hsc

পাঠ-১৩: বৃষ্টিপাতের শ্রেণিবিন্যাস

ভূগোল ১ম পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

14

(Classification of Rainfall)

প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য অনুসারে বৃষ্টিপাতকে প্রধানত নিম্নলিখিত শ্রেণিসমূহে ভাগ করা যায়:
১. পরিচলন বৃষ্টি (Convectional rain);
২. শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টি (Orographic rain);
৩. বায়ুপ্রাচীরজনিত বৃষ্টি (Frontal rain) এবং
৪. ঘূর্ণি বৃষ্টি (Cyclonic rain);

১. পরিচলন বৃষ্টি (Convectional rain) : ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অত্যধিক হলে বায়ুর বাষ্পীভবনের ক্ষমতা বাড়ে।
এ অবস্থায় জলীয়বাষ্পপূর্ণ হালকা বায়ু ঊর্ধ্বে প্রসারিত ও শীতল হলে সেখানে বৃষ্টিপাত ঘটায়। এরূপ বৃষ্টিপাতকে পরিচলন বৃষ্টিপাত বলে।

বৈশিষ্ট্য: সাধারণত নিরক্ষীয় অঞ্চলে (°-°উ. ও দ. অক্ষাংশ) প্রতিদিন পরিচলন প্রক্রিয়ায় বৃষ্টিপাত হয়। জলভাগ ও বনভূমির প্রাধান্য এবং লম্বভাবে সূর্যরশ্মির পতনে সারাদিন বাষ্পীভবন ও বাষ্পীয় প্রস্বেদনে উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু সোজা উপরে উঠে যায়। এ বায়ু শীতল বায়ুস্তরের সংস্পর্শে শীতল ও ঘনীভূত হলে বিকেলে বজ্র-বিদ্যুৎসহ ঝড়-বৃষ্টি হয়। ক্রান্তীয় অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে পরিচলন প্রক্রিয়ায় বিকেলের দিকে ও সন্ধ্যায় পরিচলন প্রক্রিয়ায় বৃষ্টিপাত হয়।

অঞ্চল: ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, ব্রাজিলের আমাজান অববাহিকা, নিউগিনি, জায়ারের কঙ্গো অববাহিকায় পরিচলন বৃষ্টিপাত হয়। ক্রান্তীয় অঞ্চলে মৌসুমি জলবায়ুর দেশ ভারত, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ইত্যাদি অঞ্চলে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু আগমনের পূর্বে এ ধরনের বৃষ্টিপাত হয়। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে মহাদেশসমূহের অভ্যন্তরভাগে গ্রীষ্মকালে এ প্রক্রিয়ায় বৃষ্টি হয়ে থাকে।

২. শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত (Orographic rainfall): জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ুর গতিপথে পর্বত থাকলে তা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পর্বতের প্রতিবাত অংশে বৃষ্টিপাত হয়। শৈল বা পাহাড় দ্বারা উৎক্ষিপ্ত হয়ে বৃষ্টিপাত হয় বলে একে শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত বলে।
বৈশিষ্ট্য: সমুদ্র উপকূলের নিকটবর্তী অঞ্চলে পাহাড়, পর্বত, মালভূমি থাকলে নিকটবর্তী উষ্ণ সমুদ্র থেকে আগত জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু এই উচ্চভূমিতে ধাক্কা খায় এবং উপরে উঠতে থাকলে শীতল ও ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়।

এই অংশকে প্রতিবাত পার্শ্ব (windward side) বলে। উচ্চভূমি অতিক্রম করে বায়ু অপর পার্শ্বে অর্থাৎ অনুবাত পার্শ্বে (lee ward side) পৌছলে এতে জলীয়বাষ্প আর থাকে না বলে বৃষ্টি খুব কম হয়। এ অঞ্চলকে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল (rain shadow area) বলে। পর্বতের অনুবাত পার্শ্বের বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলটি সাধারণভাবে শুষ্ক বা প্রায় শুষ্ক হয়। অন্যান্য উপাদান যেমন- গিরিখাতের অবস্থান, উষ্ণতার পার্থক্য ইত্যাদিও শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাতের ওপর প্রভাব ফেলে।.

অঞ্চল: আর্দ্র দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পশ্চিম ঢালে প্রচুর শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত ঘটায়। কিন্তু পূর্বে দাক্ষিণাত্যে বৃষ্টিপাত অনেক কম হয়। এটা বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে পরিণত হয়। হিমালয়ের পাদদেশ ও সমগ্র উত্তর ভারতে, বাংলাদেশের সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে এ ধরনের বৃষ্টিপাত হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় যেখানে পর্বতশ্রেণি রয়েছে সেখানে প্রতিবাত পার্শ্বে এ ধরনের বৃষ্টিপাত দেখা যায়।

৩. বায়ু প্রাচীরজনিত বৃষ্টি (Frontal rain): মধ্য অক্ষাংশ অঞ্চলে যখন শীতল ও উষ্ণ বায়ু মুখোমুখি উপস্থিত হয়ে
একে অপরের দিকে পাশাপাশি চলতে থাকে তখন শীতল বায়ুর আঘাতে উষ্ণ বায়ু ঊর্ধ্বে উঠতে থাকে। এ সময় ঐ উষ্ণ বায়ু প্রসারিত ও শীতল হয়ে উভয় বায়ুর সীমান্ত বরাবর বৃষ্টিপাত ঘটায়। এ জাতীয় বৃষ্টিপাতকে সংঘর্ষ বৃষ্টিপাত বলে।

বৈশিষ্ট্য: শীতল বায়ুপ্রাচীরের ঢাল অপেক্ষাকৃত খাড়া হয়। তাই এই বায়ু প্রাচীর সংলগ্ন এলাকায় মেঘ ও বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রটি সংকীর্ণ হয়ে যায়। আবার উষ্ণ বায়ু প্রাচীরের ক্ষেত্রে বিপরীত অবস্থা ঘটে।
অঞ্চল: মধ্য অক্ষাংশের নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে এরূপ প্রক্রিয়ায় বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে।

৪. ঘূর্ণি বৃষ্টি (Cyclonic rain): কোনো অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলে নিম্নচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হলে জলভাগের উপর থেকে
জলীয়বাষ্পপূর্ণ উষ্ণ এবং স্থলভাগের উপর থেকে শুষ্ক শীতল বায়ু ঐ একই নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে অনুভূমিকভাবে ছুটে আসে। শীতল বায়ু ভারী বলে উষ্ণ বায়ু শীতল বায়ুর উপর ধীরে ধীরে উঠতে থাকে। জলভাগের উপর থেকে আসা উষ্ণ বায়ুতে প্রচুর জলীয়বাষ্প থাকে। ঐ বায়ু শীতল বায়ুর উপরে উঠলে তার ভিতরে জলীয়বাষ্প ঘণীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়। এরূপ বৃষ্টিকে ঘূর্ণি বৃষ্টি বলে।

বৈশিষ্ট্য: বায়ু সব সময় উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপের দিকে ঘূর্ণায়মান অবস্থায় ছুটে যায়। ঘূর্ণিবাতের ফলে নিম্নচাপ কেন্দ্রের বায়ু জলীয়বাষ্প নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে উপরে ওঠে এবং শীতল ও ঘনীভূত হয়ে প্রবল ঝড়ের সঙ্গে বৃষ্টিপাত ঘটায়। এসময় বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হয়। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে ঘূর্ণিবৃষ্টির প্রক্রিয়া স্বভাবতই ভিন্ন। এখানে উষ্ণ বায়ুস্তর অতি ধীরে শীতল বায়ুস্তরের উপরে উঠার ফলে ঝড়-ঝঞ্ঝা প্রবল না হয়ে ঝিরঝির করে অনেক সময় ধরে বৃষ্টিপাত হয়। বিশেষ করে শীতকালে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে।
অঞ্চল: পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িষ্যা উপকূলের কোনো কোনো অংশ এবং আসাম, বাংলাদেশে মার্চ-মে মাসে কালবৈশাখীর প্রভাবে ঘূর্ণিবাত বৃষ্টি হয়। গ্রীষ্মকালে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিবাতসমূহ দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের সাথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে বৃষ্টিপাত ঘটায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল অঞ্চলে এ ধরনের বৃষ্টি হয়।

উপরিউক্ত চার প্রকার ছাড়াও আরও কয়েক প্রকার বৃষ্টিপাত শনাক্ত করা যায়-

৫. উষ্ণ স্রোতজনিত বৃষ্টিপাত: উষ্ণ স্রোতের মাধ্যমে বাহিত জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে উপকূলভাগে সংঘটিত হয়। ব্রিটেন ও নরওয়ের উপকূলের বৃষ্টিপাত এ ধরনের।
৬. নিয়ত বায়ুপ্রবাহজনিত বৃষ্টিপাত: সমুদ্রভাগের উপর দিয়ে প্রবাহিত অয়ন ও প্রত্যয়ন বায়ুর দ্বারা আনীত জলীয়বাষ্পের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল এবং সামুদ্রিক অঞ্চলে কিংবা সমুদ্রমধ্যে সংঘটিত বৃষ্টি এভাবে সৃষ্ট।
৭. আগ্নেয় বৃষ্টিপাত: অগ্ন্যুৎপাতে উদগীরিত জলীয়বাষ্পের ঘনীভবন থেকে সৃষ্ট মেঘের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। অগ্ন্যুৎপাতে উদগীরিত পদার্থের ৬০%-৯০% পানি এবং অগ্ন্যুৎপাতকালীন প্রচণ্ড উত্তাপ থাকায় এ পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে উর্দ্ধ বায়ুমণ্ডলে গমন করে এবং ঘনীভূত হয়ে আগ্নেয়গিরি সন্নিহিত এলাকায় বৃষ্টিপাত ঘটায়।
৮. অরণ্য বৃষ্টিপাত: সুবিস্তৃত অরণ্য এলাকার প্রস্বেদন থেকে সৃষ্টি হয়। পূর্ব ভারতে এবং বিশ্বের বিভিন্ন বিস্তীর্ণ অরণ্য এলাকায় এ ধরনের হালকা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিপাত দেখা যায়।
৯. প্রতীপ ঘূর্ণিবাত জনিত বৃষ্টিপাত: উচ্চচাপ এলাকা থেকে নিম্নচাপ এলাকায় আগত বায়ুর ঊর্ধ্বগমন ও ঘনীভবন থেকে সৃষ্ট। উদাহরণ হিসেবে ভারতবর্ষের শীতকালীন বৃষ্টিপাতের কথা বলা যায়

জলবায়ুর উপাদান ও নিয়ামক কে. আশরাফুল আলম ও মো. শরিফুল ইসলাম স্যার এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...