hsc

পাঠ-১৩: বাংলাদেশের উন্নয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভাব

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

16

(Effects of Communication System on Development of Bangladesh)

যেকোনো দেশের উন্নয়নে সে দেশের যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। কোনো দেশের মুষ্টিমেয় কিছু অঞ্চলে উন্নয়ন হলেই সে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ঘটে এ কথা বলা যায় না। বরং এক অঞ্চলে উন্নয়নের সুফল বা প্রাপ্ত সুবিধা অন্য অঞ্চলে সময়মতো পৌঁছে দিতে পারলেই সমগ্র দেশের মানুষ সেই উন্নয়নের ফল ভোগ করতে পারে। এর ফলে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর হয় এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সাধিত হয়। আর কোনো দেশের এক অঞ্চলের প্রাপ্ত সুবিধা, পণ্য বা সেবা অন্য অঞ্চলে পৌছে দিতে পরিবহন বা যোগাযোগ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। সর্বোপরি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভাব ব্যতীত সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের উন্নয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থা নানাভাবে ভূমিকা পালন করে থাকে। যেমন-

ক. কৃষির উন্নয়ন: বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। ।। এদেশের অধিকাংশ মানুষের প্রধান জীবিকা হচ্ছে কৃষি এবং বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের দুই তৃতীয়াংশ আসে কৃষিজাত পণ্য থেকে। কৃষিকাজে সময় মতো সার, কীটনাশক, বীজ প্রভৃতি কৃষকের হাতে পাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আবার কৃষক যেন ভালো বা ন্যায্য দাম পায় এজন্য এক অঞ্চলের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পরিবহন করার প্রয়োজন হয়। এতে দেশের সর্বত্র পণ্যের প্রাপ্তি নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি পণ্যের সুষম বণ্টন ঘটে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, কৃষি ও কৃষকের সার্বিক উন্নয়নে পরিবহন ব্যবস্থা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

খ. কৃষিজ পণ্যের বিপণন: কৃষকের উৎপাদিত পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দেশের সব অঞ্চলে মানুষের প্রয়োজনীয় সব ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয় না। এক অন্যলে ধান বেশি হলে অন্য অঞ্চলে হয়তো মাছ বা ডাল বেশি উৎপাদিত হয়। আবার কোনো অঞ্চলে একটি বিশেষ শ্রেণির কৃষিপণ্য যে পরিমাণ উৎপাদিত হয়, তা হয়তো সেই অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়েও অনেক উদ্বৃত্ত থাকে। অনেক সময় এক অঞ্চলে হয়তো বা উৎপাদিত কৃষিপণ্যের দাম না থাকলেও অন্য অঞ্চলে দাম বেশি পাওয়া যায়। সে সকল ক্ষেত্রে এক অঞ্চল হতে অন্য অঞ্চলে সড়ক, নৌ বা রেলপথে পণ্য সরবরাহ করা হয়। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ থেকে উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী জাহাজ ও বিমানযোগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে আমরা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করি, যা আমাদের দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

গ. শিল্পায়ন: কোনো দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিল্পের উন্নয়ন খুব গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পক্ষেত্রে উন্নয়ন ব্যতীত কোনো দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিল্প স্থাপন করতে গেলে ঐ শিল্পের কাঁচামাল প্রাপ্তি এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাত করা এই দুটো বিষয় খুবই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। সময়মতো পর্যাপ্ত পরিমাণে কাঁচামাল পাওয়া না গেলে অথবা উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে না পারলে ঐ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সময়মতো কারখানায় কাঁচামাল সরবরাহ ও উৎপাদিত পণ্য দেশের সর্বত্র এবং বিদেশে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা আমাদের দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছে।

ঘ. ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন: ব্যবসা ও বাণিজ্য একটি দেশের উন্নয়নের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি পূরণ ও উদ্বৃত্ত সামগ্রী রপ্তানির পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায় যা একটি দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়। দেশে উন্নতমানের সড়ক, রেল, নৌ ও বিমান পরিবহনের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিশীলতা বাড়ে। এর ফলে দেশের আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশ হয় উন্নত।

ঙ. দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা রক্ষায়: দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে কোনো পণ্যের দামের স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে পারলে জনগণের মনের ক্ষোভ ও হতাশা দূর হয়। সবাই একাগ্রচিত্তে নিজ নিজ কাজে মনোযোগ দিতে পারে। ফলে শান্তি বজায় থাকায় উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং উন্নয়ন ঘটে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে উত্তম যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলে কোনো দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির সুযোগ থাকে না। দেশের কোনো একটি এলাকায় কোনো দ্রব্যের সংকট সৃষ্টি হলে সেখানে দ্রুত পণ্য প্রেরণ করে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা যায়। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়।

চ. পণ্যের সুষম বন্টন: পণ্যের সুষম বণ্টন কোনো দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত। পৃথিবীতে কোনো একটি দেশের বা একটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে কোনো একটি পণ্যের উৎপাদন আধিক্য বা ঘাটতি থাকতে পারে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলে উৎপাদন আধিক্য অঞ্চল থেকে ঘাটতি অঞ্চলের দিকে পণ্য পরিবহন করে পণ্যদ্রব্যের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা যায়। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গ্রাম ও শহরের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে দেয়। ফলে কৃষি উপকরণ, ভোগ্যপণ্য, শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল এবং শিল্পজাত দ্রব্য সামগ্রী গ্রাম থেকে শহরে এবং শহর থেকে দ্রুত গ্রামে পৌঁছানো যায়। ফলে দেশের সুষম উন্নতি সাধিত হয়।

ছ. শ্রমের গতিশীলতা: আমাদের দেশের সর্বত্র শ্রমিকের মজুরি সমান নয়। অভিজ্ঞ ও দক্ষ শ্রমিকের প্রাপ্তিও সহজলভ্য নয়। দেশের অনেক অঞ্চলে যেমন- উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে প্রচুর শ্রমিক আছে কিন্তু কাজ নেই। তাই শ্রম অনেক সস্তা। পক্ষান্তরে বড় বড় শহরে শ্রমিকের অপর্যাপ্ততার কারণে শ্রম অনেক দামি। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে শ্রমিকেরা সহজে দেশের এক অঞ্চল হতে অন্য অঞ্চলে গমন করতে পারে। এতে তাদের ন্যায্য মজুরি প্রাপ্তি এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন সম্ভব হয়। ফলে দেশের উন্নয়ন সাধিত হয়।

জ. আমদানি ও রপ্তানি পণ্য পরিবহনে: পৃথিবীতে কোনো দেশই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও উন্নয়নের জন্য তাকে অন্য দেশ হতে পণ্য আমদানি ও উদ্বৃত্ত পণ্য অন্য দেশে রপ্তানি করতে হয়। রপ্তানি পণ্য দ্রুত বন্দরের মাধ্যমে বিদেশে পাঠাতে এবং আমদানি পণ্য বন্দর থেকে সারা দেশে সময়মত পৌছাতে উন্নত ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এতে করে আমদানি ও রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজে ও দ্রুত সম্পন্ন করা যায় বলে দেশের উন্নয়ন ঘটে।

ঝ. স্বাস্থ্য সুবিধা: সুস্থ নাগরিকেরাই দেশের উন্নয়নে মূল ভূমিকা পালন করতে পারে। আমাদের দেশের অধিকাংশ লোক গ্রামে বাস করে। সুদূর গ্রাম থেকে জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবসময় সময়মতো শহরের বড় হাসপাতালে আসা সম্ভব হয় না। আমাদের দেশে যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় প্রত্যন্ত থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে হাসপাতাল ও ক্লিনিক স্থাপিত হচ্ছে। এতে গ্রামের সাধারণ জনগণ স্বাস্থ্য সুবিধা পাচ্ছে। সুতরাং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা পালন করছে।

ঞ. গ্রাম ও শহরের মধ্যে সংযোগ স্থাপন: বাংলাদেশে অধিকাংশ লোক গ্রামে বাস করে। নিত্য প্রয়োজনীয় কৃষি দ্রব্যের সবকিছুই গ্রামে উৎপাদিত হয়। আবার শহরে বসবাসকারী লোকের সংখ্যা কম হলেও সকল নাগরিক সুবিধা যেমন- শিক্ষা, চিকিৎসা, গবেষণা, বিনোদন, বিপণিবিতান, বিলাস সামগ্রী প্রভৃতি সুবিধা বিদ্যমান থাকে। ফলে গ্রাম ও শহরের মধ্যে পণ্য ও সেবার পারস্পরিক বিনিময় থাকা জরুরি। আর এই বিনিময় কর্মকাণ্ড পরিচালনায় উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকলে গ্রাম ও শহরের মধ্যে দূরত্ব অনেকাংশে হ্রাস পায়। ফলে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী শহর থেকে গ্রামে এবং গ্রাম থেকে শহরে দ্রুত পৌঁছানো যায়। এতে করে দেশের উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হয়।

ট. জরুরি অবস্থা মোকাবিলা: আমাদের দেশ ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেই প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ। বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ এদেশে নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। দেশের কোনো অঞ্চলে হঠাৎ বন্যা, খরা, মহামারি, জলোচ্ছ্বাস দেখা দিলে আক্রান্ত অঞ্চলে দ্রুত খাদ্য, বস্ত্র, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা সামগ্রী, উদ্ধারকর্মী প্রভৃতি জরুরি ভিত্তিতে পাঠানোর প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে। অর্থাৎ উন্নত ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্বারা দেশের যেকোনো আপদকালীন পরিস্থিতি সাফল্যের সাথে মোকাবিলা করে দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ড অব্যাহত রাখা যায়।

ঠ. নিরাপত্তা সুবিধা: উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলে দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি শৃংখলা রক্ষা ও বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিহত করা যায়। কেননা এক্ষেত্রে স্পর্শকাতর এলাকায় যুদ্ধের সরঞ্জাম ও সৈন্য দ্রুত পাঠানোর মাধ্যমে দেশের সম্পদ রক্ষা করা যায়। এটি আমাদের দেশের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারছে।

উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে একথা বলা যায় যে, বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা এদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতেও যদি উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায় তাহলে এদেশের উত্তরোত্তর উন্নতি ও সমৃদ্ধি ঘটবে এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়।

পরিবহন ও যোগাযোগ-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...