(Environment Conservation and Mineral Extraction)
ভূগর্ভে সঞ্চিত খনিজ একটি অন্যতম প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য ভাণ্ডার। মানবজাতির বৃহৎ কল্যাণ ও সার্বিক অগ্রগতির চাবিকাঠি এ খনিজ সম্পদ। নানারকম ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট এমন অসংখ্য মূল্যবান সম্পদ ভূঅভ্যন্তরে। আধুনিক বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সার্থক প্রয়োগ করে মানুষ এই সম্পদ আহরণ করে নিজের উন্নয়নের কাজে ব্যয় করছে। পৃথিবীর যে দেশ খনিজ সম্পদে যত বেশি সমৃদ্ধ এবং সফল ব্যবহার করতে পেরেছে, সেই দেশ তত বেশি উন্নত। এজন্য গোটা পৃথিবী জুড়ে মানুষ যথেচ্ছভাবে খনিজ সম্পদ আহরণে প্রবৃত্ত আছে। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত ও অপরিকল্পিতভাবে খনিজ সম্পদ আহরণের কিছু বিরূপ প্রতিক্রিয়া আছে। যেমন- অবাধ খনিজ সম্পদ উত্তোলনের ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে মৃত্তিকা ক্ষয়, ভূমিধস, বায়ু দূষণ প্রভৃতি। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস পাওয়াসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। এ কারণে শুধু আর্থিক লাভের বিষয়টি মাথায় রেখে খনিজ উত্তোলন করলে চলবে না। পরিমিত মাত্রায় খনিজ উত্তোলন করলে আর্থিক লাভের পাশাপাশি তা পরিবেশ রক্ষায় সহায়ক হয়। যেমন- উত্তোলিত খনিজ সম্পদের সার্থক ব্যবহার ভূমিধস রোধ, মৃত্তিকা ক্ষয় রোধ, বায়ু ও পানি দূষণ রোধ ছাড়াও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে।
পরিমিত মাত্রায় খনিজ সম্পদ উত্তোলন কীভাবে পরিবেশ দূষণ রোধ তথা পরিবেশ সংরক্ষণ করে তা নিচে বর্ণনা করা হলো-
ক. মৃত্তিকা ক্ষয়রোধ: আমরা জানি, অতি বর্ষণ, বায়ু বা পানি প্রবাহের প্রবল চাপ বা অন্যান্য কারণে মৃত্তিকা ক্ষয় হয়ে থাকে। কিন্তু মৃত্তিকার উপরের উপরের স্তর কঠিন শিলা দ্বারা আবৃত থাকলে তা ক্ষয় রোধ করে। এ কারণে রাস্তাঘাট তৈরি ছাড়াও নদী ও সমুদ্র তীরবর্তী বা অন্যান্য মৃত্তিকা ক্ষয়প্রবণ এলাকায় কঠিন শিলার ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়।
খ. ভূমিধস রোধ: সাধারণত খনি যদি কূপ পদ্ধতিতে খনন করে কয়লা উত্তোলন করা হয় তাহলে তা খরচ সাশ্রয়ী হলেও কয়লা উত্তোলনের পরবর্তী সময়ে ভূমিধসের ব্যাপক সম্ভাবনা দেখা দেয়। এক্ষেত্রে কূপ পদ্ধতির পরিবর্তে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করলে তা ভূমিধসের হাত থেকে জান ও মালকে রক্ষা করবে।
গ. পানি দূষণ রোধ: খুব গভীর করে খনি খনন করে তা থেকে খনিজ সম্পদ আহরণ করলে তা ভূগর্ভস্থ পানি দূষণের কারণ হতে পারে। এ কারণে একটি নির্দিষ্ট গভীরতার মধ্যে থেকে খনিজ সম্পদ আহরণ করা উচিত।
ঘ. বায়ু দূষণ রোধ: জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ তেল) আবিষ্কারের পূর্বে মানুষ তাপ উৎপাদনের জন্য উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করত। এর ফলে ব্যাপকহারে জ্বালানি হিসেবে উদ্ভিদ ব্যবহার করায় বায়ুতে প্রচুর কার্বন ডাইঅক্সাইডসহ অন্যান্য ক্ষতিকারক গ্যাস জমা হয়ে বায়ুকে দূষিত করে। কিন্তু পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে কয়লা, খনিজ তেল এবং সর্বশেষ পর্যায়ে তাপ উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাসের সুপরিকল্পিত ব্যবহার বায়ু দূষণ অনেকাংশে হ্রাস করেছে।
ঙ. পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়: গাছ মানুষের বন্ধু। কারণ গাছ বায়ুমণ্ডল থেকে ক্ষতিকারক কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন ছেড়ে দেয়, যা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে গাছ পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। তাপশক্তি উৎপাদনে ও জ্বালানি খাতে জীবাশ্ম জ্বালানির (কয়লা, গ্যাস, খনিজ তেল) ব্যাপক ব্যবহার এই খাতে গাছের ওপর আমাদের নির্ভরতা কমিয়ে দিয়েছে। তাই ব্যাপকহারে বৃক্ষ নিধনের প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে। ফলে গাছ পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা পালন করতে পারছে।
উল্লিখিত বিষয়গুলো ছাড়াও অন্যান্য খনিজ সম্পদের পরিমিত ব্যবহার পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পরিবেশের গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশ পরিবেশবান্ধব না হলে খনিজ সম্পদ উত্তোলন করে না। আমরাও যদি সবদিক বিবেচনা না করে নির্বিচারে খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও ব্যবহার করতে থাকি, তবে তা আমাদের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে দেখা দিবে।
কাজ:
- বাংলাদেশ সরকার "পৃথিবীর যে দেশ খনিজ সম্পদে যত বেশি সমৃদ্ধ সেই দেশ তত বেশি উন্নত" এই প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করল সেখানে একজন বক্তা বললেন, পরিমিত মাত্রায় খনিজ উত্তোলন করলে আর্থিক লাভের পাশাপাশি তা পরিবেশ রক্ষায় সহায়ক হয়।
খনিজ সম্পদ একটি দেশের অর্থনীতিকে কীভাবে ত্বরান্বিত করে? ব্যাখ্যা করো।
পরিমিত খনিজ সম্পদ উত্তোলন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে? বিশ্লেষণ করো।
| খনিজ সম্পদ | কতগুলো মৌলিক উপাদান প্রাকৃতিক উপায়ে মিলিত হয়ে যে যৌগ গঠন করে তাকে খনিজ বলে। খনিজ সম্পদ এক ধরনের বস্তুগত সম্পদ। এটি অজৈব পদার্থ। যেমন- সোনা, রূপা, প্রাকৃতিক গ্যাস ইত্যাদি। |
| শক্তি সম্পদ | যে প্রাকৃতিক সম্পদ তাপ তথা শক্তি উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় তাকে শক্তি সম্পদ বলে। এ সম্পদ খনিজ সম্পদ হতে পারে। যেমন- প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, তেল প্রভৃতি খনিজাত এবং পানি, সৌরবিদ্যুৎ খনি বহির্ভূত শক্তি সম্পদ। |
| আকরিক লৌহ | আকরিক লৌহ আধুনিক যন্ত্রপাতির ভিত্তি। চীন বিশ্বের প্রধান আকরিক লৌহ উৎপাদনকারী দেশ। কোনো দেশের কৃষি, শিল্প, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য তথা অর্থনৈতিক উন্নতি এর ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। লৌহ ও ইস্পাত শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হলো আকরিক লৌহ। |
| গ্রাফাইট | গ্রাফাইট ধূসর বর্ণের অধাতব খনিজ পদার্থ। এটি কয়লার রূপভেদ। গ্রাফাইট উৎপাদনে চীন বিশ্বে প্রথম। তড়িৎদ্বার তৈরিতে, পিচ্ছিলকারক হিসেবে, ওষুধ শিল্পে, পেনসিলের সিস তৈরিতে গ্রাফাইট ব্যবহৃত হয়। |
| খনিজ তেল | যে তেল পাথর বা খনিজাত তাকে পেট্রোলিয়াম বা খনিজ তেল বলে। এটি হলদে সবুজ থেকে কালচে বাদামি রঙের হয়ে থাকে। বর্তমানে রাশিয়া বিশ্বের শীর্ষ খনিজ তেল উৎপাদনকারী দেশ। তবে OPEC (Organization of Petrolium Exporting Countries) বিশ্বের খনিজ তেলের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে খনিজ তেল তরল সোনা হিসেবে পরিচিত। এসব দেশে খনিজ তেল অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। কৃষি, শিল্প, পরিবহন, শক্তি উৎপাদন প্রভৃতি ক্ষেত্রে খনিজ তেল ব্যবহৃত হয়। |
| প্রাকৃতিক গ্যাস | প্রাকৃতিক গ্যাস বলতে মিথেন (CH₁) সমৃদ্ধ গ্যাসকে বোঝায়। উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃত দেহাবশেষ থেকে এ গ্যাস সৃষ্টি হয়। প্রাকৃতিক গ্যাসের উত্তোলনের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে প্রথম স্থানের অধিকারী। শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে এ গ্যাস ব্যবহৃত হয়। |
| কয়লা | শক্তি উৎপাদনকারী জ্বালানির মধ্যে কয়লা পৃথিবীর অন্যতম প্রধান খনিজ সম্পদ। কয়লার প্রধান উপাদান কার্বন তথা হাইড্রোকার্বন। পৃথিবীর সর্বাধিক কয়লা সঞ্চিত আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এই দেশের কয়লা উন্নতমানের অ্যানথ্রাসাইট শ্রেণির। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ কয়লা ব্যবহার করে আসছে। বিশ্বের মোট উৎপাদিত শক্তির ৬০% আসে কয়লা থেকে। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ-নেই যেখানে কয়লার প্রয়োজন নেই। পৃথিবীর শীর্ষ কয়লা উৎপাদনকারী দেশ চীন। |
| বাংলাদেশের খনিজ ও শক্তি সম্পদ | বাংলাদেশ একটি অনুন্নত দেশ। প্রাকৃতিক গ্যাস ছাড়াও এদেশে কয়লা, খনিজ তেল, চুনাপাথর, কঠিন শিলা, চীনামাটি, খনিজ লবণ প্রভৃতি পাওয়া যায়। কোনো খনিজ সম্পদ নেই। ১৯৫৫ সালে সিলেটের হরিপুরে প্রথম গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, বাংলাদেশে ১০০০ মিটার নিচে অত্যন্ত উন্নতমানের কয়লা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বর মাসে সিলেটের হরিপুর গ্যাস ক্ষেত্র এলাকায় কূপ খননের সময় তেল সঞ্চিতির সন্ধান পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রায় ১৮ লক্ষ মেট্রিক টন চুনাপাথর সঞ্চিত আছে। কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত সমৃদ্ধ সৈকতে মোনাজাইট, জিরকন, ইলমেনাইট, ব্যাটাইল প্রভৃতি তেজস্ক্রিয় খনিজ উপাদানের সন্ধান পাওয়া গেছে। সরকার যদি খনিজ সম্পদের অনুসন্ধান উত্তোলন ও পরিকল্পিত |
খনিজ ও শক্তি সম্পদ-মো: আবদুল কুদ্দুস স্যারে লেখা বই
Read more