পাঠ-৬: পৃথিবীর রাজনৈতিক অঞ্চলসমূহ: ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান

ভূগোল ২য় পত্র - ভূগোল - এইচএসসি | NCTB BOOK

13

(Political Regions of the World: India, South Koria, Japan)

ভারত

অবস্থান ও সীমানা (Location and boundary): দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম দেশ ভারত। রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া বা
ভারতীয় প্রজাতন্ত্র ২৮টি রাজ্য ও নয়টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত। এই রাজ্য ও অণ্যলগুলো আবার ৬১০টি জেলায় (সূত্র: উইকিপিডিয়া) বিভক্ত। ভারতের সীমান্তের মোট পরিসীমা ১৫,১০৬.৭০ কিলোমিটার। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের কালে সৃষ্ট র‍্যাডক্লিফ লাইন অনুসারে পাকিস্তান ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সীমা নির্ধারিত হয়েছে। এটি বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ।

আয়তন ও জনসংখ্যা: ভারতের আয়তন ও জনসংখ্যা যথাক্রমে ৩,২৮৭,৪৬৯ বর্গ কি. মি. (১,২৬৯,২৯৯ বর্গ মাইল) এবং ১,৩৬০,২২৭,৫১০ জন (worldometer, December, 2018)।

ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ৪,০৫৩ কিলোমিটার (সূত্র: bangladesh.gov.bd)। ভারত ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের মধ্যবর্তী সীমান্তরেখা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা নামে পরিচিত। ভারতীয় রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ, সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশ বরাবর ৪,০৫৭ কিমি জুড়ে এই সীমান্ত প্রসারিত। উভয় রাষ্ট্রই কাশ্মীরের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ওপর নিজ কর্তৃত্ব দাবি করে। ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের পর এই অঞ্চল চীনের দখলে চলে যায়। এছাড়াও ভারতের সাথে নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান ও মায়ানমারের সীমান্ত রয়েছে।

জলবায়ু (Climate): ভারতে একদিকে অধিক বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চল (মৌসিনরাম, চেরাপুঞ্জি), অপরদিকে মরুভূমির (যেমন- রাজস্থানে) উষ্ণতা রয়েছে। একদিকে উপকূলভাগে মৃদুভাবাপন্ন জলবায়ু, অপরদিকে অভ্যন্তরভাগে পাঞ্জাব, রাজস্থান অঞ্চলের মহাদেশীয় জলবায়ু বিরাজ করে। আবার হিমালয় পর্বতের অবস্থানও ভারতের জলবায়ুকে প্রভাবিত করছে।

ভূপ্রকৃতি (Physiography): ভারতের ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চলকে ৫টি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা: ১. পার্বত্য অঞ্চল, ২. উত্তরের বিশাল সমভূমি অঞ্চল ৩. উপকূলীয় সমভূমি অঞ্চল, ৪. দাক্ষিণাত্যের মালভূমি অঞ্চল, ৫. মরুভূমি অঞ্চল।

কৃষি ও কৃষি সম্পদ (Agriculture & agricultural resources): ভারত কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষি ভারতীয় অর্থনীতির
ভিত্তিস্বরূপ। ভারতের শতকরা প্রায় ৬০-৭০ জন অধিবাসী কৃষির ওপর নির্ভরশীল। জাতীয় আয়ের শতকরা ১৬-১৭ ভাগ কৃষি ও আনুষঙ্গিক কার্যকলাপ থেকে আসে।

খনিজ উত্তোলন ও খনিজ সম্পদ (Mining & Mineral Resources): খনিজ সম্পদে ভারত মোটামুটি সমৃদ্ধ।
ভারতে উৎপাদিত খনিজগুলোকে তিনটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যথা-

১. জ্বালানি খনিজ: কয়লা, খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম প্রভৃতি।
২. ধাতব খনিজ: আকরিক লৌহ, তামা, সোনা রূপা, বক্সাইট, সীসা, দস্তা, ম্যাঙ্গানিজ, উলফ্রাম, নিকেল প্রভৃতি।
৩. অধাতব খনিজ: অভ্র, চুনাপাথর, জিপসাম, ডলোমাইট, ফসফেট, গন্ধক প্রভৃতি।

শিল্প (Industry): ভারতের প্রধান শিল্পগুলো হলো লৌহ-ইস্পাত, মোটর (Automobile), ওষুধ, টেক্সটাইল, কার্পাস বয়ন, পাট, চিনি, কাগজ, তামাক প্রভৃতি।
বাণিজ্য (Trade): আমদানি দ্রব্যের মধ্যে পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্য, যন্ত্রপাতি ও পরিবহনের সাজ-সরঞ্জাম, লৌহ-ইস্পাত ও ধাতব দ্রব্যাদি, মুক্তা ও অন্যান্য পাথর, খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল, বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক দ্রব্য, কৃত্রিম সার, কৃত্রিম যন্ত্র, প্লাস্টিক দ্রব্য, মেশিনারিজ, কপার ও জিংক প্রভৃতি প্রধান।
রপ্তানি দ্রব্যের মধ্যে চা, কফি, কাইবাদাম, মসলা, আকরিক লৌহ, সুতিবস্ত্র, তৈরি পোশাক, পাট ও চামড়াজাত দ্রব্যাদি, রাসায়নিক দ্রব্যাদি, যন্ত্রপাতি ও পরিবহনের সরঞ্জাম, পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্য, ধাতব দ্রব্য প্রভৃতি প্রধান।

দক্ষিণ কোরিয়া

দক্ষিণ কোরিয়া অনেক বছর জাপানের উপনিবেশ ছিল। ১৯৫৩ সালে কোরিয়া উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া নামে দুই ভাগে বিভক্ত হয়। দুই কোরিয়ার সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক ভিত্তি এক থাকলেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে বিস্তর পার্থক্য ছিল। উত্তর কোরিয়া, বিশেষভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সংস্কৃতি ও রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত ছিল। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়া অনেক বেশি প্রভাবিত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও রাজনীতি দ্বারা।

অবস্থান ও আয়তন (Location & Area): দক্ষিণ কোরিয়া পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ। এর উত্তরে উত্তর কোরিয়া, পূর্বে জাপান সাগর, দক্ষিণে কোরিয়া প্রণালী ও পশ্চিমে পীত সাগর অবস্থিত। ভৌগোলিক অবস্থান ৩৩° উত্তর থেকে ৩৯° উত্তর অক্ষাংশ এবং ১২৪° পূর্ব থেকে ১৩০° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। কোরিয়া প্রণালী জাপান থেকে দক্ষিণ কোরিয়াকে পৃথক করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল। এ দেশের মোট আয়তন ৯৮,৪৮০ বর্গ কিলোমিটার। বর্তমানে দেশটির মোট জনসংখ্যা প্রায় ৪৯,০২৪,৭৩৭ জন।

প্রাকৃতিক অঞ্চল (Natural Region): ভূপ্রাকৃতিক গঠন ও উদ্ভিজ্জের বৈশিষ্ট্য অনুসারে এ দেশকে ৫টি প্রাকৃতিক অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়। যথা- (১) দক্ষিণ-পূর্ব, (২) পার্বত্য, (৩) পূর্বাংশের উপকূলীয়, (৪) উত্তর-পশ্চিম এবং (৫) দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল।

জলবায়ু (Climate): দেশের দক্ষিণাংশের জলবায়ু উষ্ণ ও আর্দ্র এবং অবশিষ্টাংশ সমভাবাপন্ন। গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে এবং শীতকালে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে বায়ু প্রবাহিত হয়। গ্রীষ্মের মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়।

খনিজ সম্পদ (Mineral Resources): এ দেশে চুনাপাথর, রূপা, দস্তা, টাংস্টেন, আকরিক লৌহ, তামা, সীসা, গ্রাফাইট ও কয়লা পাওয়া যায়। এদেশে অ্যানথ্রাইট কয়লা বিপুল পরিমাণে উত্তোলন করা হয়।

শিল্প (Industries): কয়লা ও আকরিক লৌহ বর্তমান থাকায় এ দেশে শিল্প দ্রুত বিকাশ লাভ করেছে। সুতি ও পশমি বস্ত্র দেশটির প্রধান শিল্প। এছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়ায় রাসায়নিক তন্তু, পেট্রোকেমিক্যাল, যন্ত্রপাতি, সিমেন্ট, জাহাজ নির্মাণ এবং ইলেকট্রনিকস শিল্প প্রসার লাভ করেছে।
বাণিজ্য (Trade): দেশটি চাল, সয়াবিন, রেশম, মাছ, উন্নতমানের পোশাক, ইলেকট্রনিকস, কম্পিউটার যন্ত্রাংশ বিদেশে রপ্তানি এবং লোহা ও ইস্পাতজাত কলকজা, কাগজ, ঔষধ ও উন্নতমানের তুলা আমদানি করে।
জাপান

জাপানে সংসদীয় গণতন্ত্র বিরাজমান। এখানে সম্রাট প্রতীকী রাষ্ট্রপ্রধান। জাপানের স্থানীয় সরকারগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ আছে। তবে জাপানের ৪৭টি দপ্তর এবং কয়েক হাজার বড় শহর, ছোট শহর ও গ্রামের স্থানীয় সরকারগুলো স্থানীয় বিষয়গুলোর ব্যাপারে যথেষ্ট ক্ষমতা রাখে। জাপানের এক্সক্লুসিভ মৎস্য এলাকা ২০০ নটিক্যাল মাইল এবং আঞ্চলিক সমুদ্র সীমা ১২ নটিক্যাল মাইল। জাপানের সাথে আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে ইত্রোয়, কুনাসিরি এবং শিকোতার দ্বীপের যা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমানে রাশিয়া) দখল করে নিয়েছিল। জাপান দ্বীপসমূহকে নিজের দাবি করে। জাপানের পার্লামেন্টের নাম ডায়েট।

অবস্থান ও আয়তন (Location & Area): জাপান দক্ষিণে ২৪° উত্তর অক্ষাংশ থেকে উত্তরে ৪৬° উত্তর অক্ষাংশ
পর্যন্ত এবং পূর্বে ১২৮° পূর্ব দ্রাঘিমা থেকে পশ্চিমে ১৪৬° পূর্ব দ্রাঘিমা পর্যন্ত বিস্তৃত। এর আয়তন প্রায় ৩৭৭,৮৩৫ বর্গ কি.মি.। জাপান দেশটি সমুদ্রবেষ্টিত। এর চারিদিকের পানিভাগ বিভিন্ন নামে পরিচিত। জাপানের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১২৬,৯৮২,১৮৮ জন (সূত্র: worldometer, ফেব্রুয়ারি, ২০১৯)।

ভূপ্রকৃতি (Physiography): জাপানের অধিকাংশ স্থান (শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ) পার্বত্যভূমির অন্তর্গত। জাপানের পর্বতগুলো দুটি সমান্তরাল শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে উত্তর-দক্ষিণে ধনুকের আকারে বিন্যস্ত রয়েছে। এর একটি শ্রেণি পূর্বপ্রান্তে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল বরাবর এবং অপর শ্রেণিটি পশ্চিমপ্রান্তে জাপান সাগরের উপকূল বরাবর অবস্থান করছে। আর এদের মাঝে রয়েছে কয়েকটি নিম্ন উপত্যকা ও সমতলভূমি।
জলবায়ু (Climate): জাপান দেশটি নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলে অবস্থিত। জলবায়ুর পার্থক্য অনুসারে জাপানকে ৩টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়। যথা- ১। উপমেরুদেশীয়, ২। আর্দ্র মহাদেশীয়, ৩। আর্দ্র উপক্রান্তীয়।

কৃষি (Agriculture): জাপানের মোট কৃষিযোগ্য জমির ১২.৩৩ শতাংশ ধান চাষের জন্য ব্যবহৃত হয়। দক্ষিণ জাপান ধান চাষের প্রধান অঞ্চল। এ দেশে হেক্টর প্রতি ধানের উৎপাদন প্রায় ৫,৭৫০ কিলোগ্রাম। এছাড়া এখানে গম, যব, সয়াবিন, রাই, ওট ও তুঁত গাছের চাষ করা হয়ে থাকে। বর্তমানে এখানে ভুট্টা, ইক্ষু, কার্পাস, তামাক, আলু প্রভৃতি উৎপন্ন হচ্ছে। জাপানে নানারকম ফল উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে কমলালেবু, চেরি, পিচ, আপেল, আঙ্গুর প্রভৃতি প্রধান।
খনিজ সম্পদ (Mineral Resources): জাপান খনিজ সম্পদে বিশেষ সমৃদ্ধ নয়। খনিজ দ্রব্যের মধ্যে কয়লা, তামা,
গন্ধক, চিনামাটি, অ্যান্টিমনি, সীসা, ক্রোমাইট, সোনা, রূপা প্রভৃতি প্রধান। এছাড়া লোহা ও খনিজ তেলও এ দেশে পাওয়া যায়।

প্রধান শিল্পসমূহ (Main Industries): এদেশের কার্পাস, রেশম, লৌহ-ইস্পাত, জাহাজ নির্মাণ, কাগজ প্রভৃতি শিল্প খুব উন্নত। বর্তমানে গাড়ি, টেলিফোন, রেডিও, ক্যামেরা, ঘড়ি, ক্যালকুলেটর প্রভৃতি ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি উৎপাদনে জাপান প্রচুর উন্নতি করেছে। শিল্পের অভাবনীয় সাফল্যের জন্য জাপানকে প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার বলা হয়।
বাণিজ্য (Trade): জাপানের বাণিজ্যের বৈশিষ্ট্য হলো কাঁচামাল আমদানি এবং শিল্পজাত পণ্য রপ্তানি। জাপানের আমদানির ৪৫ শতাংশ আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এবং রপ্তানির ৪০ শতাংশ যায় এশিয়ার দেশসমূহে। জাপান প্রধানত তুলা, খনিজ তেল, কয়লা, চাউল ও অন্যান্য খাদ্যশস্য, পশম প্রভৃতি আমদানি করে এবং বস্ত্র, ইস্পাত, রাসায়নিক দ্রব্য, চিনামাটির বাসনপত্র, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক দ্রব্যাদি, ক্যামেরা প্রভৃতি রপ্তানি করে।

মানব ভূগোল - মোহা: আনিছুর রহমান ও মোঃ আব্দুর রাজ্জাক-স্যারে লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...