(Mineral and Energy Resources of India)
ভারত খনিজ সম্পদে যথেষ্ট সমৃদ্ধ। বিশাল আয়তন এবং ভূতাত্ত্বিক গঠনগত কারণে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরনের খনিজ ও শক্তি সম্পদ পাওয়া যায়। খনিজ তেল, আকরিক লৌহ, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস, গ্রাফাইট, বক্সাইট, ম্যাঙ্গানিজ, অভ্র প্রভৃতি নানাবিধ খনিজ সম্পদ এদেশে পাওয়া যায়। ভারতের দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতিতে খনিজ সম্পদসমূহ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
ভারতের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও শক্তি সম্পদ
ক. আকরিক লৌহ; আকরিক লৌহ ভারতের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ। ভারতে প্রাপ্ত আকরিক লৌহ হেমাটাইট ও ম্যাগনেটাইট শ্রেণির অর্থাৎ অতি উন্নতমানের। এদেশের প্রধান আকরিক লৌহের খনিগুলো বিহারের মালভূম, সিংভূম, উড়িষ্যার কেওনাঝাড়, ময়ূরভজ্ঞ, বোনাই, মধ্যপ্রদেশের দুগ, বাস্তার, রায়পুর, বিলাসপুর প্রভৃতি অঞ্চলে অবস্থিত। এছাড়া কর্নাটক, অস্ত্রপ্রদেশ, গোয়া, মহারাষ্ট্র প্রভৃতি রাজ্যেও আকরিক লৌহ পাওয়া যায়। U.S. Geological Servey, 2020 অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ভারত মোট ২০৫ মিলিয়ন টন আকরিক লৌহ উত্তোলন করে, যা পৃথিবীর ৪র্থ শীর্ষস্থানীয়। দেশটিতে সঞ্চিত আকরিক লৌহের পরিমাণ প্রায় ৫,৫০০ মিলিয়ন টন। ব্যবহার: ভারতে প্রাপ্ত আকরিক লৌহের উপর ভিত্তি করে বিহারের জামশেদপুরে গড়ে উঠেছে বিশাল লৌহ ও ইস্পাত শিল্প কারখানা। শিল্পের কাঁচামাল, পরিবহন সামগ্রী, যুদ্ধাস্ত্র, বৈদ্যুতিক সামগ্রী, গৃহনির্মাণ উপকরণ, কৃষি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রভৃতি তৈরিতে আকরিক লৌহের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। ভারতের উদীয়মান অর্থনীতিতে আকরিক লৌহ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
খ. সীসা: ভারত বিশ্বের সপ্তম সীসা উত্তোলনকারী দেশ। ভারতের বিহার, ওড়িষ্যা, আসাম, মেঘালয় প্রভৃতি রাজ্যে সীসার খনিগুলো অবস্থিত। US Geological Survey-2020, অনুযায়ী, দেশটিতে সঞ্চিত সীসার পরিমাণ প্রায় ২,৫০০ মিলিয়ন টন। ২০১৮ সালে দেশটির সীসা উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৯২ মিলিয়ন টন। ব্যবহার: সীসা বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। যেমন- বিদ্যুৎ শিল্পে, যন্ত্রাংশ উৎপাদনে, পরিবহন খাতে, রাসায়নিক শিল্পে, রং প্রস্তুতিতে, সমরাস্ত্র নির্মাণে, গৃহস্থালির সামগ্রী তৈরি এবং শঙ্কর বা মিশ্র ধাতু উৎপাদনে সীসা ব্যবহৃত হয়।
গ. বক্সাইট: বক্সাইট ভারতের অন্যতম খনিজ সম্পদ। গুজরাট, মেঘালয়, মনিপুর প্রভৃতি রাজ্যে বক্সাইট পাওয়া যায়। ভারতে প্রায় ৬৬০ মিলিয়ন টন বক্সাইটের মজুদ আছে এবং দেশটি ২০১৮ সালে ২৩ মিলিয়ন টন বক্সাইট উত্তোলন করে।
ব্যবহার: বৈদ্যুতিক তার তৈরিতে, পরিবহনের যন্ত্রপাতি উৎপাদনে, গৃহনির্মাণে, আসবাবপত্র প্রস্তুতিতে, শঙ্কর ধাতু উৎপাদন প্রভৃতি কাজে বক্সাইট ব্যবহৃত হয়ে থাকে।।
ঘ. ম্যাঙ্গানিজ: ভারত পৃথিবীর অন্যতম প্রধান ম্যাঙ্গানিজ উৎপাদনকারী দেশ। ২০২০ সালে প্রকাশিত US
Geoglogical Survey এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে ৩৪ মিলিয়ন টন ম্যাঙ্গানিজ মজুদ আছে। দেশটি ২০১৮
সালে ৯৬১ হাজার টন ম্যাঙ্গানিজ উত্তোলন করে। ভারত পৃথিবীর অন্যতম ম্যাঙ্গানিজ রপ্তানিকারক দেশ। ব্যবহার: ভারতের লৌহ ও ইস্পাত শিল্পে ব্যাপকহারে ম্যাঙ্গানিজ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এছাড়া যানবাহন, সমরাস্ত্র নির্মাণ, কাঁচ প্রস্তুত ও মিশ্র ধাতু উৎপাদনে ম্যাঙ্গানিজের ব্যাপক ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়।
ঙ. কয়লা: পৃথিবীর কয়লা উৎপাদনের দিক থেকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়ার পরেই ভারতের অবস্থান চতুর্থ। দেশটিতে প্রায় ৯৭,৭২৮ মিলিয়ন টন কয়লা সঞ্চিত আছে। Statistical Review of World energy, 2019 এর মতে, দেশটি ২০১৮ সালে ৩০৮ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন করে। ভারতের দুই-তৃতীয়াংশ কয়লা পাওয়া যায় পশ্চিমবঙ্গের রানীগঞ্জ এবং বিহারের ঝারিয়া, গিরিডি, বোকারা, করাপুর প্রভৃতি অঞ্চল থেকে। অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে উড়িষ্যার তালচেরা, রামপুর, মধ্যপ্রদেশের সোহাগপুর, সাপুর, ছত্তিশগড়, তামিলনাডুর নিভেলি ও সালেম প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতই একমাত্র কয়লা সমৃদ্ধ দেশ।
ব্যবহার ও গুরুত্ব: ভারতে কয়লার সর্বোত্তম ব্যবহার হয় লৌহ ও ইস্পাত শিল্পে। জ্বালানি হিসেবে কয়লার সহজলভ্যতা ভারতের লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে চলেছে। এছাড়া বিভিন্ন যানবাহন ও কারখানায় জ্বালানি হিসেবে কয়লার বহুল ব্যবহার রয়েছে। দেশটি পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে (থাইল্যান্ড, মিয়ানমার) কয়লা রপ্তানি করে থাকে।
চ. প্রাকৃতিক গ্যাস: প্রাকৃতিক গ্যাস ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সম্পদ। Statistical Review of World energy, 2019 অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশটির প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদের পরিমাণ প্রায় ৪৫.৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। ভারতের আসাম রাজ্যের নাহারকাটিয়া, মোরান, হুগীরজান, টিনালি, উত্তর ভারতের কাংড়া এবং পশ্চিত ভারতে প্রাকৃতিক গ্যাসের খনিগুলো অবস্থিত।
ব্যবহার ও গুরুত্ব: বিভিন্ন শিল্প কারখানার কাঁচামাল হিসেবে, সার উৎপাদনে, যানবাহন ও কালকারখানার জ্বালানি হিসেবে, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং গৃহস্থালির রান্নার কাজে জ্বালানি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হয়।
ছ. খনিজ তেল: খনিজ তেল উৎপাদনে ভারত বেশ সমৃদ্ধ। ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা, আসাম, নাগাল্যান্ড, অন্ধ্রপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাট প্রভৃতি রাজ্যসমূহে খনিজ তেল উত্তোলিত হয়। Statistical Review of World Energy-2019 এর তথ্য মতে, ভারতে খনিজ তেলের মজুদের পরিমাণ প্রায় ৪.৫ হাজার মিলিয়ন ব্যারেল। ২০১৮ সালে দেশটির দৈনিক উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৬৯ হাজার ব্যারেল।
ব্যবহার: বিভিন্ন শিল্পের জ্বালানি, পরিবহন, কৃষি প্রভৃতি ক্ষেত্রে খনিজ তেল ব্যবহৃত হয়।
খনিজ ও শক্তি সম্পদ-মো: আবদুল কুদ্দুস স্যারে লেখা বই
Read more