(Agricultural Organization of Bangladesh and Their Contributions on Production)
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। বাংলাদেশের অধিকাংশ লোক (শতকরা ৮০ ভাগ; সূত্র-BARC) প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি পেশায় নিয়োজিত। এদেশের অর্থনীতির প্রধান উৎস কৃষি। কিন্তু দুঃখের বিষয় দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ পরাধীন থাকায় এবং নেতৃত্বের অদূরদর্শিতার কারণে এদেশে কৃষিকাজ নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়নি। স্বাধীনতার পূর্বে এদেশের কৃষি ছিল সনাতন পদ্ধতির। জমি অত্যন্ত উর্বর হলেও প্রকৃতি নির্ভরতা ও প্রাচীন পদ্ধতির চাষাবাদের কারণে আশানুরূপ ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হতো না। তবে আশার কথা এই যে, স্বাধীনতা লাভের পর থেকে এদেশের সরকার কৃষি বিষয়ক কর্মকান্ডকে যথেষ্ট প্রাধান্য দিয়ে কৃষিবিষয়ক উচ্চতর গবেষণার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে। ফলে বাংলাদেশের কৃষি আজ বিশ্ব পর্যায়ে স্থান করে নিয়েছে।
বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কৃষিসংস্থা সমূহের বর্ণনা
১. মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (Soil Resources Development Institute-SRDI): কৃষিকাজে মাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বাংলাদেশের মাটি খুবই উর্বর। তবে কোন মাটিতে কী ধরনের ফসল জন্মে এবং কোন এলাকার মাটিতে কী ধরনের সমস্যা আছে এসমস্ত বিষয়ে উচ্চতর গবেষণার জন্য স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে মৃত্তিকা জরিপ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে এই সংস্থাই কাজের ব্যাপকতার কথা চিন্তা করে ১৯৮৩ সালে 'মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট' নামে নতুন কর্ম পরিধি নিয়ে কাজ শুরু করে। সংস্থাটি ঢাকার ফার্মগেটে অবস্থিত।
কৃষিতে অবদান : মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট মূলত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটির গুণাগুণ, বৈশিষ্ট্য, সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে কাজ করে থাকে। কোন মাটি কোন ধরনের ফসলের জন্য উত্তম সেই সংক্রান্ত পরামর্শ প্রদান সংস্থাটির অন্যতম উদ্দেশ্য। কোনো জমিতে আশানরূপ ফসল উৎপাদিত না হলে সেই জমির মাটি নিয়ে গবেষণা করে সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান প্রদান করে সংস্থাটি। এছাড়া এই সংস্থায় মাটি পরীক্ষার জন্য ৬টি ভ্রাম্যমাণ গাড়ি আছে। দেশের যেকোনো প্রান্তে গিয়ে মাটি পরীক্ষা করে যথার্থ পরামর্শ প্রদান এই সংস্থার প্রধান উদ্দেশ্য।
২. বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (Bangladesh Agricultural Research Council-BARC): বাংলাদেশের কৃষি সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণার জন্য ১৯৭৩ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কৃষি গবষেণা কাউন্সিল গঠিত হয়। ঢাকার ফার্মগেটে অবস্থিত সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে দেশের খ্যাতনামা কৃষি বিশেষজ্ঞগণ কাজ করেন।
কৃষিতে অবদান: বিভিন্ন কৃষি বিষয়ক গবেষণা, পরামর্শ প্রদান, গবেষণা তত্ত্বাবধান করা এবং বিভিন্ন কৃষি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন করা সংস্থাটির উদ্দেশ্য।
৩. বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (Bangladesh Agricultural Research Institute-BARI): ১৯০৮ সালে লর্ড কার্জন নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করেন। এ কৃষি সংস্থাটি নানা ধাপ পেরিয়ে ১৯৭৬ সালে BARI নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সংস্থাটির ৭টি গবেষণা কেন্দ্র এবং ২৮টি আঞ্চলিক উপকেন্দ্র রয়েছে। এর সদরদপ্তর গাজীপুরের জয়দেবপুরে অবস্থিত।
কৃষিতে অবদান: বাংলাদেশে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট একটি বৃহৎ সংস্থা। সব ধরনের কৃষি ফসল ও বীজ সম্পর্কে গবেষণা করে নতুন জাত উদ্ভাবন, রোগ নির্ণয়, কীটপতঙ্গ দমন কৌশল, কীটনাশক প্রয়োগ, নতুন কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন প্রভৃতি নানাবিধ কাজ করা এই সংস্থার প্রধান কাজ। সংস্থাটি এ পর্যন্ত ফসলের ২৯০টি জাত ও ৩১০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে।
৪. বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (Bangladesh Rice Research Institure-BRRI): ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট নামে নতুন করে যাত্রা শুরু করে। ঢাকার অদূরে গাজীপুরে প্রায় ৭৭ হেক্টর জায়গা জুড়ে BRRI এর কার্যালয় অবস্থিত। এছাড়া সারা দেশে সংস্থাটির ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয় আছে।
কৃষিতে অবদান: ধান বাংলাদেশের প্রধান কৃষি ফসল। এই ধান সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণা যেমন- ধানের উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন জাত উদ্ভাবন, রোগ নির্ণয়, কোন ধরনের মাটিতে কী ধরনের ধান জন্মে তা বের করা তথা ধান সংক্রান্ত যাবতীয় গবেষণা করা এই সংস্থার প্রধান কাজ।
৫. বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (Bangladesh Agricultural Development Corporation, BADC): East Pakistan Agricultural Development Corporation নামে ১৯৬১ সালে সংস্থাটির যাত্রা শুরু হয়। স্বাধীনতার পরে ১৯৭৬ সালে কৃষি ও কৃষকদের উন্নয়নকল্পে সংস্থাটি নতুনভাবে BADC নামে যাত্রা শুরু করে। ঢাকায় অবস্থিত সংস্থাটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন।
কৃষিতে অবদান: সমগ্র দেশের কৃষি ও কৃষকদের উন্নয়নকল্পে সংস্থাটি কাজ করে যাচ্ছে। কাজের সুবিধার্থে দেশের সকল উপজেলা পর্যায়ে এই সংস্থার কার্যালয় আছে। এই সংস্থাটি মূলত বিভিন্ন ফসলের বীজ সংরক্ষণ ও সময়মতো সরবরাহ, সেচ প্রদান, ফসল সংরক্ষণ ও সরবরাহ, সার সরবরাহ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে।
৬. বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন (Bangladesh Atomic Energy Commission-BAEC): পরমাণু শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিতে সব ধরনের উচ্চতর গবেষণার জন্য ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন গঠিত হয়। সংস্থার সদর দপ্তর ঢাকায় বাংলা একাডেমির পাশে এবং কার্যালয় সাভারের গণক বাড়িতে অবস্থিত।
কৃষিতে অবদান: মূলত বিভিন্ন ধরনের কৃষি ফসলের রোগ নির্ণয় ও দমন কৌশল আবিষ্কার এই সংস্থার কাজ।
৭. বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (Bangladesh Jute Research Institute-BJRI): পাট সংক্রান্ত
গবেষণার জন্য ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থার প্রধান কার্যালয় ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত।
কৃষিতে অবদান: পাটের নতুন জাত উদ্ভাবন, রোগ নির্ণয়, দমন কৌশল প্রভৃতি সংক্রান্ত গবেষণা করা এই
সংস্থার কাজ।
৮. কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (Agricultural University): বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের কৃষিতে বা কৃষি বিষয়ক কাজে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বাংলাদেশে এ পর্যন্ত চারটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এগুলো হলো-
ক. বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ; খ. শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা; গ. সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট; ঘ. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর। এছাড়া দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও (খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি) কৃষি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা ও পড়াশুনার সুযোগ আছে।
কৃষিতে অবদান: কৃষি বিষয়ক জ্ঞান আহরণ, উচ্চতর গবেষণার সুযোগ এ সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে।
৯. ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় (Veterinary University): পশু চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয় বিষয়ক পড়াশুনা ও উচ্চতর গবেষণার জন্য চট্টগ্রামে পূর্ণাঙ্গ ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও অন্যান্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ সংক্রান্ত পড়াশুনার সুযোগ আছে।
কৃষিতে অবদান : বিভিন্ন প্রাণীর রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাসেবা প্রদান সংক্রান্ত উচ্চতর পড়াশুনা ও গবেষণার সুযোগ প্রদান করা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রধান উদ্দেশ্য।
১০. কৃষি তথ্য সেবা (Agricultural Information Service-AIS): সব ধরনের কৃষি সেবা সংক্রান্ত তথ্য
পেতে ১৯৬৯ সালে এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো কৃষি ও কৃষক সংশ্লিষ্টদের কৃষিবিষয়ক জ্ঞান সমৃদ্ধকরণ।
কৃষিতে অবদান: কোথাও কোনো নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন হয়েছে কিনা, কোন এলাকায় ফসলের উৎপাদন ব্যবস্থা কেমন, কোন রোগের কী প্রতিরোধ ব্যবস্থা, নতুন চাষাবাদ পদ্ধতি প্রভৃতি সংক্রান্ত তথ্য এই সংস্থার মাধ্যমে জানা যায়।
কৃষি (Agriculture)-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
Read more