(Medicine Industry)
চিকিৎসা সেবার একটি আবশ্যিক অনুষঙ্গ ওষুধ। বর্তমান বিশ্বে ওষুধ অন্যতম বৃহত্তম এবং লাভজনক শিল্প। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প অত্যন্ত সম্ভাবনাময় উদীয়মান শিল্প খাত হিসেবে চিহ্নিত। অনেক সংকটের মধ্য দিয়েও এই শিল্প সুষ্ঠু বিকাশ ও মানসম্মত উৎপাদনশীলতার জন্য যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে, আন্তর্জাতিক মান অর্জনে সক্ষম হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালীকরণে এই শিল্প উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বর্তমান অবস্থা: বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলো জাতীয় ওষুধ নীতি। ১৯৮২ সালে কার্যকর হওয়া এই নীতির উদ্দেশ্য বাজার থেকে ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ অপসারণ করে সকল ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ওষুধের ন্যায্যমূল্যে প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। এই নীতির ফলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প দ্রুত বিকাশ লাভকরেছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন মেটানোর পর রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বর্তমানে দেশের মোট চাহিদার ৯৮ শতাংশ ওষুধ দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। অথচ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ৯৬ শতাংশ ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। বর্তমানে ৫৪টি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের প্রায় ১৪৬ টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩৫১৪.২৮ কোটি টাকার ওষুধ রপ্তানি করেছে।
বাংলাদেশের ছোট-বড় নিবন্ধিত ওষুধ কোম্পানির সংখ্যা ২৫৭টি। এদের মধ্যে প্রধান ৫৪ টি কোম্পানি ১৯৯০ সাল থেকে সিংহভাগ (৮৫%) ওষুধ রপ্তানি করে আসছে। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠান হতে উৎপন্ন প্রায় ১৮০০ শ্রেণির ওষুধের মধ্যে প্রায় ৩০০ প্রকার ওষুধ বিশ্ব বাজারে রপ্তানি হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে এন্টিবায়োটিক, এনালজেসিক, কন্ট্রাসেপ্টিক, স্টিমুলেন্ট, ভিটামিন, ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট, হার্বাল ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ রয়েছে। ২০৩৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের দুটি ওষুধ কোম্পানি যথা- স্কয়ার এবং বেক্সিমকো ফার্মা FDA কর্তৃক ওষুধ রপ্তানির অনুমোদন প্রাপ্ত (Intellcetul property rights)। ইনসেপ্টা ফার্মাও এ অনুমোদনের আশা করছে। FDA (US Food and Drugs Administration) কর্তৃক এ স্বীকৃতি দেশের ওষুধ রপ্তানি আয়কে কয়েকগুণ বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা যায়। ফার্মাসিউটিক্যালসের কোনো প্রোডাক্ট ডাক্তার, ওষুধ বিক্রেতা ও ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হলে তা বিনিয়োগকারীর ব্যাপক লাভের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। মানবসেবার মহান ব্রত ছাড়া শুধু অর্থনৈতিক লাভ কিংবা নিছক ব্যবসায়িক স্বার্থকে কেন্দ্র করে চলাটা এ শিল্পের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য নয়। ওষুধ শিল্পদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ইতিবাচক মনোভাব এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা, আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে দ্রুততার সাথে এই শিল্পের বিস্তৃতি লাভকে সহজ করেছে।
সারণি-৬.১০: ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল রপ্তানি বাণিজ্য (কোটি টাকা)
| সাল | প্রস্তুতকৃত ওষুধ | ওষুধের কাঁচামাল | মোট রপ্তানি | যতটি দেশে রপ্তানি করে |
| ২০১৪ | ৭১৪.২০ | ১৯.০৭ | ৭৩৩.২৭ | ৯২ |
| ২০১৫ | ৮১২.৫০ | ১৯৫.৫৮ | ১০০৮.০৮ | ১১৩ |
| ২০১৬ | ২২৪৫ | ১.৪০ | ২২৪৭.০৫ | ১২৭ |
| ২০১৭ | ৩১৯২.৪৬ | ৩.৮৬ | ৩১৯৬.৩২ | ১৪৫ |
| ২০১৮ | ৩৫০৮.১৭ | ৬.১২ | ৩৫১৪.২৮ | ১৪৬ |
সূত্র: ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, ২০১৯
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে করণীয়: ওষুধ শিল্পের সাথে জড়িতদের WHO (world Health Organization) কর্তৃক স্বীকৃত ওষুধ তৈরির উত্তম পদ্ধতি CGMP (Current Good Manufacturing Practices) এর নির্দেশনাসমূহ অনুসরণে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। ওষুধ কোম্পানির আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএফপিএমএ (IFPMA-International. Federation of Pharmaceuticals Manufacturares Association) এর নির্দেশনার ব্যাপারেও শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। WHO-এর শীর্ষ সিদ্ধান্তের ব্যাপারেও পূর্ণ মনোযোগ থাকতে হবে।
ওষুধের কাঁচামালের বেশিরভাগ (প্রায় ৭০ শতাংশ) বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কাঁচামাল দেশেই তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন নতুন ওষুধ আবিষ্কারে আমাদের মৌলিক গবেষণার দিকেও নজর দেয়া দরকার। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে WTO (World Trade Organization) নীতিমালা অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য প্যাটেন্ট ড্রাগ উৎপাদনের ক্ষেত্রে কোন ধরনের রয়েলিটি আরোপ করা হয়নি। দ্রুত এপিআই শিল্প পার্ক স্থাপন করা হলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পখাত আগামী ৫ বছরে তৈরি পোশাক শিল্পের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সক্ষম হবে। সমগ্র বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ভেষজ উদ্ভিদের চাহিদা রয়েছে। সুতরাং, এলোপ্যাথিক ওষুধের পাশাপাশি ভেষজ ওষুধও তৈরি করা যায়। দেশের বেশিরভাগ মানুষ গরীব হওয়ায় বেশি দামে ওষুধ ক্রয় করা সম্ভবপর হয় না। পুরো ডোজ শেষ না করেই তারা ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেয়। ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা দরকার। ওষুধ শিল্পের অধিকাংশ কাঁচামাল দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব হলে মানবতার কল্যাণে এ শিল্পের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব।
উৎপাদিত ওষুধে মূল্য সংযোজন এবং জেনেরিক প্রোডাক্ট উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ওষুধের আন্তর্জাতিক বাজার দখল করতে পারে। বর্তমান বিশ্বে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের ওষুধের বাজার রয়েছে। ভারত ও চীন চুক্তিবদ্ধ উৎপাদনের মাধ্যমে বিশাল অংকের ওষুধ রপ্তানি করলেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির কারণে তাদের রপ্তানির সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এ সুযোগ লুফে নিতে পারে।
বিশ্বায়নের এই যুগে ওষুধ শিল্প একটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ওষুধ বেচাকেনায় যোগ দিতে পণ্যের সর্বোচ্চ মান নিয়ন্ত্রণ রপ্তানির পূর্বশর্ত। তাই পণ্য গুণে ও মানে এমন হবে যে প্রচারে ও প্রসারে বাংলাদেশ থাকবে সামনের সারিতে। বিদেশে এদেশের ওষুধের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য এর গুণগতমান পরীক্ষার পদ্ধতি অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানের করতে হবে। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পকে বিদেশে উপস্থাপন করতে ওষুধ শিল্প প্রদর্শনী মেলা বেশি বেশি করা জরুরি। চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ওষুধে ভেজাল থাকার কারণে অনেক রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে এসকল ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে।
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প এবং আগামীর চ্যালেঞ্জ: দিনে দিনে ওষুধের জন্য ব্যয় বাড়ছে। ওষুধ কেনার ক্ষমতা সবার সমান নয়। এক্ষেত্রে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বিরাট বৈষম্য দেখা যায়। উন্নত দেশগুলো উৎপাদিত ওষুধের ৮৬% ব্যবহার করে, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলো ব্যবহার করে ১৪% ওষুধ। অথচ জনসংখ্যার মাত্র ২৫% মানুষ বসবাস করে উন্নত দেশে আর ৭৫% বাস করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে।
পৃথিবীতে যে তিনটি ব্যবসা সবচেয়ে বেশি অর্থ এনে দেয় তার মধ্যে ওষুধ সবার উপরে অবস্থান করছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতেও এটি নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি শিল্পের ভবিষ্যৎ অনেক উজ্জ্বল। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম। ওষুধ মানব কল্যাণে বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় অবদান। আলেকজান্ডার ফ্লেমিং আবিষ্কৃত পেনিসিলিন কিংবা গুটি বসন্ত, পোলিওসহ বিভিন্ন রোগের টিকা অথবা আমাদের ICDDRB (International Centre for Diarrhoeal Disease Research, Bangladesh) আবিষ্কৃত খাবার স্যালাইন পৃথিবীর কোটি মানুষের প্রাণ রক্ষা করছে। সবচেয়ে জনপ্রিয়, দ্রুত বর্ধনশীল, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং সেবামূলক এই শিল্পে বিনিয়োগ করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কর্মক্ষম সুস্থ সবল জাতি গঠনে অবদান রাখতে আমাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে।
খনিজ ও শক্তি সম্পদ-মো: আবদুল কুদ্দুস স্যারে লেখা বই
Read more