hsc

পাঠ-১১: মেঘ সংঘটন ও শ্রেণিবিভাগ

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

14

(Formation & Classification of Clouds)

সম্পৃক্ত বায়ু উষ্ণ হলে তখন এটি আরও বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করতে পারে। আবার বায়ু শীতল হতে থাকলে পূর্বের মতো বেশি জলীয়বাষ্প ধারণ করে রাখতে পারে না। তখন জলীয়বাষ্পের কিছু অংশ পানিতে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়াকে ঘনীভবন বলে। ঊর্ধ্বমুখী সম্পৃক্ত বায়ু ঘনীভবন সমতলের আরও উপরে উঠে নানা প্রকারের মেঘের সৃষ্টি করে। বায়ু যদি দ্রুত বেগে উপরের দিকে উঠে ঘনীভবন ঘটায়, তাহলে মেঘের উলম্ব বিস্তৃতি হয় খুব বেশি। আর বায়ু যদি ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠে ঘনীভবন ঘটায়, তাহলে মেঘ অনুভূমিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন আকার ও আকৃতি, বর্ণ এবং আলোকের প্রতিফলন ও প্রতিসরণের বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে মেঘের শ্রেণিবিভাগ করা হয়। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) মেঘকে দশটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে। বোঝার সুবিধার জন্য উচ্চতা অনুযায়ী মেঘকে চারটি গোত্রে ভাগ করা হয়ে থাকে। যেমন- (ক) ঊর্ধ্ব মেঘ, (খ) মধ্যম উচ্চতার মেঘ, (গ) নিচের স্তরের মেঘ এবং (ঘ) উলম্ব বিস্তার সম্পন্ন মেঘ।

(ক) ঊর্ধ্ব মেঘ (High Altitude Clouds): ঊর্ধ্ব মেঘ ৬ km থেকে ট্রপোপজ (১২-১৫ Km) এর মধ্যে অবস্থান করে। এ উচ্চতায় বায়ুর তাপমাত্রা এত কম থাকে যে, বায়ু সম্পৃক্ত হলেও এর জলীয় পদার্থের পরিমাণ থাকে খুবই কম এবং তাপমাত্রা অত্যন্ত কম বলে ঘনীভবন হয় বরফকণার আকারে। ঊর্ধ্ব মেঘ গোত্রে তিন শ্রেণির মেঘ দেখা যায়। যেমন- ১. পালক মেঘ, ২. পালকপুঞ্জ মেঘ এবং ৩. ঊর্ধ্বস্তর মেঘ। এসব মেঘ থেকে অধঃক্ষেপণ হয় না।

১. পালক-মেঘ (Cirrus clouds): এ শ্রেণির মেঘকে দেখতে পাখির পালকের মতো বা চিত্রপটে আঁকা তুলির আঁচড়ের মতো মনে হয়। এগুলো আকাশের সবচেয়ে উঁচু মেঘ এবং বেশ স্বচ্ছ বা সাদা হয়ে থাকে। এসব মেঘ যখন আকাশে বিচ্ছিন্ন ও অবিন্যস্ত অবস্থায় অবস্থান করে তখন নির্মল আবহাওয়া নির্দেশ করে।
২. পালকপুঞ্জ মেঘ (Cirrocumulus clouds): এ শ্রেণির মেঘ আকাশের অনেক উপরের স্তরে, কিন্তু পালক মেঘের নিচে অবস্থান করে। এগুলো দেখতে পেঁজা তুলার মতো। সূর্যাস্তের সময় এসব মেঘ সূর্যের লাল বর্ণকে প্রতিফলন করে বলে আকাশকে লাল দেখায়।
৩. ঊর্ধ্বস্তর মেঘ (Cirrostratus clouds): পালকপুঞ্জ মেঘের নিচে এ শ্রেণির মেঘ অবস্থান করে। এ ধরনের মেঘ সাদা এবং বেশ হালকা ও স্বচ্ছ হয়ে থাকে। এসব মেঘের মধ্যে অবস্থিত বরফকণায় সূর্য ও চাঁদের আলোর Activ প্রতিসরণ (Reflaction) হয় বলে এরকম আবেষ্টনীর সৃষ্টি হয়। ঘূর্ণিঝড়ের (Cyclonic Storm) আগে এ ধরনের মেঘ আকাশে দেখা যায়।

(খ) মধ্যম উচ্চতার মেঘ (Mid Altitude clouds): আকাশে দুই থেকে ছয় km উচ্চতার মধ্যে মধ্যম উচ্চতার মেঘ
অবস্থান করে। মূলত জলকণা দিয়ে এ গোত্রের মেঘগুলো গঠিত। এ গোত্রের মেঘে দুটি পৃথক শ্রেণির মেঘ দেখা যায়। যেমন-১. উন্মেঘপুঞ্জ মেঘ ও ২. উন্মেঘস্তর মেঘ। এসব মেঘ থেকে কখনও কখনও অধঃক্ষেপণ (Precipitation) হয়ে থাকে।

৪. উন্মেঘপুঞ্জ মেঘ (Altocumulus clouds): এ শ্রেণির মেঘ হলো চাপা মেঘের পুঞ্জ। এসব মেঘ প্রধানত জলকণা
দিয়ে গঠিত। তবে যখন এসব মেঘের তাপমাত্রা বেশ নিচে নেমে যায় তখন এতে জলকণা ও বরফকণার মিশ্রণ দেখা যায়। এ থেকে কখনও কখনও বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। তবে সে বৃষ্টি সব সময় পৃথিবীতে এসে পৌঁছে না। এই মেঘ সাদাটে ধূসর রঙের সূক্ষ্ম ও মসৃণ পশমের গুচ্ছের মতো দেখায়। এগুলো নীল আকাশে টেউয়ের মতো ছড়িয়ে থাকে। এ মেঘ সুন্দর আবহাওয়ার প্রতীক।

৫. উন্মেঘস্তর মেঘ (Altostratus clouds): এ শ্রেণির মেঘগুলো Altocumulus মেঘের নিচে স্তরে স্তরে আঁশের মতো (Fibrous) অবস্থান করে। এদের বর্ণ ধূসর কিংবা নীলচে ধূসর হয়ে থাকে। Altocumulus মেঘের মতো এসব মেঘ থেকেও বৃষ্টিপাত হতে পারে। তবে এসব বৃষ্টি সব সময় পৃথিবীতে এসে পৌঁছে না। মেঘের তলদেশ থেকে ঝালরের মতো এসব বৃষ্টিকে ঝুলতে দেখা যায়।

(গ) নিচের স্তরের মেঘ (Low Altitude clouds): এ গোত্রের মেঘ দু' কিলোমিটার উচ্চতার নিচে অবস্থান করে। এ গোত্রের মেঘগুলো সম্পূর্ণভাবে জলকণা দিয়ে গঠিত। তবে মধ্য ও উচ্চ অক্ষাংশ অঞ্চলে শীতকালে এ গোত্রের মেঘে বরফকণা এবং তুষার অবস্থান করে। নিচের স্তরের মেঘের গোত্রে তিন শ্রেণির মেঘ দেখা যায়। সেগুলো হলো- ১. স্তরপুঞ্জ মেঘ বা স্তূপ মেঘ, ২. বর্ষণ মেঘ এবং ৩. স্তর মেঘ।

৬. স্তরপুঞ্জ বা স্তূপ মেঘ (Stratocumulus clouds): এ শ্রেণির মেঘ এক থেকে দুই কিলোমিটার উচ্চতায়
স্তূপাকারে সারিবদ্ধভাবে অবস্থান করে। এদের বর্ণ ধূসর থেকে গাঢ় ছাই রংয়ের হতে পারে। কখনও কখনও Altostratus মেঘকে স্তরপুঞ্জ মেঘ বলে মনে হয়। এ ধরনের মেঘ থেকে খুব কমই বৃষ্টিপাত হয়, হলেও তা খুবই সামান্য হয়ে থাকে।

৭. বর্ষণ মেঘ বা বর্ষণ স্তর মেঘ (Nimbus or Nimbostratus clouds): এ শ্রেণির মেঘ স্তরপুঞ্জ মেঘের নিচে অবস্থান করে। অতি ঘন ও কালো বর্ণের এসব মেঘ হতে অবিরাম হালকা থেকে মাঝারি রকমের বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। বৃষ্টিপাতের তীব্রতা (Intensity) কম হলেও দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টিপাত হয় বলে এ ধরনের মেঘ থেকে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি হয়ে থাকে।

৮. স্তর মেঘ (Stratus clouds): এ শ্রেণির মেঘ হলো ভূপৃষ্ঠের নিকটতম মেঘ। মেঘগুলো স্তরে স্তরে বিন্যস্ত থাকে। অনুভূমিকভাবে বিস্তৃত ছাই রংয়ের এ মেঘগুলো সারা আকাশকে ছেয়ে রাখে। পর্বতারোহী ও বিমান চালকদের জন্য এ মেঘ খুবই বিপদজনক।

(ঘ) উল্লম্ব বিস্তার সম্পন্ন মেঘ (Vertically developed clouds): এ গোত্রের মেঘগুলো কেবল উলম্বভাবেই বিস্তৃত হয়। এসব মেঘ কখনো সারা আকাশকে ঢেকে রাখে না, বরং এরা আকাশে বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করে। যে দু'শ্রেণির মেঘ এ গোত্রে দেখা যায়। সেগুলো হলো- ১. পুঞ্জ মেঘ এবং ২. ঝড়োপুঞ্জ মেঘ।

৯. পুঞ্জ মেঘ (Cumulus clouds): এ শ্রেণির মেঘগুলো বিশালাকার পেঁজা তুলার মতো বায়ুমণ্ডলের নিচের স্তরে
বিচ্ছিন্নভাবে ভেসে বেড়ায়। এদের গভীরতা ৫০ মি. থেকে ১০০০ মি. পর্যন্ত হতে পারে। স্বল্প গভীরতাসম্পন্ন পুঞ্জ মেঘগুলো নির্মল আবহাওয়া নির্দেশ করে।

১০. ঝড়োপুঞ্জ মেঘ (Cumulonimbus clouds): এ শ্রেণির মেঘগুলো অতি গভীর, ঘন, কালো এবং বিশাল
আকারের হয়ে থাকে। এদের গভীরতা ভূপৃষ্ঠ হতে আধা কিলোমিটার উপর থেকে ট্রপোপজ (১২-১৫km) পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে থাকে। ঊর্ধ্ব বায়ুতে পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে এ মেঘগুলো পূর্ব দিকে বিস্তৃত হয়ে কামারের লোহা পেটানোর নেহাই (anvil head) এর আকৃতি ধারণ করে। এ ধরনের মেঘ থেকে বজ্রপাত ও বিদ্যুৎসহ মুষলধারে বৃষ্টিপাত হয়। বর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হয়। কোনো কোনো সময় এসব মেঘ থেকে শিলাবৃষ্টিও হয়ে থাকে। বাংলাদেশের কালবৈশাখী ঝড় এ ধরনের মেঘ থেকে হয়ে থাকে।

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...