্রধান খনিজ সম্পদ। বিশ্বের জ্বালানি খাতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে এ গ্যাস থেকে। বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের জ্বালানি (বাস, রেল, জাহাজ, বিমান প্রভৃতি), সার শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে, বিভিন্ন শিল্প পণ্যদ্রব্যের (প্লাস্টিক রাবার) কাঁচামাল তৈরি এবং কারখানাগুলোতে তাপ উৎপাদনকারী শক্তি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস বহুল ব্যবহৃত হয়। এ জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার

১. প্রাকৃতিক গ্যাস শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কৃত্রিম রবার, কীটনাশক, সার, কালি, রং, সিমেন্ট, কৃত্রিম তত্ত্ব ইত্যাদি প্রস্তুত করতে গ্যাস কাঁচামাল হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
২. প্রাকৃতিক গ্যাস বিভিন্ন শিল্পকারখানায় শক্তি উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়। সিমেন্ট, লোহা ও ইস্পাত এবং রাসায়নিক শিল্পে শক্তি উৎপাদনের জন্য গ্যাসের ব্যবহার সর্বাধিক।
৩. খনিজ তেল শোধনের জন্য জ্বালানি হিসেবে তেল শোধনাগারে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করা হয়।
৪. বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে (বাংলাদেশ) গ্যাস ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হচ্ছে। লাদেশ) প্রাকৃতিক
৫. গাড়ির জ্বালানি হিসেবে রূপান্তরিত গ্যাস (CNG) ব্যবহার করা হয়।
৬. গৃহস্থালি অর্থাৎ রান্নাবান্নার কাজে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন- ঢাকা শহরে।

কোনো দেশের অর্থনীতির অগ্রগতি বহুলাংশে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কেননা যেকোনো দেশের শিল্পায়নে প্রাকৃতিক গ্যাসের ভূমিকা অপরিসীম।

খনিজ ও শক্তি সম্পদ-মো: আবদুল কুদ্দুস স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...