পাঠ-১০ ও ১১: জোয়ার-ভাটার সংজ্ঞা ও কারণ

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

8

(Definition of Ebb-Tide)

সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি সবসময় একই সমতলে থাকে না; দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর এক স্থানে ফুলে ওঠে এবং অন্য স্থানে নেমে যায়। পানির এ ফুলে উঠাকে জোয়ার (flow or high tide) এবং নেমে যাওয়াকে ভাটা (ebb or low tide) বলে। সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি কোনো স্থানে একবার ফুলে ওঠার ৬ ঘণ্টা ১৩ মি. পরে নেমে যায় অর্থাৎ ভাটা হয়। আবার ঐ স্থানে ভাটা হওয়ার ৬ ঘণ্টা ১৩ মি. পরে পুনরায় সমুদ্রের পানি ফুলে ওঠে অর্থাৎ জোয়ার হয়। সুতরাং আমরা বলতে পারি, সমুদ্রে একবার জোয়ার হওয়ায় ১২ ঘণ্টা ২৬ মি. পর পুনরায় জোয়ার হয়। পৃথিবীর উপর চন্দ্র ও সূর্যের আকর্ষণ, কেন্দ্রাতিগ বল ও মহাকর্ষ শক্তির আকর্ষণে মূলত জোয়ার-ভাটা হয়ে থাকে।

Trujillo (১৯৯৯)-এর মতে, 'জোয়ার-ভাটা হলো সমুদ্রের পানির নির্দিষ্ট অবস্থান বা সমুদ্র সমতল থেকে পানির নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ব্যাপী ওঠানামা।' সমুদ্রের পানির এই ওঠানামা মূলত চন্দ্র ও সূর্যের আকর্ষণেই হয়ে থাকে। তবে অন্যান্য জ্যোতিষ্কগুলোর আকর্ষণও কিছুটা কাজ করে। P.R. Pinet (2000)-এর মতে, 'জোয়ার-ভাটা হলো সাধারণ বায়ুতাড়িত সমুদ্রতরঙ্গের চেয়ে অনেক দীর্ঘ তরঙ্গ, যা অসাধারণ নিয়মতান্ত্রিকতায় নিয়মিতভাবে সমুদ্র সমতল ওঠানামার দ্বারা আবির্ভূত হয়। উপকূলীয় অঞ্চলে জোয়ার-ভাটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হলেও মাঝসমুদ্রে এর প্রভাব খুব বেশি অনুভূত হয় না।

জোয়ার-ভাটার কারণ (Causes of Ebb-Tide)

সমুদ্র এবং উপকূলবর্তী নদীর জলরাশি প্রতিদিনই কোনো একটি সময়ে ধীরে ধীরে ফুলে উঠছে এবং কিছুক্ষণ পরে আবার তা ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে। জলরাশির এ রকম নিয়মিত স্ফীতি বা ফুলে উঠাকে জোয়ার ও নেমে যাওয়াকে ভাটা বলে।
প্রাচীনকালে ধারণা ছিল পৃথিবীর শ্বাস গ্রহণের সময় পানি ফুলে জোয়ার এবং শ্বাস ত্যাগ করার সময় পানি নেমে গিয়ে ভাটার সৃষ্টি হয়। বর্তমানে বিজ্ঞানীগণ মনে করেন, পৃথিবীর ওপর চন্দ্র ও সূর্যের আকর্ষণ এবং পৃথিবীর আবর্তনের দরুন সৃষ্ট কেন্দ্রাতিগ শক্তিই জোয়ার-ভাটার জন্য দায়ী।

ক. মহাকর্ষের প্রভাব: মহাশূন্যে প্রতিটি গ্রহ-উপগ্রহই পরস্পরকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করছে। এ আকর্ষণের নাম
মহাকর্ষ। এ আকর্ষণের ফলে পৃথিবীসহ সকল গ্রহ সূর্যের চারদিকে এবং সকল উপগ্রহ গ্রহগুলোর চারদিকে ঘুরছে। এ আকর্ষণ শক্তির প্রভাবে পৃথিবীর উপরিভাগের তরল পানিরাশি, পৃথিবী হতে চ্যুত হতে পারে না কিন্তু স্ফীত হয়। এ মহাকর্ষশক্তির প্রভাব আবার সর্বত্র সমান নয়। যে গ্রহ বা উপগ্রহ যত বড় তার আকর্ষণ ক্ষমতা তত বেশি। আবার দূরত্ব বৃদ্ধি পেলে এ আকর্ষণ ক্ষমতা কমে যায়। অতএব, মহাকর্ষশক্তি দুইটি নিয়ামকের ওপর নির্ভর করে। যথা:

১. সরাসরি জ্যোতিষ্কের আয়তনের (ভর) ওপর এবং
২. জ্যোতিষ্কের দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতের ওপর। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত সূত্রটি,

F=Gm1m2d2

এখানে,

F = আকর্ষণ বল .

G = মহাকর্ষীয় ধ্রুবক

d = দূরত্ব

m1= পৃথিবীর ভর/আয়তন

m2 = চন্দ্রের ভর/আয়তন

সূর্য, চাঁদ অপেক্ষা দুই কোটি ষাট লক্ষ গুণ বড়। কিন্তু সূর্য, চাঁদ অপেক্ষা পৃথিবী হতে ৩৮০ গুণ দূরে অবস্থিত। এ জন্য পৃথিবীর ওপর সূর্য থেকে চাঁদের আকর্ষণ অনেক বেশি এবং অধিক কার্যকর। এ আকর্ষণশক্তি সূর্য থেকে ২.৫ গুণ বেশি। এ জন্যই চাঁদের আকর্ষণে পানিরাশি অধিক ফুলে ওঠে এবং জোয়ারের সৃষ্টি হয়। এ আকর্ষণশক্তি পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে কাজ করে, কিন্তু পানি তরল বলে এর উপরিভাগে আকর্ষণ শক্তি অধিক কার্যকরী হয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর কেন্দ্র ও পানির উপরিভাগের ওপর চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণশক্তির তারতম্যই জোয়ার-ভাটার কারণ।

খ. কেন্দ্রাভিমুখী প্রভাব কেন্দ্রাভিমুখী শক্তির প্রভাবেও জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হতে পারে। পৃথিবী তার অক্ষ বা মেরুদন্ডের ওপর চারদিকে দ্রুত বেগে ঘুরে। এ ঘূর্ণন গতির ফলে ভূপৃষ্ঠ হতে তরল পানিরাশি চতুর্দিকে নিক্ষিপ্ত হওয়ার প্রবণতা লাভ করে। একেই কেন্দ্রাভিমুখী বা বিকর্ষণশক্তি বলে। পৃথিবী নিজ কক্ষপথে ১,৬১০ কিলোমিটার বেগে পশ্চিম হতে পূর্ব দিকে আবর্তন করছে। পৃথিবী ও চাঁদের আবর্তনের জন্য ভূপৃষ্ঠের তরল ও হালকা পানিরাশির ওপর কেন্দ্রাভিমুখী শক্তির প্রভাব অধিক হয়। এর ফলে পানিরাশি ভূভাগ হতে বিচ্ছিন্ন হতে চায়। এভাবে কেন্দ্রাভিমুখী শক্তি জোয়ার সৃষ্টিতে সহায়তা করে।

এক্ষেত্রে ব্যবহৃত সূত্রটি হচ্ছে-

C=mv2r

এখানে, C = কেন্দ্রাভিমুখী শক্তি

m = পৃথিবীর ভর

v = পৃথিবীর গতিবেগ

r = ব্যাসার্ধ

ভাটার কারণ: পৃথিবীর মোট পানিরাশির পরিমাণ সব জায়গায় (উপরিতল) সমান। পৃথিবীর এক অংশে যখন মুখ্য জোয়ার ও তার বিপরীত অংশে গৌণ জোয়ার হয়; তখন ঐ স্থানদ্বয়ের মধ্যবর্তী সমকোণে অবস্থিত অংশদ্বয় থেকে পানিরাশি আগের স্থানদ্বয়ের দিকে প্রবাহিত হওয়ায় সেখানে পানিরাশি কমে যায়। ফলে ঐ স্থানদ্বয়ে ভাটার সৃষ্টি হয়। এক স্থানে প্রতিদিন দুইবার ভাটা হয়। জোয়ার ও ভাটা প্রত্যেকটির স্থিতিকাল প্রায় ৬ ঘণ্টা।

সুমদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটা-প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...