(Climate Change: Bangladesh Perspective)
বাংলাদেশের জলবায়ু প্রায় সমভাবাপন্ন। এখানে শীতকাল দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ক্রান্তীয় অঞ্চলের অন্তর্গত হওয়ায় ঋতুভিত্তিক জলবায়ুর বৈচিত্র্য থাকলেও সার্বিক জলবায়ুর তেমন পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় না। তবে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে বাংলাদেশের জলবায়ুর যে পরিবর্তন হয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আজ থেকে ১৮ হাজার বছর পূর্বে বর্তমান বাংলাদেশসহ সংলগ্ন এলাকার জলবায়ু ছিল শুষ্ক মহাদেশীয় (dry continental)। তারপর বিশ্বের জলবায়ুর পরিবর্তন ধারায় পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে উষ্ণ আর্দ্র ক্রান্তীয় জলবায়ুতে রূপান্তরিত হয়েছে।
বিগত কয়েক দশক ধরে দেশের জলবায়ুতে কিছু বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। এর ফলস্বরূপ দেশে অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি ও বন্যা দেখা দিচ্ছে। ভূবিদরা দেশের উত্তর-পশ্চিমাংশে মরুময়তার বৈশিষ্ট্য খুঁজে পেয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনে যদি মরু বিস্তার ঘটে তাহলে দেশের উত্তর-পশ্চিমাংশে মরু এলাকার ভূমিরূপ (land form) সৃষ্টি হবে।
মানুষের নিয়ন্ত্রণহীন সম্পদ ব্যবহারের কারণে মাত্রাতিরিক্ত গ্রিন হাউস গ্যাস অর্থাৎ কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড এবং ক্লোরোফ্লুরো কার্বন (CFC) প্রভৃতি গ্যাস নির্গমনের ফলে বিশ্বে উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের যে ধারা শুরু হয়েছে তাতে বিশ্বের স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশ ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে। আর এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশ আছে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে। অন্যান্য দেশ এ ক্ষতির মুখোমুখি হওয়ার আগেই বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়ে গেছে। আগামী দিনগুলোতে এর মাত্রা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জাতিসংঘ তার সতর্কীকরণে বলেছে, পরবর্তী ৫০ বছরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৩ ফুট বাড়লে তাতে বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী একটি অংশ প্লাবিত হবে এবং প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি পানির নিচে চলে যাবে। আনুমানিক ৩ কোটি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি হারিয়ে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (IPCC) এর তথ্য অনুসারে, ২০৩০ সালের পর নদীর প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে যাবে। ফলে এশিয়ায় পানির স্বল্পতা দেখা দেবে। ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাবে ঘন ঘন বন্যা, ঝড়, অনাবৃষ্টি এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে, যা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে অনুভূত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।
২০০৯ সালে বিশ্বব্যাংক বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য ৫টি ঝুঁকিপূর্ণ দিক চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো- মরুকরণ, বন্যা, ঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং কৃষিক্ষেত্রে অধিকতর অনিশ্চয়তা। এগুলোর মধ্যে মরুকরণ ও কৃষিক্ষেত্রে অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশ ততটা ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তবে বন্যায় বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম, ঝড়ে দ্বিতীয় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে দশম। এছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বাংলাদেশ।
| জলবায়ু অঞ্চল | বিস্তৃত অঞ্চলব্যাপী সমরূপী একই বৈশিষ্ট্যের জলবায়ু পরিলক্ষিত হলে তা জলবায়ু অঞ্চল গঠন করে। ভৌগোলিক অবস্থানগত পার্থক্যের কারণে পৃথিবীর তিনটি প্রধান জলবায়ু অঞ্চল হলো- নিরক্ষীয়, ভূমধ্যসাগরীয় ও মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চল। |
| বাংলাদেশের জলবায়ু | বাংলাদেশ মৌসুমি জলবায়ুর অন্তর্গত। এ দেশের জলবায়ু মোটামোটি আর্দ্র, উষ্ণ ও সমভাবাপন্ন। বাংলাদেশের জলবায়ুকে গ্রীষ্মকাল, শীতকাল ও বর্ষাকাল এই তিন ঋতুতে ভাগ করে জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হয়। গ্রীষ্মকালে কালবৈশাখী নামে বায়ুমণ্ডলীয় গোলযোগ দেখা দেয়। শীতকালে তাপমাত্রা খুবই কম থাকে। বর্ষাকালে প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের কোথাও কোথাও বন্যাও দেখা দেয়। |
| বৃষ্টিমাপক যন্ত্র | যে যন্ত্রের সাহায্যে বৃষ্টির পানি মাপা হয় তাকে বৃষ্টিমাপক যন্ত্র বলে। এ যন্ত্রের সাহায্যে সহজেই বৃষ্টির পরিমাণ জানা যায়। |
| তাপমান যন্ত্র | বায়ুমণ্ডলের তাপের তীব্রতাকে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বলে। বায়ুর গরম বা ঠান্ডা অবস্থার মাত্রাই তাপমাত্রা। এই তাপমাত্রা মাপক যন্ত্রের নাম থার্মোমিটার (Thermometer) বা তাপমান যন্ত্র। |
| হাইগ্রোমিটার | শুষ্ক ও আর্দ্র কুণ্ডযুক্ত হাইগ্রোমিটার (hygrometer) এর সাহায্যে বায়ুর আর্দ্রতা মাপা হয়। এ যন্ত্রে এক শ্রেণির দু'টি থার্মোমিটার একটি ফ্রেমে পাশাপাশি আটকানো থাকে। একটির প্রান্তে কুন্ড খোলা থাকে এবং অন্যটির প্রান্তে কুণ্ডটি একখণ্ড মসলিন কাপড়ে আবৃত থাকে। মসলিনে আবৃত এ কুণ্ডটি একটি পাত্রে রাখা পানিতে শলতের মতো সংযুক্ত করে ভিজানো করে থাকে। |
| এ্যানিমোমিটার | বায়ুর গতিবেগ সঠিকভাবে নির্ণয় করার জন্য যে যন্ত্র ব্যবহার করা হয় তাকে এ্যানিমোমিটার বলে। এই যন্ত্রে লম্বভাবে দণ্ডায়মান একটি শলাকার মাথায় তিনটি বা চারটি সরু দণ্ডের প্রান্তভাগে বাটি থাকে। |
| সমতাপ রেখা | ভূপৃষ্ঠের একই তাপমাত্রাবিশিষ্ট অঞ্চলকে মানচিত্রে যখন একটি রেখা দ্বারা যুক্ত করা হয় তখন তাকে সমতাপ রেখা বলে। |
| সমবর্ষণ রেখা | বৃষ্টিপাতের ভিন্নতা থাকলেও একই বা সমপরিমাণ বৃষ্টিপাতপ্রবণ অঞ্চল রেখা দ্বারা যুক্ত করে মানচিত্রে উপস্থাপন করা হয়- একে সমবর্ষণ রেখা বলে। |
| জলবায়ুর পরিবর্তনশীলতা | জলবায়ুর পরিবর্তন সর্বদাই বারিপাত ও তাপমাত্রার তারতম্যের পারস্পরিক জটিল ক্রিয়ায় সংঘটিত হয়। বারিপাতের ফলে আর্দ্র মরুতে ভূমিরূপগত পরিবর্তন বেশি হয়। তাপমাত্রার পরিবর্তনে পৃথিবীপৃষ্ঠের ভূমিরূপে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন সাধিত হয়। বিজ্ঞানীদের মতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন কারণের মধ্যে প্লেটের গতি, সৌর শক্তির উৎপাদন, কক্ষপথের পরিবর্তন, অগ্ন্যুৎপাত, সামুদ্রিক পরিবর্তনশীলতা, প্রকৃতির উপর মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপ প্রভৃতি অনেকাংশেই দায়ী। |
| গ্রিন হাউস | শীতপ্রধান দেশে যেখানে সাধারণ তাপ ও আলোতে সবুজ উদ্ভিদ জন্মানো সম্ভব নয় সেখানে এক বিশেষ ধরনের কাঁচের ঘরে উদ্ভিদ জন্মানো হয়; একে গ্রিন হাউস বলে। প্রতিনিয়ত কার্বন ডাইঅক্সাইড, ক্লোরোফ্লুরো কার্বন, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি গ্রিন হাউস প্রভাব সৃষ্টিকারী গ্যাসের কারণে বিশ্ব উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে। |
গ্রিণ হাউস প্রতিক্রিয়া | গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া মূলত একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যা ভূপৃষ্ঠের উষ্ণায়ন ঘটায়। সূর্যরশ্মি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর এর কিছু অংশ মহাশূণ্যে ফিরে যায় এবং অবশিষ্টাংশ গ্রিন হাউস গ্যাস কর্তৃক শোষিত ও। পুনরায় বিকিরিত হয়ে বায়ুমণ্ডল ও ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। বায়ুমণ্ডল ও ভূপৃষ্ঠের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি বর্তমানে সমস্যাসংকুল হয়ে উঠেছে মূলত মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকান্ডের ফলে। বিশেষ করে বর্তমান প্রযুক্তিভিত্তিক সভ্যতায় ব্যাপকহারে জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, তেল, গ্যাস) পোড়ানো হচ্ছে, কৃষির প্রয়োজনে বন উজাড় করা হচ্ছে। ফলে বিশ্ব গ্রিন হাউস গ্যাসের ঘনত্ব বায়ুতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিণতিতে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটছে, যাকে বলা হচ্ছে গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া। |
| বৈশ্বিক উষ্ণায়ন | বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর বর্তমান সভ্যতায় মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড যেমন- শিল্পকারখানা স্থাপন, কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সার ব্যবহার, ফ্রিজ, এসি ইত্যাদি বিলাস সামগ্রীর ব্যবহার প্রভৃতি কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে প্রতিনিয়ত কার্বন ডাইঅক্সাইড, ক্লোরোফুরা কার্বন, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি গ্রিন হাউস প্রভাব সৃষ্টিকারী গ্যাসের কারণে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটছে। |
জলবায়ু অঞ্চল ও জলবায়ু পরিবর্তন-ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান স্যার এর লেখা বই
Read more