(Variability of Climate)
পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই এর পরিবেশে এসেছে নানারূপ পরিবর্তন। কখনও একাধারে বৃষ্টিপাত হয়েছে বহুদিন। বরফে আবৃত হয়েছে পৃথিবীর বিরাট অংশ। আবার কখনও তাপমাত্রার পরিবর্তনে সূচিত হয়েছে আন্তঃবরফ যুগের। ভূমিরূপ বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ুর এই বিরাট পরিবর্তনের ফলেই পৃথিবী পৃষ্ঠের ভূমিরূপগত পরিবর্তন, গঠন ও বৈচিত্র্য সাধিত হয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তনে ভূমিরূপের পরিবর্তন বিষয়টি একটি জটিল বিষয়, তবে সমসাময়িককালের ভূমিরূপ বিজ্ঞানীদের নিকট তা গ্রহণযোগ্য আলোচ্য বিষয়।
বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের দিকগুলো হলো-
১. সময় ও পরিসরের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে অর্থাৎ সমগ্র পৃথিবীর ঐতিহাসিকতার প্রেক্ষিতে জলবায়ুর পরিবর্তন হয়েছে।
২. জলবায়ুর পরিবর্তন প্রক্রিয়া হয়েছিল মূলত মহাজাগতিক, বিশ্বব্যাপী, আঞ্চলিক এবং স্থানিকভাবে।
৩. জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটতে পারে ঋতুগত পার্থক্যের ফলে সৃষ্ট বারিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও জলীয়বাষ্পাকারে উদ্ভিদরাজি থেকে পানি নির্গমনের তারতম্যের কারণে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ (Causes of climatic change)
জলবায়ু গঠনের ক্ষেত্রে জলবায়ু শক্তি নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। জলবায়ু শক্তি বলতে বিকিরণ, পৃথিবীর কক্ষপথের বিচ্যুতি, পবর্ত গঠন ও মহীসঞ্চারণ এবং গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিবর্তনকে বোঝায়। এই অবস্থাগুলো প্রাথমিক জলবায়ু গঠনকারী নিয়ামকগুলোর কার্যকারিতা ত্বরান্বিত অথবা হ্রাসপ্রাপ্ত করে। মেরু এলাকার বরফাচ্ছাদন ও মহাসাগরগুলো ধীরগতিতে জলবায়ু গঠনকারী শক্তির ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এক্ষেত্রে জলবায়ু বহিঃশক্তির দ্বারা প্রভাবিত ও পরিবর্তিত হতে শত শত বছর বা অধিক সময় নিয়ে থাকে। আধুনিক বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন প্রাকৃতিক বা মানবীয় কারণসমূহ দায়ী-
১. প্লেট টেকটনিক (Plate tectonic);
২. সৌর শক্তি উৎপাদন (Solar energy output);
৩. কক্ষপথের তারতম্য (Orbital variation)
৪. ক্রমিক ধাক্কা ও আকস্মিক স্থানান্তর (Gradual push and sudden shift)
৫. আগ্নেগিরির অগ্ন্যুৎপাত (Volcanism)
৬. সামুদ্রিক পরিবর্তনশীলতা (Oceanic variability)
৭. প্রকৃতির ওপর মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপ (Unexpected human interference on nature)
প্লেট টেকটনিক (Plate tectonic)
লক্ষ লক্ষ বছর যাবৎ প্লেট গতির তারতম্যজনিত কারণে ভূত্বক ও মহাসাগরের বিন্যাসে পরিবর্তন হয়ে আসছে এবং নতুন ভূপ্রকৃতি সৃষ্টি অথবা বিলুপ্ত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া স্থানীয় এবং বৈশ্বিক জলবায়ুর ধরন বদলাতেও ভূমিকা রেখে চলছে (Forest, et.al 1999)।
ভূতাত্ত্বিক কালপঞ্জি (Geological Time Scale) অনুযায়ী, প্যানজিয়া মহাদেশে অবিরত মৌসুমি জলবায়ু প্যাটার্ন (megamonsoonal climatic pattern) বিরাজিত ছিল। প্যানজিয়া সুপার মহাদেশেই (super continent) মৌসুমি জলবায়ুর সূত্রপাত (Judith, ১৯৯৩)। পরবর্তীতে প্লেট বিভাজনে তৎকালীন প্যানজিয়া আজ বিভিন্ন অক্ষাংশগত অবস্থানে ভিন্ন ভিন্ন জলবায়ু অঞ্চলের ধারক।
সৌরশক্তি উৎপাদন (Solar energy output)
বিভিন্ন শতাব্দীতে সৌরতাপের কার্যকারিতার তারতম্য জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম শক্তি হিসেবে কাজ করে থাকে। সৌরকলঙ্ক (Sunspot) এবং বেরিলিয়াম আইসোটোপ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা সৌরশক্তির তারতম্য ব্যাখ্যা করে থাকেন। সূর্য পৃথিবীর শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। সৌরজগতের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি তারতম্য বৈশ্বিক জলবায়ুর ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তিন থেকে চারশ কোটি বছর আগে সূর্য বর্তমান সময়ে যে তাপ প্রদান করে তার মাত্র ৭০% করত। যদি ঐ সময় বায়ুমণ্ডলের উপাদানগুলোর মিশ্রণ বর্তমানের মতো হতো তাহলে কোনো তরল পদার্থ
থাকত না (Marts 2006, Wastan and Harrison. 2005, Hegemann et.al. 1994) 1
কক্ষপথের পরিবর্তনশীলতা (Orbital variation)
পৃথিবীর কক্ষপথের সামান্য পরিবর্তন বিভিন্ন ঋতুতে সূর্যালোকের তারতম্য নিশ্চিত করে। স্থানিক ও বার্ষিক গড় সূর্যকিরণের মধ্যে সামান্য পরিবর্তন থাকলেও ভৌগোলিক ও ঋতুগত বণ্টনে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। পৃথিবীর কক্ষপথের তিন ধরনের পরিবর্তনশীলতা শনাক্ত করা যায়-
১. পৃথিবীর উৎকেন্দ্রিকতার পরিবর্তনশীলতা (Variation in earth's ecentricity)
২. আবর্তনকালীন পৃথিবীর অক্ষের তির্যক কোণ (Tilt angle of earth's axis of rotation) এবং
৩. পৃথিবীর অক্ষের পূর্বগামীতা (Precession of earth's axis)
এই নিয়ামকগুলো একত্রে মিলাঙ্কোভিচ চক্র (Milankovitch cycle- 1920) সৃষ্টি করে, যা জলবায়ুর উপরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ফেলে থাকে। বরফ যুগে ও আন্তঃবরফ যুগে এই চক্রের কার্যকর ভূমিকা উল্লেখ করার মতো। সাহারা মরুভূমির অগ্রগমন ও পশ্চাদপসরণের ক্ষেত্রেও এই চক্রের ভূমিকা ছিল।
ক্রমিক ধাক্কা ও আকস্মিক স্থানান্তর (Gradual Push and Sudden Shift)
ক্রমিক জলবায়ু পরিবর্তনকে আবহাওয়াবিদগন Gradual push বলে অভিহিত করেন। পরিবর্তনশীল শক্তির ক্রমাগত ক্রিয়ার ফলস্বরূপ হঠাৎ জলবায়ুর পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। ১৯৯৭ সালে এল-নিনোর দীর্ঘস্থায়ীত্বের কারণে আমাজান বেসিন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরক্ষীয় অরণ্যে দাবানলে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞে বায়ুমণ্ডলে অতিমাত্রায় কার্বন ডাইঅক্সাইড সঞ্চিত হয় এবং সারা বিশ্বে চরম আবহাওয়া অনুভূত হয়।
কখনো কখনো আকস্মিকভাবে জলবায়ু স্থানান্তর ঘটে থাকে। মহাসাগরীয় স্রোতচক্রের মাধ্যমে শেষ বরফ যুগে উত্তর আটলান্টিকের স্রোতচক্র সারা বিশ্বের জলবায়ুর ওপর প্রভাব ফেলেছিল (Calvin.2004)। ১৯৭৬-৭৭ সালে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের তীবর্তী অঞ্চলে এ ধরনের জলবায়ু স্থানান্তর লক্ষ করা যায়-
১৯৫০ সাল থেকে এল-নিনোর স্থায়িত্ব ক্ষণস্থায়ী হলেও লা-নিনো ছিল দীর্ঘস্থায়ী। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে। ১৯৫০-১৯৭৬ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক তাপমাত্রায় তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি। যদিও এসময় জীবাশ্ম জ্বালানির (কাঠ কয়লা) ব্যবহার বৃদ্ধিতে কার্বন ডাইঅক্সাইড ৩১০ থেকে ৩৩২ পিপিএম-এ উন্নীত হয়। ১৯৭৭ সালে আকস্মিকভাবে পৃথিবীর ভূভাগের তাপমাত্রা গড়ে ২০ সে. বেশি রেকর্ড করা হয় (Miller.1994)।
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত (Volcanism)
অগ্ন্যুৎপাত হলো ভূগর্ভ থেকে উত্তপ্ত গলিত ছাই, ভস্ম অথবা বায়বীয় পদার্থ ভূপৃষ্ঠে উৎক্ষেপনের প্রক্রিয়া। সরাসরি অগ্ন্যুৎপাত, উষ্ণ প্রস্রবণ বা গেইসার আগ্নেয় কর্মকাণ্ডের উদাহরণ। অগ্ন্যুৎপাত বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন গ্যাসীয় পদার্থ, জলীয়বাষ্প, ধূলিকণা, ভস্ম ইত্যাদি নিক্ষেপ করে থাকে। অগ্ন্যুৎপাতের সময় নিক্ষিপ্ত পদার্থের প্রায় ৯০% জলীয়বাষ্প। এ কারণে ব্যাপক অগ্ন্যুৎপাতের সময় সন্নিহিত অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। প্রতি শতাব্দীতেই অগ্ন্যুৎপাতের ফলে জলবায়ু ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। বায়ুমণ্ডলে নিক্ষিপ্ত গ্যাসীয় পদার্থ ও ভস্মাদি তাপ বিকিরণে বাধার সৃষ্টি করে। ব্যাপক অগ্ন্যুৎপাতে পরবর্তী কয়েক বছর এ অবস্থা বিরাজ করে। ১৯৯১ সালে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ফিলিপাইনে অবস্থিত মাউন্ট পিনাটুবো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে জলবায়ুর ওপর তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ঐ অগ্ন্যুৎপাতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ০.৫° সে. হ্রাসপ্রাপ্ত হয় (Adams.2006)। ১৮১৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার মাউন্ট টামবোরা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের পর একটি বছর গ্রীষ্মকাল অনুভূত হয়নি (Oppenheimer.2003)। মাঝে মধ্যে আগ্নেয়গিরি অঞ্চলসমূহে সৃষ্ট অগ্ন্যুৎপাত ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণ হয়ে দ্বাড়ায় (Wignall-2001)।
মহাসাগরে পরিবর্তনশীলতা (Oceanic variability)
মহাসাগরগুলো জলবায়ুর অন্যতম নিয়ন্ত্রক বা মৌলিক অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। স্বল্প মেয়াদি সামুদ্রিক প্রবাহের তারতম্য জলবায়ুর আঞ্চলিক প্রভেদ সৃষ্টি করে, পরিবর্তন ঘটায়। দীর্ঘমেয়াদি তাপজলীয় প্রবাহ এক অক্ষাংশ থেকে আরেক অক্ষাংশে তাপ পরিবহনের কাজ করে থাকে। উষ্ণ স্রোত বরফাচ্ছাদিত উচ্চ অক্ষাংশ বরফমুক্ত রাখে ও বৃষ্টিপাত ঘটায়। আবার শীতল স্রোত নিম্ন অক্ষাংশে শীতলতা আনয়ন করে।
প্রকৃতির ওপর মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপ (Unexpected human interference)
মানুষের কার্যকলাপে বর্তমানে বিশ্বে জলবায়ুর পরিবর্তন সৃষ্টি হচ্ছে। বিগত ও বর্তমান শতাব্দীতে চলমান বৈশ্বিক উন্নয়ন প্রকৃতির ওপর মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপের ফল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষের কার্যকলাপ সরাসরি আবহাওয়া ও জলবায়ুর ওপর প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাপক পরিসরে সেচকার্য কোনো অঞ্চলের 'বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতার ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে। মানুষের হস্তক্ষেপে জলবায়ুর পরিবর্তন প্রসঙ্গে যুক্তি-তর্কের অবতারণা হচ্ছে। বিগত দশকসমূহের তুলনায় বর্তমানে মানুষের কর্মকান্ডে উষ্ণায়নের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে (IPCC.2007)। ফলাফল পর্যবেক্ষণ সৃষ্ট বিতর্কে অবিলম্বে উষ্ণায়ন কমানোর পন্থা নির্ধারণ এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অভিযোজনের (Adaptation) বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মানবীয় কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট ক্ষতিকর বিষয়গুলো হচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানির যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে বায়ুমণ্ডলে অতিমাত্রায় কার্বন ডাইঅক্সাইড সংযোজন, CFC., মিথেন ও সালফার ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ, ইত্যাদি। উপরিউক্ত বিষয়গুলো পৃথকভাবে অথবা সম্মিলিতভাবে জলবায়ু, ক্ষুদ্রায়তন জলবায়ু অথবা জলবায়ুর নিয়ামকসমূহের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে।
জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Read more