(Wordwide Communication of Bangladesh)
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষতার যুগে যখন গোটা পৃথিবী একটি গ্রামে পরিণত হচ্ছে (Global Village) তখন বিশ্বের কোনো দেশের পক্ষেই আর একা চলা সম্ভব নয়। প্রয়োজনের তাগিদেই এক দেশকে অন্য দেশের সাহায্য সহযোগিতা গ্রহণ করতে হয়। আর বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো যারা প্রতিনিয়ত নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে উন্নত দেশের কাতারে পৌছাতে চায় তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রসমূহের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হয়। পরিবহন ও যোগাযোগ এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ স্থাপন করে বিশ্বায়নের (Globalization) সেই অগ্রযাত্রায় নিজেকে গর্বিত অংশীদার করতে চায়। এজন্য বাংলাদেশ চেষ্টা করছে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে।
বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পন্ন হয় তিনটি মাধ্যমে। যথা-
১. স্থলপথ: বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ক্ষেত্রে স্থলপথ প্রধানতম মাধ্যম হলেও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে স্থলপথ খুব বেশি গুরুত্ব বহন করে না। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশ তাদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে স্থলপথকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখনো তা সম্ভব হয়নি। তবে প্রস্তাবিত এশিয়ান হাইওয়ের সাথে বাংলাদেশ যুক্ত হলে চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, মায়ানমার, ভারত, পাকিস্তান, ইরান হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহের সাথে স্থলপথে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
বাংলাদেশের স্থলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা দুটি উপায়ে সংঘটিত হয়ে থাকে। যথা- ১. সড়কপথ ২. রেলপথ।
i. সড়কপথ: বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান সড়কপথে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অন্যতম অন্তরায়। কেননা বাংলাদেশের তিনদিকে ভারত এবং একদিকে বঙ্গোপসাগর। দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে যে কয়েক কি.মি. সীমান্ত মায়ানমারের সাথে আছে; সেই অংশটুকু আবার পর্বতসঙ্কুল। ফলে সড়কপথে অন্য দেশগুলোর মধ্যে কেবল ভারতের সাথে বাংলাদেশের সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বর্তমানে ঢাকার সাথে ভারতের কোলকাতা এবং ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলার মধ্যে সরাসরি বাস যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। এই সমস্ত পথে উভয় দেশের সরকারি বাসের সাথে বেসরকারি শোভনীয় অনেক বাস চলাচল করে। এছাড়া বাংলাদেশের ডোমার, বেনাপোল, দর্শনা, হিলি বাংলাবান্ধা, তামাবিল প্রভৃতি ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ২৪ টি স্থল বন্দর আছে। এই সকল বন্দরের মাধ্যমে ট্রাকের সাহায্যে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রতিনিয়ত বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।
প্রধান রুট: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সড়কপথে প্রধান রুট ২টি। যথা-
(i) ঢাকা যশোর বেনাপোল কোলকাতা
(ii) ঢাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়াআগরতলা
ii. রেলপথ: ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশের সাথে অন্যান্য দেশের রেল যোগাযোগও গড়ে উঠেনি। এদেশের সাথে এক সময় ভারতের সরাসরি রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু ছিল। তবে স্বাধীনতার পরে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি অনিয়মিতভাবে আবার ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পুনরায় রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। বর্তমানে উভয় দেশের মধ্যে ব্যবহৃত রেল রুট নিম্নরূপ:
ঢাকা (কমলাপুর) টঙ্গী জয়দেবপুর বঙ্গবন্ধু সেতু ঈশ্বরদী পোড়াদহ দর্শনা গেঁদে
(পশ্চিমবঙ্গ) কোলকাতা
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক যোগসূত্র থাকায় এবং প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে অনেক বেশি বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়ায় এই দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্র খুবই সম্ভাবনাময়। দুই দেশ যদি নিজেদের মধ্যে আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাসমূহ দূর করে, তাহলে এই পথে রেল একটি লাভজনক মাধ্যম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
২. জলপথ: বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে একসময় জলপথ সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল ব্যবহৃত মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হতো। আরামদায়ক এবং খরচ সাশ্রয়ী হলেও সময় বেশি লাগে বলে আন্তর্জাতিক জলপথে বর্তমান সময়ে যাত্রী পরিবহন করা হয়না বললেই চলে। তবে বিশ্বব্যাপী আমদানি রপ্তানি কর্মকাণ্ডের সিংহভাগ হয় জলপথে। বাংলাদেশের দক্ষিণে দিগন্ত বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর থাকায় এবং চট্টগ্রাম ও মংলায় দুটি সমুদ্র বন্দর থাকায় বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সমুদ্র পথকে অত্যন্ত সার্থকভাবে ব্যবহার করে থাকে। সমুদ্রপথেই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৭৫ ভাগ সম্পন্ন হয়ে থাকে। নিরাপদ এবং অনুকূল ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিশ্বের অনেক দেশের জাহাজ বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশের সাথে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের মাধ্যমে জলপথে ভারত, পাকিস্তান, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, তুরস্ক, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, ইংল্যান্ড, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, আর্জেন্টিনা, নিউজিল্যান্ড, চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, ', মালয়েশিয়া,মালয়েশিয়া, ি সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মায়ানমার প্রভৃতি দেশের বড় বড় বন্দরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে উঠেছে।
সমুদ্রপথে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের যোগাযোগ আরো সমৃদ্ধ করতে কক্সবাজারের সোনাদিয়া এবং বরগুনার নিকট আকরাম পয়েন্টে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের সমীক্ষা চালানো হচ্ছে।
৩. বিমানপথ: বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে বিমানপথ খুব বেশি ভূমিকা পালন করতে না পারলেও বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে বিমানপথ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এক জনপ্রিয় মাধ্যম। ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি সরকারি এক আদেশে 'বাংলাদেশ বিমান' নামে জাতীয় বিমান সংস্থা গঠন করা হয়। ৫ই ফেব্রুয়ারি ভারতের দেওয়া একটি ডাকোটা বিমান নিয়ে এদেশে বিমানের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ১৯৭৩-৭৪ সালে সর্বপ্রথম বাংলাদেশ একটি বোয়িং বিমান সংগ্রহ করে এবং এই বিমানের দ্বারা নিয়মিত আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে।
বাংলাদেশ বিমানের ১২টি এয়ারক্র্যাফট রয়েছে। যার মধ্যে ৪টি 770-300s, ২টি 787-800s, ৪টি 737-800s এবং ৩টি Dash 8-Q400s। এই সমস্ত প্লেনে করে বাংলাদেশ বিমান বিশ্বের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দেশের সাথে যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। (সূত্র- বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৯)।
বাংলাদেশে বর্তমানে তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আছে। এগুলো হলো-
i. হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ঢাকা।
ii. শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম।
iii. ওসমানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেট।
জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লিমিটেড দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে আকাশ পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নানা সীমাবদ্ধতা (আর্থিক, আকাশপোত) সত্ত্বেও বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ দেশের অভ্যন্তরে ৭টি এবং বাইরে ১৫টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করে। আন্তর্জাতিক গন্তব্যের ফ্লাইটগুলোর মধ্যে ২টি সার্কভুক্ত দেশে, ৪টি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, ৮টি মধ্যপ্রাচ্যে এবং একটি ইউরোপে পরিচালিত হয়।
আন্তর্জাতিক রুটে বিমানের গন্তব্য স্টেশনসমূহ নিম্নরূপ-
ঢাকা সিঙ্গা পুরঢাকা করাচি
ঢাকা কুয়ালালামপুর ঢাকা মাস্কট
ঢাকা ব্যাংককঢাকা দুবাই
ঢাকা হংকং ঢাকা দোহা
ঢাকা কাঠমুন্ডু ঢাকা জেদ্দা
ঢাকা কলকাতাঢাকা রোম
ঢাকা দিল্লী ঢাকা ম্যানচেস্টার
এছাড়া ঢাকার সাথে নিউইয়র্ক, টরেন্টো, কলম্বো প্রভৃতি শহরের বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা কা হচ্ছে। ইদানিং সরকারি বিমান সংস্থার পাশাপাশি এদেশের কিছু বেসরকারি বিমান সংস্থা কলকাতা, ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর প্রভৃতি শহরে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন শুরু করেছে।
পরিচালনাগত ত্রুটি থাকায় বিমান একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তবে সরকার ও প্রশাসন এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করায় বিমান পুনরায় ক্ষতির মাত্রা কাটিয়ে উঠছে। যদি পরিবর্তনের এই ধারা অব্যাহত থাকে তাহলে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে বিমান অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
উপরের আলোচনা থেকে আমরা একথা বলতে পারি যে, ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে স্থলপথে বাংলাদেশ খুব বেশি দেশের সাথে সংযুক্ত না হলেও সমুদ্র তথা জল ও আকাশপথে বিশ্বের অনেক বড় ও উন্নত দেশের সাথে সংযুক্ত। আমাদের আমদানি-রপ্তানি তথা বাণিজ্যিক কর্মকান্ডে এই সমস্ত যোগাযোগ মাধ্যম অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা যদি বৃদ্ধি করা যায় তাহলে বাংলাদেশের উন্নয়নে তা কার্যকর অবদান রাখতে পারবে।
পরিবহন ও যোগাযোগ-ড. হ জ ম হাসিবুশ শাহীদ-স্যারে লেখা বই
Read more