(Causes and Distribution of Bangladesh Population due to Density)
জনসংখ্যার ঘনত্ব
জনসংখ্যার ঘনত্ব বলতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে কত জন লোক বাস করে তাকে বোঝায়। কোনো দেশের মোট জনসংখ্যাকে সে দেশের মোট আয়তন দ্বারা ভাগ করলেই প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাসকারী লোকসংখ্যার ঘনত্ব পাওয়া যায়। জনসংখ্যার ঘনত্ব নির্ণয়ের সূত্রটি নিম্নরূপ-
জনসংখ্যার ঘনত্ব = মোট জনসংখ্যা মোট আয়তন।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান অষ্টম কিন্তু আয়তনের দিক দিয়ে এর স্থান তিরানব্বইতম। বর্তমানে এদেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১,২৭৮ জন (সূত্র: World Population Review, 2018) এবং এ ঘনত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এদেশের সর্বত্র জনসংখ্যা সমানভাবে বণ্টিত নয়। ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, মৃত্তিকা, পরিবহন ও যাতায়াত ব্যবস্থা, শিল্প, ব্যবসা বাণিজ্য প্রভৃতি উপাদানের প্রভাব সর্বত্র সমান নয় বলে বিভিন্ন অঞ্চলের জনসংখ্যার ঘনত্ব ও বণ্টনের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা বণ্টনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
বাংলাদেশ পৃথিবীর প্রধান ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল। তবে এদেশের সব জায়গায় জনসংখ্যার সুষম বণ্টন পরিলক্ষিত হয় না। ভূপ্রাকৃতিক কারণে চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়িয়া এলাকায় ও দক্ষিণের বনাঞ্চলগুলোর পার্শ্ববর্তী এলাকায় জনবসতির ঘনত্ব খুবই কম। অন্যদিকে, নদ-নদী, উর্বর মৃত্তিকা, সমতল ভূভাগ ও নানাবিধ অর্থনৈতিক কারণে ঢাকা, কুমিল্লা ইত্যাদি এলাকায় নিবিড় জনবসতি পরিলক্ষিত হয়।
গ্রামে জনসংখ্যার বণ্টন: দেশের কতিপয় পার্বত্য ও উচ্চভূমি বাদে সমস্ত ভূমিই সমতল ও উর্বর। যেখানে রয়েছে গ্রামীণ জনপদ। এসব সমতল ভূমিতে কম পরিশ্রমে অধিক ফসল উৎপন্ন হয়। এছাড়া প্রতিবছর পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র প্রভৃতি নদী এবং এদের শাখা নদীগুলো দ্বারা পলি সঞ্চিত হয় বলে জমির উর্বরাশক্তি নষ্ট হয় না। অধিক সার প্রয়োগ না করেও অল্প পরিশ্রম ও অল্প খরচে গ্রামীণ অধিবাসীরা ধান, পাট, আখ ও অন্যান্য শস্য প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন করতে সক্ষম হয়। তাই গ্রামাঞ্চলে লোকবসতির ঘনত্ব অধিক।

বাংলাদেশ মৌসুমি জলবায়ুর অন্তর্গত এবং এর প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। ফলে কৃষিকাজের জন্য পানি সেচের বিশেষ প্রয়োজন হয় না এবং কৃষি উৎপাদন সহজ হয়। এ কারণে গ্রামে জনসংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে ঘনবসতিপূর্ণ
হয়েছে।
বাংলাদেশে সমতল অঞ্চলে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন: সড়কপথ, রেলপথ এবং জলপথ আছে। অতি সহজে নানা ধরনের যানবাহনে যাতায়াত এবং পরিবহন ব্যবস্থার সুবিধা এ দেশের গ্রামাঞ্চলে লোকবসতির ঘনত্বের অন্যতম কারণ। এছাড়া সমতল ভূমিতে অধিবাসীদের ঘরবাড়ি তৈরি করে বসবাস করা সহজতর বলে লোকবসতির ঘনত্ব অধিক।
বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার দক্ষিণাংশে জনবসতি অতি বিরল। বান্দরবান জেলায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৮৭ জন, রাঙ্গামাটি জেলায় ৯৭ জন, খাগড়াছড়ি জেলায় ২২৩ জন বসবাস করে।
[Population Monograph of Bangladesh, November, 2015]
অন্যদিকে, পদ্মা ও মেঘনার মোহনার নিকটবর্তী অঞ্চলে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১,০০০ জনের অধিক লোক বাস করে। এটি বাংলাদেশের অতি নিবিড় অঞ্চল। এখানে প্রগাঢ় বা নিবিড় চাষের মাধ্যমে বছরে দুইটি বা কোনো কোনো স্থানে তিনটি ফসল উৎপাদন করা হয়। উর্বর পলল সমৃদ্ধ কৃষিজমির জন্য এ অঞ্চলে জনবসতি খুবই ঘন হয়েছে।
আবার মধুপুর ও ভাওয়ালের গড় এবং বরেন্দ্রভূমির অনুর্বর জমিতে কৃষিকাজের বিশেষ সুবিধা না থাকায় সেখানে জনবসতি কম। সাবেক সিলেট জেলার 'হাওর' বা বিল এলাকায় জলমগ্নতার দরুন এবং বৃহত্তর দিনাজপুর, কুষ্টিয়া ও যশোরের কোনো কোনো অংশে জমির অনুর্বরতার জন্য জনসংখ্যা তেমন ঘন নয়।
শহর এলাকায় জনসংখ্যা বণ্টন: বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং এটি শিল্প ও বাণিজ্যে অনুন্নত। ১৯৭৪ সালের
হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশের জনসংখ্যার মাত্র ৮.৮% লোক শহরে বাস করে। ১৯৯১ সালের হিসাব অনুযায়ী তা বৃদ্ধি পেয়ে ১৩% এ দাঁড়িয়েছে। ১৯৯২ সালে শহরের জনসংখ্যা ছিল ১৫% আর তা বৃদ্ধি পেয়ে ২০০১ সালে হয়েছে। ২৩%। বর্তমানে এদেশে শহরে জনসংখ্যার হার প্রায় ৩৫.০৩% (সূত্র- বিশ্বব্যাংক-২০১৮)।
বর্তমানে এদেশের ৫০০০ ও তার অধিক জনসংখ্যাকে নগরীয় জনসংখ্যারূপে গণ্য করা হয়। অবশ্য ৫০০০ অপেক্ষা কম অধিবাসীর কয়েকটি জনসংখ্যাকে স্থানীয় ও অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্যের জন্য শহর হিসেবে ধরা হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে ১১টি সিটি কর্পোরেশন রয়েছে। এছাড়া ১৫টি বৃহৎ নগর (City) রয়েছে যেগুলোর জনসংখ্যা লক্ষাধিক। যথা-
সারণি-২.১৫: প্রধান প্রধান শহরের জনসংখ্যা-২০১৯
| শহরের নাম | লোকসংখ্যা | শহরের নাম | লোকসংখ্যা |
| ঢাকা | ১০,৩৫৬,৫০০ | যশোর | ২৪৩,৯৮৭ |
| চট্টগ্রাম | ৩,৯২০,২২২ | সিলেট | ২৩৭,০০০ |
| খুলনা | ১,৩৪২,৩৩৯ | ময়মনসিংহ | ২২৫,১২৬ |
| রাজশাহী | ৭০০,১৩৩ | গাজীপুর | ২৩১,০৬১ |
| কুমিল্লা | ৩৮৯,৪১১ | নারায়ণগঞ্জ | ২২৩,৬২২ |
| নাটোর | ৩৬৯,১৩৮ | বগুড়া | ২১০,০০০ |
| রংপুর | ৩৪৩,১২২ | দিনাজপুর | ২০৬,২৩৪ |
| কক্সবাজার | ২৫৩,৭৮৮। | বরিশাল | ২০২,২৪২ |
উৎস: Worldometer.com-2019
বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। এদেশের সর্বত্র জনসংখ্যার বণ্টন সমান নয়। কিন্তু আয়তনে ছোট বলে জনসংখ্যা বণ্টনের সুনির্দিষ্ট কাঠামো প্রদান করা কষ্টকর। ভূপ্রকৃতি, মৃত্তিকা, জলবায়ু, পরিবহন ও যাতায়াত ব্যবস্থা, শিক্ষা, শিল্প, ব্যবসা বাণিজ্য, নগরায়ণ প্রভৃতি নিয়ামক দ্বারা বাংলাদেশের গ্রামীণ ও শহুরে জনসংখ্যার বণ্টন বিশেষভাবে প্রভাবিত।
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল রাষ্ট্র (৮ম)। এ দেশের আয়তনের তুলনায় লোকসংখ্যার ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। তবে এ জনসংখ্যার ঘনত্ব সর্বত্র সমভাবে বণ্টিত নয়। ভূ-প্রকৃতি, জলবায়ু, মৃত্তিকার উর্বরতা, শিল্পায়ন, নগরায়ণ প্রভৃতি কারণে এদেশে জনসংখ্যার অসম বণ্টন পরিলক্ষিত হয়।
দূষণ ও দুর্যোগ- প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী- স্যারে লেখা বই
Read more